বন্যায় ৭ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ মানুষ, নিহত ৫১

চার নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি

স্টাফ রিপোর্টার

চার নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি

দেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি ধীর গতিতে উন্নতি হলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের ছয় বিভাগে এবং উজানে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশে ভারি থেকে অতিভারী এবং ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

এ প্রসঙ্গে রোববার রাতে পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান আমার দেশকে বলেন, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে দেশের চার জেলার ৪টি নদীর পানি ৫টি পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে যাওয়ায় সেখানে ধীরগতিতে উন্নতি হলেও ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর আরো উল্লেখযোগ্য হারে উন্নতি হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে উন্নতি হলেও দেশের মধ্য ও উত্তর- পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে ৭২ ঘণ্টা পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে টানা ও থেমে থেমে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও লাগাতার বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের রোববার সন্ধ্যা ছয়টার তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফেনী জেলার মুহুরী ও সেলোনিয়া; উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, ভুগাই-কংস; উত্তরাঞ্চলীয় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার; নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে।

এতে আরো বলা হয়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক আমার দেশকে জানিয়েছেন, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে এই ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৃষ্টি সোমবারও অব্যাহত থাকতে পারে। ঢাকার সেন্ট্রালে বৃষ্টি কমে গেলেও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি আরো দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

দেশের ছয় বিভাগে আরো ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আভাস দিয়ে আবহাওয়াবিদ খোন্দকার হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পূর্বাভাসে বলা হয়, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে রোববার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।

সংস্থাটির দৃষ্টিতে ২৪ ঘণ্টায় দেশের কোথাও ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার হলে ভারী এবং তারও বেশি অর্থাৎ ৮৮ মিলিমিটার থেকে বেশি হলে তাতে অতিভারী বৃষ্টিপাত ধরা হয়।

বন্যায় ৭ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ মানুষ, নিহত ৫১

দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে সাতটি জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৫১ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। রোববার দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত সাতটি জেলা হলো খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে।

পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩।

এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৫১ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন।

জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার।

চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলার ১৫২টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকা আংশিকভাবে জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৯৫ হাজার। জেলায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। সেখানে ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ২১ হাজার ৯০০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, নগদ অর্থ, শুকনা ও রান্না করা খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ মোট নিহত হয়েছেন ২৮ জন, যার মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন, যার মধ্যে পাঁচজন রোহিঙ্গা। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। জেলায় ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

বান্দরবানের সাতটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ১২ হাজার ৫০০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৫০। সেখানে নিহত হয়েছেন ছয়জন এবং আহত হয়েছেন দুজন। জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার, ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

রাঙামাটির নয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ১ হাজার ৪৪টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৫২৪। সেখানে তিনজন নিহত হয়েছেন। জেলায় ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন। চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার ও ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ির নয়টি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ১ হাজার ৭৩টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৪১৭। সেখানে একজন আহত হয়েছেন। জেলায় ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৮৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন। চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার ও ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারের পাঁচটি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ৭ হাজার ৩০৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৪৪। সেখানে একজন নিহত হয়েছেন। জেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ১৭২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার ও ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে।

হবিগঞ্জের তিনটি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় ৬ হাজার ৪৪৪টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২৮ হাজার ১৪০। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সেখানে এখন পর্যন্ত কেউ আশ্রয় নেননি। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার ও ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ ও বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় দুর্গত মানুষের কাছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

গত ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত অতিবৃষ্টি ও বন্যা মোকাবিলায় সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলার জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে মোট ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন