সম্ভবত জুলাই বিপ্লবোত্তর উচ্ছ্বাসের প্রায় সমাপ্তি ঘটেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বিপ্লবোত্তর মধুচন্দ্রিমার দিনগুলো এখন স্মৃতির পাতায় চলে গেছে। বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন বিরাজ করছে কঠিন বাস্তবতা। কারণ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর দিয়ে জনগণকে কিছুকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায়, কিন্তু দীর্ঘকাল নয়।
সামনে যে কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জাতিকে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া। কিন্তু এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। বিশেষ করে, চট্টগ্রামে নির্বাচনি মিছিলে হামলা ও হত্যার ঘটনা এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে গোলাগুলির লড়াই সংশয়ের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবে এই ধারণা পোষণ করা অমূলক নয় যে, তফসিলের আগে যখন এ ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটছে, তফসিল ঘোষণার পরে না জানি এসব সহিংসতা আরো কত ভয়ংকর রূপ নেবে। এ রকম একটা আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ মনে করে, এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের দায় শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর পড়বে না, এ দায় রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিতে হবে।
কারণ এই অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো দল নেই, বরং রাজনৈতিক দলগুলো এই সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবে একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোকেই পূর্ণ সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেরাই পরস্পর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এ সরকারের পক্ষে ওই রকম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে, যার আলামত ইতোমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সুতরাং যেকোনো ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিক দলগুলোকেও বহন করতে হবে।
অন্যদিকে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যারা সরকার গঠন করবে, তাদের সামনে থাকবে জনগণের সীমাহীন স্বপ্ন বাস্তবায়নের কঠিন কাজ। বিশেষ করে, ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গঠন করা খুবই কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ শেখ হাসিনা ১৫ বছর দেশ শাসন করেছেন তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে। যার ফলে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার কাজটি হবে খুবই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। কিন্তু জনগণ দ্রুত স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদ দিতে থাকবে অব্যাহতভাবে, যা সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।
এছাড়া আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা, মানবাধিকার সংরক্ষণ, রাষ্ট্র ও ছোট-বড় বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের ভেতরে দলের দোহাই দিয়ে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপতৎপরতা রোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি অনেক বিষয়ের এক জটিল সমীকরণ আগামী সরকারের সামনে দাঁড়াবে। এসব বিষয় ফ্যাসিবাদ আমলে ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিচালিত হতো। কিন্তু ইতোমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেকে দলের শীর্ষ নেতাদের দোহাই দিয়ে এমন সব কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন জনগণ দেখছে, তা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বিষয়টি একটি আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে। কারণ এটি এখন ব্যক্তিগত জিঘাংসা চরিতার্থ করার কাজেও ব্যবহার হচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থে যাকে খুশি তাকে ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দায় চাপানো হচ্ছে দলের শীর্ষ নেতাদের কাঁধে। বলা যায়, ফ্যাসিবাদের দোসর তাড়াতে গিয়ে কেউ কেউ নিজেই ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে, যা কার্যত দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, একটানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন জনগণের মনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো ও ফ্যাসিবাদ একটি সমার্থক বিষয়। জনগণের এই মানসিক ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে চলেছে দলের শীর্ষ নেতাদের দোহাই দিয়ে ওইসব অপতৎপরতা । যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংঘটিত বিপ্লবোত্তরকালে ওই ধরনের কুকীর্তিকলাপ বিপ্লবের মূল স্পিরিটকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম হবে, তা ভাবা যায় না। যেমন : বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকের মধ্যে অহংকার ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভীতি সৃষ্টি করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা নিজেদের অতিপ্রাকৃতিক শক্তির আধার হিসেবে ভাবছেন, যে ভাবনাগুলো আমরা লক্ষ করেছি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতানেত্রীদের মধ্যে।
এই প্রেক্ষাপটে সেই ঐতিহাসিক উক্তিটাই যেন বারবার স্মরণ হচ্ছে। অর্থাৎ ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। বারবার এ দেশে তা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও অব্যাহতভাবে একই ঘটনা ঘটেই চলেছে। যেমনটা শেখ হাসিনা তার বাবার একদলীয় শাসনের পরিণতি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেনি। কিংবা শেখ হাসিনা ও তার দলের শাসনের করুণ পরিণতি থেকে যদি আগামী দিনের শাসকরা শিক্ষা না নেয়, তাহলে তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। সর্বশক্তি আল্লাহর দুনিয়ায় মানুষের ক্ষমতা খুবই সীমিত অথচ সে সীমাহীন ক্ষমতাশালী হিসেবে ভাবতে পছন্দ করে, যা শেষ পর্যন্ত পরিহাসে পরিণত হয়।
এ প্রসঙ্গে ব্রিটেনের এক রাজার কাহিনি দিয়ে আমার লেখা শেষ করতে চাই। ব্রিটেনের সেই রাজার নাম ছিল কিং ক্যানুট। সে দেশের রাজনীতিতে ওই রাজা ও সমুদ্রের জোয়ারের একটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবে বারবার আলোচনায় চলে আসে। তিনি দশম শতকে ব্রিটেনের এক শক্তিশালী রাজা হলেও মূলত তিনি ছিলেন ডেনমার্কের প্রিন্স, যিনি ইংল্যান্ড দখল করে সেখানের রাজা হয়ে যান। পরে তিনি একই সঙ্গে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের রাজা ছিলেন। ইতিহাসে তিনি দিগ্বিজয়ী যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। তার ধারণা ছিল যে, তার কথামতো প্রজারা ওঠাবসা করে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি নিজেকে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির আধার হিসেবে ভাবতে থাকেন। জাগতিক সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সমুদ্রের জোয়ার তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
তাই একদিন কিং ক্যানুট তার সিংহাসন নিয়ে সমুদ্রের তীরে গিয়ে বসলেন । তখন ছিল জোয়ারের সময়। তিনি সমুদ্রের জোয়ারের পানিকে বললেন, যেখানে আছো সেখানেই থাকো, সামনে এগিয়ে এসো না। কিন্তু জোয়ার তার কথা তো শুনলই না; বরং তার পদযুগল ভাসিয়ে দিল। রাজাকে সম্মান দেখানো তো দূরের কথা, বরং এক নির্মম পরিহাসে তাকে ভাসিয়ে দিল। পরিস্থিতি দেখে কিং ক্যানুট উপলব্ধি করলেন, রাজার ক্ষমতা কতটা শূন্য। তাকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা কারো নেই। তবু মানুষ অতিপ্রাকৃতিক বিশেষ করে শাসকরা কিংবা শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের অলীক শক্তির আধার হিসেবে ভাবতে পছন্দ করে।
ইতিহাসের ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষের অতিপ্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী হওয়ার প্রবণতা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা লাভ করে, তাদের ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্থানপতন ও তার শাস্তির ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, অহংকারী শাসকরা নিয়তির হাতে কতটা অসহায়। অতিপ্রাকৃতিক, অলীক কিংবা পৌরাণিক শক্তির আধার হিসেবে ভাবতে থাকা এসব শাসক ক্ষমতার জোরে অনেক কিছু করতে পারে কিন্তু নিয়তির নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করতে পারে না।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

