আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভেঙে পড়ছে ইসরাইলের জীবন-সমাজ

জুলফিকার হায়দার

ভেঙে পড়ছে ইসরাইলের জীবন-সমাজ

তেল আবিবকে বহু দশক ধরে ইসরাইলের অন্যতম নিরাপদ আর স্বাভাবিক শহর মনে করা হতো। ক্যাফেগুলো বহু রাত পর্যন্ত খোলা থাকত। পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা আসতেন দেখতে—আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী সমাজ কেমন দেখায়। কিন্তু সম্প্রতি সেই ইমেজ পুরোপুরি ধসে পড়েছে। তেল আবিবের অনেক জায়গা এখন প্রায় শূন্য। ইরানের হামলার ভয়ে আর নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে পরিবার, শিক্ষার্থী, তরুণ দম্পতিরা শহর ছেড়ে যাচ্ছে। শুধু বাহ্যিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে তেল আবিবকে ভূতুড়ে শহর মনে হচ্ছে এমন নয়, আরো বড় কারণ হলো মনস্তাত্ত্বিক। যে রাষ্ট্র একসময় নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এখন নিজের জনগণকে আশ্বস্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে তারা।

ইরান-ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ ইসরাইলিদের আবাসস্থলকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের শুরুটা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে। পরে মিসাইল আর ড্রোন দিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। ইসরাইলিরা এখন একরকম সাইরেন, শেল্টার আর হোঁচট খাওয়া জীবনের রুটিনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ইসরাইলের ভেতর থেকে সেখানকার খবর জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। ইরানের হামলার সময়টায় ইসরাইলিদের বারবার শেল্টারের দিকে দৌড় দিতে হচ্ছে। পাবলিক শেল্টারগুলোয় প্রচণ্ড ভিড়। যাদের বাড়িতে সুরক্ষিত কক্ষ আছে, তাদের সঙ্গে অন্যদের পার্থক্যটাও বোঝা যাচ্ছে পরিষ্কার। এই অসমতাটা চোখে পড়ছে সবার। গরিবদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। যারা ভাড়া থাকে, তারাও আছে আতঙ্কে।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের আঘাত লাগার আগে থেকেই অবশ্য নড়বড়ে হয়ে আছে ইসরাইলের সমাজ। ইরান যুদ্ধের আগে ভয়াবহ রকমের রাজনৈতিক মেরূকরণ আর সামাজিক উত্তেজনা দেখেছে ইসরাইলিরা। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশেষ করে সেক্যুলার আর শিক্ষিত ইসরাইলিদের মধ্যে দেশ ছাড়ার যে হিড়িক পড়েছে, সেটি অর্থনীতির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে দেড় লাখের মতো ইসরাইলি দেশ ছেড়ে গেছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশ ছেড়েছে ২ লাখ প্রায়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, আসল সংখ্যা আরো বেশি। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট। ইসরাইলিদের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা প্রবলভাবে বাড়ছে।

খোদ ইসরাইল সরকারের হিসাবেও একই চিত্র দেখা গেছে। ইসরাইলের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ৬৯ হাজার ৩০০ জন দেশ ছেড়ে গেছে। এদের মধ্যে ১৯ হাজার আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু বাকিরা ফেরেনি। এই নেতিবাচক প্রবণতার প্রতীকী তাৎপর্য বিশাল। ইসরাইল বহুকাল ধরেই অভিবাসীদের তাদের শক্তির অন্যতম কৌশলগত ভিত্তি মনে করেছে। আগমনের চেয়ে দেশ ছাড়ার সংখ্যা যখন অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে ইসরাইলের ব্যাপারে তাদের আত্মবিশ্বাসে ধস নেমেছে।

এই উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ। সঙ্ঘাতের শুরুর দিকেই বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। দেশের বাইরে অনেক ইসরাইলি আটকা পড়ে। আবার ইসরাইলের ভেতরে থাকা অনেকেই নিজেদের ফাঁদে বন্দি মনে করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরাইল খুব অল্প পরিসরে বিমান চালুর চেষ্টা করছে। কিন্তু সেখানেও যাত্রী পরিবহন হবে খুবই কম। প্রথমদিকে শুধু ইসরাইলমুখী বিমানগুলোকে সুযোগ দেওয়া হবে। ইরানের মিসাইল হুমকির কারণে বিমান অবতরণ করতে ভয় পাচ্ছে। এই সংকটে দুটো বিপরীতমুখী নড়াচড়া শুরু হয়েছে। অনেকেই তড়িঘড়ি ইসরাইলে ফিরতে চাচ্ছে। কারণ তাদের পরিবার সেখানে আছে। অন্যরা দেশ ছাড়ার জন্য উদগ্রিব হয়ে উঠেছে। কারণ মোটেই নিরাপদ মনে করছে না তারা ইসরাইলকে।

প্রশ্ন হলো, ইসরাইলের ইহুদিরা কি শেষ পর্যন্ত থাকতে পারবে সেখানে? স্বল্প মেয়াদে অনেকেই হয়তো থাকবে। কারণ সেখানেই তাদের চাকরি-বাকরি, সেখানেই তাদের পরিবার ও শিকড়। সরকারও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু জরুরি প্রশ্নটা হলো-যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা কি ইসরাইলে থাকাকে দীর্ঘ মেয়াদে যৌক্তিক মনে করবে? তারা কি আদৌ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হবে? এই গোষ্ঠী যদি মনে করে সহিংসতার ধাক্কাটা ঘুরে-ফিরে আসতেই থাকবে বা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে, তাহলে ইসরাইলে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। বারবার তাদের আশ্বস্ত করে ধরে রাখাটা ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে।

মানসিক বোঝাটা এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। সিবিএসভিত্তিক এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইলিদের মধ্যে ডিপ্রেশন আর মানসিক চাপের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে সেই চাপ আরো বাড়ে। তাদের মধ্যে হামলার ভয় বাড়ছে। ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে আস্থা কমছে। ইরানের মতো অন্যতম আঞ্চলিক শক্তিধর একটা দেশ থেকে এখন মিসাইল হামলা শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় ইসরাইলিদের অসহায়ত্ব আরো মারাত্মক হয়ে উঠেছে। বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের স্কুল আর নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে চিন্তিত। তরুণরা উদ্বিগ্ন। কারণ তাদের চাকরি বা ক্যারিয়ারের জায়গাগুলো এক রাতেই হয়তো ধসে পড়তে পারে।

দ্বিতীয় মারাত্মক চাপের জায়গাটা হলো অর্থনীতি। যুদ্ধের খরচ আর সেনা মোতায়েনের কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে গেছে। বেড়েছে ব্যয়। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বলেছে, গাজায় যুদ্ধবিরতির পরে ইসরাইলের অর্থনীতি কিছুটা শক্তি পেয়েছিল। কিন্তু সতর্ক করেছে যে, সঙ্ঘাতে জড়ানো মানেই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়বে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়বে, শ্রমিকসংকট দেখা দেবে। আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে জড়ানো মানেই নাগরিকদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়বে। বাধাগ্রস্ত হবে প্রবৃদ্ধি। সাধারণ ইসরাইলিদের জন্য এর অর্থ হলো জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ব্যবসায় অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ আরো তীব্র হলে সেভিংস ও সুযোগ-সুবিধা-সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে-এই উদ্বেগ তাদের সবসময় তাড়া করে।

অভিবাসন তাই সবসময় শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটা গার্হস্থ্য কৌশলেরও অংশ। সাইরেন যদি বারবার কাজে বিঘ্ন ঘটায়, স্কুলগুলো যদি বন্ধ থাকে, স্ত্রী সন্তানকে সবসময় যদি দৌড়ের ওপর থাকতে হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন চিন্তা করতে ইসরাইলিরা বাধ্য হবে। ওইসিডি দেশগুলোয় ইসরাইলিদের অভিবাসনের হার আরো আগে থেকেই বেড়েছে। তাদের প্রধান গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি আর কানাডা। যারা শিক্ষিত, যাদের ভাষার দক্ষতা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কটা জোরালো, তারা সহজেই দেশ ছাড়ছে। দেখা যাচ্ছে, অভিবাসনের কারণে আসলে ইসরাইলের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কমতে শুরু করেছে।

যুদ্ধের প্রভাবটা আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন সীমান্তে যুদ্ধ ছড়িয়ে গেছে। ইসরাইল লেবাননেও হামলা করেছে। ইরান সঙ্ঘাতের সঙ্গে যতগুলো পক্ষ জড়িত, সবখানেই অস্থিরতা ছড়িয়ে গেছে। ইসরাইল বিপদকে দেশের সীমান্ত থেকে দূরে রাখতে পারবে বলে যারা বিশ্বাস করত, তাদের বিশ্বাসে চিড় ধরেছে অনেক আগেই। এখন সেটার মাত্রা আরো বাড়ছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে যখন একসঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন প্রতিদিনের জীবনযাত্রা সার্বক্ষণিক জরুরি অবস্থার মধ্যে চলে যায়।

তবে ইসরাইলের যে এখনই পতন হবে, সেটা বলার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ইসরাইলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে। দেশের বাইরে থেকে জোরালো সমর্থন আছে। কিন্তু উচ্চ সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে ঢুকে পড়া ও সেখানে টিকে থাকার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টার অর্থ হলো তাদের আকাশচুম্বী ব্যয় বাড়তেই থাকবে। প্রবল অস্থিরতার কারণে সামাজিক সংহতি এরই মধ্যে দুর্বল হতে শুরু করেছে সেখানে। এ রকম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিকর ফলটা আসবে ধীরগতিতে। মেধাবী জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে দেশ ছাড়বে। বাকি জনবলের ওপর বাড়তে থাকবে চাপ। আর সমাজটা হয়ে উঠবে আরো অসম, আরো ভীত-সন্ত্রস্ত।

ইসরাইলের ইহুদিরা এখন খানিকটা প্রতিরোধ শক্তি আর গভীর বিষাদের মাঝখানে টিকে আছে। খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে কেউ কেউ। তারা সাইরেনের শব্দে শেল্টারে দৌড়ে যাচ্ছে। দোকান খুলছে-আবার বন্ধ করছে। এটাকেই রুটিন মেনে নিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু মেনে নেওয়া আর আত্মবিশ্বাস এক জিনিস নয়। ইসরাইলিদের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ সেটাকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা মনে করত, রাষ্ট্র বড় ধরনের হামলা ঠেকাতে পারবে, রাজনীতি থেকে হয়তো স্থিতিশীল নেতা উঠে আসবে, ভবিষ্যৎটা বর্তমানের চেয়ে ভালো হবে। কিন্তু যুদ্ধ তাদের সব বিশ্বাসই ধসিয়ে দিয়েছে।

ইসরাইলিরা কি শেষ পর্যন্ত আদৌ তাদের দেশে টিকতে পারবে? এর অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধ কতটা দীর্ঘ হয় আর যুদ্ধের পর কী হয় তার ওপর। যদি সঙ্ঘাতের তীব্রতা বাড়ে আর জীবনযাত্রার মান পড়তেই থাকে, তাহলে আরো বহু পরিবার ইসরাইল ছাড়ার কথা ভাবতে বাধ্য হবে। ইসরাইলের নিরাপত্তা যদি আরো বাড়ে বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ কমে, তাহলে দেশ ত্যাগ হয়তো কমতে পারে। কিন্তু তেমন সম্ভাবনা বিশ্লেষকরা আপাতত দেখছেন না। এখন সব সূচকই এর উল্টোটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। যে শহরটা একসময় ইহুদিদের স্বর্গ ছিল, সেই শহর এখন বিরান হতে শুরু করেছে। যারা এখনো টিকে থাকার জন্য লড়ছে, তাদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পরের মিসাইলটা কখন আঘাত হানবে, এটা আর বড় উদ্বেগের কারণ নয়। বড় উদ্বেগ হলো, এই মিসাইলটা কোনোভাবেই শেষ মিসাইল হবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন