আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আমরা কি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ম্যাসাকার ভুলে গেছি?

এলাহী নেওয়াজ খান

আমরা কি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ম্যাসাকার ভুলে গেছি?

আমরা কি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ম্যাসাকারের কথা ভুলে গেছি? সম্ভবত তা-ই; কিংবা হয়তো শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের নিষ্ঠুর শাসনকালের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডগুলো অতীতের অনেক কিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। তবে আমরা খুব তাড়াতাড়িই সবকিছু ভুলে যাই, যেমন করে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম ১৯৭২-৭৫-এর দুঃস্বপ্নের দিনগুলোর কথা। ভুলে গেছি ’৭৪-এর ভয়াল দুর্ভিক্ষের স্মৃতি। আমরা ভুলে গেছি সেই দিনটির কথা, যেদিন সংবিধানের ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়ে একদলীয় শাসন কায়েম করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছিল। এমনকি রক্ষীবাহিনীর নিষ্ঠুর অত্যাচার ও নিপীড়নের কথাও আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। আর সেই ভুলে যাওয়ার কারণে আবার আমাদের দেশে ফিরে এসেছিল ফ্যাসিবাদের কঠোর নিষ্পেষণ।

বিজ্ঞাপন

পাঠক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম টার্মে। সময়টা ছিল ২০০১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। এটা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো ছোট্ট একটি মফস্বল শহরে সরাসরি মিছিলের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রথম ঘটনা। এক দিনে ছয়টি তরতাজা তরুণের এই করুণ পরিণতি মানুষ মেনে নিতে পারেনি। আহত হয়েছিল বহু।

সেদিন মিছিলটি ছিল শান্তিপূর্ণ। তারা ছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ। তারা মিছিল করছিলেন হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে, যে রায়ে সব ধরনের ফতোয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি এই রায়টি প্রদান করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা।

তখন ‘দৈনিক ইনকিলাব’-এর বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হত্যাকাণ্ডের ওপর সরেজমিনে তদন্ত করে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম, যা ধারাবাহিকভাবে দৈনিকটিতে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে কোনো একটা প্রকাশনা সংস্থা তা পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশ করে। সেদিন হাজার হাজার মানুষের মিছিলের ওপর বিনা উসকানিতে উপর্যুপরি গুলি চালিয়ে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল। তাতে বিশ্ববিবেক বিচলিত হলেও সরকার ছিল চরম বিবেকহীন।

সেসময়কার ওই হত্যাকাণ্ডকে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল, যদিও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ঘটনাটিকে ‘নিষ্ঠুর’ বলে অভিহিত করে একধরনের দায় সেরেছিলেন, কিংবা তারও ৭৭ বছর পর ব্রিটেনের আরেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১৩ সালে ভারত সফরে এসে ‘চরম লজ্জাজনক’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার দুঃখ প্রকাশ তো দূরের কথা, পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে হেফাজত হত্যাকাণ্ড এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণহত্যার মতো জঘন্য নজির স্থাপন করেছে।

আবার ’২৪-এর গণহত্যার সঙ্গে সেদিনকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া হত্যাকাণ্ডের চমৎকার সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। সেদিন সেখানে কোনো উসকানি ছিল না। ছিল শুধু গগনবিদারী স্লোগান। এরকম পরিস্থিতিতে কয়েকটি ঢিল ছোড়ার ঘটনাকে করে বিডিআর ও পুলিশ যৌথভাবে মিছিলের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু করে। একের পর এক লুটিয়ে পড়তে থাকে মানুষ। সৃষ্টি হয় বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। একজন ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে নিজেই মহড়া দেওয়া শুরু করেন। হাজার হাজার মানুষ ম্যাজিস্ট্রেটের এ কীর্তি দেখে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন।

বাংলাদেশে এভাবে সতর্কীকরণ ছাড়াই নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনা আগে আর কখনো ঘটেনি। সেটা আবার আমরা দেখতে পেলাম ’২৪-এর গণহত্যার সময়। হেফাজত হত্যাকাণ্ডের সময় একই ঘটনা ঘটেছিল। অর্থাৎ কোনো উসকানি ছাড়া গুলি চালিয়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে বলা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সরকারের পরবর্তী উন্মত্ততা ও হিংস্রতা দেখে তা সন্দেহাতীত হয়ে ওঠে। তখন আহতদের মধ্যে যাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, তাদের চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। এমনকি আহতের সঙ্গে যেসব আত্মীয়-স্বজন গিয়েছিলেন, তাদের পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। যেটা ’২৪-এর ম্যাসাকারের সময়ও দেখা গেছে।

সেসময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নানারকম উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ভারতের পত্রপত্রিকায় ফতোয়া নিষিদ্ধ করার পক্ষে লেখালেখি ঘৃতে আগুন দেওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। এসব পত্রপত্রিকায় ফতোয়াকে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটা নিয়ে ভারতীয়দের উগ্র মাতামাতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছায় যে, সেখানকার এক বিখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার ইঙ্গিতপূর্ণ এমন এক নিবন্ধ রচনা করেন, যার পথ ধরেই মূলত সরকারের পরবর্তী অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি হয়। নিবন্ধটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হত্যাযজ্ঞের চার দিন পর ঢাকার একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘আগামী নির্বাচনের সময় মানবসৃষ্ট বিপর্যয় বাংলাদেশের ওপর আঘাত হানবে’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি লেখেন, বাংলাদেশে মৌলবাদ দিনদিন ঘনীভূত হচ্ছে। দেশের আনাচকানাচে মসজিদ-মাদ্রাসা স্থাপন করা হচ্ছে। ঠিক এখন যেমনটা ভারতীয় পত্রপত্রিকায় করা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ম্যাসাকারের পর ‘বড় হুজুর’ হিসেবে পরিচিত সেখানকার বিখ্যাত আলেম মওলানা সিরাজুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে দুঃসহ মর্মবেদনা নিয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘জালিমদের আল্লাহ তায়ালা একবারেই শেষ করেন।’ জানি না সেটা এখন হয়েছে কি না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন