রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ মঙ্গলবার দুপুরে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১১টা ৪১ মিনিট; ঠিক তখন ঢাকার অদূরে ময়মনসিংহের ভালুকায় এর উৎপত্তি হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৪। সংস্থাটির ভাষায় এটি ছিল স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক রুবাইয়াৎ কবীর আমার দেশকে বলেন, বেলা ১১টা ৪১ মিনিটে এ ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৪। এটি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প; এ ধরনের মৃদু ভূমিকম্প প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হয়ে থাকে। এনিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক রুবাইয়াৎ কবীরের এই মতের সঙ্গে একমত নন দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবারের স্বল্পমাত্রার ক্ষণিকের এ ভূকম্পনে বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, সাধারণ মানুষের মনে তা ফের জাগিয়ে তুলেছে এক পুরোনো আতঙ্ক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রায়ই এমন স্বল্পমাত্রার কম্পন অনুভূত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এই ছোট ছোট ঝাঁকুনিগুলোকে সাধারণ বিষয় মনে হলেও, ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন এক মহাসংকটের পূর্বাভাস হিসেবে। তাদের মতে, ঘন ঘন এই মৃদু কম্পন আসলে মাটির নিচে জমে থাকা বিশাল শক্তির মৃদু বহিঃপ্রকাশ এবং এটি দেশে একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে।
সম্প্রতি দেশি-বিদেশি গবেষকদের সমন্বয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক গবেষণায়ও বাংলাদেশ ভয়াবহ বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে দেশে শীর্ষস্থানীয় ভূমিকম্প ও ভূতত্ত্ব প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী মঙ্গলবার রাতে আমার দেশকে বলেন, আমরা তো বলে বড় ভূমি ঝুঁকির কথা বলে আসছি; সরকার তো তা শুনছে না; কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এমতাবস্থায় বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হলে ম্যাসাকার হয়ে যাবে; দেশের বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাবে। ফলে সরকারের উচিত এ বিষয়ে এখনোই যথাযথ ভূমিকা নেওয়া। তিনি বলেন ১০০ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি; ফলে ছোট ছোট ঝাঁকুনিগুলোকে সাধারণ বিষয় মনে হলেও, আমাদেরকে বড় বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
২০২৩ সালের তুরস্কের ভূমিকম্পের ঘটনা কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৫৩ হাজার ৫০০ মানুষ মারা গেছে, যাদের বেশিরভাগই ভবন ধসে মারা যান। একইভাবে, আমরা যদি ২০১০ সালের হাইতির ৭ মাত্রা এবং চিলির ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে হাইতিতে দুর্বলভাবে নির্মিত ভবনের কারণে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, যেখানে চিলিতে মাত্র ২৮০ জন মারা যায়। যদিও চিলির ভূমিকম্পটি হাইতির ভূমিকম্পের চেয়ে ৮০০ গুণ বেশি শক্তি নির্গত করেছিল।
তিনি বলেন, অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো সময় বাংলাদেশে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হতে পারে। বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য ভূমিকম্পের প্রভাব কমাতে আমাদের অবিলম্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অবশ্যই শহরগুলোর বিদ্যমান ভবনগুলোর কাঠামোগত মূল্যায়ন করতে হবে এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধের ক্ষমতার ভিত্তিতে সেগুলোকে দুর্বল (লাল), মাঝারি দুর্বল (হলুদ) এবং তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী (সবুজ) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে হবে। এই শ্রেণিবিন্যাস কেন্দ্রীয় ও নগর কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে রেট্রোফিটিং প্রয়োজন, যা এমন ভবনগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দিতে সাহায্য করবে। এটি ব্যাংকগুলোকে যথাযথ নথিপত্রের ভিত্তিতে রেট্রোফিটিংয়ের জন্য ঋণ প্রদানেও সক্ষম করবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ভবনের রেট্রোফিটিংয়ের জন্য একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এছাড়াও সম্ভাব্য বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তিনি আরো আটটি পরামর্শ দিয়েছে।
কেন বাড়ছে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি?
বাংলাদেশ মূলত তিনটি গতিশীল টেকটনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্ডিয়ান প্লেটটি প্রতি বছর উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার গতিতে ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এই দুই প্লেটের সংযোগস্থলে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় সেখানে বিপুল পরিমাণ ‘লকড এনার্জি’ বা ভূগর্ভস্থ চাপ জমা হয়ে আছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি বড় ভূমিকম্পের পর সেই ফল্টলাইনে আবার শক্তি জমা হতে কয়েকশ বছর সময় লাগে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বলা হয়। আমাদের এই অঞ্চলে গত ১০০ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে ৮ বা তার বেশি মাত্রার কোনো মহাবিপর্যয়কারী ভূমিকম্প হয়নি। ফলে পরিসংখ্যান ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থান—উভয় দিক থেকেই একটি বড় ভূমিকম্পের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
বদলে যাচ্ছে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল
একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশে কম্পন অনুভূত হলে তার উৎপত্তিস্থল বা এপিসেন্টার থাকতো ভারতের আসাম, মিয়ানমার কিংবা নেপালে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল এখন দেশের ভেতরেই বেশি তৈরি হচ্ছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, এমনকি ঢাকা ও এর আশেপাশের জেলাগুলো আজকের ভালুকা কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদী ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, দেশের অভ্যন্তরের ফল্টলাইনগুলো (ডাউকি ফল্ট ও ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোন) অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিপদের নতুন মাত্রা
ভূমিকম্পের তীব্রতা বাড়াতে মাটির গঠন একটি বড় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ মূলত পলিমাটি দিয়ে গঠিত একটি বদ্বীপ। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, দূরবর্তী কোনো ফল্টলাইনেও যদি বড় কম্পন হয়, তবে এই নরম মাটির কারণে কম্পনের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যাকে ‘সাইট অ্যাম্প্লিফিকেশন’ বলা হয়। ফলে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও বাংলাদেশের নরম মাটির কারণে ৮ মাত্রার সমপরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে।
ঢাকা যেন মরণফাঁদ
‘ভূমিকম্প নিজে মানুষ মারে না, মানুষ মারা যায় অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে।’ এই চিরন্তন সত্যটিই এখন ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার অবস্থা কী হবে, তা অকল্পনীয়। রাজউকের বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হাজার হাজার বহুতল ভবন, অপরিসর রাস্তা এবং ঘিঞ্জি বসতির কারণে ঢাকা এখন কার্যত একটি ডেঞ্জার জোনে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরান ঢাকা এবং নতুন ঢাকার দুর্বল ভবনগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। রাস্তা সরু হওয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সুযোগই পাবে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানির লাইন ফেটে তৈরি হবে আরেক মানবিক বিপর্যয়।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

