লালমনিরহাটের আদিতমারীতে মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম। হামলার প্রায় ২১ দিন পর তিনি ২১ আগস্ট রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
আরিফুলের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, তিনি যে অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, সেই অপরাধীদের আক্রোশের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারালেন। অর্থাৎ একজন নাগরিক অন্যায় দেখেছিলেন, প্রতিবাদ করেছিলেন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছিলেন। এই বাস্তবতা যদি সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় যে, অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বললেই প্রাণহানির ঝুঁকি আছে, তাহলে আগামী দিনে অন্যায় দেখেও মানুষ নীরব থাকবে। আর একটি সমাজের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি আর কী হতে পারে?
আরিফুল ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামের একটি সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা মাদক, জুয়া, বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করে। ওই আন্দোলনে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের নেতৃত্ব এবং শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।
তাহলে প্রশ্ন আরো গুরুতর হয়ে যায় যে, যে সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে প্রশাসন ও পুলিশ নেতৃত্বের পর্যায়ে যুক্ত, সেই উদ্যোগের একজন সক্রিয় শিক্ষক কর্মী যদি অপরাধীদের হামলার শিকার হন, তাহলে তার নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতেই হবে।
একজন শিক্ষক মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। বরং সমাজের প্রত্যাশা এমনই হওয়া উচিত। একজন শিক্ষক যদি তার শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘মাদক থেকে দূরে থাকো, জুয়া থেকে দূরে থাকো, অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াও’—তাহলে তিনি রাষ্ট্রের আইন ও সামাজিক নৈতিকতারই সহযোগী।
কিন্তু সেই শিক্ষক যদি প্রতিবাদের কারণে হামলার শিকার হয়ে মারা যান, তাহলে অপরাধীরা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি, তারা একটি সামাজিক বার্তাও দেওয়ার চেষ্টা করেছে—‘আমাদের বিরুদ্ধে কথা বললে পরিণতি ভয়াবহ হবে।’ এই হুমকি বার্তাকে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যাবে না। কারণ আজ আরিফুল, কাল অন্য কোনো শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী কিংবা সাধারণ নাগরিক একই পরিণতি ভোগ করবে।
আমাদের সমাজে জুয়াকে অনেক সময় ছোটখাটো সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে জুয়ার চরিত্র বদলে গেছে। অনলাইন বেটিং, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল আর্থিক লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে জুয়া এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
একজন তরুণ স্মার্টফোন হাতে নিয়ে কয়েক মিনিটেই অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। শুরুতে অল্প অর্থের বাজি, এরপর জেতার উত্তেজনা, হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত আসক্তি—এভাবেই একজন মানুষ জুয়ার গভীরে চলে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ঋণ, পারিবারিক অশান্তি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ।
আর যখন জুয়া পরিচালনা করে সংঘবদ্ধ চক্র, তখন বিষয়টি আরো ভয়ংকর। কারণ তখন জুয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ যুক্ত হয়। সেই স্বার্থ রক্ষায় তারা ভয় দেখাতে, হামলা করতে এমনকি হত্যার মতো অপরাধেও জড়াতে পারে।
কোন এলাকায় জুয়ার আসর বসে, কারা পরিচালনা করে, কারা অর্থ লেনদেন করে, কারা নতুন সদস্য সংগ্রহ করে, কারা তাদের আশ্রয় দেয়—এসব তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশের কাছে থাকার কথা। গোয়েন্দা নজরদারি কার্যকর হলে অনেক অপরাধের আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজের দীর্ঘ নীরবতা অপরাধীর জন্য এক ধরনের অদৃশ্য নিরাপত্তা তৈরি করে। আরিফুল হয়তো সেই নীরবতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন।
অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশি অভিযানে সফল হবে না। এর অর্থনৈতিক অবকাঠামো ভাঙতে হবে। কারা টাকা সংগ্রহ করে? কোন মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংক হিসাবে টাকা যায়? কারা বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে? কোন নম্বর বা অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে সাইবার অপরাধ তদন্ত, আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় প্রয়োজন। একটি জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করে নতুন ওয়েবসাইট খুলে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতে পারলেই চক্রের শক্তি কমবে।
আরিফুলের পরিবার একজন মানুষকে হারিয়েছে। তার দীর্ঘ চিকিৎসা, মৃত্যুর পরের শোক এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিবারটির ওপর বড় আঘাত এসেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু মামলা পরিচালনা নয়; ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও। আইনি সহায়তা, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য, সাক্ষী সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত।
তার পরিবারের সবচেয়ে বড় দাবি অবশ্যই ন্যায়বিচার। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রত্যক্ষ হামলাকারী ছাড়াও পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা বা পৃষ্ঠপোষক থাকলে তাদেরও শনাক্ত করতে হবে। তবে বিচার অবশ্যই প্রমাণনির্ভর হতে হবে। জনরোষ কখনো আইনের বিকল্প হতে পারে না।
এজন্য আমাদের করণীয় হলো, কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রথমত, হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এ জেলায় মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, আরিফুলের মতো সামাজিক অপরাধবিরোধী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, অনলাইন জুয়ার অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং প্রশাসনের কোনো স্তরে দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, এটাই যদি তার ওপর হামলার কারণ হয়ে থাকে, তাহলে তার মৃত্যু একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকেত। সেই সংকেত হলো—অপরাধীরা এখন শুধু অপরাধ করতে চায় না, তারা অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও দমন করতে চায়। এই জায়গাতেই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

