আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এ দেশে ‘ইংরেজী’ ‘নববর্ষ’

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

এ দেশে ‘ইংরেজী’ ‘নববর্ষ’

‘ইংরেজী নববর্ষ’ আসলে ‘ইংরেজী’-ও নয়, ‘নববর্ষ’-ও নয়। আর বাংলায় তার ‘উদযাপন’ তেমনই, যেমন বাঙ্গালীর সাধের ডাল আর মাছের মাথার ঝাল মুড়িঘণ্টে ইংরেজের অতি মিষ্ট খ্রিষ্ট মাসের ১০০% জমাট রক্তের ‘ব্লাড পুডিং’ ঢেলে দেওয়া।

যারা জানেন না, তাদের অবগতির জন্য এককালের এক ঐতিহ্যবাহী ইংরেজবাড়ীর জামাই হিসেবে ইংরেজের হাঁড়ির খবর হিসেবে জানাতে পারি। ‘কালো পুডিং’ বলে পরিচিত এই ‘ব্লাড পুডিং, ইংলন্ডসহ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই উৎসব উদযাপনে বিশেষ আগ্রহে রান্না করা এমন একটি বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার, যার প্রধান উপাদানই হলো পশুর তাজা রক্তের খুব কালো করে আনা জমাটবদ্ধ রূপ। আমি নিজে, বা আমার সেকালের সে শ্বশুরবাড়ীর কেউ অবশ্য, আমার জানামতে তা কখনো খাইনি। আমার ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালী রুচিতে তা’ ভাবতেও যেন পারি না—খাওয়া তো দূরের কথা।

বিজ্ঞাপন

বাঙ্গালীর সাধের ঐ মুড়িঘণ্টে ইংরেজের ঐ বিশেষ পুডিং ঢেলে দিলে তা হবে শুধু বেমানানই নয়, বাঙ্গালীর জন্য অরুচিকর হবার সঙ্গে সঙ্গে বিস্বাদ, অস্বাস্থ্যকর ও অবমাননাকরও। যদিও খাবার দুটি দুই জাতের যার যার সংস্কৃতির প্রভাবে তার তা কাছে সুস্বাদু বলেই গণ্য। খাবারের মতো সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রেই এমন।

সাংস্কৃতিক ধার-কর্জ

এক সংস্কৃতিতে থেকে আরেক সংস্কৃতি ধার নেয়া, ধার নেয়া বিষয়টি ধার নেয়া সংস্কৃতির জন্য একান্তই জরুরী হলে, বহু প্রজন্মের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে গ্রাহক সংস্কৃতির অঙ্গীভূতও হয়ে যেতে পারে প্রাকৃতিকভাবেই। উদাহরণস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের বহু আরবী শব্দ ও তার অন্তর্নিহিত ধারণা ও বিশ্বাস বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে গেছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। একইভাবে একই মধ্যপ্রাচ্যের যীশুখৃষ্টের খৃষ্টধর্ম, যদিও অনেক বিবর্তনসহ, ইংরেজী সংস্কৃতির এমনই অংশ হয়ে গিয়েছে, যে ইংরেজদের প্রায় সবাই নিজেদের সেই বিবর্তিত রূপে হলেও সেই মধ্যপ্রাচ্যিক খৃষ্টধর্মের অনুসারী মনে করে—তাই শুধু নয়, তাদের রাজা আনুষ্ঠানিকভাবেই সেই খৃষ্টধর্মের ‘এংলিক্যান’ ধারার ধর্মপ্রধান বলে স্বীকৃত।

