গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ ফিলিস্তিনপন্থি বক্তব্য রাখায় লুইসিয়ানার এক অভিবাসন বিচারক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন স্নাতক শিক্ষার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক মাহমুদ খলিলকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের রায় দেন ১১ এপ্রিল। এর আগে খলিলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকার শীতলযুদ্ধকালীন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ২৩৭(এ)(৪)(সি)(আই) ধারার অধীনে মামলা করে।
উল্লেখ্য, মার্কিন নাগরিক নন, দেশটিতে এমন কারো উপস্থিতি যদি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির জন্য হুমকি মনে হয়, তবে ওই আইনে তাকে বহিষ্কার করার অনুমোদন রয়েছে। খলিলের বিরুদ্ধে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবি আনীত দুই পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয়েছে- খলিলের মতাদর্শ ও সংগঠন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থবিরোধী। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অন্যথায় খলিলের বাকি কর্মকাণ্ড আইনসম্মত ছিল বলে নথিতে বলা হয়েছে।
প্রথম সংশোধনী সুরক্ষা, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং কাণ্ডজ্ঞানের স্থলে এখন এই ‘বৈদেশিক নীতি’ কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র ধারণাই যেন আইনি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিয়ামক হয়ে উঠেছে!
খলিলের ঘটনাটি ব্যতিক্রম কিছু নয়। এটি উদ্ভট আইনি প্রক্রিয়ায় ইসরাইলি নীতির সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানোর মতো ভিন্নমত দমনে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত বৈষম্যমূলক বিচারব্যবস্থার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। মার্কিন আইনি ব্যবস্থার এই বিপজ্জনক নজির মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কারণ হবে। কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই মুসলিম রাষ্ট্রের অনেক শিক্ষার্থী এবং পণ্ডিত আজ এ ধরনের বহিষ্কার, অবৈধ আটক এবং নজরদারির শিকার। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাগত শিক্ষক এবং ভারতীয় নাগরিক বদর খান সুরি এমনই একজন। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের হাতে নিজের ভার্জিনিয়ার বাসা থেকে আটক হওয়ার পর তিনি এখন টেক্সাসে বন্দি। জানা যায়, সুরির অপরাধ তার মার্কিন স্ত্রীর বাবা গাজা সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।
টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল শিক্ষার্থী তুর্কি বংশীয় রুমেসা ওজতর্ককে আটক করা হয় ইসরাইলবিরোধী অহিংস ‘বয়কট ডাইভেস্টমেন্ট স্যাংশন্স-বিডস মুভমেন্টের সমর্থনে পত্রিকায় একটি নিবন্ধন লেখার জন্য। ওজতর্ক সমাজের জন্য হুমকি এবং পালিয়ে যেতে পারেনÑ এ বিবেচনায় এক মার্কিন বিচারক তার মুক্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।
ফিলিস্তিনি গ্রিনকার্ডধারী এবং কলম্বিয়ার ছাত্র আন্দোলনের নেতা মহসেন মাদাবি নিজের মার্কিন নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে আইসিই এজেন্টের কাছে আটক হন। এরই মধ্যে ইসরাইলি বর্বরতায় পরিবার ও বন্ধু হারানো মাদাবি এখন দখলকৃত পশ্চিমতীরে যে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন, তা তার মতে মৃত্যুদণ্ডসদৃশ।
ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীদের বিরুদ্ধে গৃহীত নির্বাহী আদেশগুলোর ফলে নিজের প্রথম ও পঞ্চম সংশোধনী অধিকার খর্ব হচ্ছে, উল্লেখ করে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র মমদু তাল ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসৃত তালের এ মামলাটি শেষ পর্যন্ত বিচারিক কূটকৌশল ও নির্বাহী চাপের কারণে ধোপে টেকেনি। ২৭ মার্চ একজন ফেডারেল জজ তার ইনজাংশনটি বাতিল করে দিলে আদালতের প্রতি অনাস্থা পোষণ করে তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান প্রাণে বাঁচতে।
পিএইচডিপ্রত্যাশী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ইরানি সন্তান আলী রেজা দরৌদি গ্রেপ্তার হওয়ার পেছনে কোনো ব্যাখ্যা জানা যায়নি।
এ ধরনের রাজনৈতিক নিবর্তনমূলক অভিযানে অভিবাসন আদালতের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের নির্ভরতা মার্কিন সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদের স্বাধীন ফেডারেল বিচার বিভাগের অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো মূলত নির্বাহী শাখা ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের অন্তর্গত প্রশাসনিক বিচার। সাধারণত অ্যাটর্নি জেনারেল কর্তৃক নিযুক্ত এসব অভিবাসন আদালতের বিচারকদের চাকরি অস্থায়ী এবং তারা সব সময় রাজনৈতিক তদারকির মধ্যে থাকেন।
সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লিখিত পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্যভিত্তিক শুনানি, নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং যথাযথ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের মতো পদ্ধতিগত সুরক্ষার বিষয়গুলো এসব আদালতে অনেকটাই সীমিত। কোনো গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের ঘটনায় ফেডারেল আদালত যেখানে ‘ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’ বা সমান নাগরিক সুরক্ষা-সংক্রান্ত সাংবিধানিক লঙ্ঘনের বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখে, অভিবাসন আদালত ‘পররাষ্ট্রনীতি’ কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’বিষয়ক- এমন অস্পষ্ট দাবিতে রায় দিয়ে দেয়। এমন দ্বৈত আইনি ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আইনের মুখোশ পরে সংবিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ দিয়েছে।
আইনবিশারদ, মানবাধিকার সংস্থা, এমনকি সাবেক অভিবাসন বিচারকরা এ ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের কথা জোরেশোরে বলে আসছেন। এ জন্য তারা অভিবাসন আদালতকে ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস থেকে পৃথক করে সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের অধীন করে বিচারিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে আইনসভার নিষ্ক্রিয়তা এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলোর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে এ ধরনের সংস্কার এর আগে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রশাসনগুলো এমন আইনি ব্যবস্থাগত শৈথিল্যের পুরো ফায়দা লুটেছে। নির্বাহী শাখা অভিবাসন আদালতগুলোকে নিরপেক্ষ বিচারের পরিবর্তে নীতি প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেই দেখে আসছে।
আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ অনাগরিকরা এই নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হলেও, এই খড়্গ সহসাই সেখানকার নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ওপরও নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা মার্কিন আইনে জালিয়াতি, সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অন্যান্য অপরাধের শাস্তি হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের অনুমোদন রয়েছে। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ‘ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস’-এ নাগরিকত্ব প্রত্যাহারজনিত একটি ধারা যোগ করেছিলেন। তখন ১৬০০টি মামলা আদালতে আনতে প্রায় সাত লাখ অভিবাসীর ফাইল তদন্ত করা হয়েছিল। এবার ট্রাম্প এই নাগরিকত্ব বাতিলের অভিযান আরো বেগবান করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
যদি তাই হয়, তবে বৈধ নাগরিকত্বও সরকারবিরোধী মতপ্রকাশের দায়ে কাউকে সুরক্ষা দিতে পারবে না। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-ডিএইচএস এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট- আইসিই ভিন্নমতবিরোধী প্রচারণায় কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে অলাভজনক সংস্থাগুলোর জনসমর্থনও পাচ্ছে।
ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনে যুক্ত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করার এবং তাদের বহিষ্কারের দাবি জানানোর পুরস্কারস্বরূপ বেটার এবং ক্যানারি মিশনের মতো সংস্থাগুলো প্রশংসা কুড়াচ্ছে। এরই মধ্যে বিদেশিদের চিহ্নিত করে তাদের একটি তালিকা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে বলে বেতারের দাবি। ‘আনকভারিং ফরেন ন্যাশনালস’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ক্যানারি মিশন। এই প্রকল্পটির কাজ ইসরাইলবিরোধী কিংবা ইহুদিবিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বিদেশি শিক্ষার্থীদের নাম ও ছবি প্রকাশ করা।
নিজেকে স্বাধীনতার বাতিঘর এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জাতি হিসেবে দাবি করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাকস্বাধীনতা একটি পবিত্র বিষয়। কিন্তু খলিল এবং খলিলের মতো অন্যদের কাহিনি এ ক্ষেত্রে দেশটির অন্ধকার দিকটিই তুলে ধরে। যদি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশের জন্য নাগরিকত্ব, শিক্ষা, আবাসন এবং নিজের স্বাধীনতা বাতিল হয়ে যায়, তবে মুখের ভাষা আর অধিকার থাকে না। বিষয়টি আইনি লঙ্ঘনেরও অধিক; মার্কিন গণতন্ত্রের এক নৈতিক সংকট।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইমরান রহমান
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

