দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

নিঃসঙ্গ ইসরাইল

জুলফিকার হায়দার

নিঃসঙ্গ ইসরাইল

জেরুসালেমের এক গলির ভেতরের সেলুন। নাপিতের হাতে ধারালো খুর। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘কাল রাতের ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা দেখেছিলেন?’ আমি মাথা নেড়ে জানালাম, কোনো কারণে দেখা হয়নি। তবে আমি জানতাম সে কেন এই প্রশ্নটা করেছে। এবারের ইউরোভিশন প্রতিযোগিতায় রাজনীতির প্রতিবাদ ঢুকে পড়েছে।

এই প্রতিযোগিতাটি সাধারণত পরিচিত বিদঘুটে সব গান, সস্তা লিরিক আর অদ্ভুত পোশাকের জন্য। কিন্তু এবার ইসরাইল ফাইনালে ওঠার পর থেকেই শুরু হয়েছে হট্টগোল। গাজায় ইসরাইলের কঠোর সামরিক অভিযানের কারণে ইউরোপের পাঁচটি দেশ এই প্রতিযোগিতা বয়কট করেছে। ফাইনালে যখন ইসরাইলের নাম ঘোষণা করা হলো, তখন দর্শকদের একাংশ যেমন হাততালি দিল, অন্য অংশ তেমনি ভুয়ো ধ্বনি দিয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত ইসরাইল দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইসরাইলের এই একাকী হয়ে পড়াটা কিন্তু মোটেও হালকা কোনো বিষয় নয়। দেশটির বিজ্ঞানীরা এখন প্রায়ই দেখছেন, আন্তর্জাতিক গবেষণার ফান্ড নবায়নের আবেদনগুলো কোনো কারণ ছাড়াই প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। বাবা-মায়েরা চিন্তিত তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। বিশেষ করে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) থেকে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা শেষ করে যখন এই তরুণরা বাইরের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছে, তখন তাদের একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

তবে বয়কট বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইসরাইলকে দমানো কঠিন। দেশটির দায়িত্বরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি আমলা এবং নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের সঙ্গে পাঁচ দিন ধরে কথা বলে একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা গেল—এই দেশটা এখনো বিশ্বাস করে যে তারা অতি বিপজ্জনক প্রতিবেশীদের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই লড়ছে। এমন একটা দেশ একাকিত্ব সহ্য করে নিতে পারে। এক অদ্ভুত অহংকার নিয়ে এক সরকারি কর্মকর্তা বাইবেলের বুক অব নাম্বারসের একটা বাণী আওড়ালেন, যেখানে ইহুদিদের বলা হয়েছেÑ‘এমন এক জাতি, যারা একাই বসবাস করে; অন্য জাতিদের মধ্যে যাদের গণনা করা হয় না।’ তা ছাড়া, সমালোচক বা শত্রুরা যতটা ভাবছে, ইসরাইল আসলে ততটাও একা নয়।

গাজা যুদ্ধে ৭০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে ইসরাইলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক, নারী ও শিশু। তবে ইসরাইলের ভেতরের চিত্রটা ভিন্ন। সেখানে বৈশ্বিক এই সমালোচনাকে দেখা হচ্ছে অন্যায্য হিসেবে। তাদের দাবি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস সন্ত্রাসীদের আকস্মিক হামলায় যখন ১২০০ মানুষ নির্মমভাবে খুন হলোÑযাদের বেশির ভাগই ছিল সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুÑতখন ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারকে এই সমালোচকরা পাত্তাই দিতে চায়নি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে অনেক ইসরাইলিই এখন সমালোচকদের ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে গালি দিচ্ছেন।

ইসরাইলের পক্ষের মানুষদের কিছু যুক্তি আছে। তাদের মতে, এসব সমালোচনাকে পাত্তা না দিলেও চলবে, কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গুঞ্জন আছে, দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা এখন নজিরবিহীন পর্যায়ে। আমেরিকান ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা এখন অপারেশন রুমে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ কাজ করছেন। কেউ কেউ তো এমনও ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা ও যুদ্ধাস্ত্রের একটি বড় ‘দুর্গ’ হয়ে উঠবে এই ইসরাইল। মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের এই যৌথ কাজকে একটি মডেল হিসেবে দেখছেন। তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সঙ্গে যদি কখনো জাপানের যুদ্ধ বাঁধে, তবে এই মডেলটি সেখানে ব্যবহার করা যাবেÑএমনটাই শুনলাম এক কর্মকর্তার মুখে।

ইসরাইলের সমর্থকরা আরো একটি ক্ষুব্ধ দাবি করছেন। অনেক দেশের সরকারই গাজায় মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। লেবাননে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরাইলের নির্বিচার বিমান হামলারও সমালোচনা করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে অদূরদর্শী যুদ্ধ শুরু করার জন্য বিশ্বনেতারা আমেরিকা ও ইসরাইলকে ধমকও দিয়েছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালের গল্পটা নাকি ভিন্ন। ইউরোপ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব সরকার প্রকাশ্যে আঙুল তুলছে, তারা নাকি গোপনে ইসরাইলের এই কঠোরতার প্রশংসা করছে এবং তাদের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।

আরব বিশ্বে ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। তারা এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখান থেকে আর ফেরার পথ নেই। ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন আমিরাতকে ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করছে। জর্ডানকেও এখন ঘনিষ্ঠ অংশীদার বলা হচ্ছে। এই তালিকায় ভারতও আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৭ সালে ইসরাইল সফরের সময় দুই দেশের গভীর সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে এনেছিলেন।

নেতানিয়াহুর যত সমালোচনাই থাক না কেন, ইউরোপ এখনো ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। জার্মানির নেতৃত্বে দুই পক্ষের মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সাবমেরিনের মতো ভারী যুদ্ধাস্ত্রের বিশাল লেনদেন চলছে। গ্রিস ও ইতালি স্বপ্ন দেখছে পবিত্র ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া জ্বালানি পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। কাজেই, ইসরাইল পুরোপুরি একা হয়ে যায়নি। তবে মনে রাখা ভালো, স্বার্থের অংশীদারত্ব আর শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস কিন্তু এক জিনিস নয়। আর ঠিক এ কারণেই, উচ্চপদস্থ কিছু ইসরাইলি কর্মকর্তা মনে করছেনÑতাদের দেশ আসলে এক বিপজ্জনক একাকিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সাধারণ ইসরাইলিদের অনেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের দেশের একনিষ্ঠ বন্ধু মনে করে দেবতাতুল্য মানেন। কিন্তু ভেতরের মানুষজন অতটা নিশ্চিত নন। নিরাপত্তা গোয়েন্দা বিভাগের কর্তারা আশঙ্কা করছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং তার প্রধান সহযোগীদের এক আঘাতেই শেষ করে দেওয়ার এক জমকালো পরিকল্পনা দেখিয়ে ট্রাম্পকে মন্ত্রমুগ্ধ করা হয়েছিল। ট্রাম্পও হয়তো ভেবেছিলেন খুব দ্রুত ইরানের শাসনক্ষমতা বদলে যাবে। কিন্তু ইরান এখনো মাথা নোয়ায়নি। উল্টো, ১৮ মে উদ্বিগ্ন আরব শাসকদের অনুরোধে ট্রাম্প তার পরিকল্পিত বিমান হামলা স্থগিত করতে বাধ্য হন। ভেতরের এক সূত্র জানায়, নিজের অহংকারের কারণেই ট্রাম্প হয়তো স্বীকার করবেন না যে তাকে এমন এক যুদ্ধে টেনে আনা হয়েছে, যেখানে জয় পাওয়াটা অসম্ভব। তবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানÑউভয় দলেরই অনেক নির্বাচিত নেতা এখন আমেরিকাকে এই বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য ইসরাইলকে দোষারোপ করতে শুরু করেছেন। তারা ভালো করেই জানেন, ইসরাইলের চেয়ে আমেরিকার কাছে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বড় ভয় হলো, খামখেয়ালি ট্রাম্প হয়তো ইরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করে বসবেন, যেখানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো শর্তই থাকবে নাÑঅথচ এটাই ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য। এরই মধ্যে আমেরিকায় ইসরাইল ইস্যুটি রাজনৈতিক বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন রিপাবলিকানদের তুলনায় অনেক কম।

নিরাপত্তা একটি মরীচিকা, যদি মানুষের মনে আশা না থাকে

ইসরাইলের কেউ কেউ মনে করেন, আগামী শরতের নির্বাচনে যদি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে, তবে বৈদেশিক সম্পর্কের এই মেঘ কেটে যাবে। কিন্তু অন্যরা মনে করেন, পরিবর্তনটা আরো বড় হওয়া দরকার। অমি আইয়ালন ছিলেন একজন নেভাল কমান্ডো, ইসরাইলি নৌবাহিনীর প্রধান এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের পরিচালক। পরবর্তী সময়ে তিনি লেবার পার্টির হয়ে সরকারের মন্ত্রীও হন। তার পরামর্শ হলোÑনেতারা কোনোভাবেই জনমতকে উপেক্ষা করতে পারেন না। মিসরের প্রেসিডেন্ট বা জর্ডানের রাজা হয়তো ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চান, কিন্তু ইসরাইল যদি ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র না দিতে পারে, তবে ‘আমরা মিসর ও জর্ডানের সঙ্গে এই শান্তি বজায় রাখতে পারব না’। এই প্রবীণ যোদ্ধা সন্ত্রাসবাদকে তুলনা করলেন মাটির নিচ থেকে বিরামহীন বয়ে চলা ঝরনার সঙ্গে, যাকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার ভাষায়, ১২ বা ১৪ বছরের একটা শিশু যখন তার বাবাকে চোখের সামনে খুন হতে দেখে, তখন সেও ‘হাতে ছুরি তুলে নেয় এবং মরার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়’। তিনি আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরাইলের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। তারা আমাদের ঘৃণা করে না, কিন্তু আমরা যদি আমাদের নীতি না বদলাই, তবে একদিন ঠিকই ঘৃণা করবে।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং নিজেদের ভেতর বিভক্ত এই ইসরাইল এখনই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা দিয়ে দেবে—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকেও এমন কোনো দূরদর্শী বা প্রভাবশালী নেতা দেখা যাচ্ছে না, যিনি আলোচনার টেবিলে বসতে পারেন। যতক্ষণ না বিশ্ববাসী এই সংকটের কোনো আশার আলো দেখছে, ইসরাইল দিন দিন আরো বেশি একাকী, আরো বেশি নিঃসঙ্গ এক দেশে পরিণত হতে থাকবে।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে ভাষান্তর জুলফিকার হায়দার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন