পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফল শুধু একটি রাজ্য ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়নি, এটি পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে এমন এক পরিবর্তন এনেছে, যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশ সীমান্ত, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠী, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ফল অনুযায়ী ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ভারতীয় জনতা পার্টি ২০৭টি আসন পেয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি, কংগ্রেস ও আম-জনতা উন্নয়ন পার্টি পেয়েছে দুটি করে আর সিপিআই (এম) ও অল ইন্ডিয়া সেক্যুলার ফ্রন্ট পেয়েছে একটি করে আসন।
এই ফলের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রায় দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটেছে এবং ভারতীয় জনতা পার্টি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে। বিজেপির নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুসলিমবিরোধী মন্তব্যের জের ধরে নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের যে চিত্র, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে, তা এক কথায় ভয়ংকর। বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিমপ্রধান দেশ, সেহেতু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির বিজয় এবং সেখানকার মুসলিম সমাজের ওপর এর প্রভাব, পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ, সীমান্তজুড়ে ঘনীভূত নতুন বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের সামনে উপস্থিত ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে আলোচনা করা এখন সময়ের দাবি।
বিজেপির এই জয় দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল
বিজেপি নির্বাচন প্রভাবিত করতে কেন্দ্রীয় শক্তি ব্যবহার করেছে, তৃণমূলের এই দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে না দিলেও, শুধু নির্বাচনি গণিত দিয়ে এই ফলকে মূল্যায়ন করা সম্ভব না। বরং বলা যায়, এই ফল বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার এক সফল বাস্তবায়ন। বিজেপি কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে পরিকল্পিতভাবে নিজেদের মাঠ তৈরি করেছে। তৃণমূলের দুর্নীতি, দলীয় বিভাজন, প্রশাসনিক ক্লান্তি, আইনশৃঙ্খলা সংকট, আই-প্যাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে প্রচারে তারা যেমন মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি মুসলিম ভোটব্যাংককে সুকৌশলে বিভক্ত করে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করেছে।
তৃণমূলের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম ভোট, নারী ভোট, গ্রামীণ ভাতানির্ভর জনসমর্থন এবং আঞ্চলিক বাঙালি পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু মুসলিম ভোটারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে বিজেপি এবার সেই মিথ প্রায় ভেঙে দিয়েছে। ২০২১-এ ৭৪টি মুসলিমপ্রধান আসনে যেখানে তৃণমূল পেয়েছিল ৭১টি আসন এবং বিজেপি মাত্র ২টি, সেখানে এবার তৃণমূল পেয়েছে ৫০টি এবং বিজেপি পেয়েছে ১৮টি। মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো এলাকায় ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট ও আম-জনতা উন্নয়ন পার্টির মতো ছোট দল তৃণমূলের ভোটের অঙ্কে ভাগ বসিয়েছে। এছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ভোটার তালিকা থেকে মুসলমান ভোটারদের ব্যাপকভাবে বাদ দেওয়ার কারণেও ওইসব এলাকায় বিজেপির আসন বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি হিন্দু ভোটকে আগের চেয়ে বেশি একত্র করেছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুসলিম ভোট ঝুলিতে পুরেছে, মতুয়া ও উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধরে রেখেছে, উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন’ উন্নয়নের ভাষা দিয়ে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। এসব কারণেই এবারের নির্বাচনি ফল শুধু তৃণমূলের পরাজয় নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের ভোট-মানসিকতায় একটি গভীর আদর্শিক রূপান্তরের প্রতিফলন হিসেবেও ধরে নেওয়া যায়।
নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিজেপির বাজিমাত
সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা Special Intensive Revision ছিল তৃণমূলকে দুর্বল করতে বিজেপির একটি মাস্টার স্ট্রোক। এই সংশোধনের ফলে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯২ লাখ নাম বাদ পড়া, ‘বহিরাগত’ ও ‘ভুয়া ভোটার’ বয়ান এবং ভোট না দিলে নাগরিকত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে যাওয়ার ভীতি, এবার ভোটারদের নির্বাচনি আচরণে বড় প্রভাব ফেলেছে।
তৃণমূল সরকারকে কেন্দ্রের অর্থনৈতিক অসহযোগিতা
বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের মেগা প্রকল্পগুলো আটকে অথবা শ্লথ করে দেওয়ার অভিযোগ বেশ পুরোনো। মূলত কেন্দ্রের অসহযোগিতায় স্থানীয় সরকারের অর্থনৈতিক কাঠামো অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। বিজেপি এই অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের যোগসাজশকে কেন্দ্র করে পঞ্চায়েত স্তরে বিরাজমান ক্ষোভকে বিজেপি, তৃণমূলের ভোটব্যাংকে ধস নামাতে অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছে। বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ধূমায়িত এই ক্ষোভকে শুধু সরকারবিরোধী ভোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি বরং সেটিকে হিন্দুদের নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় উন্নয়নের অংশীদারত্ব, নারী ভাতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক শুদ্ধি এবং ‘অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ’ বয়ানের সঙ্গে সফলভাবে যুক্ত করেছে। ফলে তৃণমূলের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ, বিজেপির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা-জাতীয়তাবাদের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
তরুণ তুর্কিদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং প্রবীণ নেতাদের অবমূল্যায়ন
তৃণমূলের লজ্জাজনক পরাজয়ের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে অধিকাংশ বিশ্লেষক নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসছেন। তাদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তরুণ তুর্কি দলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, দলের প্রবীণ অংশটিকে ধীরে ধীরে কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় করে দেয়। প্রবীণ নেতারা নামকাওয়াস্তে বড় বড় পদ ধরে রাখলেও দলটিকে অভিষেকের ‘ক্যামাক অফিস’ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। পুরোপুরি করপোরেট কায়দায় পরিচালিত দলটির মূল চালিকাশক্তি ছিল আইপ্যাক, যে প্রতিষ্ঠানটি একসময় মোদির পক্ষেও কাজ করেছে। নির্বাচনে অভিষেকের অতিরিক্ত খবরদারি এবং তার নেতৃত্বাধীন একদল তরুণ তুর্কির দুর্বিনীত আচরণের খেসারত তৃণমূলকে দিতে হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। বলা যায়, প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির দূরত্ব সৃষ্টির নেপথ্যে কাজ করে এই তরুণ তুর্কির দল, প্রকারান্তরে তৃণমূলের রাজনীতির কফিনে খুব সম্ভবত স্থায়ীভাবে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশের জন্য সৃষ্ট নতুন চ্যালেঞ্জ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থানের ফলে তৃণমূলের রাজনীতিÑঅর্থাৎ, বাংলা ভাষা, বাম ঐতিহ্য, ধর্মনিরপেক্ষতা, আঞ্চলিকতা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে কল্যাণের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ক্রমেই বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব যাচাই এবং মুসলিম সন্দেহবাদীদের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে এখন শুধু আরেকটি রাজ্য হিসেবে না দেখে, বাংলাদেশসংলগ্ন সীমানাকে একটি ভূ-কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করার সম্ভাবনা আছে। এই রাজ্যটি বাংলাদেশের জন্য খুবই সংবেদনশীল, কারণ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত ২,২১৬.৭ কিলোমিটার, যার মধ্যে ১,৬৪৭.৬৯ কিলোমিটার ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্টাংশের সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণও দীর্ঘদিন ধরে প্রক্রিয়াধীন।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সীমান্ত এবং মুসলমানদের নিয়ে বারবার তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতার রদবদল সরাসরি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্তবাসীর চলাচল, চোরাচালানবিরোধী অভিযান, নদীপথ নজরদারি, কাঁটাতার, মুসলমানদের পুশ ইন এবং সীমান্ত হত্যার প্রশ্নে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, যার বেশ কিছু প্রমাণ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে।
মুসলিম সমাজের সামনে সৃষ্টি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা
এই পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই রাজ্যে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলমান এবং তাদের বসবাস মূলত মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায়। ভারতীয় জনতা পার্টির বহুল ব্যবহৃত ‘বাংলাদেশি’, ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘ভুয়া ভোটার’ এবং ‘নাগরিকত্ব যাচাই’ শব্দগুলো শুধু নির্বাচনি স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক নীতির ভাষা হওয়ার প্রবল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাস্তবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এই রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বিজেপিশাসিত রাজ্যের বাস্তবতা : পশ্চিমবঙ্গের জন্য এক অশনিসংকেত
ভারতের অন্যান্য রাজ্যের অভিজ্ঞতা পশ্চিমবঙ্গের জন্য একধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যায়। হিউমেন রাইটস ওয়াচ, ২০১৯ সালে গরু রক্ষার নামে মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে, এভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের সহিংসতা প্রতিরোধ ও বিচার করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যেমন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল এবং কথিত গরু রক্ষা নেটওয়ার্ক যদি প্রশাসনিক প্রশ্রয় বা রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস পায়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে গরু পরিবহন, মাংস বিক্রি, মসজিদ ও মাদরাসায় মাইক ব্যবহারের মতো তুচ্ছ ইস্যুতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা এবং রক্তপাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার পশু জবাইসংক্রান্ত যে আদেশ জারি করেছে, তাতে করে আসন্ন কোরবানি ঈদে মুসলমানদের কোরবানি দেওয়া মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।
একই সরলরেখায় দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কূটনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক এই পরিবর্তন কি কূটনৈতিক সম্পর্ক বদলে দেবে? আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেন্দ্রের হাতে, কোনো রাজ্য সরকার সরাসরি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও সাবেক কূটনীতিকদের বক্তব্যেও এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। তারা তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সংকট দেখছেন না। তাদের মতে, বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অনেক বিশ্লেষকই এমন সরলীকরণের ঘোরবিরোধী।
কারণ রাজ্য সরকার সরাসরি পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন না করলেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় পুলিশি সহযোগিতা, রাজনৈতিক আশ্রয়, সীমান্তবাসীর ওপর চাপ, পানিবণ্টন রাজনীতি, স্বাস্থ্য-পর্যটন, ভিসা প্রদান এবং জনমত গঠনের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার বাস্তব প্রভাব রাখে। এ কারণেই অতীতে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনে ব্যর্থতার দায়, মোদি সরকার সম্পূর্ণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর চাপিয়ে দিয়ে সুকৌশলে দায়মুক্তি নিয়েছেন।
এখন সেই অজুহাত দুর্বল হবে। ফলে পানি চুক্তির ক্ষেত্রে তাত্ত্বিকভাবে দরজা খুলতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা আরো জটিল। একই রাজনৈতিক শক্তি যদি পানি, সীমান্ত, অনুপ্রবেশ, নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে একসঙ্গে দরকষাকষির প্যাকেজে পরিণত করে, তাহলে বাংলাদেশ নিচে বর্ণিত বেশ কিছু চাপের মুখে পড়তে পারে।
পুশ ইন সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয় হলো পুশ ইন। যদি পশ্চিমবঙ্গে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বয়ান প্রশাসনিক নীতিতে রূপ নেয়, তাহলে সন্দেহভাজন মানুষকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা বাড়তে পারে। এটি শুধু মানবিক সংকট তৈরি করবে না, এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বেরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ কোনো নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করলে তা ভবিষ্যতে বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। আবার সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের মানবিক সংকট অস্বীকার করাও সম্ভব হবে নয়। তাই এখানে বাংলাদেশকে একই সঙ্গে মানবিক, আইনি, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রস্তুতি নিতে হবে। এখানে স্মর্তব্য যে, কিছুদিন আগেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে, ১৫০০ জন তথাকথিত বাংলাদেশিকে রাতের আঁধারে পুশ ব্যাক করার এক লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। সম্পূর্ণ নিরুত্তাপ ভাষায় তিনি তার ভাষায়, আরো অন্তত ১১ লাখ তথাকথিত বাংলাদেশি মুসলমানকে পুশ ব্যাক করার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের আগে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী আখ্যায়িত করে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। নির্বাচিত হলে তিনি তাদের বাংলাদেশে পাঠাবেন বলে ঘোষণা দেন । বিজেপি তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হলে এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পুশব্যাক পরিকল্পনা একে অন্যের পরিপূরক হলে, ভবিষ্যতে সীমান্ত পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।
পশ্চিমবঙ্গ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের ঘাঁটি হতে পারে
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই রাজনৈতিক পরিবর্তন অস্বস্তিকর প্রভাব ফেলতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন বাংলাদেশের নির্বাসিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, মিডিয়া এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি নিরাপদ আশ্রয়ভূমি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর। আগে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক ভরসা ছিল দিল্লি। তাদের কূটনৈতিক আশ্রয়, রাজনৈতিক লবিং, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং বাংলাদেশবিরোধী প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড দিল্লিকেন্দ্রিক ছিল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ে বাংলাদেশবিরোধী আওয়ামী প্রচার এখন থেকে, সীমান্ত ঘেঁষা পশ্চিমবঙ্গ থেকে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে ।
অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার শুধু একটি প্রতিবেশী রাজ্য সরকার নয়, এটি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য লঞ্চিং প্যাড হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই বিষয়টি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়, এটি হয়ে দাঁড়াবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্ন।
গুজব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
বিজেপির উত্থানে ব্যাপক অবদান রাখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুজব সৃষ্টির মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের কোনো মসজিদ, মাদরাসা, ধর্মীয় মিছিল, নারী নির্যাতন কিংবা গোমাংসকেন্দ্রিক যেকোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে, বাংলাদেশেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর সঙ্গে যদি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগপন্থি সংবাদমাধ্যম এবং ভারতঘনিষ্ঠ প্রচারণা প্ল্যাটফর্মগুলো যুক্ত হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক জনমতকে বিভ্রান্ত করা আরো সহজ হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নামের সঙ্গে আবার অতীতের মতো সংখ্যালঘুবিরোধী এবং জঙ্গিপ্রবণ রাষ্ট্রের তকমা লাগানো হবে ।
প্রশ্ন হলো, এমন অবস্থায় বাংলাদেশ কী করতে পারে? উত্তর হলোÑএমন জটিল অবস্থায় আমাদের নিম্নপ্রদত্ত কিছু বিষয়ে দ্রুত, সমন্বিত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সীমান্তসংলগ্ন অধিবাসীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি
সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড়ের মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গবাদি পশু পালনকারী, নদীপথনির্ভর মানুষ এবং সীমান্ত হাটের অর্থনীতি, ভারতীয় সীমান্তনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সীমান্তে নজরদারি বাড়লে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী কঠোর হলে, রাত্রিকালীন চলাচল বিঘ্নিত হলে, নদীপথে তল্লাশি বাড়লে এবং অনুপ্রবেশ সন্দেহে গুলি বা আটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে, সীমান্ত অর্থনীতি সংকুচিত হবে। সীমান্তবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে জমির চাষ কমাবে, নদীতে নামতে ভয় পাবে, বাজারে পণ্য নেবে না এবং ধীরে ধীরে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষজন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে করে সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে বিকল্প পথে জীবনধারণের প্রবণতা সৃষ্টি হয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতি ঘটাবে।
কিন্তু এই সীমান্তবাসীই বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রথম সারির সামাজিক প্রতিরক্ষা, অগ্রবর্তী পর্যবেক্ষক। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় মানেই আগামীকাল থেকেই শরণার্থী ঢল বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা শুরু হবে, এমন সরল সমীকরণে আসা ঠিক হবে না। নির্বাচনি ভাষা ও শাসন পরিচালনার মধ্যে পার্থক্য থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলো আত্মবিশ্বাসী হয়, প্রশাসনের ভাষা বদলায়, সংখ্যালঘু সমাজের ওপর নজরদারি বাড়ে এবং সীমান্তকে মানবিক সম্পর্কের জায়গা থেকে নিরাপত্তা ফ্রন্ট হিসেবে দেখা শুরু হয়। কাজেই সদা সতর্ক অবস্থান বজায় রেখে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাস্তবে কী নীতি অবলম্বন করে, সেটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন
নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দলীয় বিভাজন যত গভীর হবে, দিল্লির জন্য ঢাকার ওপর চাপ প্রয়োগ তত সহজ হবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিত প্রধানমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, বিজিবিপ্রধান, গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষপর্যায়, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র নীতিনির্ধারক এবং দেশের কিছু দায়িত্বশীল নাগরিককে নিয়ে একটি বিশেষ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বা উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সমন্বয় পরিষদ বা Strategic Coordination Council গঠন করা।
এই পরিষদের কাজ হবে শুধু সীমান্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য পুনর্গঠন, আওয়ামীঘেঁষা দেশি-বিদেশি মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা, সীমান্তে পুশ ইন ঝুঁকি, পানি ও বাণিজ্য চাপ, ভিসা রাজনীতি, তথ্যযুদ্ধ, সংখ্যালঘু ইস্যুর আন্তর্জাতিক ব্যবহার এবং বাংলাদেশের ভেতরে বিদেশি প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলা করা। এসব বিষয়ে সরকার, বিরোধী দল, সামরিক-বেসামরিক নীতিনির্ধারক, সীমান্ত জেলা প্রশাসন এবং কূটনৈতিক মহলের মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকা দরকার। খেয়াল রাখতে হবে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক দলগুলো যেন জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে ফেলে না দেয়।
কূটনীতিতে স্পষ্ট লক্ষণরেখা অঙ্কন করা প্রয়োজন
সীমান্তে যেকোনো উত্তেজনা প্রশমনে প্রয়োজন হলো শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে পুশ ইন, সীমান্ত হত্যা, জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া, নদীপথে হয়রানি বা ভুলবশত সীমান্ত অতিক্রমকারী বাংলাদেশি নাগরিককে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা হলে, বাংলাদেশকেÑদিল্লি ও কলকাতা দুই স্তরেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে বার্তা দিতে হবে।
একই সঙ্গে পানি, বাণিজ্য, ভিসা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক আশ্রয় ইস্যুতে বাস্তববাদী দরকষাকষি চালিয়ে যেতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন একান্তই তাদের নিজের বিষয়, এ নিয়ে আমাদের অতিরিক্ত উদ্বেগ বা আনন্দের কোনো উপলক্ষ তৈরি হয়নি, তাই এ নিয়ে জল ঘোলা করার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সব ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা, বৈদেশিক ভূখণ্ড ব্যবহার করে যেকোনো বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক অপারেশন এবং তথ্যযুদ্ধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
সীমান্ত গোয়েন্দা সক্ষমতা জোরদার করতে হবে
সুষ্ঠু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টর, চর, নদীপথ, অনানুষ্ঠানিক পারাপার, সীমান্ত হাট, মাদক রুট, মানব পাচার রুট, রাজনৈতিক আশ্রয় রুট, পলাতকদের ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক, হুন্ডি চ্যানেলÑঅর্থাৎ সবকিছুর হালনাগাদ ম্যাপিং দরকার। একই সঙ্গে বিজিবি, পুলিশ, জেলা প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সার্বক্ষণিক সমন্বয় না থাকলে সীমান্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরি হবে। সীমান্তে দুর্বলতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই, কারণ দুর্বলতা প্রদর্শন শুধু বডিব্যাগের সংখ্যা বাড়ায়।
পুশ ইনের আগেই প্রয়োজন প্রতিরোধ পরিকল্পনা
সরকারিপর্যায়ে আরেকটি অন্যতম জরুরি করণীয় হলো শরণার্থী ও পুশ ইন প্রতিরোধ পরিকল্পনা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বড় আকারের শরণার্থী ঢল নাও আসতে পারে; কিন্তু সীমান্তে ছোট ছোট পুশ ইন, নথিহীন মানুষ, আটক পরিবার, শিশু, নারী বা শ্রমজীবী মানুষের জন্য মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে।
এর জন্য পরিচয় শনাক্তকরণ, অস্থায়ী অপেক্ষমাণ এলাকা প্রস্তুতকরণ, কূটনৈতিক প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিতকরণ, মিডিয়া ব্যবস্থাপনা এবং মানবাধিকার দলিলে নথিভুক্তকরণের সার্বিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।
তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে
তথ্যযুদ্ধ মোকাবিলায় আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকতে হবে। ভারতীয় মিডিয়া যদি বাংলাদেশকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের রাষ্ট্র’, ‘জঙ্গি আশ্রয়দাতা’ বা ‘হিন্দুবিরোধী রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রচার করে, তাহলে শুধু প্রতিবাদ যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশের দরকার তথ্যভিত্তিক প্রতি-বয়ান সৃষ্টি করার সক্ষমতা। ভারত যেভাবে প্রকৃত খবর ধামাচাপা দিয়ে সুবিধাজনক তথ্য ছড়ানোতে পারদর্শিতা অর্জন করেছে, তাদের মোকাবিলা করতে আমাদেরও ইংরেজি-বাংলা-হিন্দি কনটেন্ট তৈরি, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, সীমান্ত ডেটা প্রকাশ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথি এবং কূটনৈতিক ভাষায় ধারাবাহিক অবস্থান গ্রহণ করে জুতসই প্রত্যুত্তর দিতে হবে।
চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরো শক্ত করতে হবে
বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরো বাস্তববাদী ও শক্তিশালী করা। ভারতের চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশের দরকার এমন কৌশলগত ভারসাম্য, যাতে কোনো একক শক্তি ঢাকাকে একতরফাভাবে চাপে ফেলতে না পারে। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নদী ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে সম্পর্ক গভীর করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সম্পর্ক হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, অন্ধ নির্ভরতাভিত্তিক নয়।
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারতের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্য সৃষ্টি করবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যদি পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপে ফেলার ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশের বিকল্প শক্তির সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক থাকা জরুরি।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে হবে
বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে হবে। সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা আজকে সময়ের দাবি।
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমবিরোধী বয়ান বা সীমান্তের ওপারে যেকোনো মুসলমানকে বাংলাদেশি মুসলিম পরিচয়ে পুশ ব্যাকের ঘটনা যখন ঘটে, তখন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় আবেগের প্রশ্ন নয়, এটি শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
আসিয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে নতুন কৌশল দরকার
বাংলাদেশের আরেকটি বড় কৌশল হওয়া উচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো। আসিয়ান অঞ্চলের শক্তিশালী অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুধু ভারতকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বাস্তবতায় আটকে থাকে, তাহলে দিল্লি বা কলকাতার চাপের সময় ঢাকার কৌশলগত বিকল্প কমে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক দরকার
বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্যের আরেকটি স্তম্ভ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক। বাংলাদেশকে এমনভাবে ওয়াশিংটন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, যাতে ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একতরফা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে না পারে। তবে এই সম্পর্কও হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। বাংলাদেশকে একদিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রমঅধিকার, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে নিজের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।
বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খোলামনে আলোচনা করতে হবে যে বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থার হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিতি পাওয়া চীনকে বাইপাস করা, আমাদের অর্থনীতির জন্য হবে চরম বিপর্যয়কর, যা প্রতিপালন করা আমাদের জন্য অসম্ভব। বহুমাত্রিক সম্পর্কের এই ভারসাম্যই আমাদের, যেকোনো একপক্ষীয় চাপ মোকাবিলার রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রেক্ষিত পশ্চিমবঙ্গ : ঝুঁকির ভেতরেও লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা
বিজেপি নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি প্রতিবেশী রাজ্য নয়, এটি একটি নিরাপত্তা ফ্রন্টও বটে। সেখানে বিজেপির ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে ঝুঁকি ও সুযোগ তৈরি করছে।
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসায়, একদিকে যেমন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি পানি ও বাণিজ্য ইস্যুতে বাস্তববাদী দরকষাকষির নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। তাই খর্বশক্তির তৃণমূল সরকারের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় মদতপুষ্ট বর্তমান বিজেপি সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত কেমন হবে, তা নির্ভর করবে নতুন রাজ্য সরকারের কূটনীতি, দিল্লির নির্দেশনা, সীমান্ত প্রশাসনের আচরণ, মুসলিম সমাজের ওপর চাপ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রতি বিজেপির রাজনৈতিক সহায়তা এবং বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়ার ওপর। এটা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলে গেছে। ঢাকার নীতিনির্ধারকদের এখন বুঝতে হবে, পশ্চিমবঙ্গ এখন শুধু কলকাতার সংস্কৃতি, চিকিৎসা, ভিসা, বাজার ও আত্মীয়তার জায়গা নয়, এটি ভারতীয় ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী রাষ্ট্রনীতির পূর্ব ফ্রন্টের রূপ পরিগ্রহ করতে পারে।
এই ফ্রন্ট শুধু সীমান্তে কাঁটাতার বা পুশ ইনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে না, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার অপারেশনাল ঘাঁটিতেও পরিণত হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে এখনই ভবিষ্যতের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এই প্রস্তুতি নিতে হবে ঠান্ডা মাথায়, মেরুদণ্ড ঋজু রেখে, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করে, নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে, সীমান্ত গোয়েন্দা সক্ষমতা জোরদার করে, চীন-মুসলিম বিশ্ব-আসিয়ান-আমেরিকা-পশ্চিমের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে এবং জাতীয় স্বার্থকে দলীয় হিসাবের ঊর্ধ্বে উড্ডীন রেখে। আমাদের সব মহলকে চলমান বৈশ্বিক রূঢ় কূটনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে যে, শক্তির ভরকেন্দ্র এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী যুদ্ধে চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক-মিসর এবং সর্বশেষ সৌদি আরবের ভূমিকা ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে দিয়েছে। উদীয়মান এই নতুন অক্ষশক্তিকে উপেক্ষা না করে, বরং প্রচলিত একপক্ষীয় নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠে আগামীর পথচলা হবে, সার্বিক বিবেচনায় সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এই বোধোদয় যত দ্রুত আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হবে, আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি তত ত্বরান্বিত হবে।
লেখক : এনডিসি, পিএসসি (অব.), চেয়ারম্যান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