কিন্তু বিজাতীয় কোনো কিছু জাতির কোনো অনিবার্য প্রয়োজন ছাড়া, বা উপরোক্তভাবে প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরের ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে অঙ্গীভূত না হয়ে পড়লে, বা জাতির জন্য ক্ষতিকর হলে, তা হয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির জন্য অপসংস্কৃতি। বাংলায় তথাকথিত ‘ইংরেজী নববর্ষ’ উদযাপন অনেকটা তাই। তার আগের রাত বা দিনে উদযাপিত তথাকতিত ‘র‍্যাগ-ডে’, তা আরো বেশী তাই। সে কথাই খাটে, এই দুই অপসংস্কৃতিমূলক ‘উদযাপন’-এরই রেশ ধরে, মাস দেড়েক পর ‘উদযাপিত’, ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ বা তথাকথিত ‘ভালোবাসা দিবস’-এর বেলেল্লাপনা—এ সবই বাংলায় অতি সম্প্রতিই গেলানোর চেষ্টা শুরু হয়, আর বেকুব দু’চারজন গিলতে শুরু করে।

এটা বোঝা যাবে বাংলায় উদযাপনের চেষ্টা করা এই তথাকথিত ‘ইংরেজী নবর্ষে’র—আর বাংলায় করো করো তার উদযাপনের নতুন অভ্যাসের ঐতিহাসিক পটভূমিকাটি জানলেই।

পটভূমি

বর্তমানে ‘ইংরেজী’ বা ‘খৃষ্টাব্দ’ বলে প্রচলিত ‘সন’ বা ‘অব্দ’টি মূলত প্রাচীন ইতালীয়, ‘রোমক’, আর ‘খৃষ্টীয়’-এর পরিবর্তে আসলে ‘খৃষ্টাব্দ’ বলে চালিয়ে দেয়া সেই ‘পাগান’ (‘Pagan’), অর্থাৎ বহু-ঈশ্বরবাদী (‘Polytheist’), প্রকৃতি -পূজারী (‘Animist’ ), পৌত্তলিক (‘Idol-worshipping’) ধর্মের ‘সন’-গণনা পদ্ধতি, যার অনুসারী রোমক সাম্রাজ্যবাদী স্বৈরাচারী শাসকগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী, খৃষ্ট, তার অনুসারী ও তাদের ধর্ম নিধন করে। তাদের দখল করা, খৃষ্ট ও তার অনুসারীদের দেশে আর খোদ রোম-এ। মধ্যপ্রাচ্য ও খোদ ইউরোপীয় রোমক সাম্রাজ্যে ব্যাপকতর জনসাধারণ্যে—খৃষ্ট, তার ধর্ম ও অনুসারীদের জনপ্রিয়তার মোকাবিলা করতে না পেরে, একপর্যায়ে, নিজেরাই খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে তার রক্ষক সেজে নেতৃত্ব দখল করে, খৃষ্টধর্ম ও তার অনুসারীদের সমাজে অনুপ্রবেশ করে ধর্মটিকে ভেতর থেকেই পরিবর্তন করে ফেলে। নিজেদের প্রকৃতি পূজারী পৌত্তলিক, ‘পাগান’, অর্থাৎ ধর্মের কিছু মৌলিক বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক দিকের সঙ্গে সংকরায়ণের মাধ্যমে। এই প্রকৃত-পূজারী, পৌত্তলিক ‘পাগান’ ধর্মে সংকরায়িত বহুলাংশে পরিবর্তিত ‘খৃষ্ট’ ধর্মকেই ‘খৃষ্ট’-এর নামে, তার ধর্মের আবরণের মোড়কে অনেকটা ‘বাজার’-জাত করে—প্রথমত প্রধানত তাদের উপনিবেশ ইংলন্ডসহ ইউরোপে।

দখলীকৃত উপনিবেশের নিপীড়িতরা, নিপীড়ত শাসিত বর্ণ বা শ্রেণিদের মতই নিপীড়ক শাসকদের মত হয়ে ‘জাতে উঠবার’ চেষ্টায়, শাসকের অনেক কিছুকে নিজেরা গ্রহণ করে, নিজের বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ফ্রান্তস ফানোঁ এ বিষয়ে বই লিখে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেই প্রাচীন রোমক সাম্রাজ্যের উপনিবেশ বৃটেন, তথা ইংলন্ডেও তাই ঘটে। ফলে ইংলন্ডে রোমক সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসকদের চাপিয়ে দেয়া রোমকদের প্রকৃতি-পূজারী পৌত্তলিক ‘পাগান ‘-ধর্মীয় ‘অব্দ’ বা ‘সন’-কে ইংলন্ডের ‘নিজের’, তথা ‘ইংরেজী’ ‘সন’ রূপে ব্যবহার করে। ও পরে ‘খৃষ্ট’ ধর্মের ‘রক্ষক’ সেজে বসা একই সাম্রাজ্যবাদী রোমক শাসকদের প্রভাবে তারা সংকরায়িত ‘খৃষ্ট ধর্মে’ দীক্ষিত হলে, ঐ ‘ইংরেজী’ সন-কে ‘খৃষ্টাব্দ’ বলে ‘আপন’ সন হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে এবং বহু প্রজন্ম ধরে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে তারা এই সনকেই সারা বিশ্বে প্রচলিত করে দেয়। ফ্রান্সসহ একই প্রাচীন রোমকদের অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশদের বহু পরে উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যবাদের মতই, তাদের সঙ্গে।

এভাবেই ওই প্রাচীন রোমক প্রকৃতি-পূজারী পৌত্তলিক ‘পাগান’ ধর্ম-সম্প্রদায়ের পাগান খৃষ্টান সংকর ধর্ম সাম্প্রদায়িক সন বা অব্দ ইংরেজের দখল করা বাংলায়ও তা ‘ইংরেজী’ সন, ও ‘খৃষ্টাব্দ’ বলে প্রচলিত করা হয়। বেশী আগে নয়, মাত্র শ’ দেড়েক বছর, বা তার কাছাকাছি সময় পূর্বে। বাংলার স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিষ্ঠুর, বিভীষিকাময় দমন ও নিধনের মনস্তাত্ত্বিক পটভূমিকায়।

এই ‘ইংরেজী’ সন, বা ‘খৃষ্টাব্দ’ সাম্রাজ্যবাদ ও নব-সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বব্যাপী বিস্তারে বর্তমানে সারা দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে ‘সাধারণ বর্ষ’ (Common Era বা ‘CE’) ব্যবহৃত হওয়ায়, আর বিশ্বায়ন (Globalisation)-এর ফলে সারা বিশ্বের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগের স্বার্থে—বাংলায়ও আজ ব্যবহারিক পর্যায়ে এই সনটি ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজনে আপন করে নেয়া এই অভ্যাসে কোনো অসুবিধা নেই। এটা উদার মনে বিশ্ব সমাজেরই অংশ হবার অংশ।

কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকভাবে এই একই সন ব্যবহার করা আর সেই সনকে কেন্দ্র করে তথাকথিত ‘ইংরেজি নববর্ষ’ উপলক্ষে ইংরেজদের মতো উৎসাহ–উদ্দীপনা নিয়ে হাস্যকর, সংসুলভ ভড়ং করে উদযাপন করা—এই দুটো এক বিষয় নয়। প্রথমটি প্রয়োজনীয়, বিশ্বময় জ্ঞাতি-করা উদারনৈতিক কার্যকর বাস্তব প্রজ্ঞা। দ্বিতীয়টি অপ্রয়োজনীয় হীনমন্যতাসূচক, ‘জাতে ওঠা’-এর চেষ্টা- জ্ঞাপক অপসংসংস্কৃতি।

ক্ষতিকর অপসংস্কৃতি

পূর্বে বলেছি, ‘বিজাতীয় কোনো কিছু জাতির কোনো অনিবার্য প্রয়োজন ছাড়া বা উপরোক্তভাবে প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরের ক্রম-বিবর্তনের মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে অঙ্গীভূত না হয়ে পড়লে, বা জাতির জন্য ক্ষতিকর হলে, তা হয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির জন্য অপসংস্কৃতি।’

ইংরেজী নববর্ষ উদযাপন বাঙ্গালীর জন্য ‘কোন অনিবার্য প্রয়োজন’ নয়। এই উদযাপন ‘প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরের ক্রম-বিবর্তনের মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে অঙ্গীভূত’ হয়ে পড়েনি। তা হবার কোন সম্ভাবনাও নেই, কেন না এটি জাতির জন্য কোন অনিবার্য প্রয়োজন নয়। আর সর্বোপরি, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের আলোকে দেখলে বোঝা যাবে, তা জাতীয় স্বার্থের জন্য সুদূর-প্রসারী বিচারে এমনই ক্ষতিকর যে তা থেকে জাতিকে রক্ষা দরকার।

আপাতদৃষ্টে একটি সহজ মজার বিষয়মাত্র হলেও সুদূরপ্রসারী বিচারে তা জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা তা প্রায় সকলেরই অলক্ষ্যে জাতির ভেতর ঔপনিবেশিক ও নব্য-ঔপনিবেশিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসকদের দ্বারা লালিত, নিজেরই অজ্ঞাতে জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে, বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণে অভ্যস্ত কম্প্রাদর শ্রেণীর শক্তি ও বিস্তার বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু হয়, প্রতি বছর এক এক দিন করে সামান্য একটু মজার বিষয়রূপে হলেও, মহাকালে ধারায় এরকম অনুল্লেখযোগ্য-প্রায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই এরকম একটি ‘কম্প্রাদর’ শ্রেণী গড়ে তোলে ও তারই মাধ্যমে দেশ থেকে উপনিবেশবাদ খেদানো হলেও নব্য-উপনিবেশবাদ এসে হাজির হয়। দেশের জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা অনর্জিতই থেকে যায়। বরং জাতি পূর্বের চেয়েও বেশী পরাধীনতার নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে দুঃসহ স্বৈরাচারের শিকার হয়।

‘কম্প্রাদর’ শ্রেণীর ভয়ংকর ভূমিকা

পশ্চিম ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রীগণ তৃতীয় বিশ্বে এসে নানা ছলেবলে কৌশলে দখলদার হয়ে বসবার পর ঐ দখল বজায় রাখবার উদ্দেশ্যে স্থানীয়দের ভেতর থেকে যাদের পারলো তাদের নানারূপ সুবিধার প্রলোভনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে এক নতুন শ্রেণীতে পরিণত করে। এই শ্রেণীটিরই সমাজ-বিশ্লেষণ বৈজ্ঞানিক নাম, ‘কম্প্রাদর’—বাংলায় তাকে ‘মুতসুদ্দী’, বা আরো সহজে, ‘আর্থ-সাংস্কৃতিক দালাল’ শ্রেণীও বলা যায়। মাও সে-তুং-এর সমাজ বিশ্লেষণমূলক এক প্রবন্ধ, ‘চীনা সমাজের শ্রেণী বিশ্লেষণ’-এ যেমন বলা হয়েছে, ‘কম্প্রাদর শ্রেণী হল নিজেদের টিকে থাকা ও (সাময়িক সীমিত বৈষয়িক) উন্নতির জন্য সম্পূর্ণ রূপেই আন্তর্জাতিক পুঁজিপতি শ্রেণীর ওপর নির্ভরশীল, তাদেরই এক লেজুড়’। আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা ও আইন ক্ষেত্রে ‘সংস্কার’-এর বাহানায় প্রথমত দেশী-বিদেশী বেসরকারী ব্যবসায় বা সাহায্য সংস্থা ও পরে তাদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত পরিস্থিতির সুযোগে এসে হাজির হওয়া বিদেশী ঔপনিবেশিক ‘সরকার’-এর বিভিন্ন নীতির অলক্ষিত, পরোক্ষ, কিন্তু মারাত্মক ফলাফলের মাধ্যমে স্থানীয়দের ভেতর যাদের পারা যায়, সাম্রাজ্যবাদী বিদেশীদের অনুকূলে তাদের ‘মগজ ধোলাই’ করে এই নব-গঠমান শ্রেণীর সদস্য হিসেবে তৈরী করা হয়। পাশ্চাত্য ‘উন্নয়ন বিজ্ঞান’ (‘Development Studies’)-এর পরিভাষায় এই ‘মগজ ধোলাই’ করা বেকুবদের ‘পরিবর্তনের মাধ্যম’ বা ‘দালাল’ (‘Agents of Change’)-ও বলা হয়। এদের ধোলাইকৃত মগজ দ্বারা চালিত হয়ে তাদের ছোট-বড় কথা ও কাজ, দৈনন্দিন আচরণ-অভ্যাস ও তাদের দ্বারা রচিত বা প্রযুক্ত নতুন সামাজিক রীতি ও সরকারী নীতি দিয়ে সমাজে এমন সব সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ ও চিন্তাভ্যাস প্রসার করা হয়, যা প্রায় সকলের অলক্ষ্যে বিদেশী উপনিবেশবাদী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থের অনুকূলে সমাজ ও জাতির কর্মকে পরিচালিত করে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিদেশী উপনিবেশবাদী, আধিপত্যবাদী, সাম্রাজ্যবাদীগণ নিজেদের দালালীর জন্য প্রস্তুত করাদের হীনমন্যতা-জাত বিদেশী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের মত আচরণের মাধ্যমে, ‘জাতে ওঠার’ মনোবিকার-গত অবচেতন মনোভাবের ব্যবহার করে থাকে। এ বিষয়ে কিছুটা লেখা আছে, এতদিনে ‘চিরায়ত’ (‘Classic’) হয়ে পড়া, ‘ফরাসী’ পশ্চিম-ভারতীয় মনোবিজ্ঞানী, ফ্রান্তস ফানোঁ’র লেখনীতে আগ্রহী পাঠক সেসব বের করে পড়তে পারেন।

প্রয়োজনের তাগিদে আর্থ-ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রায় সকলেরই ব্যবহৃত হয়ে ‘সাধারণ সন-গণনা রীতি’ (‘Common Era’, তথা ‘CE’ ) হয়ে ওঠা তথাকথিত ‘ইংরেজী’ বা ‘খৃষ্টাব্দ’ হিসাবে সাধারণ ব্যবসায়িক ও আর্থ-ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তার ব্যবহার, আজ বাংলাদেশেও কয়েক প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হয়ে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাই বলে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এই সন গণনারীতির তথাকথিত ‘প্রথম দিন’ মনে করে তথাকথিত ‘ইংরেজী নববর্ষ’ উদযাপন, আর তাকে ঘিরে আগের রাতের তথাকথিত ‘র‍্যাগ-ডে’-ও তার রেশ ধরে, দেড় মাস পর তথাকথিত ‘ভালোবাসা দিবস’-এর নামে কার্ড-পাঠানো, তার ‘শুভ’-সম্ভাষণ, বা অনুষ্ঠানাদির আয়োজন ইত্যাদির মত বেলেল্লাপনা বা নাবালক-সুলভ আচরণ বাঙ্গালীর জন্য প্রয়োজনীয় নয়, তার সংস্কৃতির অংশও নয়। স্রেফ, ‘কম্প্রাদর’-সুলভ হীনমন্যতা প্রকাশক বিদেশী উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে সমাজ ও জাতির সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও তার পথ ধরে অর্থনৈতিক স্বার্থ জলাঞ্জলির ব্যাপক ও দীর্ঘ পিচ্ছিল পথে আরেক কদম... আরো এক কদম, আরো এক।

বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু হয়, কদম কদম করে অজ্ঞাতের পথে সুদূর যাত্রাও হয়। কম্প্রাদরদের আপাতদৃষ্টের ছোট ছোট কথা ও কাজে দেশ ও জাতি বিক্রির পিচ্ছিল পথে পিছলে পড়ে যাওয়াও হয়।

লেখক : ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও গবেষণা এবং পাশ্চাত্যে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ সমাজবিশ্লেষক। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বসহ বিবিধ বিষয়ে গবেষণাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন