আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের সুযোগ

ড. শাহজাহান খান

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের সুযোগ
ড. শাহজাহান খান

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আমাদের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। তাই দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো প্রতিটি তরুণকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা, যাতে তারা দেশে বা বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জাতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। আমাদের বর্তমান শ্রমনির্ভর অর্থনীতিকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে তরুণদের যথাযথভাবে কর্মক্ষম করে প্রস্তুত করার ওপর।

নির্বাচনি প্রচারণার সময় স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি নাগরিক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ব্যাপক চাঁদাবাজি, দুর্নীতির বিস্তার, মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রভাব, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় সীমিত প্রবেশাধিকারসহ নানা দৈনন্দিন সমস্যায় উদ্বিগ্ন আছে।

বিজ্ঞাপন

সব রাজনৈতিক দলই শান্তি, সমৃদ্ধি, সমতা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি উন্নত বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

যদিও সব প্রধান রাজনৈতিক দলই শিক্ষা, বিশেষ করে নারীশিক্ষা এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, তবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তাদের একই রকম গুরুত্ব দৃশ্যমান নয়।

তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (বিজেআই) নেতৃত্বাধীন উভয় নির্বাচনি জোটই তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ও দলীয় নথিতে যুবসমাজের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করেছে।

বিএনপি নিম্ন ও মধ্যস্তরে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চস্তরে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চালুর কথা বলেছে। তারা শিক্ষা খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে গবেষণা ও উন্নয়নের (R&D) অগ্রাধিকারের কথাও বলা হয়েছে। বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তুলতে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতকে শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী আধুনিক বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং ধাপে ধাপে বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠনের কথাও উল্লেখ করেছে। যদিও বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই, তবুও তাদের লক্ষ্য অর্জনে গবেষণা ও উন্নয়ন যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তা স্পষ্ট।

উভয় প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটের মূল বার্তা হলো—দেশে ও বিদেশে কাজের জন্য প্রস্তুত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করা। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে।

বিশ্ব গবেষণায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উচ্চশিক্ষা খাত এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সব প্রতিষ্ঠানকে পুরোনো ধাঁচের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণার নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশে এখনো কোনো শক্তিশালী সরকারি গবেষণা সংস্থা গড়ে ওঠেনি ।

গবেষণার জন্য কাঠামোগত ও কৌশলগত উদ্যোগ

গবেষণা ও উদ্ভাবন যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও অর্থনীতি এমন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যার সমাধানে নতুন চিন্তা ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের গবেষণা কার্যক্রম সমন্বয়, উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য সরকারকে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল (BNRC)’ গঠন করা উচিত। এটি হবে জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ গবেষণা সংস্থা, যা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা তদারকি করবে, আর্থিক অনুদান প্রদান করবে, গবেষক তৈরি করবে এবং বহুমুখী গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।

এই সংস্থা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি জাতীয় গবেষণা ছাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা উন্নয়নের কেন্দ্র হবে।

জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, নীতি প্রণয়ন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি অগ্রাধিকার খাতে গবেষণা উন্নয়ন এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তি সৃষ্টিতে বিএনআরসি বাংলাদেশকে বিশ্বনেতায় পরিণত করতে সহায়তা করবে।

এটি প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় অংশগ্রহণসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াবে এবং টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

এই কাউন্সিলের লক্ষ্য হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান সৃষ্টির সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এর কাজ হবে—১. বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে মানসম্পন্ন গবেষণা পরিচালনা; ২. অগ্রাধিকারভিত্তিক গবেষণায় অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ; ৩. আন্তর্জাতিক ও প্রবাসী গবেষকদের সঙ্গে যৌথ কাজ; এবং ৪. বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবদান নিশ্চিত করা।

আমাদের উচিত শিক্ষা খাতে সচেতনভাবে ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিনিয়োগ করা, যাতে মানবিক গুণসম্পন্ন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়। তরুণদের বিশ্বমানের দক্ষ কর্মীতে পরিণত করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য আমাদের উদ্যমী তরুণদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করতে হবে। সরকারকে মানুষের উপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।

যদি আমরা দেশে ও বিদেশে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হবে। এজন্য দরকার সৎ ও জবাবদিহিতামূলক নেতৃত্ব, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা।

বাংলাদেশে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতিতে কার্যকর পরিবর্তন আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দক্ষ নেতৃত্ব অপরিহার্য। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতের নেতৃত্বকে অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অভিজ্ঞ হতে হবে।

লেখক : ইমেরিটাস প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...