আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিদায় ২০২৫: অগ্রাহ্য বিপ্লব আর জাতীয় চুনকাম কার্যক্রম

আমীর খসরু

বিদায় ২০২৫: অগ্রাহ্য বিপ্লব আর জাতীয় চুনকাম কার্যক্রম

বছর যায়, বছর আসে এভাবেই সময় চলে যায়। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের বিখ্যাত উক্তি ‘দশকের পর দশক যায়, উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটে না। আবার এমন কোনো সপ্তাহ আছে, যাতে দশকের পর দশকে যা ঘটেনি তা ঘটে যায় একটি মাত্র সপ্তাহে।’ এমনই একসময় গেছে ২০২৫ এবং ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ইতিহাসে। ২০২৪-এর প্রসঙ্গ এ কারণে যে, এই বছরটিতে শুধু ফ্যাসিবাদের বিদায় হয়েছে তাই নয়; আর এটি সম্ভব হয়েছে ন্যায়, নীতি, ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর বদলে নতুন ‘এক রাষ্ট্রকাঠামো’ বিনির্মাণের অর্থাৎ ‘নতুন এক বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে। তরুণ প্রজন্মের রক্তাক্ত উত্থানের নাম বিপ্লব। ২০২৪-এ দশকের পর দশকের ঘটনা সপ্তাহেই ঘটে গেছে। আর ২০২৫ ছিল বিপ্লব রক্ষা, স্বাধীনতা, আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় বহিঃশত্রুর চেষ্টা এবং তার দেশীয় মক্কেলদের বিরুদ্ধে লড়াই, সংগ্রামের বছর। চলমান লড়াই-সংগ্রামে মাঠেঘাটে, পথে-প্রান্তরে জনমানুষের শক্তিমত্তা আরো তীব্র থেকে তীব্র হয়েছে। ২০২৪ এ কারণে ছিল উৎখাতের বছর। আর ২০২৫ হলো রক্ষার এবং অধীনতা, পরাধীনতা থেকে মুক্তির। আর ২০২৪-এর প্রাসঙ্গিকতাÑএ কারণে ২০২৫ সালে অনিবার্যভাবে জরুরি।

প্রশ্ন উঠবেইÑকেন ২০২৪-কে নিয়ে ২০২৫-এ এসে আলোচনা। আলোচনা এ কারণে যে, ন্যায়, ন্যায্যতা এবং জনঅংশগ্রহণমূলক ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার’ বিপ্লবকে কীভাবে ২০২৫-এ এসেও রক্ষা করতে জীবন দিতে হয়? কেন পরাধীনতা, আধিপত্যবিরোধী লড়াইকে শানিত করতে এখনো লড়াই-সংগ্রাম, আন্দোলন করতে হয়? কেন একজন ওসমান হাদিÑকোটি কোটিতে রূপান্তরিত হতে হয়? এ কারণে বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং প্রেক্ষাপটে ২০২৪-এর মতো ২০২৫ সালও ছিল অনন্যসাধারণ এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। এ প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত বিপ্লবের চেতনা অনিবার্যভাবেই বারবার ফিরে আসবে।

বিজ্ঞাপন

এ কথাও বলতে হবে, কীভাবে ৫ আগস্ট (বিপ্লবীদের ভাষায় ৩৬ জুলাই) বিপ্লবের কবর খোঁড়া হয়েছিল? কেন সেনাপ্রধান শুধু একজন ব্যক্তিবিশেষকে ‘পুরো বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে’ আবির্ভূত করলেন? কেন শহীদ মিনারে শপথ না নিয়ে ড. ইউনূস ফ্যাসিবাদী আমলের রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিলেন? কেন সেনানিবাস থেকে অনতিদূরে অপেক্ষমাণ তরুণদের সঙ্গে দেখা করা হলো না? কেন সামান্য বাসে চড়ে বাঘা বাঘা জাতীয় নেতা যাবতীয় প্রটোকল না পেয়েও সেনানিবাসে গিয়েছিলেন?

কেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে তড়িঘড়ি করে বলতে হলোÑ‘এই বিপ্লবের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই? কেন বিপ্লবের শহীদ এবং আহতদের বিষয়ে সামান্য খোঁজখবর না নিয়েই ২০২৪-এর ৭ আগস্ট জনসভা করে দাবি করা হলোÑতিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে? এসবই ২০২৪-এর আগস্টের ৫ থেকে ১৫, অর্থাৎ ১০ দিনের ঘটনা মাত্র। এসব প্রশ্ন উঠবে বারবার, অসংখ্যবার। বিপ্লবকে ব্যর্থ করার চেষ্টাকারী কে, কোন প্রতিষ্ঠান, কোন দেশÑএ প্রশ্নও উঠবে ভবিষ্যৎ বিপ্লবীদের মাধ্যমে।

কারণ সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলসহ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন ‘নাবালক’, ‘বাচ্ছা ছেলেপেলে’ বলে বিপ্লবী তরুণদের আখ্যা দিয়ে একে শুধু ছাত্রদের একটি গণঅভ্যুত্থান হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে নারাজ ছিলেন। তারা তখন ‘সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল, মার্কস-অ্যাঙ্গেলস, মাওবাদ’ না পড়েই শুধু বুলি কপচালেন।

কিন্তু তারা যে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, ঐতিহাসিক জ্ঞানের অভাবে ‘নিদারুণ অভাবী’, তা তারা বুঝতে পারলেন না, পারেননি। প্রথম প্রশ্নটির মীমাংসা প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থান এবং বিপ্লবের মধ্যে বিস্তর ফারাক। গণঅভ্যুত্থানের বৈশিষ্ট্য এবং অর্থ হলো যেকোনো বিষয়ে ক্ষোভ থেকে গণঅভ্যুত্থানের জন্ম নেয়। এটি সরকার বা ক্ষমতার পালাবদল, সামাজিক-অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কারণে ঘটতে পারে। অনেক বা স্বল্পমাত্রায় জনসম্পৃক্ততা থাকে গণঅভ্যুত্থানে এবং গণঅভ্যুত্থান বড় থেকে ছোটÑযেকোনো মাত্রায় হতে পারে। সহিংস বা অহিংস মাত্রারও ঘটনা এটি। খুবই কম ক্ষেত্রে অনুঘটকের (Catalyst) ভূমিকা পালনকারী গণঅভ্যুত্থান কার্যসিদ্ধির পরই শেষ হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং এর কাঠামোসহ রাষ্ট্র ও সমাজের পুরো বা মৌলিক পরিবর্তনের বিষয় সম্পৃক্ত নয়।

আর বিপ্লবের সঙ্গে অতি অবশ্যই রাষ্ট্র কাঠামো, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং এর মৌলিক পরিবর্তন জড়িত এবং এর সঙ্গে অব্যাহত চেষ্টা অবশ্যই থাকতে হবে। চে গুয়েভারার বিখ্যাত উক্তিÑ‘বিপ্লব কখনোই মরে না। বিপ্লবের কোনো মৃত্যু নেই।’ বিপ্লবের চেতনা হচ্ছে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনৈতিকসহ সামগ্রিক মুক্তি, স্থায়ী রাজনৈতিক জনঅংশীদারত্বমূলক বন্দোবস্তসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর বদল। কোনোক্রমেই চুনকাম বা প্লাস্টিক সার্জারি নয়।

বিপ্লব সম্পন্ন করতে হলে মার্কস, লেনিন, চে’র প্রয়োজন শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের জন্য। কৃষিভিত্তিক চীন বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন মাও সেতুংয়ের। তাকে প্রয়োজন জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবী তত্ত্ব তৈরির সময়। শ্রমিক শ্রেণি এবং জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের তাত্ত্বিক আলোচনায় যাব না। শুধু আমাদের বয়োবৃদ্ধ নেতাদের বুর্জোয়া বিপ্লবও যে সম্ভব, সে কথাটি জানাতে চাই। ফরাসি বিপ্লব এবং আমেরিকান বা জার্মান বিপ্লব কোন ধরনের বিপ্লব ছিল? ইরানি ইসলামি বিপ্লবে মার্কস, লেনিন, মাও এবং তাদের তত্ত্ব কোথায়? বিপ্লবে একমাত্রিকতা বা এক বা একক নেতৃত্ব ও দল থাকতে হবেÑএমনও নয়, যেমন ফরাসি বিপ্লব। এ নিয়েও আর আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। বুর্জোয়া বিপ্লবও যে সম্ভবÑবোধ করি সে বোধ-বুদ্ধির বিকাশ না হওয়ায় এবং মতলবি রাজনীতিবিদ, ভিনদেশের ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী বা স্বঘোষিত সুশীল সমাজ কেন ২০২৪-এর বিপ্লবের বৈধতা দেবে? এ শ্রেণিগুলো সমস্বরে কেন বলবে না যে, এটি ছিল শুধু কিছুসংখ্যক ছাত্রের আন্দোলন?

জবাব হচ্ছেÑ২০২৪-এর বিপ্লব এবং ২০২৫ সালে তা রক্ষার চেষ্টাকারী সবাই সাধারণ মানুষ। একটি মাত্র উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে। প্রথম আলোর ২০২৫-এর ২০ জুলাই সংখ্যায় বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৮৪ জন শ্রমজীবী, ২৬৯ জন শিক্ষার্থী বা ছাত্র, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১২০ জন, চাকরিজীবী ১০৮ এবং অন্যান্য ২৯ জন অর্থাৎ ৮৪৪ জন শহীদ হয়েছেন। এর বাইরেও শুধু ২০২৪-এর জুলাইয়ে শিশু নিহত হয়েছে ১৩৩ জন। এছাড়া হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী শহীদের সংখ্যা ৯৮৬ জন, যাদের মধ্যে ১১৮ জন অজ্ঞাত পরিচয়।

জাতিসংঘ মানবাধিকার-সংক্রান্ত হাইকমিশন অফিস (OHCHR) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, জুলাই বিপ্লবে কমপক্ষে এক হাজার ৪০০ জন (জুলাই মাস ও ৫ আগস্ট) নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু। আহত হয়েছেন (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী) কমপক্ষে ১৪ হাজার জন। বেসরকারি এবং সংবাদপত্রের হিসাব অনুযায়ী কমপক্ষে ১৫০ থেকে ২০০ জনের হিসাব ২০২৫-এর ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচয় অজ্ঞাত। এছাড়াও জাতিসংঘ গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। এসবসহ জুলাই বিপ্লব হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও এর গোয়েন্দা সংস্থা, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সরাসরি দায়ী করেছে। ওই রিপোর্ট অনুযায়ী ৬৬ শতাংশ সেনাবাহিনীর রাইফেলের গুলি, ১২ শতাংশ শটগানের গুলি এবং প্রাণঘাতী মেটাল বা ধাতুজাতীয় গুলি, ২ শতাংশ পিস্তলের গুলি ব্যবহৃত হয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৬৭৭ জন গুম হয়েছেন। এই যখন পরিস্থিতি, তখন তরুণ বিপ্লবীরা দুটি সমস্যার মধ্যে পড়ে যায়। এক. বিপ্লবী সরকারের একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তি, যে ব্যক্তি বিপ্লবের কারণ এবং অঙ্গীকারগুলো অন্তরে ধারণ করবেন এবং তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। আদর্শিক বিপ্লবে বিপ্লবী নেতার কাজটি তিনি সম্পাদন করতে পারবেন নাÑএটা সত্য। তবে তিনি এই বিপ্লবে সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। দুই. বুদ্ধিবৃত্তিক এবং দার্শনিক ভিত্তি তৈরির জন্য সমাজের বুদ্ধিজীবী এবং দার্শনিকগণ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ দুই ক্ষেত্রেই ছিল বিশাল ঘাটতি। ছাত্রসহ তরুণ শ্রেণি খুঁজে বের করলেন এমন একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি চাক্ষুস বিপ্লবের সঙ্গে কোনোক্রমেই সম্পৃক্ত ছিলেন না। জুলাই বিপ্লব তিনি স্বচক্ষে দেখেনওনি এবং ‘ন্যায়, ন্যায্যতা ও ইনসাফের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ এবং ‘রাষ্ট্র কাঠামোর’ অনুসারীও নন। তিনি এনজিও চালানো একজন নোবেল বিজয়ী।

বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিভূমি ছিল তরুণ বিপ্লবীদের বিপক্ষে। বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোটি পরিচালিত হয়Ñপ্রায় সবক্ষেত্রে বহিঃদেশীয় আধিপত্যবাদ ও অধীনতামূলক বাস্তবতার মাধ্যমে ও নিরিখে। এখানে ফরাসি বিপ্লবের কথা বলতে গেলে জ্যঁ জ্যাঁক রুশো, ভলতেয়ার (আসল নাম ফ্রাঁসোয়া মারি আরুয়েট), চার্লস দে মতেস্কুর মতো দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীর কথা বলা হয়। আমেরিকান বিপ্লবের প্রধান পুরুষরা ছিলেন স্যামুয়েল অ্যাডামস, জন অ্যাডামস, জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন প্রমুখ। জার্মান বিপ্লবের (যা ছিল মূলত চার্চের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ) মূল নেতা ছিলেন মার্টিন লুথার। তিনি খ্রিষ্টধর্মের একটি অংশের প্রধান পুরুষ অর্থাৎ প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান ধর্মের প্রবক্তা।

দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি বিপ্লবের জন্য কেন অনিবার্যভাবে প্রয়োজন, তা আমরা বুঝতে পারব ফরাসি বিপ্লবের এমন একজন ব্যক্তি অর্থাৎ জ্যঁ জ্যাঁক রুশোর ‘সোশ্যাল কনট্রাক্ট’ (সমাজ সংস্থা) নামের বইয়ে তারই এক উক্তিতে। তিনি বলছেন, “শক্তিমানের (আসুরিক) শক্তির ভিত্তিতে ‘জনগোষ্ঠীর’ (তাদের) স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আবার সেই শক্তির ভিত্তিতেই সেই জনগোষ্ঠী তা ফিরিয়ে নিল। যদি বলপূর্বক মুক্তি অর্জন ন্যায়সংগত না হয়ে থাকে, তাহলে এ কথাও সত্য যে, তাদের বলপূর্বক স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়াও ন্যায়সংগত ছিল না।” রুশো এও বলেন, সমাজব্যবস্থা একটি পবিত্র বন্ধন এবং এ বন্ধনই মানুষের অধিকারগুলোর ভিত্তিভূমি। (তথ্যসূত্র : সোশ্যাল কনট্রাক্ট, প্রথম খণ্ড, প্রথম অধ্যায়)

বাংলাদেশের এমন দুর্ভাগ্য যে, ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের অর্থাৎ বিপ্লবের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এত আন্দোলন-সংগ্রামের পরও ‘আসল সময়ে’ অনুপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ বিপ্লবের ‘মূল পর্বে’ তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। আর ড. মুহাম্মদ ইউনূস পুরো বিপ্লবকালে ছিলেন প্যারিসসহ বিদেশে। বিপ্লবকে ধারণ করতে গেলে নিজেকে বিপ্লবের সঙ্গে একাত্ম, আপন করা এবং এর সঙ্গে একাকার হওয়ার জন্য বিপ্লবের প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হয়। এ কথা বলতেই হবে, ড. ইউনূস বিপ্লব তো দূরের কথা; রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না।

তাদের এ অনুপস্থিতিতে বিপ্লবের চেতনা এবং ব্যক্তি চৈতন্যে বাস্তবতার সঙ্গে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয়। এটা একটি শূন্যতা এবং রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ’৭০-এর দশকের মধ্যবর্তী সময়ে গোষ্ঠী এবং দালাল তোষামোদকারী শ্রেণি জন্ম নিয়েছে। আর ২০২৪-এ ওই স্থান দখল করেছে অলিগার্কি, ডিপ স্টেট (Deep-state)।

এছাড়াও একটি শ্রেণি এমতাবস্থায় চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকেন। দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির মতে, (রাজা বা ক্ষমতার প্রধান ব্যক্তি) চাটুকারদের হাতে সহজেই ঘায়েল হতে পারেন। কারণ, চাটুকারের অবস্থান ব্যাপক ও বিস্তৃত। [নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি দ্য প্রিন্স, পরিচ্ছদ-২৩ এবং এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৫৩২ সালে। বর্তমান বইটি প্রকাশিত হয় আগস্ট ২০১৫]।

২০২৪-এর এমনই এক রক্তাক্ত বিপ্লবকে ব্যর্থ করার লক্ষ্যে ডিপ স্টেটের, যার সঙ্গে পতিত ফ্যাসিবাদের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, সংবাদপত্র ও মাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসহ যারা সংযুক্ত থাকে, তাদের সবাই এবং বৃহৎ রাজনৈতিক একটি দল ও গোষ্ঠীসহ তারা সবাই শুধু জোটবদ্ধই হলো না; বরং উল্টো উঠেপড়ে লাগল। এর সঙ্গে বড় আকারে যুক্ত হলো হেজিমনি অর্থাৎ আধিপত্য এবং স্বাধীনতাবাদী বহিঃশত্রু এবং এর দেশীয় সহযোগীরা। আমি আগাগোড়াই বলে এসেছিÑশুধু শাসক বা এককের বদলে রাষ্ট্র কাঠামো বদল হয় না। বরং তা জন্ম নেয় এক গভীর সংকটেরÑহামজা আলাভি যার তাত্ত্বিক নাম দিয়েছেন ‘ওভার ডেভেলপট স্টেট’ বলে। বাংলাদেশে পুনরায় এ তত্ত্ব কার্যকর হলো।

২০২৫-এ একই সঙ্গে দুটি ঘটনা ঘটল। বিপ্লবের তরুণরা কান্ডারিহীন হয়ে ‘ভুল পদ্ধতি’তে নতুন দল গঠন করল। স্পষ্ট করেই বলছি দল গঠনে ভুল ছিল না, ভুল ছিল এর পদ্ধতিতে এবং প্রক্রিয়ায়। ২০২৫-এর ২৮ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি বা এনসিপি গঠন করে ছাত্র ও তরুণরা। ২০২৪-এর বিপ্লবে শ্রমিক, কর্মচারী, রিকশাওয়ালা, মজুর, কৃষকসহ সর্বজনের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু এনসিপি হয়ে উঠল শুধু ছাত্র-তরুণদের একটি প্রান্তিক দলে। সেখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লবীদেরও বাদ দেওয়া হলো। নতুন দলটিতে শ্রমিক, মজুর, কর্মচারীসহ বিপ্লবের অংশীজনদের বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপির সঙ্গে বিপ্লব ও অধিকাংশ সক্রিয় বিপ্লবীদের বিশাল দূরত্ব এবং ফারাক তৈরি হলো। এ সংকটের বিকলাঙ্গতায় এনসিপি আগে থেকেই ভুগছে। একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় অধিকাংশ বিপ্লবীর মায়েরা কোথায় এ দলটিতে? যাদের অবদান অনস্বীকার্য। এনসিপি নিজ প্রক্রিয়াগত ভুলে হয়ে গেল শুধু ছাত্রদের দল। অথচ এটি হতে পারত ১৯৪৭-এর পর প্রথম ‘তরুণ নেতৃত্বের পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সর্বশ্রেণির বিপ্লবী দলে’। কিন্তু তারা বৃত্তবন্দি হয়ে পড়ল।

এনসিপির দ্বিতীয় ভ্রান্তিÑতারা কি নির্বাচনমুখী দল? না, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পরিবেশ যাকে পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ (Political Landscape) বলা হয়Ñতাই তাদের নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য করেছে? এ দোদুল্যমানতার কারণেই যে বড় দলটি জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই, তারা কুমতলবি রাজনীতি শুরু করল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস বিপ্লবকে অস্বীকার করা এবং হত্যাকারী দুয়েকজন উপদেষ্টার বুদ্ধি-পরামর্শে ঐকমত্য কমিশন ও প্রায় ডজন দুয়েক সংস্কার কমিশন গঠন করলেন। ঐকমত্য কমিশন এবং সংস্কারের নামে কমিশনগুলো বিপ্লববিরোধী, নির্বাচনমুখী এবং বর্তমান কাঠামোকে বজায় রাখার লক্ষ্যে বিপ্লবীদের প্রত্যাশিত ‘নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। সংস্কার কমিশনগুলোকে ভেঙে পড়া কাঠামো টিকিয়ে রাখার ‘চুনকাম প্রকল্প’ ছাড়া কিছুই বলা উচিত হবে না। এটি প্লাস্টিক সার্জারির মতো ব্যয়সাপেক্ষ এবং উন্নতও নয়। আর ঐকমত্য কমিশনের নামে ভালো ভালো প্লেয়ার থাকলেও বিদেশি ভাড়াটিয়া মতলববাজদের ‘হায়ার করা প্লেয়ার’ আনা হলো, যাদের এ-সম্পর্কিত রাজনৈতিক কোনো দক্ষতা-প্রজ্ঞার অতীত ইতিহাস নেই। ঐক্যের বদলে এ কমিশন রাজনৈতিক অনৈক্য সৃষ্টি করেছে বলে মনে করে সাধারণ মানুষ।

এ কমিশনের সদস্যদের কিংবা সরকারের হয়তো জানা নেই জেনারেল এরশাদ আমলে ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর স্যার নিনিয়ান স্টিফেন এবং ১৯৯৪-৯৫-এ বেগম খালেদা জিয়ার আমলে কমনওয়েলথের তৎকালীন মহাসচিব এমেকা আনিয়াওকু ঢাকায় এসেছিলেন রাজনৈতিক সংকট ও অচলাবস্থা নিরসনে। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ তথ্য জানা থাকলে অথবা জানা আছে, মতলবি কারণে বলা হচ্ছে না এমনটা হতে পারে।

এনসিপির অসহায়ত্ব, বিপ্লবের ভুয়া ও মতলবি দাবিদারদের কাছে জুলাই বিপ্লবের বৈধতার জন্য চরম তুচ্ছতাচ্ছিল হজম করে অসহায়ত্ব নিয়ে তরুণ বিপ্লবীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০২৫-এ রাজনৈতিক বিকলাঙ্গ, অসাড় এবং ভিনদেশি অধীনতাকামীদের জাতি চিনতে পেরেছে। তবে এটিও এক বিরাট অর্জন। জাতি চিনতে পেরেছে দালাল এবং তথাকথিত স্বঘোষিত জ্ঞানী বলে দাবিদারদের। জ্ঞান কপটতার কাছে তুচ্ছ, তা আবার প্রমাণিত।

নয়া বাস্তবতা

২০২৪-এর প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে এসে এক নতুন বাস্তবতা এবং নয়া রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি হয়েছে। ড. ইউনূসের সংস্কার তত্ত্ব, নির্বাচনি হাওয়া এবং এর আগে বহু কষ্টে জোগাড় করা অকার্যকর, মূল্যহীন জুলাই সনদ পাওয়া এই বাস্তবতা ও পরিপ্রেক্ষিত এখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর হয়ে পড়েছে। এক সময় এই তো ক্ষমতায় এসে গেলাম মনস্তত্ত্বের দলটি এখন অসহায় আচরণ করছে। মানুষের মনস্তত্ত্ব না বুঝলে এটা হতে বাধ্য তারা তা বুঝতে পারেনি। অলিগার্কির কার্যক্রম লন্ডভন্ড। ডিপ স্টেটের কার্যক্রমে কোনো হিসাব মিলছে না। ১/১১ এবং এর পরের ২০০৮-এর নির্বাচনি তত্ত্ব যারা ফেরি করছিলেন, তারাও ভীতসন্ত্রস্ত। আর অধীনতাবাদ ও পরাধীনতা বাস্তবায়ন প্রকল্প দিশাহারা।

এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সূক্ষ্ম দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছেন। ড. ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে নয় হঠাৎ মনে এলো তাই বলছি।

চীনের প্রাচীনকালের দার্শনিক হলেও এখনো প্রাসঙ্গিক ‘কনফুসিয়াস’ বলেছিলেন, ‘সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী-বুদ্ধিমান এবং সবচেয়ে উচ্চমাত্রার বেকুব কখনোই বদলায় না।’ আবার এর উল্টোটাও বলেছেনÑহিটলারের শাসনামলে সীমাহীন নির্যাতনের শিকার, অস্ট্রীয় মনস্তত্ত্ববিদ, দার্শনিক ভিক্টর ফ্রাঙ্ককে তিনি বলেন, ‘যখন পরিস্থিতিকে কোনোক্রমেই পরিবর্তন করা যায় না, তখন নিজেকে পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।’

ওসমান হাদির শহীদ হওয়া নয়া বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার এবং বড় দলটিসহ পুরো রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি এবং জাতীয়, পররাষ্ট্র নীতি, নিরাপত্তা-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। ২০২৪-এর ঝিমিয়ে পড়া বিপ্লব আবার জেগে উঠেছে লক্ষ-কোটি গুণ বেশি শক্তি অর্জন করে। হাদির ইস্যু আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক, পররাষ্ট্র, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং পুরো রাজনৈতিকসহ এ-সম্পর্কিত বিষয়কে শুধু নাড়াচাড়া নয়, বদলে দিতে পারে। পরিবর্তন হতে পারে বিপ্লবের ভরকেন্দ্রের এবং বেশ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে নয় হবেই। এর প্রথম আলামত নির্বাচনি জোট গঠন। এর মধ্য দিয়ে এনসিপি বিপ্লবী দল থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক দলে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে যদি চায় তাহলে ৩০০ আসন গোছানোর সুযোগ পাবে। আবার জামায়াত তার রাজনৈতিক পন্থা পরিবর্তন করে মধ্যপন্থার কাছাকাছি একটি বিকল্প বড় দল হিসেবে নিজেকে পরিণত করতে পারার সুযোগ পেল। তাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তুরস্ক থেকে। তাদের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের এ কে পার্টির (তুরস্ক ভাষান্তর ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন দল) মতো রক্ষণশীল প্রজাতন্ত্রী দল অথবা মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো যেমন আছি তেমন থাকব অর্থাৎ জামায়াত রাজনৈতিক, সামাজিক, পরিশোধনে যাবে কি যাবে না?

আর বিএনপিপ্রধান তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, তার অতীত বাক্যের মতোইÑ‘আমার একার ওপর সবকিছু নির্ভর করে না’র মতো হবে অথবা তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সবই জনাব রহমানের ওপর নির্ভর করে। দল এখানে মুখ্য নয়।

তবে ২০২৫-এর আলোচনায় যে কথাটি না বললেই নয়, তা হচ্ছে বাংলাদেশে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষার পরিবর্তন হবে বলেই কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। ভূরাজনৈতিক মেরূকরণ শুরু হয়েছেÑঅদূর ভবিষ্যতে আরো স্পষ্ট হবে নতুন মেরূকরণ। এটিও একটি নতুন বাস্তবতা, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।

নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে আগামী সময়টি; অন্তত কয়েক মাস যেন আর সহিংসতা না হয়, সেটাই কামনা করি।

তবে একটি কথা বলতেই হবে, ২০২৬-এও বিপ্লব এবং বিপ্লবী চেতনা অব্যাহত থাকবে। আর এর মূল কেন্দ্রে থাকবেন শহীদ ওসমান হাদি। এ বিপ্লবের ‘ভরকেন্দ্র’ (Center of Mass or Center of Gravity) অদলবদল হবে এবং হতে বাধ্য। আশা করি, তা যেন হয় শান্তিপূর্ণ। যদিও বিপ্লবের সমাধানে অর্থাৎ পূর্ণ বাস্তবায়নে শান্তিপূর্ণ কোনো পথ নেই।

আবারও বলছি, ২০২৬ হবে বিপ্লব বাস্তবায়নের বছর। আর পুরোনোকে বিদায় দিয়ে অধীনতা, আধিপত্যের বিরুদ্ধে দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ এবং প্রস্তুতÑএ বার্তা দেওয়া অপরিহার্য।

লেখক : লেখক, গবেষক, সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন