বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু সিসার বিষক্রিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ও অনিরাপদ সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ভাঙা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (রিসাইক্লিং) সিসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে বুধবার বরিশালে পদযাত্রা ও সমাবেশ করেছেন তরুণ, পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অর্ধশত মানুষ।
‘সিসা দূষণ বন্ধ করুন, সুস্থ জীবন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করুন’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও পিওর আর্থ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দেশের আটটি বিভাগে চলমান সপ্তাহব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণার অংশ হিসেবে বরিশালে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অশ্বিনী কুমার হল প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া পদযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, তরুণ প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা সিসা দূষণবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান সম্বলিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ভাঙা ও রিসাইক্লিংয়ের ফলে মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিক, শিশু এবং আশপাশের জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তারা বলেন, সিসা দূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এর মারাত্মক প্রভাব রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। সামান্য পরিমাণ সিসার সংস্পর্শও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে, শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সিসা দূষণ মোকাবিলায় সমাবেশ থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সিসাকে বিষাক্ত রাসায়নিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর রক্তে সিসার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা, ব্যাটারি উৎপাদনকারীদের জন্য এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) কার্যকর করা, ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং নিশ্চিত করা এবং সিসা দূষণ নিয়ে গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী সাজিদ মাহমুদ বলেন, “সিসা দূষণ একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে শুধু শ্রমিক নয়, আশপাশের পুরো জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সিসামুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে হলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক নজরদারি এবং কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।”
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, সরকার সিসা দূষণ কমাতে এনজিও, জনগোষ্ঠী ও শিল্প খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “বিদ্যমান বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ, শিল্প খাতে নিরাপদ চর্চা নিশ্চিত করা এবং সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সরকার, শিল্প খাত, নাগরিক সমাজ ও জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শক্তিশালী আইন প্রয়োগ, নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, গবেষণা এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “সিসা দূষণ একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সংকট। কিন্তু কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবে এটি বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে ব্যাটারি রিসাইক্লিং খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।”
পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালি দাস বলেন, সিসা শুধু ব্যাটারি থেকেই নয়, খেলনা, গৃহস্থালি পণ্যসহ বিভিন্ন উৎস থেকেও মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
তিনি বলেন, “সিসা দূষণ কমাতে সরকারি নজরদারি, নিরাপদ রিসাইক্লিং ব্যবস্থা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

