আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক পাটাতনে বলিউডি বৈধতা

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক পাটাতনে বলিউডি বৈধতা
ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করলেই কোনো শাসক সরাসরি ফ্যাসিস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে না। এর পেছনে অনেকগুলো আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রতিপক্ষকে দমন করতে গিয়ে ডিহিউম্যানাইজেশন তথা বিমানবীকরণের মধ্য দিয়ে তাদের ওপর সব ধরনের অত্যাচার ও নিপীড়নের নারকীয় তাণ্ডবের বৈধতা উৎপাদন করা হয়। শুরুতে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি রচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কথিত সাংগঠনিক অবকাঠামোর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তবে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের দখল নেওয়া। বিশেষ করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মন ও মননে ফ্যাসিবাদী তাণ্ডবের নীরব স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র, নাটক, নাচ ও গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন কাঠামোতে নৃশংসতার অংশ হিসেবে যেভাবে ‘বিএনপি ও জামায়াত’ পদবন্ধে যে কাউকে গুম, খুন, অত্যাচার এমনকি আয়নাঘরে পাঠানো হয়েছে, সেটি দেখে বেশির ভাগ মানুষ টুঁ-শব্দ করেনি। তারা সবাই এগুলো দেখেও যেভাবে না দেখার ভান করেছে, তার সাংস্কৃতিক শেকড় অনেক গহিনে গ্রোথিত। মূলত বিভিন্ন জনপ্রিয় বলিউডি চলচ্চিত্র এই পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে বড় ভূমিকা রেখেছিল। বলিউডে নির্মিত বহু সিনেমা পুলিশি এনকাউন্টার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ভিজিলান্টি জাস্টিসের সারবস্তুর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়। যে বিষয়গুলো দেশের প্রচলিত আইন ও ন্যায়ের নিরিখে গভীরভাবে প্রশ্ন করার কথা, সেই বিষয়গুলো রুপালি পর্দায় দেখে মানুষের হাততালি দেওয়ার বদ-অভ্যাস হয়ে যায়। এসব সিনেমায় পুলিশের ভূমিকা এবং আইনের বাইরে বিচারব্যবস্থার সমস্যাগুলো আড়াল করে রাখা হয়। উল্টো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য বিষয়কে মহিমান্বিত করে তোলার প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কয়েকটি বলিউডি চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করলে ভয়াবহ এই নির্মমতার শেকড় সন্ধান করা যেতে পারে। পুলিশি অরাজকতা, দুর্নীতি এবং ন্যায়বিচারের সন্ধান করতে গিয়ে প্রখ্যাত পরিচালক প্রকাশ ঝা নির্মাণ করেছিলেন গঙ্গাজল। এই ছবিটিতে বিহারের একটি ছোট শহরের পটভূমিতে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, দুর্নীতি এবং আইনব্যবস্থার অভাবে ধুঁকতে থাকা মানুষকে উদ্ধারে তৈরি করা হয়েছিল আবহা মথুরের চরিত্র। একজন ন্যায়নিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন অভিনেতা অজয় দেবগন। তিনি একদিকে রাজনৈতিক শক্তির অপব্যবহার এবং পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে লড়াই করেন, অন্যদিকে তার চরিত্র ন্যায়বিচার এবং শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সিনেমার মধ্যে পুলিশের চরিত্রগুলো আইন ভেঙে অপরাধীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে থাকে। বিশেষ করে ব্যাটারি ভেঙে তার অ্যাসিড ঢেলে অপরাধীদের চোখ-মুখ ঝলসে দেওয়ার যে ভয়াবহ চিত্র এখানে দেখানো হয়, তা অনেকের মনের অজান্তেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বৈধতা তৈরি করে দিয়েছিল। ১৯৮৭ সালের দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত নায়াকাম কিংবা ১৯৯৮ সালের সাত্যিয়া যেভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের জীবন এবং পুলিশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতির নৈতিক অস্থিরতাকে সামনে এনেছে। পুলিশ বাহিনীর নৈতিকতা ও আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বৈধতা বাদের বিশ্রী একটা প্রবণতা এখানে স্পষ্ট।

ভারতে পুলিশি এনকাউন্টার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নির্মম দৃশ্যায়ন দেখা যায় শুটআউট অ্যাট লোখান্ডালা সিনেমায়। ২০০৭ সালের এই সিনেমাটি ১৯৯১ সালে মুম্বাইয়ের লোখান্ডালা কমপ্লেক্সে গ্যাংস্টারদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানেও ক্রসফায়ারকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। ঠিক যেমন ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সালমান খান ও শিল্পী শেট্টির গার্বঃপ্রাইড অ্যান্ড অনার মুভিতে ক্রসফায়ারকে বিরাট মহিমান্বিত করে দেখানো হয়। প্রতিশোধ, দুর্নীতি এবং অপরাধ ও আইন প্রয়োগের সংঘর্ষে পুলিশের ভূমিকা ও তাদের ভিজিলান্টি কার্যকলাপ জনমনে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল এর মধ্য দিয়ে। অভিন্ন বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত খাকি সিনেমায় পুলিশের এবং অপরাধী গ্যাংয়ের সম্পর্কের জটিলতায় পুলিশ কর্মকর্তারা আইনবহির্ভূত পন্থায় কাজ করে কীভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনে তার দৃশ্যায়ন ঘটেছিল।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সামনে রেখে তৈরি করা গার্ব সিনেমার সাফল্য থেকে ২০১০, ২০১২ এবং ২০১৯ সালে সালমান খানকে নিয়ে তৈরি করা হয় দাবাং নামে তিনটি সিক্যুয়েল সিনেমা। এগুলো চুলবুল পান্ডে নামে এক পুলিশ অফিসারের গল্প, যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এনকাউন্টারকে প্রধান অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করে। এর মধ্য দিয়ে তার ভিজিলান্টি চরিত্রের উত্থান ঘটে, যা পরবর্তী পর্বগুলোয় চুলবুল পান্ডে চরিত্রের সফলতা হিসেবে আইনের বাইরে তার কাজের আধিক্য তৈরি করেছিল। প্রথম সিনেমার মতো, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সিনেমায়ও চুলবুল পান্ডে তার নিজস্ব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশের নিয়ম ভেঙে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এই সিনেমাগুলোয় পুলিশি কার্যকলাপ এবং ভিজিলান্টি জাস্টিসের থিম আবার ঘুরেফিরে এসেছে।

‘ভাতের হোটেলের হারুন’ নামে কুখ্যাত একজন দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসারকে আওয়ামী লীগের লোকজন মহিমান্বিত করত ‘বাংলার সিংহাম’ নামে। তার এই নামের পেছনে রয়েছে অজয় দেবগন অভিনীত সিংহাম চলচ্চিত্রের দুটি পর্বের বিরাট ভূমিকা। সিংহাম সিনেমাতেও একজন সৎ পুলিশ অফিসারের গল্প এগিয়ে নেওয়া হয়েছে আইনের বাইরে গিয়ে অপরাধীদের মোকাবিলা করার মাধ্যমে। এমনকি নায়িকা সিল্ক স্মিতার দুর্বিষহ জীবন কাহিনি নিয়ে নির্মিত দ্য ডার্টি পিকচার মুভিতেও পুলিশি অপকর্ম ও এনকাউন্টারকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়েছিল। একইভাবে গ্যাংঙ্গস অব ওয়াসিপুর, শুটআউট অ্যাট ওয়াদালা কিংবা রাগিণী এমএমএস টু থেকে শুরু করে রাত আকেলি হ্যায় কিংবা মুম্বাই মাফিয়া : পুলিশ ভার্সেস দি আন্ডারওয়ার্ল্ড টাইপের মুভিগুলোতেও পুলিশ এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের মধ্যে সংঘর্ষ এবং এনকাউন্টারকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

পুলিশের হাতে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দিয়েই থামেনি বলিউড। তারা সেনাবাহিনী এমনকি কমান্ডোকে যুক্ত করে এই অপকর্মে। দেশের অপরাধ দমনে পুলিশসহ সব প্রশাসন যখন ব্যর্থ, তখন একজন কমান্ডো আবির্ভূত হন। ২০১৩, ২০১৭ এবং ২০১৯ এই সিনেমার পরপর যে তিনটি সিক্যুয়েল নির্মিত হয়েছিল, সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে এক এবং একমাত্র ন্যায়বিচারের মাধ্যম হিসেবে জনমনে ধারণা দেওয়া হয়। গুম, খুন আর সিক্রেট পুলিশ অপারেশনের থিম নিয়ে তৈরি হয় এ ধরনের আরো সিনেমা। সেখানে পুলিশের চরিত্রটি আইনবিরোধী পথে অপরাধ দমন করতে এগিয়ে আসে। এগুলোতে যুক্ত হয় একের পর এক নতুন চলচ্চিত্র।

সারফরোশ থেকে শুরু করে আন্ধারাম, অর্ধসত্য, শুল, আর্টিকেল ১৫, খাকি, জানজীর, আব তক ছপ্পান, শ্যাহর, দোকাল, মার্দানি, মোহরা, তালাশ, শাগিরদ, ওয়ানটেড, আক্রোশ, সমায় : হোয়েন টাইম স্ট্রাইকস, ফোর্স, সূর্যবংশী, সিম্বা, কুরুক্ষেত্র, আন : মেন অ্যাট ওয়ার্ক কিংবা রাউডি রাঠোরের সাফল্য আরো অনেক পরিচালককে উৎসাহিত করে এ ধরনের প্রচুর চলচ্চিত্র নির্মাণে। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে যে চলচ্চিত্রগুলো তৈরি হয়েছে,তার সিংহভাগ থিম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলেগু, কানাড়ি, মৈথিলি, ভোজপুরি ও মালায়লামের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, সেখানে সিনেমার নামই ‘গোলিমার কিংবা এনকাউন্টার শংকর’। অন্যদিকে মহারাজা, পরথোজিল, থানি ওরুভান, ধুরুভঙ্গল পাঠিনারু, অন্নিয়ান, স্পিরিট, থিরান অধিগারাম ওন্দারুর মতো চলচ্চিত্রের মূল ফোকাসই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া নিয়ে। ওদিকে কাখা কাখা, থেরি, মাহান, ঘিল্লি, অপূর্ব সাগোধরার্গাল, ঘাজিনী, ইমাইক্কা নোদিগাল কিংবা কোবরার মতো সিনেমায় প্রচলিত আইনকাঠামোকে অথর্ব হিসেবে তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়েছে পুলিশি হস্তক্ষেপ তথা, যা ইচ্ছা তাই করার পুলিশি যথেচ্ছাচারকে।

বিদুথালাই, আন্নাইপোল ওরুভান, আনন্দে, পাথু থালা, রিদম, মানকাঠা, পোক্কিরি, ওরে ব্যামার্ধি, দি ওয়ারিয়র, এনইআই অরিন্দহাল, লিটল যাফনা, ভেটটাইকারান, সিংহামের তিনটি পর্ব, যুথাম সাই, নান সিগাপ্পু মণিথান, নেনজুকু নিধি, কাস্টডি, ধুল, তামিলারসান, আমারকালাম, ভেদি, চত্রিয়ান, হিদিম্বা, রানাম, টাক্কার, মুম্বাই এক্সপ্রেস, ভেত্রি বিজা, মানাগরা কাওভাল, সৎ রাজ, সিরুথাই, কাথালা কাথালা, মুদ্রু মুঘাম কিংবা নেডুনচালাইয়ের থিম পুরোপুরি বিচারবহির্ভূত পুলিশি হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। তাই, বলিউড থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলেগু, মালায়লাম, কানাড়ি, ভোজপুরি ও অন্যান্য ভাষায় নির্মিত এবং হিন্দি-বাংলায় ডাবিংকৃত এসব সিনেমা সমাজে পুলিশের এনকাউন্টার এবং ভিজিলান্টি জাস্টিসের বৈধতা তৈরি করেছে। সামাজিক অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনার বর্ণিল উপস্থাপনার সঙ্গে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের এই প্যাকেজ দর্শকদের মধ্যে আইনের বাইরে গিয়ে বিচারের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণও তৈরি করে।

মূলত এই সিনেমাগুলোর মাধ্যমেই জনগণের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল, ‘আইনের প্রয়োগ ব্যর্থ হলে তখন কি আইনবহির্ভূত খুন ও গায়ের জোরে বিচার গ্রহণ করা জায়েজ?’ তারা এই প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে চেঁচিয়ে হ্যাঁ বলার মধ্য দিয়ে প্রতাপশালী ফ্যাসিবাদ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিয়েছিল। পরিস্থিতি আমলে নিয়ে ফ্যাসিবাদের অংশীজনরা বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পকেও গুম, খুন এবং ক্রসফায়ারের মতো বিষয়গুলোর বৈধতা উৎপাদনের মাধ্যমে পরিণত করে। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলোর বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি আইন ও বিচারব্যবস্থাকে পদ্ধতিগতভাবে অপর্যাপ্ত এবং দুর্বল হিসেবে তুলে ধরে। পাশাপাশি এর জায়গায় শাস্তি প্রদান করার ক্ষমতা বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে তার সফলতা চিত্রিত করা হয়। সরকারি অনুদানেও নির্মাণ করা হয় কিছু অ্যাকশন এবং থ্রিলার সিনেমা। সেখানে ক্রসফায়ার বা অতিরিক্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের চিত্রায়ণ সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠে। এ ধরনের সিনেমায় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিজেদের মতামত এবং অধিকারের ভিত্তিতে অপরাধীদের হত্যার কাজ করে।

বলিউডি বৈধতায় ‘ক্রসফায়ার’ কিংবা ‘এনকাউন্টার’ শব্দগুলো প্রায়ই পুলিশ বাহিনীর সাহসিকতা, দুর্নীতি দমন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জনপ্রিয় সিনেমাগুলোয় পুলিশ সদস্যরা সমাজের শত্রুদের ধরার জন্য তাদের অধিকারের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করেনি। এই ধারণাগুলোর দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তৈরি হওয়া মনোজাগতিক ফল ছিল ভয়াবহ। এর মধ্য দিয়েই অনেকে পুলিশের হাতে গুম, খুন কিংবা ক্রসফায়ারকে কোনোভাবেই অন্যায় বলে মনে করতে ভুলে গিয়েছিল।

সিনেমা থেকে নেমে এসে বাস্তব জীবনে এ রকম ঘটনা ঘটতে থাকলেও, জনগণ মনে করেছে এটিও ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। আর তাই সিনেমার অতি প্রশংসিত দৃশ্যগুলোই বাস্তবে বাস্তবায়িত হয়ে প্রলম্বিত করেছিল শ্বাসরুদ্ধকর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ দেড়টি যুগ। এ জন্যই বলিউড কিংবা দক্ষিণ ভারত পেরিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রের পর্দায় পুলিশি তাণ্ডবের যে দৃশ্যায়ন, তাকে এত নিষ্পাপভাবে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে যে গুম, খুন, ক্রসফায়ারের প্রচলন করেছিল আওয়ামী সরকার, জনমনে তার সাংস্কৃতিক পাটাতন ও প্রাথমিক বৈধতা উৎপাদিত হয়েছিল এসব বলিউডি চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দা থেকেই। তারপর সেই সফলতার বিষবাষ্প ঢাকাই চলচ্চিত্রের পাশাপাশি জনমনকেও এতটা গ্রাস করেছিল যে, ‘হাউন আংকেল’ তথা ‘ভাতের হোটেলের হারুন’ অনেকের চোখে হয়ে গিয়েছিল ‘বাংলার সিংহাম’।

লেখক : গবেষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর

সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন