আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খালেদা জিয়া-উত্তর বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের বার্তা

এম আবদুল্লাহ

খালেদা জিয়া-উত্তর বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের বার্তা
এম আবদুল্লাহ

জাতির অভিভাবক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের অবিসংবাদিত কাণ্ডারি বেগম খালেদা জিয়া আর আমাদের মধ্যে নেই। চলে গেছেন মহান রবের সান্নিধ্যে। তাকে নিয়ে এরই মধ্যে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে, আরো হবে। নির্ধারিত দিনের নিয়মিত লেখক হিসেবে পত্রিকার শিডিউল মানতে হয়। সে কারণে প্রিয় নেত্রীর বিদায়ের পাঁচ দিনের মাথায় লিখতে হলো। পাঠকদের কাছে পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে ভেবে দেশনেত্রীর জীবনের অনেক দিক এড়িয়ে যেতে হবে। পরিমিতি বজায় রেখে সংক্ষেপে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা তুলে না ধরলে অপরাধবোধে ভুগতে হবে।

দীর্ঘ পেশাগত জীবনে খালেদা জিয়ার নাম যতবার লিখতে হয়েছে, সম্ভবত আর কোনো নেতা-নেত্রীর নাম এতবার আমার হাতে লেখা হয়নি। বিএনপির সংবাদ কাভার করার দায়িত্ব পালন করেছি দেড় দশকের বেশি সময়। এ সময় খালেদা জিয়াকে দু-দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখেছি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে স্বল্পস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রিত্ব ধরলে তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখার সুযোগ হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তার সঙ্গে দেশের প্রায় সব জেলা সফর করার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই সূত্রে অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। সাতক্ষীরার পথে মাদারীপুর ফেরিঘাটে বাহাউদ্দিন নাছিমের গুন্ডাবাহিনীর বৃষ্টির মতো গুলি, পার্বত্য লংমার্চে নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর গডফাদার শামিম ওসমান-জয়নাল হাজারীর সেই তাণ্ডবের সময় সফরসঙ্গী হিসেবে দেশনেত্রীর যে সাহস ও দৃঢ়তা দেখেছি, তা কোনো দিন ভোলার নয়। সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচারাভিযানে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ তাকে অনুসরণ করার সময় যে অম্ল-মধুর স্মৃতি, তা লেখা এই সীমিত পরিসরে সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ক্ষমতাকালে তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ কাভার করার সময় দেখেছি তিনি দুর্নীতিপ্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রের অর্থ-সাশ্রয়ে কতটা কঠোর এমনকি ‘কিপ্টে’ ছিলেন। বিদেশে সফরসঙ্গীর সংখ্যা কমাতে তালিকায় লাল কলম চালাতেন। অনেকের দৃষ্টিতে সেটা নির্দয়ভাবেই করতেন। শেখ হাসিনা যেখানে অনুগ্রহভাজনদের তুষ্ট করতে রাষ্ট্রের অর্থ শ্রাদ্ধ করে ডজন ডজন সাংবাদিক-পেশাজীবীকে সফরসঙ্গী করেছেন, সেখানে খালেদা জিয়া চার-পাঁচজনের অধিক হলেই প্রেস উইং কর্তাদের বলতেন, সরকারি অর্থে এত সাংবাদিককে কেন সফরসঙ্গী করতে হবে। অন্য সফরসঙ্গীদের ক্ষেত্রেও একই মনোভাব দেখিয়েছেন।

সংসদ কাভার করার সূত্রে সংসদ নেত্রী হিসেবে যেমন দেখেছি, তেমনি বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে তার আগুন-ঝরা বক্তব্য লিখেছি হাত খুলে। তার ডাকে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি সফল করতে নেমে মায়ার নেতৃত্বে গুন্ডাবাহিনীর আক্রমণে আহত হয়েছি। ‘আধলা’ ইট বাম বাহুর ওপর পড়ে যে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছি, তা এখনো অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ভোগায়। সেদিন আমরা সাংবাদিকরা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেগোনা কজন শিক্ষক ছাড়া আর কেউ মাঠে নামেননি।

দলের কিছু কুচক্রী সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে সাড়া-জাগানো ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি পণ্ড না করলে হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের সেদিনই পতন হতো এবং খালেদা জিয়া ২০১৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হতেন। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওপর ক্র্যাকডাউন চালানোর রাতে সেই একই কুচক্রীরা খালেদা জিয়ার আহ্বানের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে হাসিনাকে টিকিয়ে রাখে। তিন দিন আগে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ঘিরে মরহুম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যে কয়েক মিলিয়ন মানুষের ঢল নেমেছিল, বালুর ট্রাক সরিয়ে ফিরোজা থেকে প্রিয় নেত্রীকে বের করার জন্য তার ১ শতাংশ রাস্তায় নামলে ইতিহাস ভিন্ন হতো। এমনকি বানোয়াট মামলায় ফরমায়েশি সাজা দেওয়ার দিন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যদি ১০ হাজার মানুষ তার সঙ্গে বকশীবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠের উদ্দেশে রওনা হতো, বিচারক নামধারী ক্যাঙ্গারু কোর্টের লীগ ক্যাডাররা প্যান্ট-জাইঙ্গা ফেলে পালাতে হতো। অপ্রিয় সত্য হচ্ছে—এখন যারা শোকে, কান্নায় মানিক মিয়া কিংবা চন্দ্রিমা উদ্যান ভাসাচ্ছেন, তাদের অনেকে এসিতে বসে ‘দেখি কী হয়’ ধরনের ভূমিকায় ছিলেন। অনেকে আবার ‘জিয়া পরিবার মহাদুর্নীতিবাজ’—এমন আওয়ামী ন্যারেটিভে ‘যা রটে তা কিছু না কিছু বটে’ টাইপের সুশীলতা দেখিয়ে জাতে ওঠার চেষ্টায় ছিলেন।

অনুকূল পরিবেশে পাশে থাকা, আহা-উহু করে সমবেদনা, সমব্যথা জানানো খুবই সহজ ও লাভজনক। এখন বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী-সুহৃদের অভাব নেই। সব অফিসেই ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা। এ ধরনের সুবিধাবাদী চরিত্রের অনুসারীদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া শক্ত উচ্চারণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন—‘খালেদা জিয়া ভয় নাই-রাজপথ ছাড়ি নাই’ স্লোগান আমি শুনতে চাই না। খালেদা জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটতে শুরু করার পর থেকে জীবনের পুরো সময়ই উজানে নাও বেয়েছেন। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটেছেন। ক্ষমতায় থেকেও স্বস্তিতে থাকতে পারেননি। নানামুখী ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে দেশ চালাতে হয়েছে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে মাগুরার একটি উপনির্বাচনে সাধারণ অনিয়মকে পুঁজি করে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে মেয়াদের অর্ধেকই দেশে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করেছে আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযাত্রীরা। তিনি দমনের পথ বেছে নিয়ে গণহত্যা চালিয়ে গদি টিকিয়ে রাখার ফন্দি না করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক রূপ দিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যান। তার আগে পঞ্চম সংসদের শুরুতেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে গণতান্ত্রিক বিশ্বে সোনার হরফে নাম লেখান। তিনি চাইলে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম বহাল রেখে, নিজে প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে পারতেন। সে ধরনের সমর্থন তার পক্ষে তখন ছিল।

খালেদা-জিয়ার-পাশে-তারেক-রহমান

খালেদা জিয়া যে আপসহীন নেত্রী হিসেবে জনস্বীকৃতি পেয়েছেন, তা এসেছে আধিপত্যবাদের বিপরীতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবিচল এবং অনমনীয় মনোভাবের কারণে। বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, বন্দি হয়েছেন, জেল খেটেছেন, তবু মাথা নোয়াননি। প্রতিটি রাজনৈতিক দুর্বিপাকে নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে হিমালয়ের মতো অটল ছিলেন। ২০১৮ সালে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হলে খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হতো না। হাসিনার পাইক-পেয়াদারা বারবার তার কাছে বার্তা পাঠিয়ে রাজি করাতে চেয়েছিল, তিনি যেন সে বছরের ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেন। ‘শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়’—এমন দৃঢ় ও অনমনীয় অবস্থানের কারণেই তাকে দুঃসহ জেল জীবনে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে। আর সেই কারাজীবনই তিলে তিলে তাকে জাগতিক জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত করেছে। স্লো পয়জনিং করে তাকে ক্রমেই মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে কি না—সে সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ শুরুতে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারের জরাজীর্ণ ভবনে ইঁদুর আর পোকা-মাকড়ের সঙ্গে রেখে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। অনেক পরে তার সঙ্গে সহায়তাকারী হিসেবে ফাতেমাকে দেওয়া হয়।

মৃত্যু অমোঘ। ‘জন্মিলে মরিতে হইবে’—এটা অলঙ্ঘনীয়। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু দেশের জন্য, দেশবাসীর জন্য যে ক্ষতি বয়ে আনে, তা অপূরণীয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পর খালেদা জিয়াই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক, যিনি বাংলাদেশকে ধারণ করেছিলেন মনেপ্রাণে। দেশের মানুষকে আত্মার আত্মীয় করে নিয়েছিলেন। আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ ও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির লাল চোখকে পরোয়া করেননি কখনো। যার জন্য অনেক মূল্য তাকে চুকাতে হয়েছে। প্রতিদানও এ দেশের মানুষ তাকে সুদে-আসলে পরিশোধ করল গেল কয়েক দিনে। এমন ভালোবাসা পাওয়া যেকোনো নেতা বা রাষ্ট্রনায়কের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার। এত বড় জানাজা, এত সম্মান, এত মানুষের আবেগতাড়িত উপস্থিতি বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি। শহীদ জিয়ার পর কোনো রাজনীতিকের অন্তিম বিদায়ের এমন দৃশ্য আর দেখা যায়নি। খালেদা জিয়া চন্দ্রিমা উদ্যানের সবুজ গালিচায় নিচে শুয়ে থেকে ভর পূর্ণিমার মতোই জ্যোৎস্নার আলো ছড়াবেন যুগ থেকে যুগান্তরে। বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি, গণতন্ত্রপন্থি অকুতোভয় সংগ্রামী চেতনা ধারণ ও লালন করতে পারলেই শুধু তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে।

এখন আসি খালেদা জিয়া-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে। আসন্ন নির্বাচনে সশরীরে না থাকলেও প্রভাবক শক্তি হিসেবে থাকবেন খালেদা জিয়া। তার বিদায় গণতন্ত্রে উত্তরণের সংকটময় সময়ে বিএনপির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা নিঃসন্দেহে। বছরের পর বছর অসুস্থতা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যেও যিনি দলের ঐক্যের প্রতীক ছিলেন; সেই নেত্রীকে ছাড়াই এখন নির্বাচনি লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে দলটিকে। উত্তরসূরি তারেক রহমান এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন থেকে চেয়ারপারসনে উন্নীত হয়েছেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়তো দু-এক দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবেই সে ঘোষণা আসবে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখন ক্ষমতা ও জবাবদিহির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন তারেক রহমান। দেশে ফিরে ১০ দিনের মধ্যেই তিনি নতুন রাজনীতির বার্তা দিয়েছেন। ২৫ ডিসেম্বর এক অবিস্মরণীয় রাজনৈতিক সমাবেশের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন এবং নতুন অভিষেকের পর তারেক রহমানের প্রত্যেকটি পদক্ষেপই উৎসাহব্যঞ্জক এবং ইতিবাচক। মানবিক ও সংবেদনশীল নেতা হিসেবে তিনি নিজেকে তুলে ধরছেন বলে মনে হচ্ছে। প্রত্যাবর্তনের দিন পূর্বাচল ৩৬ জুলাই স্মরণীতে সমাবেশ মঞ্চে নির্ধারিত বড় চেয়ার পরিহার করে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা, প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা পরিহার করে উদ্দীপনামূলক বক্তব্য, মায়ের জানাজায় প্রদত্ত বক্তব্যে পরিমিতিবোধ, খালেদা জিয়ার কষ্টের জীবনের নিত্যসঙ্গী ফাতেমাকে আইনিগতভাবে বোনের স্বীকৃতি দেওয়া, গুলশানের কার্যালয়ে অঙ্গসংগঠনের নেতার পা ছুঁয়ে সালামে বাধা দিয়ে ‘বিএনপি ও তারেক রহমানের রাজনীতিতে এটা চলবে না’ ধরনের বার্তা দেওয়াসহ স্বল্প সময়ে তিনি ইতিবাচক রাজনীতির বার্তা স্পষ্ট করেছেন।

যদিও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং রাজনীতিবিশ্লেষকরা মনে করছেন, খালেদা জিয়াবিহীন রাজানীতির মাঠ তারেক রহমানের জন্য মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। ভেতরে-বাইরে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েও তাকে পথ চলতে হবে। তাকে অনুধাবন করতে হবে যে, চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়ার চেয়ারপারসনের দায়িত্বের সময়কালে তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। রাজনীতির সম্মুখভাগে অনুপস্থিত থাকার সময়ও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক ভরকেন্দ্র। তার উপস্থিতির কারণেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিতে পারেনি, প্রবল ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও ঐক্য অটুট থেকেছে এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে কারো মনে সংশয় ছিল না। তার অভিভাবকত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। আওয়ামী লীগ বাদে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাকে সম্মান ও সমীহ করেছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সব বাহিনী ও ক্ষমতার নিয়ামক শক্তিগুলো তার ব্যক্তিত্ব, সততা ও দৃঢ়চেতা কর্মকৌশলের কাছে নত ছিল।

তারেক রহমান দেশের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিতে তার ঘোষিত ৩১ দফার সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা কীভাবে তিনি উতরাবেন, তা দেখার জন্য সবাই মুখিয়ে আছেন। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার প্রতীকী শক্তিকে দুর্বল করেছে কি না—সেটা দেখতে আরো কিছু সময় লাগবে। মরহুমের ব্যক্তিগত কারিশমা যে দলটিকে উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে বড় ভূমিকা পালন করত, এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিশ্চয়ই তারেক রহমান সচেষ্ট হবেন। এই ছন্দে বিঘ্ন ঘটার যে আশঙ্কা বিভিন্ন তরফে করা হচ্ছে, তা ভুল প্রমাণ করাই তারেক রহমানের প্রথম কর্তব্য। খালেদা জিয়ার মতোই স্বচ্ছ ও দৃঢ়চেতা গণমুখী নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে তাকে।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে মাত্র আট বছরের মাথায় দলকে ক্ষমতায় আসীন করতে পেরেছিলেন খালেদা জিয়া। তারেক রহমান রাজনীতিতে আছেন সেই ১৯৯২ সাল থেকে। এর মধ্যে দুটি নির্বাচনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। ২০০১ সালে চার-দলীয় জোটের ভূমিধস বিজয়ের পেছনে তারেক রহমানের তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের কথাও জানা। তবে এবার চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন। প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের মতো বিপরীত আদর্শের দল নয়। কাছাকাছি মতাদর্শের দলের সঙ্গে লড়তে হবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। আওয়ামী-বিরোধী ভোট এক বাক্সে পড়েছিল-২০০১-এ। এবার ভাগ হবে। আওয়ামী লীগের ভোট কোনদিকে পড়বে, তা পরিষ্কার নয়। তার ওপর নতুন প্রজন্মের কমবেশি ৪০ শতাংশ ভোটারের মতিগতি অজানা। প্রত্যাবর্তনের সমাবেশে ও খালেদা জিয়ার বিদায়ি সংবর্ধনায় (জানাজা) জনস্রোত দেখে নতুন প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব প্রভাবিত হবে বলে আশা করছেন বিএনপি নেতৃত্ব। তবে এ ধরনের প্রভাব স্থায়ী হয় কমই। সেটা মাথায় রাখতে হবে। অতি আত্মবিশ্বাস অনেক সময় আত্মঘাতী হয়।

প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এক বিশ্লেষণে তৃণমূল বিএনপিকর্মীকে উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘বিএনপির রাজনীতি হলো মানুষের রাজনীতি, যা শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান আর এত দিন টেনে নিয়েছেন খালেদা জিয়া। আমি বিশ্বাস করি, তারেক রহমানও তা-ই করবেন। অন্যথায় জনগণই তাকে প্রত্যাখ্যান করবে।’

তারেক রহমান অবশ্য তার দর্শন ও পথনকশা সম্পর্কে এরই মধ্যে জানান দিয়েছেন। বলেছেন, মায়ের পথচলা যেখানে থেমেছে, সেখান থেকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করবেন তিনি। মানুষও সেটাই আশা করে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু, জানাজা ও দাফনের মতো কঠিন মুহূর্তে দেশের মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি একাকিত্বে ভুগতে দেয়নি বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি এটা জানান দেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি জানান, ‘গভীর শোক ও কৃতজ্ঞতায় ভাস্বর হয়ে আমি আমার প্রিয় মা, জীবনের প্রথম শিক্ষক, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে আমার বাবা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করেছি। তার অনুপস্থিতির শূন্যতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবু, এই কঠিন মুহূর্তে দেশের মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি আমাকে একাকিত্বে ভুগতে দেয়নি।’ আবেগঘন সেই স্ট্যাটাসে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আমার প্রাণপ্রিয় বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে স্মরণ করছি। আজ এত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মনে হচ্ছে, নিকটজন হারানোর শূন্যতা পেরিয়ে, পুরো বাংলাদেশই আমার পরিবার হয়ে উঠেছে।’

রাজনীতিকরা ক্ষমতার চেয়ারে কিংবা বাইরে থেকে দেশকে পরিবার ও দেশের মানুষকে পারিবারিক সদস্য জ্ঞান করলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। জনগণকে প্রজা ভাবলেই সংকটের উদ্ভব হয়। আশা করি, তারেক রহমান ব্যক্ত করা অনুভূতির প্রতি সর্বাবস্থায় সুবিচার করবেন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি-বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন