পরিবার থেকেই শুরু হোক সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকাশ

ড. মোহাম্মদ আবদুল বারী

পরিবার থেকেই শুরু হোক সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকাশ
প্রতীকী ছবি

কোনো রাষ্ট্র হুট করে ধ্বংসের মুখে পড়ে না। নৈতিকতার পচন ধরে খুব সংগোপনে—যখন চারপাশের অন্যায়-অসততা গা-সহা হয়ে যায়, তখন চরম নৃশংসতাও মানুষের মনকে আর নাড়া দেয় না; আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে ওঠে কোনো লক্ষ্য, আদর্শ বা অনুশাসন ছাড়া। আজকের বাংলাদেশ এই রূঢ় বাস্তবতারই মুখোমুখি। সম্প্রতি আট বছরের এক কন্যাশিশুর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি সমাজের গভীরে প্রোথিত নৈতিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যে আশার জন্ম দিয়েছিল, তার পরও দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সহিংসতা এবং দিশাহীন রাজনীতির অবসান ঘটেনি। এই দেশের পরিবর্তন যদি সত্যিই কাম্য হয়, তবে তা কেবল নির্বাচন বা স্লোগানের মাধ্যমে আসবে না; তার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে।

একটি সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান আমানত তার সন্তানরা। প্রতিটি শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের শিক্ষক, নেতা, সংস্কারক কিংবা জাতির রক্ষক। আজ পরিবারে যে মূল্যবোধের বীজ বপন করা হবে, আগামী দিনের সমাজ তারই প্রতিফলন বহন করবে। তাই সন্তান প্রতিপালনকে কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং জাতি গঠনের এক জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের লক্ষ্য শুধু ডিগ্রি বা বস্তুগত সাফল্য নয়; বরং সততা, সাহস, দেশপ্রেম, সেবাবোধ ও দায়িত্বশীলতায় সমৃদ্ধ মানুষ গড়ে তোলা। আজ যদি আমরা নীতিবান ও দক্ষ নাগরিক তৈরি করতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী দিনগুলোয় আমাদের উত্তরাধিকার হবে একটি সংকটগ্রস্ত সমাজ।

বিজ্ঞাপন

শুরুটা হোক ঘরের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে

সন্তান হলো মা-বাবার কাছে একটি পবিত্র আমানত। প্যারেন্টিং মানে শুধু সন্তানের নিরাপত্তা, পড়াশোনা বা ভদ্রতা শেখানো নয়; বরং এমন মানুষ গড়ে তোলা, যে সমাজের জন্য সম্পদ হবে, বোঝা নয়। একটি দেশের মূল্যবোধ জনপরিসরে প্রকাশ পাওয়ার বহু আগে পরিবারে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ যদি সততা, দেশপ্রেম ও যোগ্যতায় সমৃদ্ধ নেতৃত্ব চায়, তবে তার ভিত্তি পরিবারেই নির্মাণ করতে হবে।

অনেক দিক থেকেই পরিবার হলো একটি শিশুর প্রথম ‘ক্ষুদ্র রাষ্ট্র’। মা-বাবা শুধু অভিভাবক নন; তারা নেতা, শিক্ষক ও আদর্শ। শিশুরা উপদেশের চেয়ে মা-বাবার আচরণ দেখেই বেশি শেখে। মা-বাবার কথা, আচরণ, বিরোধ মীমাংসা, চাপ মোকাবিলা ও ব্যর্থতার প্রতি মনোভাব—সবই তারা গভীরভাবে লক্ষ করে। যে অভিভাবক শৃঙ্খলার কথা বলেন, কিন্তু নিজেই অসৎ আচরণ করেন, তিনি অজান্তেই মূল্যবোধের ভিত দুর্বল করে দেন।

সুস্থ পরিবার মানসিকভাবে নিরাপদ শিশু গড়ে তোলে। ঘরে শান্তি, ন্যায়পরায়ণতা ও পারস্পরিক সম্মানের চর্চা থাকলে শিশুরা তা নিজেদের চরিত্রের অংশ করে নেয়। এর বিপরীতে, ভণ্ডামি, অবহেলা ও ক্রোধে ভরা পরিবেশ অনিরাপত্তা ও মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। কোনো জাতিই তার পরিবারে লালিত মূল্যবোধের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না।

আগে চরিত্র গঠন, তারপর সাফল্যের অন্বেষণ

দূরদর্শী প্যারেন্টিংয়ের প্রথম শর্ত হলো চরিত্রকে সাফল্যের আগে স্থান দেওয়া। একাডেমিক কৃতিত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কখনো নৈতিকতার বিকল্প হতে পারে না। নৈতিকতাবিহীন মেধা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, আর সততার সঙ্গে সাধারণ যোগ্যতাও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। মা-বাবাকে অবশ্যই সততা, বিনয়, দায়িত্ববোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতাকে সন্তানের সব শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে নিতে হবে।

শিশুদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে। সত্য বলার জন্য যদি শাস্তি পেতে হয়, তবে তারা দায়িত্ব গ্রহণের পরিবর্তে সত্য গোপন করতে শেখে। নৈতিক অভিভাবকত্ব ঘরে এমন পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সততাকে শ্রদ্ধা করা হয় এবং নৈতিক সাহসকে উৎসাহিত করা হয়।

এটার পাশাপাশি সহমর্মিতাও অপরিহার্য। অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতা সামাজিক সচেতনতার ভিত্তি। প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো, বয়স্কদের সহায়তা করা কিংবা সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া শিশুদের শেখায় যে মানুষের মর্যাদা তার পদের উচ্চ আসনে নয়, বরং তার কর্মের মাঝে নিহিত। প্রকৃত নেতৃত্ব কখনো কর্তৃত্বকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না, এটি দায়িত্ব, সেবা ও ন্যায়বোধের মাধ্যমে বিকশিত হয়।

কৌতূহল ও মুক্তচিন্তার বিকাশ

মা-বাবাকে সন্তানের মনে জানার আগ্রহ আর স্বাধীন চিন্তার ডানা মেলে দিতে হবে। আজকের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ফলে চিন্তাশীল মানুষ তৈরির বদলে আমরা প্রায়ই পরীক্ষার্থী তৈরি করছি। আদর্শ প্যারেন্টিং এই প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি শিশুকে প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নতুন ধারণা নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে।

দৈনন্দিন ছোট ছোট অভ্যাসই মন্ত্রের মতো কাজ করে। বই পড়া, সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং বই, প্রকৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় শিশুর চিন্তার গভীরতা বাড়ায়। এক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের বই পড়া ও বাস্তব জীবনে সেই পাঠের প্রভাব নিয়ে পর্যবেক্ষণ বিরাট ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসবে। এগুলোর মাধ্যমে শিশুদের এটাও শেখাতে হবে যে ভদ্রতা বজায় রেখে দ্বিমত পোষণ করা অপরাধ নয়। যে সন্তান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, তার বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা গড়ে ওঠে। আর ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য এই স্বাধীন চিন্তাশক্তি অপরিহার্য।

কর্মের মাধ্যমে নেতৃত্বের শিক্ষা

নেতৃত্বের পাঠ দিতে হবে বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে। ইতিহাস মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মতো ব্যক্তিত্বদের কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক সাফল্যের জন্যই স্মরণ করে না, বরং তাদের ন্যায়বিচার, নম্রতা, মানবিকতা ও কর্তব্যবোধের জন্য স্মরণ করে।

বাবা-মা বাস্তব কাজের মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে এই গুণাবলি বিকশিত করতে পারেন। এতিমখানা পরিদর্শন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান কিংবা সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো অভিজ্ঞতা শিশুদের শেখায়—প্রকৃত সম্মান মানুষের সেবায় নিহিত, সামাজিক মর্যাদায় নয়।

পারিবারিক দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বয়স অনুযায়ী ঘরের কাজ ভাগ করে দিলে শিশুরা জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ও দলগত দায়িত্ববোধ শেখে। একই সঙ্গে তাদের প্রচেষ্টা, সততা, দয়া ও অধ্যবসায়ের প্রশংসা করা প্রয়োজন। কারণ শিশুরা সেই মূল্যবোধই গ্রহণ করে, যা পরিবার উদ্‌যাপন করে।

ডিজিটাল যুগে প্রজ্ঞার চর্চা

আজকের দিনে প্যারেন্টিংয়ের অন্যতম বড় কাজ হলো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ডিজিটাল যুগকে সামলানো। বর্তমান প্রজন্ম এমন এক ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। প্রযুক্তি যেমন পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, তেমনি আসক্তি, বিভ্রান্তি ও একাকীত্বের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।

সমাধান প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা নয়; বরং দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো। বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ, অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল প্ল্যাটফর্মে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। শিশুদের বুঝতে হবে যে অনলাইনের সব তথ্য সত্য নয় এবং ডিজিটাল কর্মকাণ্ডেরও বাস্তব জীবনে প্রভাব রয়েছে।

একই সঙ্গে পারিবারিক সংযোগ অটুট রাখা জরুরি। একসঙ্গে খাবার খাওয়া, পারিবারিক আলাপচারিতা, ঘুরতে যাওয়া এবং ডিভাইসমুক্ত সময় কাটানো সম্পর্ককে দৃঢ় করে। যে শিশু পরিবারে মানসিক নিরাপত্তা পায়, সে বাইরের জগতে অস্বাস্থ্যকর স্বীকৃতির খোঁজে কম ছুটে বেড়ায়।

সবশেষে, অবিনাশী আগামীর আবাহন

দূরদর্শী প্যারেন্টিং এমন এক মহিরুহ রোপণের সেই নীরব সাধনা, যার ছায়ায় রোপণকারী নিজে বসার সুযোগ পাবেন নাও পেতে পারেন। এটি এমন মানুষ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি, যারা শুধু সফল নয়, বরং অর্থবহ; শুধু দক্ষ নয়, বরং নৈতিক; শুধু উচ্চাভিলাষী নয়, বরং সমাজের কল্যাণে নিবেদিত।

বাংলাদেশের পরিবারগুলো যদি এই শিক্ষা ও দর্শনকে শক্তভাবে ধারণ করে, তবে আমরা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব, যারা দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও সহিংসতার অন্ধকার পেরিয়ে সততা, প্রজ্ঞা, সাহস ও সেবার আলোয় উদ্ভাসিত হবে। সেই প্রজন্ম শুধু দেশের অর্থনৈতিক শক্তিকেই সমৃদ্ধ করবে না; পুনরুদ্ধার করবে আমাদের সমাজের নৈতিক মর্যাদা, আশা এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা।

লেখক : ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ গ্রন্থকার, সিভিক অ্যাডভোকেট ও প্যারেন্টিং কনসালট্যান্ট

X অ্যাকাউন্ট : @MAbdulBari

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...