রংপুরে পদযাত্রা

শিশুদের রক্তে বাড়ছে সিসার মাত্রা, নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

শিশুদের রক্তে বাড়ছে সিসার মাত্রা, নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি

রংপুরে শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে সচেতনতামূলক পদযাত্রা ও প্রচারণা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বক্তারা বলেন, অনিয়ন্ত্রিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া সিসা শিশুদের স্বাস্থ্য, মেধার বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার সকালে সিসা ও বিষাক্ত দূষণ মোকাবিলায় কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা পিওর আর্থ-এর সহযোগিতায় এবং ইয়ুথনেট গ্লোবালের উদ্যোগে কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হয়।

‘সিসা দূষণ বন্ধ করি, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নগরীর চন্দ্রার মোড় থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে আবু সাঈদ চত্বরসহ শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে গিয়ে শেষ হয়।

পদযাত্রায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, সরকারি প্রতিনিধি, তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তারা সিসা দূষণবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, অপরিকল্পিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি ভাঙা ও রিসাইক্লিংয়ের ফলে মাটি, পানি ও বাতাসে বিষাক্ত সিসা ছড়িয়ে পড়ছে, যা শ্রমিক, শিশু এবং আশপাশের জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

র‍্যালি থেকে সিসাকে ‘বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য’ হিসেবে ঘোষণা করে সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর রক্তে সিসার মাত্রা পর্যবেক্ষণে নিয়মিত ব্যবস্থা চালু, অনিরাপদ ব্যাটারি রিসাইক্লিং বন্ধে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) কার্যকর করা, ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পরিবেশবান্ধব পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা এবং সিসা দূষণবিষয়ক গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়।

বক্তারা বিবিএস ও সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, শিশুদের সিসা দূষণের বোঝার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। দেশে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি শিশু সিসার ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকিতে রয়েছে।

তাদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। বিভাগভিত্তিক তথ্যে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে শিশুদের রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা শনাক্তের হার যথাক্রমে ৬৫ শতাংশ, ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।

বক্তারা বলেন, শিশুদের সিসা দূষণ থেকে সুরক্ষায় সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়কারী জিলহজ্জ সরকার বলেন, ‘সিসা দূষণ শিশুদের অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং সুবিচারের প্রশ্ন। শিশুদের সুরক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আবু রেজা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিসা একটি নীরব বিষ, যা ধীরে ধীরে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ও সচেতনতাই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অদৃশ্য হুমকি থেকে রক্ষা করতে।’

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, ‘অপরিকল্পিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং শুধু শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের পুরো জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সিসা দূষণ একটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সুবিচারের বিষয়। এটি মোকাবিলায় কঠোর নীতিমালা, কার্যকর নজরদারি এবং তরুণদের সম্পৃক্ততা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের রংপুর জেলা প্রতিনিধি ও সলিউশন বাংলাদেশ-এর সদস্য সোহাগ কুমার বলেন, ‘সিসা কোনো সাধারণ বর্জ্য নয়, এটি একটি নীরব ঘাতক, যা আমাদের অজান্তেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সিসা দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ বিষাক্ত দূষণের কাছে জিম্মি হতে পারে না। নিরাপদ পরিবেশ, সুস্থ জীবন ও সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস বলেন, শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে রান্নার বাসনপত্রসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সিসার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তাই সরকারি পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ব্যবহৃত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারির নিরাপদ রিসাইক্লিং এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের পরিবেশগত সুবিচার ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক সমন্বয়ক মোহাইমিনুল ইসলাম জিপাত বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সিসামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সিসা দূষণ প্রতিরোধ শুধু সরকারের নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজেরও সম্মিলিত দায়িত্ব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন