সম্প্রতি কয়েকজন তরুণ-তরুণী রাজধানীতে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপন করেছেন এবং সেই অপরাধে জুলাইযোদ্ধা আয়াসসহ আরো কয়েকজন রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জেলে গেছেন। দুটি ঘটনাই অনভিপ্রেত এবং দুঃখজনক।
১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এবং ১৯৪১ সালে প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টেনে এনে অযথা ভিলেন বানানো যেমন আকাট মূর্খতা, তেমনি তার প্রতিকৃতিতে কালি লেপন করার অপরাধে একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়াও সরকারের আইনের চরম অপব্যবহার। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এত ঠুনকো করা হলে প্রকৃত রাষ্ট্রদ্রোহের সময় অতি উৎসাহী সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি দেখতে পারেন। আমি দুই ঘটনারই নিন্দা করি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য প্রতিভাÑএটা অস্বীকার করার মতো অবিমৃশ্যকারিতা যারা করছেন তারা হয় তার লেখা পড়েননি, সংগীত শোনেননি, অথবা ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের অনুরূপ ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দানবে পরিণত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই অযথা দড়ি টানাটানির গর্হিত কাজটি পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে আমার পূর্ববর্তী ‘অতি বাঙালি’ প্রজন্ম এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শুরু করেছিল। মূলত ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই সে সময় রবীন্দ্রনাথের প্রতি মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে অতি ভক্তির বিস্তার আমরা দেখেছিলাম। আমার জন্ম পঞ্চাশের দশকে।
শৈশবের সেই সময়ের স্মৃতি সংগত কারণেই অতটা স্মরণে নেই। তবে ষাটের দশকের কথা পরিষ্কার মনে আছে যে, ঢাকায় শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের বাড়িতে গেলে দেয়ালে দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন প্রতিকৃতি ঝুলতে দেখা যেত। তখনকার বৈশাখী মেলায় রবীন্দ্রনাথের মতো চেহারার, মুখভর্তি লম্বা সাদা দাড়িসহ একধরনের স্প্রিং দেওয়া মাটির ছোট মূর্তি পাওয়া যেত। আমরা সেগুলো মেলা থেকে কিনেও নিয়ে এসেছি। স্প্রিং থাকার কারণে নাড়া দিলেই সেই মাটির তৈরি বুড়ো রবীন্দ্রনাথের মাথা খানিকটা কাঁপত। আমরা সেই মাথা কাঁপা দেখে খুবই আমোদ পেতাম। যাই হোক, পাকিস্তানি আমলে সময় যত গড়িয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রবীন্দ্রপ্রেম ততই গাঢ় হয়েছে।
তখন গভর্নর মোনায়েম খানের আমল। ময়মনসিংহের সেই উকিল ভদ্রলোক তার মনিব প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে খুশি করতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বেতার-টেলিভিশনে দিলেন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে। ওকালতি প্যাঁচ দিয়ে যে সাংস্কৃতিক ময়দানে লড়াই করা যায় না, সেটা মোনায়েম খান বোঝেননি। আর আইয়ুব খান ছিলেন একে তো সৈনিক, তার ওপর জাতিতে পাঠান। আমার ঘোরতর সন্দেহ যে তিনি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথকে চিনতেনই না। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার প্রতিক্রিয়ায় যে ব্যক্তি জীবনে ‘সঞ্চয়িতা’র পাতা উল্টে দেখেননি, রবীন্দ্রসংগীত কী জিনিস জানেন না, তিনিও রাতারাতি রবীন্দ্রনাথের জন্য হাহাকার শুরু করে দিয়েছিলেন।
জাতে মুসলমান হলে কী হবে, বাঙালির বাঁধভাঙা আবেগ সব যুক্তি ছাপিয়ে শহর-গ্রামের মানুষজনকে দল বেঁধে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই অযৌক্তিক আবেগের ফলস্বরূপ, ইতিহাস অসচেতন শেখ মুজিবুর রহমান সংগীত রচনার কোনোরকম ইতিহাস না জেনে, ১৯০৫ সালে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে লেখা, রবীন্দ্রনাথের বাঙালি হিন্দুর কল্পনার অখণ্ড বাংলার চেতনাবর্ধক ‘আমার সোনার বাংলা’কে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বানিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নির্ভেজাল হিন্দু চেতনাসঞ্জাত অখণ্ড বাংলার গান লিখলেন ১৯০৫ সালে আর মূর্খ বাংলাদেশিরা অন্ধ আবেগে সেটাকে ১৯৪৭-এর পাকিস্তান আন্দোলন পার হয়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ খণ্ডিত রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত বানালো ১৯৭২ সালে! এখানে আমার প্রশ্ন, পুরো ঘটনায় বেচারা কবির অপরাধটা কী? চিতা থেকে উঠে এসে শেখ মুজিবের ঘাড় ধরে তো আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করতে বাধ্য করেননি।
রবীন্দ্রনাথের আত্মা নিশ্চয়ই হুমকি দেয়নি যে, আমার সোনার বাংলাকে জাতীয় সংগীত না বানালে শেখ মুজিবের ঘাড় মটকে দেবেন। শেখ মুজিবের সেই অবিবেচনার মূল্য এখন খামোখা বিশ্বের এক অন্যতম প্রধান কবিকে দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত-সংক্রান্ত এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের এবার অবসান হওয়া উচিত। আমি মাত্র চারটি দেশে জাতীয় সংগীতের মৌলিক পরিবর্তন খুঁজে পেয়েছি। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনের অবসানের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সংগত কারণেই জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নাইজেরিয়ায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে জাতীয় সংগীত একবার পরিবর্তন করে আবার পুরোনোটায় ফিরে গেছে।
ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর পুরোনো জাতীয় সংগীত বাতিল করা হয়েছে। ২০০৪ সালে আফগানিস্তানের জাতীয় সংগীতে একাধিক ভাষার পঙ্ক্তি যুক্ত করে বিভিন্ন জাতির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ২০১২ সালে অস্ট্রিয়ায় নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংগীতে ‘Great Sons’-কে ‘Great Daughters and Sons’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে, ২০১৮ সালে কানাডায় লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করার জন্য একটি বাক্য বাদ দেওয়া হয়েছে, এবং ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ আদিবাসী ইতিহাসকে বিলম্বে হলেও স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কয়েকটি মাত্র শব্দের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়েছে। ইংল্যান্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে জাতীয় সংগীতে একটি ছোট পরিবর্তন নিয়মিতভাবেই করে যেতে হয়। তাদের জাতীয় সংগীতে ‘God save the King অথবা Queen’, এই পরিবর্তনটুকু নির্ভর করে সিংহাসনে পুরুষ অথবা নারী কে বসে আছেন তার ওপর। আমাদের ক্ষেত্রে কবি পছন্দ হচ্ছে না শুধু এই কারণে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা হলে তাতে জাতির ইজ্জত বাড়বে না বলেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। নাইজেরিয়ার মতো মূর্খ, দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের ইচ্ছায় নতুন জাতীয় সংগীত করে আবার পুরোনোটায় ফিরে যাওয়ার মতো আজগুবি পরিস্থিতি এ দেশে যেন না হয় সেটাই কামনা করি।
আমার ভক্তকুলের একাংশের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও বলছি, রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা অসামান্য এবং তার রচিত সাহিত্য বাঙালি হিসেবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমি যখন তার সাহিত্য পাঠ করব তখন তিনি জমিদার ছিলেন নাকি প্রজা ছিলেন, সেটা আমার কাছে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি পূর্ববঙ্গে তার জমিদারির সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের নিয়ে লেখেননি শতবর্ষ পরে সেই নালিশ করেও আজ কোনো ফায়দা নেই। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র না হলেও জীবনভর বইপত্র পড়ার চেষ্টা করেছি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান নিয়ে তো সর্বত্রই আলোচনা হয়। আমি বিশেষ করে তার ছোটগল্পের কথা বলব। আমার বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প লেখক। যাই হোক, আমি রবীন্দ্রসাহিত্যের মূল্যায়ন করতে আজ লিখতে বসিনি। সেই যোগ্যতাও আমার নেই। আমি রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গেই শুধু কয়েকটি কথা বলে আমার লেখা শেষ করব।
সব কাজের যে প্রতিক্রিয়া আছে, সেটা নিউটন বহু আগে বিজ্ঞানের সূত্র দিয়েই প্রমাণ করে গেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে থেকেই আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কর্তাব্যক্তিদের অধিকাংশই ভারতঘেঁষা বাম রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।
নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করলেও সেই ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে তারা প্রকৃতপক্ষে দেশে ইসলামোফোবিয়াকে উৎসাহিত করেছেন। উপরন্তু, এই শ্রেণির একটি অংশ বাংলাদেশে বাস করেও অখণ্ড ভারত তত্ত্বে বিশ্বাসী থেকেছেন। ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত করার জন্য উপরোক্ত শ্রেণি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দায়ী সাব্যস্ত করে পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি জিন্নাহর প্রতি ভয়ানক বিদ্বেষ পোষণ করেছেন। কালক্রমে ভারতে হিন্দুত্ববাদ বিকশিত হলে, ভারতপ্রেমে অন্ধ হয়ে এই গোষ্ঠী বাংলাদেশেও হিন্দুত্ববাদের ফুট সোলজারে পরিণত হয়েছেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সরাসরি ইসলামবিরোধিতা করতে না পেরে তারা একধরনের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ কায়েম করার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এবং পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের আসমানে তুলতে গিয়ে পাকিস্তানপন্থার অভিযোগ তুলে ফররুখ আহমদের মতো মহান কবিকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে চরম নিগৃহীত ও অপমানিত হতে হয়েছে।
এমনকি আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ নজরুল ইসলামকেও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বাংলা বিভাগের পাঠক্রমে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। উদীচী, ছায়ানট ইত্যাদি সংগঠন বাংলাদেশকে সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের অধীনস্থ করার মিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আইকন হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে একজন বিশাল মাপের সাহিত্যিকের প্রতি সমাজের একাংশের মনে বীতশ্রদ্ধা বিস্তার লাভ করেছে। জুলাই বিপ্লবে হাসিনার ফ্যাসিবাদ অবশেষে পরাজিত হলে নিউটনের তৃতীয় সূত্র ধরেই আমাদের তরুণ প্রজন্মের মনে একধরনের রবীন্দ্রবিদ্বেষের উন্মেষ ঘটেছে।
রবীন্দ্রনাথ ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন কি না এই বিতর্কে অংশগ্রহণ না করলেও আমি তার লেখা যতটুকু পড়েছি সেখান থেকে নির্মোহভাবে এটুকু বলতে পারি যে, তিনি লেখালেখিতে তৎকালীন যুক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়, বাঙালি মুসলমানকে অবজ্ঞা করেছেন।
সেই বাস্তবতায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে উদীচী ও ছায়ানটজাতীয় আওয়ামী ও ভারতীয় বামপন্থি সংগঠনের রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাড়াবাড়ি অনুচিত হয়েছে। বাংলাদেশে তাকে ঋষি ও মহামানব বানানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমাদের দেশের তথাকথিত সেক্যুলার গোষ্ঠী যদি হিন্দুত্ববাদী না হয়ে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ হতেন, তাহলে সর্ববিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের জায়গায় কবি নজরুল ইসলাম তাদের আইকন হওয়া উচিত ছিল। নজরুলের চার ছেলে জন্মলাভ করেছিল। প্রথম ছেলে জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ছেলে চার বছর বয়সে মারা গিয়েছিল। নজরুল তার চার ছেলের নাম রেখেছিলেন যথাক্রমে কৃষ্ণ-মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধ। শেষ দুজন বিখ্যাত আবৃত্তি শিল্পী এবং গিটার বাদক হয়েছিলেন। ছেলেদের নাম নির্বাচন থেকেই ব্যক্তি নজরুলের চিন্তাধারা নিশ্চয়ই পাঠক উপলব্ধি করতে পারছেন। কবি নজরুল একদিকে যেমন প্রচুর ইসলামি সংগীত রচনা করেছেন, অন্যদিকে হিন্দু দেবতা কালীকে নিয়ে তার শ্যামাসংগীতের সংখ্যাও কম নয়।
নজরুলের শ্যামাসংগীতের দেবীবন্দনার সঙ্গে চরম ইসলামবিদ্বেষী এবং দিল্লির ক্ষমতাসীন বিজেপির বাঙালি আদর্শিক তাত্ত্বিক বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক উপন্যাস ‘আনন্দমঠে’র ‘বন্দে মাতরম’ গানের দেবী অর্চনার মধ্যে বিশেষ কোনো ফারাক নেই। কোনো একেশ্বরবাদী মুসলমান ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গাইতে পারে কি না, এ নিয়ে বর্তমানে ভারতে তীব্র বিতর্ক চলছে। নজরুলের শ্যামাসংগীতও আমি কোনো মুসলমান নারী-পুরুষের কণ্ঠে শুনিনি। বিজেপি সরকার সম্প্রতি ‘বন্দে মাতরম’কে দেশটির জাতীয় সংগীতের সমতুল্য মর্যাদা দিয়েছে। অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ভাবধারার পূজাপর্বের সব চমৎকার গান লিখলেও ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে কখনো মাথা ঘামাননি। তার পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পুনরায় হিন্দুধর্মে প্রবেশ না করলেও হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল।
মারাঠা নেতা শিবাজী, যার দলবল বাংলায় হত্যা ও লুটপাট চালিয়ে বর্গী নামে কুখ্যাত হয়েছিল, তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশাল কবিতা রচনা করলেও একমাত্র সম্রাট শাহজাহান ছাড়া তিনি আর কোনো ঐতিহাসিক কিংবা সমসাময়িক মুসলমান চরিত্রকে তার সাহিত্যে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেননি। শাহজাহানকেও তিনি কেবল তাজমহল নির্মাণ করার জন্য মহিমান্বিত করেছেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রসাহিত্যে বাকি মুসলমান চরিত্র হয় ভিলেন অথবা অনুল্লেখ্য। সুতরাং, বাংলাদেশে সংস্কৃতি অঙ্গনের তথাকথিত সেক্যুলার হোতাদের কাছে এই প্রশ্ন যুক্তিসংগতভাবেই উত্থাপন করা যেতে পারে যে, কেন তারা নিখাদ সেক্যুলার নজরুলকে আইকন না বানিয়ে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল রবীন্দ্রনাথকে বেছে নিয়েছেন? এর দায় অবশ্য সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পাণ্ডাদের, কোনোভাবেই সেটা মৃত রবীন্দ্রনাথের নয়।
সবশেষে বলতে চাই, রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে এ দেশে অবশ্যই সুস্থ বিতর্ক এবং একাডেমিক আলোচনা হওয়ার অবারিত সুযোগ রয়েছে। কিন্তু, তার অসাধারণ প্রতিভাকে অস্বীকার করার চেষ্টা অথবা তাকে অসম্মান করার ধৃষ্টতা জাতি হিসেবে আমাদেরকে কেবল ছোটই করবে। পার্শ্ববর্তী আগ্রাসী দেশের বিজেপির কট্টর সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ঘৃণা করে আবার তাদের মতো আচরণ আমি বাংলাদেশের বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা করি না। ঘৃণা দিয়ে কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। সাংস্কৃতিক লড়াই আমরা পেশি নয়, মেধা দিয়ে করব ইনশাআল্লাহ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


