এক শিল্পপতির গল্প বলি। ভদ্রলোকের কোম্পানির ব্যবসা দারুণ চলছিল। প্রতিষ্ঠার মাত্র এক দশকের মধ্যে বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি তাদের দখলে চলে আসে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এতদূর তো এলেন। সামনের দিনগুলোয় আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে হয়?’ তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চোখ চলে গেল সুদূর অতীতে বা ভবিষ্যতে। তারপর বেশ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘প্রতিযোগিতার অভাব।’
ক্রিকেটের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানদের জিজ্ঞেস করে দেখবেন। তারা বলবেন, দুর্বল দলের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করার চেয়ে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলানো মারাত্মক বোলিংয়ের সামনে খেলা ইনিংসগুলোই তাদের জীবনের সেরা। সাধারণ দর্শকরাও একপেশে ম্যাড়মেড়ে খেলার চেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখতে পছন্দ করেন। নিজের প্রিয় খেলোয়াড় কোনো আনাড়িকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিচ্ছেÑএমন দৃশ্য দেখার চেয়ে মানুষ লড়াই দেখতে ভালোবাসে।
ব্যবসা আর খেলাধুলার মতো প্রতিযোগিতাও হলো গণতন্ত্রের রক্তের হিমোগ্লোবিন। এটিই ‘জনগণের শাসন’ কথাটিকে সত্যি করে তোলে। এই প্রতিযোগিতাই সাধারণ মানুষকে ক্ষমতাশালীকে বিদায় করার এবং নতুন কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। মানুষ তখন ‘কোনো বিকল্প নেই’-এর ফাঁদ থেকে মুক্তি পায়। তবে এর জন্য একটা শর্ত আছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর লড়াই করার মতো ক্ষমতা থাকতে হবে। আর যারা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তাদের মনে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে ব্যবস্থাটা অন্তত নিরপেক্ষ।
ম্যান্ডেটের জন্য সত্যিকারের লড়াই প্রয়োজন
আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থার নিয়মকানুনগুলো বড় অদ্ভুত। ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৫৩(৩) ধারায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হওয়ার নিয়ম আছে। এর মানে হলো, মাঠে পর্যাপ্ত খেলোয়াড় নামলেই শুধু প্রতিযোগিতা হবে। তা না হলে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই জেতা সম্ভব। খেলা ছাড়াই বিজয়ী হওয়া যায়। একটা ভোটও না পেয়ে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে যাওয়া যায়। একেই বলে ওয়াকওভার। এই জিনিসটা খেলার আনন্দ আর স্পিরিটÑদুই-ই এক ঝটকায় খুন করে ফেলে।
বিজয় দাবি করতে হলে তো একটা লড়াই হতে হবে। একটা সরকার তখনই নিজেকে বৈধ বলতে পারে, যখন ভোটাররা বিশ্বাস করে যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জিতে এসেছেন। লড়াই ছাড়া ক্ষমতা পাওয়া যায়, কিন্তু জনগণের আসল সমর্থন বা ম্যান্ডেট পাওয়া যায় না। সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকলে পরাজিত পক্ষও আশা ধরে রাখে। তারা ভাবে, পরেরবার ভালো করে জিততে হবে। এর ফলেই মানুষ নির্বাচনের ফল মেনে নেয়। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার এই বদলই তো গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
প্রতিযোগিতা থাকলে সমাজ ও রাজনীতিতে নানা মতাদর্শ টিকে থাকে। অর্থনীতির নিয়ম বলে, প্রতিযোগিতা থাকলে কাজের মান বাড়ে। রাজনীতিতেও তাই হওয়া উচিত। প্রতিপক্ষ যখনই কোনো ভুল ধরিয়ে দেবে, রাজনৈতিক দলগুলো তখন নিজেদের নীতি আরো উন্নত করার চেষ্টা করবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন। যে ব্যবস্থায় ভোটে মানুষের অংশগ্রহণ অনেক বেশি কিন্তু আসল কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই (যেমন একদলীয় রাষ্ট্র), তাকে তিনি আসল গণতন্ত্র বলেননি। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘গণভোটের স্বৈরতন্ত্র’।
তবে প্রতিযোগিতার জন্য মাঠে সমান সুযোগ এবং একজন নিরপেক্ষ আম্পায়ার থাকা জরুরি। এর কোনো একটির অভাব হলেই পাল্লা ভারী দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দুর্বলদের জেতার আশা শেষ হয়ে যায়, ভেঙে পড়ে তাদের মনোবল। সবচেয়ে বড় কথা, ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। আম্পায়ার যদি পক্ষপাতিত্ব করেন, তবে বিজয়ী দল আসলেই জেতার যোগ্য হলেও সেই জয়ের আনন্দ মাটি হয়ে যায়। আপনি হয়তো র্যাংকিংয়ে ওপরে আছেন, দারুণ খেলছেন, দর্শকদের সমর্থনও আপনার দিকেÑতবু আম্পায়ার যদি পক্ষপাতদুষ্ট হন, তবে আপনার জয়টা কলঙ্কিত দেখাবে।
পশ্চিমবঙ্গ প্রসঙ্গে
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। শাসক দলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকতেই পারে আর বিজয়ী দলও হয়তো দারুণ প্রচার চালিয়ে এক বিশাল জয় পেয়েছে। কিন্তু নির্বাচন প্রক্রিয়ার তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সাংবিধানিক আম্পায়ারের বিরুদ্ধে যখন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে, তখন সেই দুর্দান্ত জয়টাও ম্লান হয়ে যায়।
নির্বাচনের এই ফলকে ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা তথ্য দিয়ে দেখাচ্ছেন, অনেক কেন্দ্রে যত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, বিজয়ী প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান তার চেয়েও কম। এই সংশোধন না হলে হয়তো ফল অন্যরকম হতে পারত।
এই বিশেষ সংশোধনের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। ভারতের নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের জুনে যখন বিহারে এই কাজ শুরু করে, তখন তাদের বড় দাবি ছিল ৩২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘অযোগ্য’ ভোটারদের খুঁজে বের করা। কিন্তু বিহারের কাজ শেষে বা দ্বিতীয় দফার রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে, কতজন ‘অযোগ্য’ ভোটার বাদ পড়লÑতার কোনো স্পষ্ট তথ্য কমিশন দেয়নি। হ্যাঁ, ভোটার বাদ পড়েছে ঠিকই। তবে তারা হলেন স্থায়ীভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া, মৃত বা একই নাম দুবার থাকা ভোটার। এই কাজগুলো তো সাধারণ নিয়মের সংশোধনেই করা যেত।
এর বদলে আমরা কী দেখলাম? পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখেরও বেশি ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ তালিকায় রাখা হলো। এরপর ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তাড়াহুড়োয় নিয়োগ করা বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের এক ঝড়ো অভিযানে মাত্র কয়েক দিনে ২৭ দশমিক ১৬ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে কেটে ফেলা হলো। ৭০০-এর বেশি বিচারক দিনরাত এক করে এক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করার দৌড়ে নামলেন। আর যাদের দাবি নাকচ করে দেওয়া হলো, তাদের বলা হলো এমন এক আপিল ট্রাইব্যুনালে যেতে, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই।
আসামের ডি-ভোটার (সন্দেহভাজন ভোটার) তালিকার দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই মানুষদের আপিল আদৌ শোনা হবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সাধারণ মানুষের জানার জন্য কোনো সরকারি তথ্য নেই যে তারা ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেয়েছেন, নাকি এখনো অন্ধকারের মধ্যে ঝুলে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের এই ২৭ লাখ মানুষও হয়তো খুব দ্রুত হারিয়ে যাওয়া মানুষের তালিকায় যোগ দেবেন। নিষ্ঠুর রসিকতা হলো, আসামে কয়েক বছর আগের নাগরিক তালিকায় (এনআরসি) ১৯ লাখের বেশি মানুষকে ‘অনাগরিক’ বলা হলেও, নির্বাচন কমিশন আসামকে এই বিশেষ সংশোধন থেকে দূরে রেখেছে। তাদের ভোটাধিকার কিন্তু এখনো ঠিক আছে।
সন্দেহের মুখে নিরপেক্ষতা
নির্বাচন কমিশন নিজেদের ‘তদারকি’র অধীনে এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করল, যা পুরো প্রক্রিয়াকে কলঙ্কিত করেছে। তাদের সেই বিখ্যাত স্লোগানÑ‘কোনো ভোটার বাদ যাবে না’-এর কী মূল্য রইল, যখন ২৭ লাখ ভোটারকে এভাবে ছুড়ে ফেলা হলো? কমিশন কীভাবে এমন একটা অযৌক্তিক নিয়ম ব্যবহারের নির্দেশ দিল, যা নিজেই নতুন বিভ্রান্তি তৈরি করে? ভোটার নিবন্ধন কর্মকর্তার আইনি ক্ষমতা কেন এমন এক ব্যবস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো, যা কমিশনের নিয়ন্ত্রণেই নেই? ভোটার তালিকা সময়মতো চূড়ান্ত করার ভরসাই যেখানে ছিল না, সেখানে নির্বাচনের তফসিল কেন ঘোষণা করা হলো? সময় কম থাকায় যে ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের প্রক্রিয়া শেষ করা গেল না, আইনি নিয়ম মেনে পুরোনো তালিকা অনুযায়ী তাদের ভোট দিতে কেন দেওয়া হলো না? আইনি প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য কমিশন আদালতের কাছে সময় কেন চাইল না? আদালতও যে কমিশনকে একটু থামতে বলল না এবং ২৭ লাখ মানুষের ভোটাধিকার স্থগিত করতে দ্বিধা করল নাÑতা সত্যিই অদ্ভুত এবং দুর্ভাগ্যজনক।
রাজ্যে বা জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যদি এভাবে একে একে হারিয়ে যায়, তবে কি আমরা শুধু লড়াই ছাড়া ‘জয়’ দেখে যাব? মাঠ যদি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন হয়ে পড়ে, প্রতিপক্ষ যদি দুর্বল হয়, আর আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত যদি একতরফা হয়Ñতবে খেলাটাই তো শেষ। মজার ব্যাপার হলো, কোনো প্রতিযোগী না থাকলে আম্পায়ার নিজেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বেন। ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ কিংবা ‘বিপক্ষ-মুক্ত’ দেশের ধারণা কিন্তু প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য নয়। আর এটা কোনো ভালো লক্ষণও নয়। যে রেসে ঘোড়া মাত্র একটা, সেই রেস দেখার কোনো রোমাঞ্চ থাকে না।
এই পুরো ব্যাপারটি যে দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্রের মূলে আঘাত করছে, তা হয়তো এখন অনেকের কাছে খুবই ছোট একটা বিষয় মনে হতে পারে।
অশোক লাভাসা ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থ সচিব।
দ্য হিন্দু অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

