আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বদলে গেছে সীমান্তের দৃশ্যপট

এলাহী নেওয়াজ খান

বদলে গেছে সীমান্তের দৃশ্যপট

জুলাই বিপ্লবের পর বদলে গেছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দৃশ্যপট। বিজিবি এখন বিএসএফের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে। ফলে ভারতের আগ্রাসী সীমান্তনীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অবস্থানের দৃঢ়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্মান ও গৌরবের পতাকা ওড়ানোর চেষ্টা মাত্র।

কিন্তু আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এ ধরনের দৃঢ়তা দেখানো চেষ্টার কথা কল্পনাই করা যেত না। তখন সরকারের নতজানু পররাষ্ট্র ও সমরনীতির কারণে বিজিবি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা ভুলেই গিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

আর ভারত বাংলাদেশকে দেখত তার একটি করদরাজ্য হিসেবে। যেমন করে তৎকালীন আওয়ামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন যখন দুদেশের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন; তখন অনেকে বলেছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি। কারণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অনেক সময় টানাপড়েন থাকে, ঝগড়াঝাঁটি হয়, অনেক ক্ষেত্রে বিয়েবিচ্ছেদ ঘটে যায়। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের এই সম্পর্ক সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেওয়া-নেওয়ার এক চিরন্তন বন্ধন। জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী নেতাদের ভারতে জামাই আদরে আশ্রয় পাওয়ার ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

এ কারণেই বিএসএফ প্রতিনিয়ত নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের গুলি চালিয়ে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালালেও ফ্যাসিস্ট সরকার কখনো ভারতকে দায়ী করেনি। যেমন : ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে তিনটি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিবিসিকে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছিলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধ করতে হলে ভারতীয় রক্ষীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এ দোষ বাংলাদেশি নাগরিকদের। এ ক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই।

এর আগে ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে একটি সীমান্ত হত্যা সম্পর্কে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তৎকালীন বিজিবিপ্রধান মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ (পরে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন) বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হলে বাংলাদেশি গরু চোরাচালানকারীদের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।

তিনি বাংলাদেশিদের ওপরই দোষ চাপান। আরো আগে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফ একজন বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করলে বিএনপির পক্ষ থেকে হত্যা বন্ধে ব্যর্থতার জন্য সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। এর জবাবে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, সীমান্ত হত্যা, নির্যাতনের ঘটনায় রাষ্ট্র চিন্তিত নয়। তিনি বলেন, সব কাজ ফেলে রেখে শুধু এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে সরকার মনে করে না।

পক্ষান্তরে জুলাই-আগস্ট বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক জোরদারে সীমান্ত হত্যা একটা বড় বাধা। তিনি ২০২৪-এর ৯ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ভারত- বাংলাদেশ সম্পর্ক জনমানুষের পর্যায়ে জোরদার করা দরকার। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটলে জনগণের মধ্যে নীতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সুতরাং বিজিবিপ্রধান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ওইসব বক্তব্য দাসত্ববরণেই নামান্তর।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, ভারতের সঙ্গে আর যেসব দেশের স্থল সীমান্ত আছে, তার কোনোটাতেই এ ধরনের নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে না। সেটা হোক নেপাল, ভুটান কিংবা চির বৈরী পাকিস্তান ও চীনের সীমান্ত। আর চীনা সীমান্তে তো ১৯৬২ সালের পর থেকে কোনো গুলিবর্ষণের ঘটনাই ঘটেনি। অথচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। যেন এ সীমান্ত একটি বিভীষিকাময় মৃত্যুফাঁদ।

পাকিস্তান সীমান্তে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নেই বললেই চলে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে : ভারত একটা হত্যা করলে পাকিস্তান দুটি হত্যা করে বসবে, অর্থাৎ সেয়ানা সেয়ানায় ভারসাম্য রক্ষা করে চলা। যাকে বলা হয় দুদেশের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্য। তাহলে এখন এ প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলাদেশ কি ভারতের সঙ্গে শক্তির ভারসাম্যের দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে? আসলে বিষয়টি তা নয়।

বরং বাংলাদেশ একটি আত্মরক্ষামূলক সামরিক শক্তি হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে সামরিক শক্তিতে বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৭তম। জনসংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান আটতম। শুধু রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নতজানু মানসিকতা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ শাসনামলে ভারতের অনুগত পররাষ্ট্রনীতি আমাদের সামরিক বাহিনীকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল এবং ভারতীয় নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নিতে দেওয়া হয়নি।

যাই হোক, আমাদের সীমান্তে বিএসএফের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা হয়তো দুনিয়ার আর কোনো সীমান্তে সংঘটিত হয় না। একটি মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির’ (এইচআরএসএসের) হিসাব অনুযায়ী বিগত ১০ বছরে বিএসএফের গুলিতে ৫০৫ বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে নিহত হয়েছে চারজন। এ এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি, যা একদিকে যেমন চরম অমানবিক; তেমনি অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাহীন লঙ্ঘন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমানার দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এমনভাবে এই সীমারেখা টেনে দিয়েছে, যা বিস্ময়কর। একই বাড়ির রান্নাঘর পড়েছে ভারতে আর শোওয়ার ঘর বাংলাদেশে। উঠানের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সীমানা। কৃষি জমিগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এপাশে-ওপাশে। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশিদের যাতায়াত করতে হয় এদিক-ওদিক। আর এত দীর্ঘ সীমান্তে চোরাচালান অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। আর বিএসএফের সংজ্ঞায় এরা হচ্ছে : অনুপ্রবেশকারী। জারি করা হয়েছে ‘দেখামাত্র গুলি’ করার নির্দেশ। অথচ ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের জামাই আদর করে ফেরত পাঠানো হয়।

এ ছড়া অসংখ্য ছিটমহল নিয়ে বাংলাদেশের মতো এমন সংকট হয়তো আর কোনো দেশ মোকাবিলা করে না। এ রকম একটি সীমান্তে মানুষের এপার-ওপার চলাচল স্বাভাবিক। কিন্তু ভারত অনুপ্রবেশের কথা বলে যে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়, তা অমানবিক এবং ক্ষুদ্র ও দুর্বল প্রতিবেশী দেশের প্রতি ‘বিগব্রাদার’সুলভ আচরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

যেমনটা চীনারা মনে করে থাকে। তারা ভারতের ত্রিমূর্তির ব্যাখ্যা হিসেবে বলে থাকে, ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশের প্রতি ভারতের আচরণ নেকড়ের মতো, মাঝারি শক্তির দেশের প্রতি আচরণ শৃগালের মতো আর বৃহৎ শক্তির দেশের প্রতি তার আচরণ মেষের মতো। যেমন ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আচরণ নেকড়ের মতো। পাকিস্তানের প্রতি আচরণ শৃগালের মতো। আর চীনের প্রতি আচরণ মেষের মতো।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন