বাঙালির ‘অ-যোদ্ধা’ ও ‘নারীসুলভ’ তকমার বিরুদ্ধে লড়াই

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)
কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

বাঙালির ‘অ-যোদ্ধা’ ও ‘নারীসুলভ’ তকমার বিরুদ্ধে লড়াই

একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অবসান ও নবজাগরণ

১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র উত্তরাধিকার সূত্রে ব্রিটিশদের সেই কুখ্যাত ‘নন-মার্শিয়াল’ বা ‘অ-যোদ্ধা’ তকমাটিকে সুকৌশলে বয়ে নিয়ে চলে। গত ৫ মে ২৬-এ প্রকাশিত এই সিরিজের প্রথম নিবন্ধে আমরা আলোচনা করেছি কীভাবে ম্যাকাউলে বাঙালির শারীরিক গঠন নিয়ে বর্ণবাদী বিষোদগার করেছিলেন। ব্রিটিশ এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানি শাসকরা চেয়েছিল বাঙালির আত্মবিশ্বাসকে চিরতরে চূর্ণ করে দিয়ে তাদের একটি ‘অধীনস্থ জাতি’ হিসেবে শাসন করতে। বাঙালিদের সামরিক সক্ষমতাকে খাটো করে দেখা শুধু একটি প্রশাসনিক বৈষম্য ছিল না, বরং এটি ছিল এক শতাব্দীপ্রাচীন বর্ণবাদী ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন এমন কিছু ক্ষণজন্মা বীর, যারা এই অপবাদের পাহাড় ধসিয়ে দিয়েছেন। এই দ্বিতীয় পর্বে আমরা উন্মোচন করব সেই ঘৃণ্য ইতিহাসের নেপথ্য কাহিনি এবং মেজর গনি ও জেনারেল ওসমানীর মতো অকুতোভয় বাঙালিদের সেই অমর প্রতিরোধের মহাকাব্য। এটি শুধু একটি তকমামোচনের লড়াই ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব প্রমাণের মরণকামড়। এই লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল কুর্মিটোলার প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে, যা ঝিলামের হাড়কাঁপানো পাহাড় হয়ে ১৯৭১ সালের রণক্ষেত্রে চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে।

‘দাসের পা’ বনাম ‘নারীসুলভ পুরুষ’ : ব্রিটিশ বর্ণবাদের বীভৎস রূপ

বাঙালির আত্মমর্যাদায় ব্রিটিশরা সুপরিকল্পিতভাবে বর্ণবাদী আঘাত হেনেছিল। ১৮৩৫ সালে ম্যাকাউলে বাঙালির সক্ষমতা নিয়ে বিষোদগার করে লিখেছিলেন, বাঙালির শারীরিক গঠন নারীসুলভ। বাঙালির আত্মমর্যাদায় দ্বিতীয় বড় আঘাতটি করেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক জি. ডব্লিউ. স্টিভেন্স। ১৮৯৯ সালে বাঙালির শারীরিক গঠন নিয়ে তিনি যে বীভৎস বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা পাঠ করলে আজও যেকোনো বাঙালির রক্ত গরম হয়ে ওঠে। তিনি লিখেছিলেন, ‘তার পা দেখেই তুমি বাঙালিকে চিনবে। একজন স্বাধীন মানুষের পা হয় সোজা বা সামান্য বাঁকা, যাতে সে মাটির ওপর শক্তভাবে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু বাঙালির পা হয় হাড় আর চামড়ায় ভরা; আগাগোড়া একই মাপের আর হাঁটুর জায়গায় থাকে বিশ্রী ফোলা গিঁট... বাঙালির পা হলো দাসের পা (The Bengali’s leg is the leg of a slave)।’

এই বর্ণনাগুলো ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের ব্রিটিশদের ‘Hyper-masculinity’ বা অতি-পুরুষত্বের দম্ভের বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশরা জানত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয়ভাবে জাগ্রত এই জাতি যদি একবার অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তবে তাদের পরাধীন রাখা অসম্ভব। তাই তারা বাঙালির ওপর মানসিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে এই ‘নারীসুলভ’ তকমা ব্যবহার করত। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাঞ্জাবি সামরিক নেতৃত্বও এই একই বর্ণবাদী মানসিকতা লালন শুরু করে, যাতে সুকৌশলে বাঙালিদের নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং সামরিক বাহিনী থেকে দূরে রাখা যায়। ব্রিটিশদের চোখে এই ‘দাসের পা’ ছিল পরাধীনতার চিহ্ন, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয় : এই পায়ের ওপর ভর করেই বাঙালি একদিন তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল।

১৮৫৭-এর বিদ্রোহ : বাঙালির অবাধ্যতার শাস্তি

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশদের এই ‘অ-যোদ্ধা’ তত্ত্ব তৈরির প্রধান অনুঘটক। বিদ্রোহের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গ ছিটকে এসেছিল বাংলার মাটি থেকেই। ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের বন্দুকের গর্জন যখন ঢাকার লালবাগ ও চট্টগ্রামের পাহাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তখন ব্রিটিশ রাজের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। বিদ্রোহ দমনের পর তারা সিদ্ধান্ত নেয় : যারা স্বাধীনতার স্বপ্নে লড়তে পারে, তাদের সেনাবাহিনীতে রাখা নিরাপদ নয়। নেপাল ও পাঞ্জাবের নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে ‘যোদ্ধা’ উপাধি দিয়ে ব্রিটিশরা বাঙালিদের ওপর চিরস্থায়ী সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে বাঙালিরা শুধু সেনাবাহিনী থেকেই দূরে থাকেনি, বরং তাদের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হীনম্মন্যতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। এটি ছিল একটি জাতির ‘ডি-মার্শিয়ালাইজেশন’ বা নিরস্ত্রীকরণের চূড়ান্ত নীলনকশা।

মেজর মুহাম্মদ আবদুল গনি : ‘পাপা টাইগার’ ও প্রথম সামরিক বিদ্রোহ

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন ব্রিটিশদের ‘নন-মার্শিয়াল’ তত্ত্ব ব্যবহার করে বাঙালিদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল, তখন আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হন মেজর মুহাম্মদ আবদুল গনি, যিনি ‘পাপা টাইগার’ নামে পরিচিত । ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলার প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠনকালেই তিনি এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহের সূচনা করেন। তৎকালীন জিওসি ব্রিগেডিয়ার আইয়ুব খানের সামনে তিনি সরাসরি ‘উর্দু-ওনলি’ ম্যান্ডেটকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং কুচকাওয়াজে বাঙালি পরিচয় ও ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চার বছর আগেই সামরিক বাহিনীর ভেতর জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিল তার এই সাহসী প্রতিবাদ। এই অবাধ্যতার কারণে বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও তাকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং ১৯৫৩ সালে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তবে ব্যারাক ছাড়লেও তিনি লড়াই থামাননি; পরে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি বাঙালি অধিকার রক্ষা এবং ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হিসেবে কাজ করে যান। তার এই আপসহীন মনোভাবই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সশস্ত্র সংগ্রামের আদর্শিক ভিত্তি।

জেনারেল ওসমানী ও খাজা ওয়াসিউদ্দিন : প্রতিরোধের দ্বিতীয় জোয়ার

বাঙালি সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের এই অসামান্য লড়াইয়ের পরবর্তী কাণ্ডারি ছিলেন কর্নেল (পরে জেনারেল) এমএজি ওসমানী। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের একটি বিতর্কিত মন্তব্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যেখানে তিনি জেনারেল ওসমানীকে শুধু এএসসি (ASC) অফিসার হিসেবে অভিহিত করে তার প্রধান সেনাপতির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তিকে নিয়ে এমন মন্তব্য আমাদের ইতিহাসের জন্য সঠিক নয়।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ওসমানী শুধু এএসসি অফিসার ছিলেন না, বরং তিনি অত্যন্ত কঠোর পদাতিক (Infantry) প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫১ সালে তিনি ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৃতীয় কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। একজন পদাতিক কমান্ডিং অফিসার হিসেবেই তিনি জওয়ানদের মধ্যে সেই অদম্য লড়াকু মানসিকতা এবং সামরিক উৎকর্ষের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তার অধীনে বাংলার মুসলিম কৃষক সন্তানদের নিয়ে গঠিত ‘সিনিয়র টাইগার্স’ বাহিনী ‘Grace, Strength, Speed’ মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়।

এই লড়াইয়ে কর্নেল ওসমানীর সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোদ্ধা ছিলেন তৎকালীন লে. কর্নেল খাজা ওয়াসিউদ্দিন (পরে লে. জেনারেল)। প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ওয়াসিউদ্দিন ওসমানীর বাঙালির অধিকারের দাবির সপক্ষে অটল সমর্থন দেন। এ দুই বীর কর্মকর্তার নিরন্তর লড়াই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের কোণঠাসা করার বিরুদ্ধে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, পাঞ্জাবিরা বাঙালিদের শুধু কেরানি হিসেবে দেখতে চায়, সৈনিক হিসেবে নয়। সেই মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভাঙার কাজ শুরু হয়েছিল ওসমানীর নির্দেশিত ড্রিল ও প্রশিক্ষণের কঠোরতায়।

বক্সিং রিংয়ে পাঞ্জাবিদের ‘নক-আউট’ ও ষড়যন্ত্রের সূচনা

বাঙালিরা সাঁতার এবং ফুটবলে ঐতিহাসিকভাবেই সেরা ছিল, কিন্তু পাঞ্জাবিরা এগুলো ‘মার্শাল স্পোর্টস’ বা যোদ্ধার খেলা মনে করত না। পাঞ্জাবিরা নিজেদের ‘ফর্সা চামড়ার উন্নত জাতের যোদ্ধা’ মনে করত এবং বাঙালিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। তাদের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি ছিল ‘ম্যান’স স্পোর্ট’ হিসেবে পরিচিত বক্সিং। ১৯৪৯ সালে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যখন বক্সিং রিংয়ে তৃতীয় এবং অষ্টম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মুখোমুখি হলো, তখন ইতিহাস নতুন করে লেখা হলো। স্টিভেন্স যে পাগুলো ‘দাসের পা’ বলেছিলেন, সেই পায়ের ওপর ভর করেই বাঙালি জওয়ানরা পাঞ্জাবিদের আটটি বাউটে সরাসরি ‘নক-আউট’ করেন।

পাঞ্জাবি সামরিক নেতৃত্বের জন্য এটি ছিল এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। এই পরাজয় হজম করতে না পেরে তারা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ভেঙে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা এমন কিছু পরীক্ষার ছক সাজাতে থাকে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব। তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল, বাঙালিরা শুধু রিংয়ের ভেতরেই লড়তে পারে, কিন্তু রণক্ষেত্রের রুক্ষ পরিবেশে তারা টিকবে না।

ঝিলামের অগ্নিপরীক্ষা : ষড়যন্ত্র যখন বীরত্বের কাছে হার মানল

১৯৪৯ সালে বক্সিং রিংয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এবং বাঙালিদের ‘অ-যোদ্ধা’ প্রমাণ করে ইউনিটগুলো ভেঙে দেওয়ার অজুহাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক অমানুষিক পরীক্ষার ছক সাজায়। জেনারেল কেএম শেখের অধীনে ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পশ্চিম পাকিস্তানের হাড়কাঁপানো শীতল পার্বত্য অঞ্চলে পাঠানো হয়। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, জলজ জলবায়ুর বাঙালিরা এই রুক্ষ পরিবেশে ব্যর্থ হবে। জেনারেল শেখের অধীনে জওয়ানদের ওপর যে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ চাপানো হয়েছিল, তা ছিল রীতিমতো মানবাধিকার লঙ্ঘনÑ

  • সারভাইভাল ফেজ : হিমাঙ্কের নিচে টানা তিন দিন ও তিন রাত জওয়ানদের টিকে থাকতে হয়েছিল মাত্র একটি কম্বল এবং দিনে একবার সামান্য খাবার নিয়ে।
  • মাউন্টেন মার্চ : চরম ক্ষুধা ও শারীরিক ক্লান্তির মধ্যেই পূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম ও ভারী অস্ত্র কাঁধে নিয়ে ঝিলামের দুর্গম পাহাড়ি পথে ১৯ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল তাদের।

সেনাসদর (GHQ) নিশ্চিত ছিল বাঙালিরা ব্যর্থ হবে। কিন্তু ওসমানীর কঠোর প্রশিক্ষণে জওয়ানরা প্রতিটি পর্যায়ে এমন ‘সুপার্ব’ পারফর্ম করেন যে, জেনারেল শেখ তার রিপোর্টে স্বীকার করতে বাধ্য হন—বাঙালি সৈনিকরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও রণক্ষেত্রে প্রচণ্ড কার্যকর। তার এই ইতিবাচক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই আরো ব্যাটালিয়ন গড়ার পথ প্রশস্ত হয়। এই সাফল্যেরই চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে, যেখানে লাহোর রক্ষায় ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সর্বোচ্চ ১৫টি বীরত্বসূচক পদক জয় করে ‘ডিফেন্ডারস অব লাহোর’ হিসেবে খ্যাতি পায়। জেনারেল শেখ (পরে আইয়ুবের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) যথার্থই লিখেছিলেন, প্রতিটি বাঙালি সৈনিক নিজেকে পূর্ব পাকিস্তানের ‘রাষ্ট্রদূত’ মনে করে লড়াই করে, যা তাদের অপরাজেয় করে তুলেছে। তিনি পরামর্শ দেন যে, এই ইউনিটগুলো ভেঙে দেওয়া হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অপারেশন জ্যাকপট ও নৌ-কমান্ডোদের মহাকাব্য

বাঙালির সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে আধুনিক প্রমাণ হলো ১৯৭১ সালের ‘অপারেশন জ্যাকপট’। সমুদ্রপথের (বা SLOC) গুরুত্ব বুঝতে হলে আজ আমাদের হরমোজ প্রণালির দিকে তাকাতে হয়। ১৯৭১ সালে আমাদের নৌ-কমান্ডোরা ঠিক এই কৌশলটিই প্রয়োগ করেছিলেন। ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা আটজন দুঃসাহসী সাবমেরিনারের নেতৃত্বে শত্রুর সমুদ্রপথ রুদ্ধ করে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেওয়া হয়েছিল।

‘জাতীয় দিশা : সংকট ও উত্তরণের পথ’ গ্রন্থে আমি উল্লেখ করেছি, কীভাবে এই কমান্ডোরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুঝুঁকির (Suicidal attempt) অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে অসাধ্যসাধন করেছিলেন। তারা জানতেন যে, পানিতে লিম্পেট মাইন লাগানোর পর ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। তবু তারা পিছপা হননি। এটি ছিল বাঙালির সেই ‘শানিত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই’, যেখানে পেশিশক্তির চেয়ে মেধা ও সাহসের প্রাধান্য ছিল বেশি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ানদের কয়েক দশকের সঞ্চিত তেজ আর এই নৌ-কমান্ডোদের কৌশলগত জেদই ৯ মাসে বিজয় নিশ্চিত করেছিল। আমাদের এই অকুতোভয় সৈনিকদের দুর্ধর্ষ নেতৃত্ব আর রক্তশপথ যদি না থাকত, তবে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ ভিয়েতনামের মতো ২০ বছর দীর্ঘায়িত হতে পারত। বাংলার এই ‘টাইগার’ এবং সাবমেরিনারদের আত্মবলিদানই আজ আমাদের স্বাধীনতার মূলস্তম্ভ।

এক দীর্ঘ লড়াইয়ের উত্তরাধিকার ও অস্তিত্বের দায়

মেজর আবদুল গনি ১৯৪৮ সালে বিদ্রোহের যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, জেনারেল ওসমানী ও খাজা ওয়াসিউদ্দিন তাকেই প্রজ্বলিত রেখেছিলেন। ব্রিটিশদের দেওয়া ‘অ-যোদ্ধা’ তকমা বাঙালিরা রক্ত ও বীরত্ব দিয়ে মুছে ফেলেছে। কুর্মিটোলার ভাষা প্রতিবাদ থেকে শুরু করে ঝিলামের পাহাড় জয়—প্রতিটি ঘটনাই ছিল এক একটি মাইলফলক। বিশেষ করে, ১৯৪৯ সালের বক্সিং রিংয়ে পাঞ্জাবিদের ‘নক-আউট’ করা ছিল স্টিভেন্সের ‘দাসের পা’ কটাক্ষের ঐতিহাসিক জবাব। এই সাহসিকতাই ১৯৭১ সালের বিজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু জেনারেলের পলায়নপর মানসিকতা সেই পুরোনো ব্রিটিশ দাসত্বের গ্লানিকেই মনে করিয়ে দেয়। আজ আমরা যদি এই ত্যাগের উত্তরাধিকার ভুলে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সততা বিসর্জন দিই, তবে ইতিহাস আমাদের ‘মীরজাফর’ হিসেবে চিহ্নিত করবে। ১৭৫৭ সালের বিশ্বাসঘাতকতা আর আজকের আপসহীনতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাই পতাকায় মিশে থাকা শহীদদের রক্তের সম্মান রক্ষা করা আজ আমাদের অস্তিত্বেরই দায়; নতুবা পরবর্তী প্রজন্ম আবার পরাধীনতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। বীরত্ব কোনো নির্দিষ্ট জাতির একচেটিয়া অধিকার নয়, এটি একটি অর্জিত গুণ যা বাঙালিরা বারবার প্রমাণ করেছে।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি

ব্রিটিশ সাংবাদিক ওয়ারিংটন স্টিভেন্স

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন