আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কপালে কাঁঠালপাতা ও ঘাস নেই তো?

এম আবদুল্লাহ

কপালে কাঁঠালপাতা ও ঘাস নেই তো?

বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশ অষ্টম মাসে পা ফেলেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার পূর্ণ করেছেন সাত মাস। এ সময়ে সাফল্য যেমন আছে, আছে ব্যর্থতাও। অন্তর্বর্তী শাসনের ২১০ দিনের মাথায় এসে মূল্যস্ফীতি সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এসেছে, যা একই সঙ্গে সরকার ও জনগণের জন্য খানিকটা স্বস্তির।

পতিত হাসিনা সরকারই মূল্যস্ফীতি ডবল ডিজিটে তুলে রেখে গিয়েছিল। ১০ মাস পর খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের নিচে নামার খবরটি দুদিন আগে দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। সর্বশেষ হিসাবে, ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ হয়েছে। গত বছরের (২০২৪ সালের) মার্চ মাসের পর খাদ্যের মূল্যস্ফীতি আর এক অঙ্কের ঘরে নামেনি।

বিজ্ঞাপন

সিয়াম-সাধনার রমজান মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির এক অঙ্কে নেমে আসার খবরটি আশাব্যঞ্জক। এবারের রমজানে ভোজ্যতেল ছাড়া অন্যসব ভোগ্যপণ্যে রোজাদার মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির মধ্যে আছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, ছোলা, খেজুর, বেগুন, শসাসহ রমজানে অধিক চাহিদার খাদ্যপণ্য গত কয়েক বছরের রমজানের তুলনায় কম দামে পাওয়া যাচ্ছে বা অস্বাভাবিক বাড়েনি। সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছে ‘বিগত রমজানের চেয়ে এবার রমজান-পণ্যের দাম কম’।

সপ্তম মাসেও নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে অনেকগুলো আন্দোলন সামাল দিতে হয়েছে অরাজনৈতিক সরকারকে। বিশেষত, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের রাজধানীজুড়ে অবরোধ-নৈরাজ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে বাতিল হওয়া নিয়োগ ফিরে পাওয়ার আন্দোলন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের বিক্ষোভ দ্রুতই নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।

হাসিনা শাসনে বিতর্কিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে থাকা ডিসি-এসপিদের চিহ্নিত করে বাধ্যতামূলক অবসরে দেওয়া বা ওএসডি করা, সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য সারসংক্ষেপ পাঠানো, শেখ পরিবারের নামে থাকা ১৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন, মর্যাদাপূর্ণ স্বাধীনতা ও একুশে পদকের জন্য সত্যিকারের প্রাপ্যদের মনোনয়ন, উপদেষ্টা পরিষদে সাত মাসে গৃহীত সিদ্ধান্তের ৬৮ শতাংশ বাস্তবায়ন ইতিবাচক হিসেবে দেখা যেতে পারে।

এ ছাড়া শিক্ষা ও তথ্য উপদেষ্টা পদে নতুন মুখের দায়িত্ব গ্রহণ, আরো দুই বিশেষ সহকারীকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান, যৌথবাহিনীর অপারেশন ‘ডেভিল হান্ট’র মাধ্যমে ১৩ হাজারের বেশি অপরাধী ও সন্দেহভাজনকে আটক, ট্রাম্প-মোদি বৈঠকে বাংলাদেশ ইস্যু সামাল দিতে ইউনূস-ইলনমাস্ক ফোনালাপের মতো পদক্ষেপগুলো ছিল সময়োপযোগী।

একই সঙ্গে সাত মাসে শ্রমিক অসন্তোষে তিন শিল্প এলাকার ৯৫টি কারখানা বন্ধ হওয়া, ছয় মাসে পুলিশের ওপর ২২৫ হামলার ঘটনা, ঢাকার মোহাম্মদপুরে যৌথবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে দুজনের মৃত্যু, গুলশানের একটি বাড়িতে রাত গভীরে তাণ্ডব, সিগারেট-কাণ্ড, ওড়না-কাণ্ড, আইন হাতে তুলে নিয়ে মব-ত্রাস, রাজধানীতে ফিল্মি স্টাইলে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো সরকারের জন্য যেমন খুবই অস্বস্তিকর ছিল, তেমনি নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

গেল মাসেই জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ওপর শেখ হাসিনার সরকার ও আওয়ামী লীগের বর্বর নিপীড়ন এবং গণহত্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন। অকাট্য দলিলসহ প্রতিবেদনে গণহত্যায় সরাসরি শেখ হাসিনার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে, যা ভারতে পলাতক নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী শাসকের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ষোলো বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর কৃতিত্ব নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে অনেক দিন ধরে। হাজারো ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গত বছরের জুলাই-আগস্টে যে অবিস্মরণীয় বিজয় সূচিত হয়েছে, তার কৃতিত্বের নতুন দাবিদার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের হার্ডটক অনুষ্ঠানে ফলকার টুর্ক অনেকটা সরাসরি বাংলাদেশে পরিবর্তনের ক্রেডিট নেন। ফলকার টুর্ক বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে আমরা সতর্ক করি, যদি তারা জড়িত হয়, তাহলে শান্তিরক্ষী মিশনে হয়তো আর সেনা পাঠাতে পারবে না’। ফলকার টুর্ক আরো যোগ করেন, ‘বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে সতর্ক করার পর গত ৫ আগস্ট দেশটিতে পরিবর্তন এসেছে।’ বিবিসির ওয়েবসাইটে গত বুধবার হার্ডটক অনুষ্ঠানের এই পর্ব প্রকাশ করা হয়। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই অনুষ্ঠানে ফলকার টুর্কের সঙ্গে কথা বলেন বিবিসির সাংবাদিক স্টিফেন সাকার।

ফলকার টুর্কের এ বক্তব্যের সমর্থন অবশ্য অনেক আগেই মিলেছিল। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন রিপোর্ট প্রকাশ পেয়েছিল। পয়েন্ট আকারে দৈনন্দিন ঘটনা নিয়ে প্রস্তুত ৪ আগস্টের প্রতিবেদনে ২১ নম্বর পয়েন্ট হিসেবে লেখা ছিল-‘দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু কর্তৃক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ইউএন মিশন থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে মুখ্যসচিবকে হুমকি প্রদান’।

ফলকার টুর্ক অবশ্য কোন পর্যায়ে কথা বলেছেন, তা খোলাসা করেননি। হাসিনা রেজিমে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার বিশ্ব সংস্থাটির ওই মানবাধিকার কর্তার কৃতিত্ব দাবির পর এখনো পর্যন্ত রাজনৈতিক দল, ছাত্রনেতৃত্ব বা সেনাবাহিনীর তরফে কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া আসেনি।

এটা ঠিক যে, জুলাই অভ্যুত্থানের শেষপর্যায়ে এসে সেনাবাহিনীর দৃঢ় অবস্থান চূড়ান্ত বিজয় ত্বরান্বিত করেছে এবং লাশের সারি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ জন্য সশস্ত্র বাহিনী প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানানো হয়েছে বিভিন্ন প্ল্যাটফরম থেকে।

এখন ফলকার টুর্কের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনেকে বলতে পারেন, শান্তিরক্ষা মিশন সুবিধা হারানোর মুখেই সশস্ত্র বাহিনী শেখ হাসিনার গণহত্যার হুমুক অগ্রাহ্য করে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়েছে বা দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে। ২০০৭ সালে মইনদের ক্ষমতা দখলের সময়ও শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাদ পড়ার ইস্যুটিকে সামনে আনা হয়েছিল। পরে অবশ্য জানা গেছে সেটি একটি ভুয়া চিঠির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল।

ফলকার টুর্কের বক্তব্যে গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে বাগযুদ্ধে জড়ানো রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতৃত্বের জন্যও বার্তা রয়েছে। বস্তুত, জুলাই বিপ্লবকে একটি শ্বাসরুদ্ধকর ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ইনিংসের সূত্রপাত সাফল্যের সঙ্গে সম্মানজনক রান করার পর রাজনীতিকরা যোগ করে সমতায় নেন এবং ডোনাল্ড লু, ফলকার টুর্ক ও সেনাবাহিনী মিলে শেষ বলে ছক্কা মেরে বিজয় নিশ্চিত করেন। এভাবে দেখলেই সম্ভবত গণঅভ্যুত্থানের সব শক্তির প্রতি সুবিচার করা হবে। কাউকে কেউ তুচ্ছ ও খাটো করার প্রবণতা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

এই নিবন্ধ লেখা শেষ করার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভাইরাল ভিডিও এবং নিউজ ক্লিপ নিয়ে তোলপাড় চলছিল। পুলিশের সামনে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্রের ওই ভিডিওটি পোস্ট করে বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ফেসবুকে লেখেনÑ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নবাব আবদুল লতিফ হলের শিবির সভাপতির রুম থেকে উদ্ধারকৃত পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র।

এগুলো নিয়েই সমগ্র বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটাতে চাচ্ছে’। আবার আমার দেশ-এর নামে একটি ভুয়া পেজ থেকে একই ভিডিও ক্লিপ ও সংবাদ পোস্ট করে লেখা হয়-‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নবাব আবদুল লতিফ হলের ছাত্রদল সভাপতির রুম থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র।’ দুটি পোস্টই দুপক্ষে সমর্থকরা ব্যাপকভাবে শেয়ার ও রি-পোস্ট করেন। শুক্রবার দিন ও রাতে এ নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে পরস্পরকে ঘায়েল করার তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যায়।

ফ্যাক্ট চেকাররা অস্ত্রের ভাইরাল ভিডিওটি পরীক্ষা করে দেখেন সেটি মূলত গত বছরের ১৮ আগস্টের। ৫ আগস্টের আগে-পরে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানাসহ দুই থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র সেনাবাহিনী উদ্ধার করে পুলিশকে বুঝিয়ে দেওয়ার ভিডিও এবং আলোকচিত্রকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফ্যাক্টচেকাররা বলছেন, প্রথমে ভিডিওটি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শিবিরের বিরুদ্ধে ছড়ায়। লুফে নেয় ছাত্রদল। পরে পতিত লীগ নেতাকর্মীরা বিএনপি ও ছাত্রদলের পোস্টগুলো শেয়ার করে ব্যাপকভাবে। অন্যদিকে আমার দেশ-এর নামে ফেইক পেজ থেকে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে একই ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে পোস্ট দেওয়ার পর সেটি শেয়ার করেন অনেক জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী। আমার দেশ কর্তৃপক্ষ দ্রুতই জানিয়ে দেয় যে, ওই পেজের সঙ্গে আমার দেশ-এর কোনো সম্পর্ক নেই।

এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণকারী শক্তিগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে কয়েক মাস ধরে। একে অন্যকে ঘায়েল করতে গিয়ে সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তালিয়া বাজাচ্ছে পতিত লীগ।

প্রায় প্রতিদিনই কখনো তিলকে তাল করে, আবার কখনো ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে দেখা যাচ্ছে। বিপ্লবের তিন প্রধান শক্তি ছাত্রপক্ষ, বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরকে ভিলেন বানাতে গিয়ে বস্তুত প্রত্যেকেই কমবেশি ভিলেনের তকমা নিচ্ছেন। ভোটের প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে গিয়ে প্রত্যেকেই যে কমবেশি দুর্বল হচ্ছে, তা কেউ যেন অনুধাবন করতে পারছে না। এতে সুযোগ নিতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে পরাজিত শক্তি।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্প্রতি এ বিষয়ে সতর্ক করে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, এমন কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ না করলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। তিনটি পক্ষের সুহৃদরাও বক্তব্য-বিবৃতিতে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে লেখালেখি করছেন, টকশোতে পরামর্শ ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

একটি গল্প দিয়েই আজকের লেখা শেষ করতে চাই। গল্পটি অবশ্য অনেকেরই জানা। এক মহল্লায় দুই ‘মৌলভি’ মসজিদে ইমামতি করেন। দুজনই প্রতিহিংসাপরায়ণ ও পরশ্রীকাতর। মহল্লার লোকজন দুজনকেই সম্মান দিতে চাইলেও পরস্পরের মধ্যে তুচ্ছতাচ্ছিল্যে বিপাকে পড়েন মুসল্লিরা। একজনের কাছে অন্যজনের প্রসঙ্গ তুললেই ক্ষেপে যান। এক মৌলভি অন্যজনকে বলেন, ও-তো একটা গরু। জানে কিছু! অপর ‘মৌলভি’ সাহেবও কম যান না। তিনি আগেরজন সম্পর্কে বলেন, ও আবার কীসের হুজুর? ও-তো একটা ছাগল।

বেকায়দায় পড়া এক চতুর মুসল্লি একটা উপায় বের করেন। দুজনকেই একে অন্যের অজ্ঞাতে একই বেলায় মেহমানদারির দাওয়াত করেন। দুজনই যথারীতি দুপুরের খাবারের জন্য হাজির। একে অন্যকে দেখে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেও উপাদেয় খাবার ছেড়ে তো আর চলে যাওয়া যায় না! দুজন দুমুখো হয়ে দম বন্ধ করে খাবারের অপেক্ষায়। অনেকক্ষণ পর পর্দার আড়াল থেকে দুটি প্লেট ঢেকে দেওয়া অবস্থায় ঠেলে দিলেন গৃহিণী। দুই মেহমান ধরে নিলেন ভাত এসেছে, আসবে নানা পদের সুস্বাদু গোস্ত, মাছ আর তরকারি। অপেক্ষার পালা আর শেষ হয় না।

রাগে, ক্ষোভে গড় গড় করছেন দুজনই। একপর্যায়ে গর্জন করে গৃহকর্তাকে ডাকলেন। তিনি ছুটে এসে নির্বিকার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলে, কী হয়েছে হুজুর? ক্ষুধার্ত অবস্থায় এভাবে বসিয়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে মুসল্লির উত্তরÑকেন খাবার তো অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে। ঢাকনা উল্টে দুজনের সামনে এগিয়ে দেন গৃহকর্তা। ক্ষোভে ফাটলেন দুজন। সমস্বরে জানতে চান, এসব কী? মেজবান মুসল্লি জানান, আপনাদের জন্য উপযুক্ত খাবারেরই তো ব্যবস্থা করলাম। আপনি ওনাকে বললেন গরু। সে জন্য ওনার জন্য ঘাস পরিবেশন করেছি। আর উনি বলেছেন আপনি একটা ছাগল। সে জন্য কাঁঠালপাতা পরিবেশন।

ততক্ষণে সংবিত ফিরেছে দুজনের। ভুল স্বীকার করে কোলাকুলি করেই তবে আসল খাবার পেয়েছেন তারা। গণঅভ্যুত্থানের শরিকরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যা করছেন, তাতে আশঙ্কা হয়, তাদের জন্যও একই শিক্ষা অপেক্ষা করছে কি না। কপালে ঘাস আর কাঁঠালপাতা থেকে থাকলে কোলাকুলি করে আসল খাবারের দেখা পাবেন কি না সংশয় হয়।

অতীতে একের পর এক ভুলের কারণে নিশ্চিত গদির পরিবর্তে নিপীড়ন, নির্যাতন, জেল, সাজা, খুন, গুমÑকী জুটেনি? জাতি হিসেবে আমরা বিস্মৃতিপরায়ণ-এটা ঠিক। তাই বলে এত দ্রুত আমাদের সম্মানিত রাজনীতিকরা নিকট অতীতকে ভুলে যাবেন? সেনাপ্রধানের ইঙ্গিতবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য আমলে না নিলেও অন্তত নিজস্ব বিচার-বুদ্ধিতে সংবিতে ফিরুন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন