জুলাইয়ের বৃষ্টিভেজা হিসাব চুকিয়ে এবার আগস্টের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস প্রদানের লক্ষে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি রোববার ঢাকার ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রে নিয়মিত সভায় বসে জানিয়ে দিল, চলতি আগস্টে দেশে স্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাতই থাকবে, তবে বঙ্গোপসাগরের বুকে জন্ম নিতে পারে ১ থেকে ২টি মৌসুমি লঘুচাপ, যার একটি রূপ নিতে পারে নিম্নচাপে। আর এই বৃষ্টির স্রোতেই ফুলে উঠতে পারে নদীর পানি, তাতে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু জনপদে দেখা দিতে পারে স্বল্পমেয়াদি বন্যা।
কমিটির চেয়ারম্যান ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ পূর্বাভাস চূড়ান্ত হয় এবং পরে তা সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ মাসে ঢাকায় ২৮০-৩২০, ময়মনসিংহে ৩৪০-৩৮০, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৪৮০-৫২০, সিলেটে ৪৫০-৪৯০, রাজশাহীতে ২৪০-২৬০, রংপুরে ৩৫০-৩৯০, খুলনায় ২৬০-৩০০ এবং বরিশালে ৩৮০-৪২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মাসজুড়ে ৫-৬ দিন বজ্রঝড়ের আশঙ্কাও উড়ে বেড়াবে আকাশে। দিন-রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশি থাকতে পারে, আর কোথাও কোথাও দেখা দিতে পারে ১-২টি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ।
কৃষি আবহাওয়ার হিসাবে, দৈনিক গড় বাষ্পীভবন ২.৫ থেকে ৪.৫ মিলিমিটার এবং সূর্যকিরণকাল ২.৫ থেকে ৪.৫ ঘণ্টা থাকতে পারে, যা আমন ধানসহ চলমান কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞ কমিটি জানায়, ইসিএমডব্লিউএফ, জাপান আবহাওয়া সংস্থা, নোআ, আইআরআই-কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার মডেল, ঊর্ধ্বাকাশের বিশ্লেষণ ও এল-নিনো কিংবা লা-নিনার অবস্থা যাচাই করেই তৈরি হয়েছে এ পূর্বাভাস।
সভায় জানানো হয়, বিদায়ী জুলাইয়ে সারা দেশে গড়ে বৃষ্টি ঝরেছে ৬৬৬ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিক ৪৯১ মিলিমিটারের চেয়ে ৩৫ শতাংশ ৬ বেশি। ময়মনসিংহ ছাড়া বাকি সব বিভাগেই বৃষ্টি ছাড়িয়ে গেছে স্বাভাবিক মাত্রা—চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ বেশি (১,০৪৭ মিলিমিটার), খুলনায় ৫৩ শতাংশ, সিলেটে ৩৭.৩, ঢাকায় ৩৩.৪, রাজশাহীতে ১৩.৬ ও বরিশালে প্রায় ১২.৬ শতাংশ বেশি।
এদিকে জুলাইয়ে বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠেছিল তিনটি লঘুচাপ। প্রথমটি ২ জুলাই জন্ম নিয়ে ৫ জুলাই নিম্নচাপে রূপ নেয়, ৬ জুলাই উড়িষ্যা উপকূলে মিলিয়ে যায়। দ্বিতীয়টি ১৫ জুলাই সৃষ্টি হয়ে নিম্নচাপে রূপ না নিয়েই ১৭ জুলাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তৃতীয়টি সবচেয়ে শক্তিশালী—২৫ জুলাই জন্ম নিয়ে ২৬ জুলাই নিম্নচাপ, ২৭ জুলাই গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ২৮ জুলাই পশ্চিমবঙ্গ-উড়িষ্যা উপকূল পেরিয়ে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। এসব ব্যবস্থার প্রভাবে মাসজুড়ে সারাদেশে ঝরেছে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি, সঙ্গী হয়েছে বজ্রসহ দমকা-ঝড়ো হাওয়া। ৮ জুলাই চট্টগ্রামের আমবাগানে রেকর্ড হয় সর্বোচ্চ ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টি।
অন্যদিকে ৩-৪ জুলাই দেশের কিছু অঞ্চলে বয়ে যায় মৃদু তাপপ্রবাহ। মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪ জুলাই রংপুরে, ৩৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন ২২.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয় ২১ ও ২২ জুলাই সিলেটে। তবে সামগ্রিকভাবে মাসজুড়ে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের কাছাকাছিই। বৃষ্টির এই আধিক্যের রেশ ধরেই এখন সবার নজর আগস্টের আকাশে—লঘুচাপ কতটা শক্তি সঞ্চয় করবে আর নদীর পানি কতদূর বাড়বে, সেই হিসাব মিলিয়ে দেখার অপেক্ষায় কৃষক থেকে উপকূলের মানুষ, সবাই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


