আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

একটি সময়, একটি চেতনা এবং খালেদা জিয়া

সরদার ফরিদ আহমদ

একটি সময়, একটি চেতনা এবং খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের ভূমিকা নির্দিষ্ট দল, ক্ষমতা কিংবা সময়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। তারা ইতিহাসে প্রবেশ করেন একটি বৃহত্তর পরিচয় নিয়ে—জাতির আস্থার জায়গা হিসেবে। মরহুম বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল শ্রেণির একজন। ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজায় যাকে সম্মানিত করা হয়েছে, তাকে কেবল একটি দলের চেয়ারপারসন বা সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে ছোট করে দেখা হবে। তিনি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন একটি জাতির অভিভাবক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘জাতীয় অভিভাবক’ (National Guardian) ধারণাটি সাধারণত অরাজনৈতিক, সর্বজনগ্রাহ্য কিংবা ঐতিহাসিকভাবে ঐক্যের প্রতীক কোনো চরিত্রের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী বা চেক প্রজাতন্ত্রে ভ্যাকলাভ হাভেল—তারা সবাই রাজনীতির গণ্ডি অতিক্রম করে জাতির নৈতিক মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ হয়েও খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এই ধারণা কীভাবে তৈরি হলো?

বিজ্ঞাপন

এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার রাজনীতিতে আগমন, অবস্থান, নীরবতা, ত্যাগ এবং দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাসে।

খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসতে চাননি—এটি তার সমর্থক ও সমালোচক উভয়েই স্বীকার করেন। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে সামনে আসেননি। বরং বিএনপিকে টিকিয়ে রাখা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে রক্ষা করার দায়বোধ থেকেই তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার নেতৃত্বকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন—প্রথাগত, আইনি যুক্তিসংগত ও ক্যারিশম্যাটিক। খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব প্রথমে ছিল প্রথাগত উত্তরাধিকারসূত্রে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নেয় ক্যারিশম্যাটিক ও নৈতিক নেতৃত্বে। কারণ তিনি ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে দায়িত্ববোধকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন খালেদা জিয়াকে জাতীয় রাজনীতির লাইমলাইটে নিয়ে আসে। সে সময় রাজনীতি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, দমন-পীড়নে ভরা; কিন্তু তিনি ভয় পাননি। আপসহীন আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন একজন দৃঢ়, সাহসী ও সহনশীল নেত্রী হিসেবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট বলেছেন, ‘ক্ষমতা আসে সম্মতি থেকে, কিন্তু কর্তৃত্ব আসে নৈতিক অবস্থান থেকে।’ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, তিনি তার নৈতিক অবস্থানের কারণে কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাকে বারবার অপ্রাসঙ্গিক করার অপচেষ্টা হয়েছে—কখনো মামলা দিয়ে, কখনো কারাবাস দিয়ে, কখনো প্রচারযুদ্ধের মাধ্যমে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি ক্ষমতায় থাকুন বা বিরোধী দলে—সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ছিলেন। ৪৩ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্‌জের মতে, ‘কিছু নেতা আছেন যারা ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকেন।’ খালেদা জিয়া সেই বিরল উদাহরণ।

খালেদা জিয়ার রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার নীরবতা। তিনি উচ্চকণ্ঠে কথা বলতেন না, ব্যক্তিগত আক্রমণে যেতেন না। কিন্তু তার নীরবতা ছিল গভীর অর্থবহ। এটি ছিল মর্যাদাবোধ ও আত্মসংযমের রাজনীতি। দীর্ঘ কারাবাসেও তিনি আপস করেননি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিন শার্প লিখেছেন, ‘অসহযোগ ও নীরব প্রতিরোধ অনেক সময় সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র।’ খালেদা জিয়ার নীরবতা তাকে দলের নেতার চেয়েও অনেক ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে এমন কোনো রাজনৈতিক নেত্রী দেখা যায়নি, যিনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও এতটা সম্মানিত হয়েছেন। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের ঢল—এটি কোনো দলীয় আয়োজন ছিল না, ছিল একটি জাতির আবেগ। এই সম্মান কোনো রাষ্ট্রীয় পদ, প্রশাসনিক শক্তি বা মিডিয়া ব্যবস্থাপনার ফল নয়। এটি এসেছে তার ত্যাগ, সহিষ্ণুতা এবং আপসহীন দেশপ্রেম থেকে।

খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে কখনো কোনো বিতর্ক তৈরি হয়নি। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশ ত্যাগ করেননি। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘এই দেশই আমার ঠিকানা। এখানেই আমার মৃত্যু হবে।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন বলেন, ‘দেশপ্রেম মানে কেবল পতাকা নয়, বরং জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া কষ্ট।’ খালেদা জিয়া সেই দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে এক জনসভায় খালেদা জিয়ার উচ্চারিত একটি বাক্য আজ ইতিহাসের নির্মম সত্য হিসেবে ফিরে আসে—‘আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, অন্যদের হাতে গোলামির জিঞ্জির।’ তিনি তখন আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করেছিলেন। পরবর্তী টানা ১৫ বছরে আমরা দেখেছি, কীভাবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষয় হয়েছে। বিদেশি আধিপত্য, একদলীয় কর্তৃত্ব ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কার্যত গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা সতর্ক করেছিলেন—‘গণতন্ত্র ধ্বংস হয় ধীরে ধীরে, ভেতর থেকে।’ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল সেই ধ্বংসের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ নৈতিক প্রতিরোধ। খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন জাতির অভিভাবক, কারণ তিনি ক্ষমতার চেয়ে মূল্যবোধকে বড় করে দেখেছিলেন। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আস্থার প্রতীক।

ইতিহাস একদিন এই প্রশ্নের উত্তর দেবে—কে ক্ষমতায় ছিল, কে ছিল না। কিন্তু ইতিহাস এটিও লিখে রাখবে—একজন নারী ছিলেন, যিনি রাজনীতিতে আসতে চাননি; কিন্তু রাজনীতি তাকে ছাড়া চলেনি। খালেদা জিয়া সেই নাম। বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে সম্মানিত নারী নেত্রী’।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খালেদা জিয়াকে কী পরিচয়ে মনে রাখবে

একটি জাতির ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে লেখা হয় না; লেখা হয় স্মৃতি, প্রেরণা ও উত্তরাধিকার দিয়ে। বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক চরিত্র, যার প্রভাব আজ আর শুধু সমসাময়িক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, তিনি ক্রমেই প্রবেশ করছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চেতনায়। বিশেষ করে তরুণদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন প্রেরণার উৎস। তিনি তাদের কাছে গণতন্ত্রের প্রতীক, দেশপ্রেমের প্রতীক এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের নিপীড়ন–নির্যাতনের এক জীবন্ত প্রতীক। জুলাইযোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদির উচ্চারণ—‘খালেদা জিয়াই বাংলাদেশ। খালেদা জিয়া হাসলে বাংলাদেশ হাসে, খালেদা জিয়া কাঁদলে বাংলাদেশ কাঁদে।’ এই বাক্যটি কোনো আবেগি স্লোগান নয়; এটি একটি প্রজন্মের মানসিক মানচিত্রের প্রকাশ। যে প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গণতন্ত্রহীনতা ও মতপ্রকাশের সংকটের ভেতর বড় হয়েছে, তাদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন প্রতিরোধের নীরব প্রতীক।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন ‘Imagined Community’ তত্ত্বে বলেছেন, একটি জাতি কেবল ভৌগোলিক সীমারেখায় নয়, বরং অভিন্ন অনুভূতি ও প্রতীকের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। খালেদা জিয়া সেই অর্থে একটি রাজনৈতিক প্রতীক, যার ব্যক্তিগত কষ্ট, দীর্ঘ কারাবাস ও আপসহীনতা তরুণদের মনে গণতন্ত্রের ধারণাকে জীবন্ত করে তুলেছে।

তরুণ প্রজন্ম খালেদা জিয়াকে সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে খুব বেশি দেখেনি। তারা দেখেছে একজন কারাবন্দি ও নিঃসঙ্গ নেত্রীকে, যাকে বারবার ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু যিনি মাথা নত করেননি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ‘নৈতিক কর্তৃত্ব জন্ম নেয় ভোগান্তির মধ্য দিয়ে।’ খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ভোগান্তি তাকে তরুণদের কাছে নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। এই প্রজন্মের কাছে তিনি কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন। তিনি আন্দোলনের নেত্রী, যার নাম উচ্চারণ মানেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে গুম, খুন, কারাগার ও মতপ্রকাশের দমননীতির প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন নিপীড়িত গণতন্ত্রের মুখচ্ছবি।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খালেদা জিয়াকে কোন পরিচয়ে বেশি মনে রাখবে? রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রী, আন্দোলনের নেত্রী, দেশপ্রেমিক, নাকি জাতীয় অভিভাবক হিসেবে? সম্ভবত উত্তরটি একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার যেমন বলেছিলেন, কিছু নেতা থাকেন যাদের জীবন রাজনৈতিক পদে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একসময় ‘নৈতিক রেফারেন্স পয়েন্টে’ পরিণত হন। খালেদা জিয়া সেই পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন।

তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থেকেও সবচেয়ে সম্মানিত ছিলেন। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন, কিন্তু রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন জাতির অভিভাবক, যার প্রতি সম্মান ছিল দলমতের ঊর্ধ্বে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো তাকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে সেই মানুষটি হিসেবে—যিনি হাসলে বাংলাদেশ হাসত, কাঁদলে বাংলাদেশ কাঁদত; যিনি ক্ষমতার জন্য নয়, মূল্যবোধের জন্য রাজনীতি করেছিলেন; যিনি প্রমাণ করেছিলেন, গণতন্ত্র কখনো এক দিনে গড়ে ওঠে না, কিন্তু একজন মানুষ তার নীরব দৃঢ়তায় একটি প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলতে পারেন।

ইতিহাসের বিচারে খালেদা জিয়া কেবল একজন নেত্রী নন; তিনি একটি সময়, একটি চেতনা এবং একটি প্রজন্মের প্রেরণার নাম।

লেখক : অ্যাংকর, টকশো

‘আগামীর বাংলাদেশ’, বিটিভি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন