‘চিকেনস নেক’ ও তিস্তা: ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতির বড় পরীক্ষা

‘চিকেনস নেক’ ও তিস্তা: ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতির বড় পরীক্ষা

কিছু দেশ আছে, যেগুলো ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বিশেষ সুবিধা পায়, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানই অনেক বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের পূর্বাঞ্চলের শিলিগুড়ি করিডোর যা ‘চিকেনস নেক’ (মুরগির ঘাড়) বা সরু গলার অংশ হিসেবেই বেশি পরিচিত, এর সবচেয়ে সরু স্থানের প্রস্থ ২০-২২ কিলোমিটার। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে সংযুক্ত করার এটিই একমাত্র স্থলপথ। ওই অঞ্চলের জন্য পাঠানো সব সামরিক কনভয়, মালবাহী ট্রেন বা কৌশলগত পদক্ষেপÑসবই এই করিডোর দিয়েই যেতে হয়।

শিলিগুড়ি করিডোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোনো সাধারণ রাস্তা নয়, প্রায় আট দশক ধরে এটি ভারতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল ও নীতিনির্ধারকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আছে। ঠিক এ কারণেই নয়াদিল্লি ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আগ্রহের সঙ্গে তিস্তা নদীর পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। বহু বছর ধরে তিস্তা ইস্যুকে শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে পানিবণ্টনের অনুপাতের গাণিতিক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যেন এটি পানি-বিজ্ঞানের জটিলতায় আটকে থাকা নিছক দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্যের বিষয়। কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর যথেষ্ট নয়। তিস্তা মানেই এখন আর শুধু রংপুরে সেচের সময়সূচি বা উত্তরবঙ্গে অপর্যাপ্ত মৌসুমি প্রবাহের সমস্যা নয়, বরং ২০১৫ সালের ‘স্থলসীমানা চুক্তি’র (Land Boundary Agreement) পর ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতির জন্য এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

পানির প্রবাহের মতো আস্থাকেও কোনো পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। দেশভাগের সময় শিলিগুড়ি করিডোর পেয়েছে ভারত। ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই করিডোরের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত প্রেক্ষাপট বদলে দেয়, একটি প্রকাশ্য বৈরী সীমান্তের বদলে সেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এর প্রায় চার দশক পরে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি করে আলোচনার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জটিল সীমান্ত বিরোধের সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, দুই প্রতিবেশী দেশ চাইলে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস বা সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারে।

সামরিক মানচিত্রে চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে (ভারতের সিকিম ও ভুটানের ঠিক মাঝখানে) অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চুম্বি উপত্যকা আজও তীরের ফলার মতো শিলিগুড়ি করিডোরের দিকে নির্দেশ করে আছে। ভূরাজনীতিতে এই উপত্যকার গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১৭ সালের ডোকলাম সংকট ভারতকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, কৌশলগত দুর্বলতাগুলো কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না, বরং ইতিহাসের কোনো এক সন্ধিক্ষণে সেগুলো আবার সামনে আসে। তাই ভারতের পূর্বাঞ্চলে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার বিষয়টি কখনোই শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট শত্রুকে মোকাবিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মূল লক্ষ্য সবসময়ই ছিল এটা নিশ্চিত করা যে, যাতে শিলিগুড়ি করিডোর কোনোভাবেই ভারতের কৌশলগত দুর্বলতার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নয়াদিল্লি তিস্তাকেন্দ্রিক ঘটনাবলিকে বিচার করে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের লক্ষ্যগুলো সম্পূর্ণ যৌক্তিক। লাখ লাখ মানুষের জীবিকার জন্য তিস্তা অববাহিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুর ধরন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় নদীভাঙন, অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিপাত, পলি জমা, বন্যা এবং পানির সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদী পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার ঢাকার রয়েছে। কোনো নিরপেক্ষ ও সুবিবেচক পর্যবেক্ষকই তা অস্বীকার করতে পারবেন না।

আবার বাংলাদেশে চীনের অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্পকেই যে কৌশলগত ষড়যন্ত্র হিসেবে গণ্য করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এ রকম ধারণা অনেক সময় বিশ্লেষণের বদলে আদর্শিক চিন্তাধারাকে প্রাধান্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তবে কৌশলগত পরিকল্পনা কখনোই শুধু নিশ্চিত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না, বরং সেখানে সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হয়।

যখন কোনো প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল কোনো ভৌগোলিক দুর্বলতার বিন্দুর সঙ্গে মিলে যায়, তখন নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতিই অনুসরণ করে। পরিস্থিতি যখন আরো কঠিন কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে, তার আগেই তারা জটিল প্রশ্নগুলো উত্থাপন করে। এ কারণেই তিস্তাসংক্রান্ত বিতর্ককে শুধু উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং উভয় বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করাই এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উপস্থিতি নিঃসন্দেহে সেই কৌশলগত প্রেক্ষাপটকে বদলে দিয়েছে, যার ভিত্তিতে ভারত আঞ্চলিক অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন করে থাকে। তবে তিস্তাকেন্দ্রিক আলোচনায় বেইজিংকে মূল চরিত্র হিসেবে দাঁড় করালে বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর ও আসল প্রেক্ষাপট আড়ালে পড়ে যায়। শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ চীন নয়, এর কারণ হলো ভৌগোলিক অবস্থান। স্বাধীনতার সময় থেকেই বিদ্যমান যে সমীকরণ বা পরিস্থিতি চলে আসছে, বেইজিং শুধু তাকেই আরো জটিল করে তুলেছে।

তাই আসল প্রশ্নটি এটা নয় যে, উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজতে পারে কি না। স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো প্রতিনিয়তই এটি করে থাকে। বরং আসল প্রশ্ন হলোÑউন্নয়ন-সংক্রান্ত ন্যায্য আকাঙ্ক্ষাগুলো যাতে দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অবিশ্বাসে রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করার মতো কূটনৈতিক পরিপক্বতা ভারত ও বাংলাদেশের আছে কি না। পানিবণ্টন-সংক্রান্ত কোনো সমঝোতা বা সূত্র নিয়ে আলোচনার চেয়েও এটি অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রস্তাবিত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এরই মধ্যে নদীটিরও পরিবর্তন ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির প্রবাহ ও প্রাপ্যতা নিয়ে বেড়েছে অনিশ্চয়তা। কৃষিকাজে বেড়েছে পানির চাহিদা। বেড়েছে কৌশলগত প্রতিযোগিতাও। কূটনীতি যখন পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত, সময় তখন আপন গতিতে বয়ে চলেছে। সরকারগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য প্রকৃতি যেমন অপেক্ষা করে না, তেমনি অপেক্ষা করে না ভূরাজনীতিও।

সবসময়ের মতোই এবারও তিস্তা ইস্যুকে শুধু ভারত ও চীনের মধ্যকার আরেকটি দ্বৈরথ হিসেবে দেখার প্রবণতা কাজ করছে। কিন্তু তা হবে একটি ভুল পদক্ষেপ। এ ধরনের বয়ান হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে পারে, কিন্তু খুব কমই কোনো কার্যকর সমাধান বয়ে আনে। তিস্তা ইস্যু আসলে মৌলিক একটি বিষয়ের পরীক্ষা নিচ্ছে। আর সেই পরীক্ষাটি হচ্ছেÑভারত ও বাংলাদেশ কি তাদের সম্পর্ককে শুধু তাৎক্ষণিক লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির গণ্ডি থেকে বের করে প্রকৃত ও সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারবে?

সেই অংশীদারত্ব শুধু ঐতিহাসিক সদিচ্ছা বা ১৯৭১ সালের যৌথ স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন সব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা মতপার্থক্য সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই তা সামাল দিতে সক্ষম। এমন সহযোগিতার প্রয়োজন যা শুধু পানিবণ্টনের বার্ষিক আলোচনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে যৌথ নদী-অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, বন্যা পূর্বাভাস, পরিবেশগত পুনরুদ্ধার, জলবায়ু সহনশীলতা, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্বচ্ছতার ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

সীমান্ত চুক্তির শিক্ষা শুধু এটিই ছিল না যে, সীমানাবিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব। বরং এর শিক্ষা ছিলÑআস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়। তিস্তার ক্ষেত্রেও একই ধরনের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সৃজনশীলতা প্রয়োজন। ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের উন্নয়ন-আকাঙ্ক্ষাও সমান শ্রদ্ধা পাওয়ার দাবিদার। উভয় পক্ষ যদি এই ইস্যুকে ইচ্ছাকৃতভাবে একে অন্যের পরিপন্থী করে না তোলে, তবে এই লক্ষ্যগুলো কোনোভাবেই পরস্পরবিরোধী নয়। পরিপক্ব কূটনীতির পরিচয় পাওয়া যায় ঠিক তখনই, যখন এমন কৃত্রিম ও ভুল বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

দশকের পর দশক ধরে ভারত শিলিগুড়ি করিডোরকে ভৌত হুমকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সড়ক, রেলপথ, সেতু, সুড়ঙ্গ ও সামরিক অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। অথচ আজ সেই করিডোরের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সামরিক প্রস্তুতির মতোই কূটনৈতিক কাঠামোর ওপরও সমানভাবে নির্ভর করতে পারে। কংক্রিট দিয়ে হয়তো একটি সেতুকে শক্তিশালী করা যায়, কিন্তু শুধু আস্থাই পারে একটি প্রতিবেশী সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে।

সুতরাং, তিস্তা ইস্যু এমন কোনো পরিস্থিতি নয়, যেখানে ভবিষ্যতে ‘পানিযুদ্ধ’ বাধে। আবার ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের প্রদর্শনী বা লোকদেখানো রাজনীতির মঞ্চ হয়ে ওঠাও কাম্য নয়। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক গভীর। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অংশীদারত্বের জন্য তিস্তা ইস্যু একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। দুদেশের সরকার কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করে তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।

ইতিহাস হয়তো মনে রাখবে না কোন পক্ষ কতটুকু পানি পেয়েছিল। বরং ইতিহাস মনে রাখবে দুই প্রতিবেশী দেশ এমন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখাতে পেরেছিল কি নাÑযার মাধ্যমে একটি অভিন্ন নদীকে পারস্পরিক সন্দেহের কারণ হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। আর একবার যদি সেই আস্থার প্রবাহ শুকিয়ে যায়, তবে তা আবার ফিরিয়ে আনা যেকোনো নদীর পানি ফিরিয়ে আনার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন হবে।

দ্য ফার্স্টপোস্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন