দক্ষিণ এশিয়া কেন ইইউ মতো হতে পারবে না

আমীর খসরু

দক্ষিণ এশিয়া কেন ইইউ মতো হতে পারবে না

পররাষ্ট্রনীতি আর কূটনীতিতে একটি কথা বহুল প্রচলিত। আর বাস্তবতার নিরিখে এ কথাটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কথাটা হচ্ছে, কোনো দেশই তার প্রতিবেশী দেশকে তার পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে পারে না। এটি ভূগোল ঠিক করে দিয়েছে যে, কোন দেশ বা দেশগুলো প্রতিবেশী এবং এর সীমানাও নির্ধারিত থাকে ইতিহাস, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি এবং আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী, যা প্রতিবেশীকে নিজের ইচ্ছায় আর পছন্দের বদলে স্থায়ী অবস্থানে চিরস্থায়ী করে দিয়েছে।

কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলেও বা বর্তমানেও এই ক্ষেত্রে বিবাদ, সংঘাতÑএমনকি যুদ্ধ পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং হচ্ছে। এর জন্য অপরিবর্তনীয় ভৌগোলিক অবস্থানের পরিবর্তে নানা দ্বন্দ্ব-বিবাদ কাজ করে, যা ঘটে থাকে আর তাকে দেখতে হবে প্রধানত প্রতিবেশী যদি অসম অবস্থার হয়, তার বিবেচনায়। প্রতিবেশী অসম হওয়ার বিবেচনাটি নির্ধারিত শুধু বহুমাত্রিক শক্তি, আকার, অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক, ভূরাজনৈতিক কারণেই নির্ধারিত হয় না, এটি হয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মনস্তত্ত্বে, যা জড়িয়ে আছে তার ‘নীতিকৌশল’ এবং ‘বড়ত্বের’ অহমিকায়। এটাই হচ্ছে মূল বিবেচনা যে, রাষ্ট্রটি আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদকে তার ‘নীতি’ হিসেবে গ্রহণ করে, না এর বদলে সম্পর্ক, সহযোগিতা, পারস্পরিক বন্ধুত্বকে প্রাধান্য দেয়। শ্রেষ্ঠত্ব আর বড়ত্বের পার্থক্যটি বুঝতে হবে সুসম্পর্কের বিবেচনায়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কী চিত্র আমরা দেখতে পাই দক্ষিণ এশিয়ায়? দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিবাদ, দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক অবিশ্বাসের চিত্র দেখতে পাই, যা বাংলাদেশসহ একটি বাদে কোনো দেশই দেখতে চায় না। এর বিপরীত ক্ষেত্রে একসময়ের সবচেয়ে বড় বিবাদমান অঞ্চল ইউরোপের দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতির পর্যালোচনা, বিবেচনার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো এবং প্রতিবেশীদের এককালের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা জানতে পারলে সুবিধাটা হবে। এতে স্পষ্ট হবে, কীভাবে এককালের চরম শত্রু দেশ, আজকের বিশ্বে ঐক্যবদ্ধ এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বের ‘হাত বাড়িয়ে’ ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পরিণত হয়েছে। ইইউ এখন এক অটুট বন্ধনের দৃঢ় জোট, যারা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে।

যুদ্ধ-বিবাদের ইউরোপ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগের ইউরোপের দেশগুলোর ইতিহাস হচ্ছে, দ্বন্দ্ব, বিবাদ এবং যুদ্ধের। মধ্যযুগেও ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো বর্তমান আকারে এবং নামে তখন পরিগণিত হয়নি। তখন ভিত্তি ছিল অঞ্চলগত। কত যুদ্ধ এবং সংঘাত প্রাচীন ইউরোপের অঞ্চলগুলোয় হয়েছে, তার সংখ্যা বলা মুশকিল সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে। প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্র এথেন্সের উত্থানের কারণে অপর নগর রাষ্ট্র স্পার্টার মনে সৃষ্ট ভয়ের কারণে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হয় এবং একে ইতিহাসবিদরা নাম দিয়েছেন ‘থুসিডাইসিস ট্রাপ’ বা ফাঁদ হিসেবে। এতে উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাপকভাবে।

প্রাচীনকালের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি না করে ইউরোপের মধ্যযুগের কথাই ধরা যাক। একসময়Ñঅর্থাৎ মধ্যযুগে ইউরোপের ইতিহাস সংজ্ঞায়িত হতো ভূখণ্ডগত বিরোধ, খ্রিষ্টধর্মের সংস্কার ও চার্চের ক্ষমতা, বংশ পরম্পরায় রাজবংশীয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে। উদাহরণ হিসেবে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেনের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, যাদের ‘ভাইকিং’ বলা হতো, তারা ৭৯৩ সাল থেকে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে ৩০০ বছরের বেশি সময় আক্রমণ, দখল এবং যুদ্ধ করেছে। ফরাসি সিংহাসনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স ১৩৩৭ থেকে ১৪৫৩ পর্যন্ত পারস্পরিক যুদ্ধ, সংঘাত করেছে। ইউরোপীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ১৪৯৪ থেকে ১৫৫৯ ফ্রান্স, স্পেন এবং রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ, বিবাদ এবং সম্রাট নেপোলিয়নের যুদ্ধের ইতিহাস তাদের রয়েছে। ফ্রান্স আর জার্মানির বিবাদ, যুদ্ধ-সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান পক্ষ ছিল এই ইউরোপ। প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা ইউরোপীয়ভুক্ত দেশগুলোকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। আর এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৫০ থেকে মূলত এক এবং অভিন্ন ইউরোপ গঠনের ধারণাটি আসে। প্রথমে ১৯৫১ সালে কয়লা এবং ইস্পাত বাণিজ্য নিয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়ামসহ ছয়টি দেশ যাত্রা শুরু করে। যার উদ্যোক্তা ছিলেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট সুমান, ৫৭ সালেই গঠিত হয় ঐতিহাসিক আঞ্চলিক সংস্থা ‘ইউরোপীয় ইকোনমিক কমিউনিটি বা (ইইসি) এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য ও অর্থনৈতিক একত্রীকরণ, সংহতিসাধন। আর এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে ইউরোপীয় কমিউনিটি (ইসি) এবং ২০০৯-এ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গঠনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিকসহ ভূরাজনৈতিক বিষয়াবলির ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ সমতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকার আর একই সঙ্গে কাজ করা। আশা করি, ইইউ সম্পর্কে আর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই।

এবং দক্ষিণ এশিয়া

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রটি ঠিক এর উল্টো। বাংলাদেশের প্রসঙ্গে খুব একটা যেতে চাই না; বরং নেপালের দিকেই প্রথম দৃষ্টি দেওয়া যাক। নেপাল আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক খবর হয়ে ওঠে মে মাসেরই দ্বিতীয় সপ্তাহে। ভূবেষ্টিত বা Land-locked হওয়ার কারণে নেপালের ওপরে ভারতীয় আধিপত্য কতটা, তা সবারই জানা। আর ভারতও দেশটি সম্পর্কে এক স্বাধীনতামূলক নীতি গ্রহণ করে আসছে। যদিও মাঝেমধ্যে এর প্রতিবাদ হলেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি ফল মেলেনি। নেপালের জেনজি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সঙ্গে সাক্ষাতে দিল্লির কথায় কোনো পাত্তা না দিয়ে সরাসরি নাকচ করে দেন এই বলে যে, তার পক্ষে সমকক্ষ ছাড়া কারো সঙ্গে কথা-সাক্ষাতের প্রশ্নই উঠে না। তিনি চুক্তি অনুযায়ী লিপুলেখ, কালাপানি অঞ্চলকে নেপালের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ভারতীয় দাবিকে নাকচ করে দিয়ে ধর্মীয় মানসসরোবর যাত্রায় ভারতীয়দের আগমনের ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সঙ্গে সঙ্গে ৩০ দিনের বেশি যেসব ভারতীয় নেপালে রয়েছে, তাদের বহিষ্কারের কড়া নির্দেশ জারি করেন। সীমান্তে কোনো বৈধ কাগজপত্রবিহীন কাউকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এত দিন বিনা বাধায় ভারতীয়রা নেপালে প্রবেশ করতে পারত। ভারত যেসব নেপালি ভূমি তাদের বলে দাবি করছিল, তা ভ্রূক্ষেপ না করে নেপালের নতুন ম্যাপ বা মানচিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা হয় নতুন সরকারের নির্দেশে।

শুধু নেপালই নয়, জেনজি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ওই ঘটনার আগে মার্কিন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পল কাপুরও একজন বিশেষ দূতের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ই দেননি। এছাড়া লিপুলেখ গিরিপথ ব্যবহারের জন্য চীন-ভারত চুক্তির ব্যাপারে চীনকে আপত্তির কথা ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। নেপালের নয়া সরকারের এমন সব সিদ্ধান্তের কারণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ এবং কোনো ধরনের আধিপত্য সহ্য ও না মানার নীতি। বালেন শাহ যে প্রথম এ কাজটি করেছেন, তা নয়। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৫৫-৫৬ সালে রাজা মহেন্দ্র এবং তার পিতা চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের দুটো চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং ভারতের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন। এই চুক্তির ফল ছিল স্বল্পস্থায়ী। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট এবং ভারতের ভূমিকার কারণে নেপালের ঘটনাবলি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। কারণ ভারত নিজেকে পাকিস্তান বাদে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে অধিক শক্তিধর বৃহৎ পৃষ্ঠপোষক বা মুরুব্বি (Client State) হিসেবেই ভেবে থাকে। এ ক্ষেত্রে ভারতের অধীনতার নীতির মনোভাব প্রত্যক্ষ বৃহৎ সামরিক শক্তির মাধ্যমেই নয়, বরং নীতিকৌশল, কাঠামোগত পদ্ধতি, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের মিশ্রণের মাধ্যমে জটিল একটি ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখতে হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই এ কারণে যে, সবাই এ বিষয়গুলো সম্পর্কে কমবেশি অবগত। তবে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বড় সংকটটি শুরু হয় যখন তামিল টাইগার বা এলটিটিই সশস্ত্র সংগঠনটি তাদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত রীতিমতো ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু করে এবং এলটিটিইর কার্যক্রমে জড়িত ছিল দিল্লি। সেই থেকে নানা ঘটনা যেমন চীনের সহায়তায় এবং অর্থায়নে হাম্বানটোটা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে ভারত। এছাড়া সমুদ্র সীমানা নিয়েও ১৯৭৪ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি ভঙ্গের ঘটনাও ঘটছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে মালদ্বীপের সঙ্গে তিক্ততার সম্পর্ক ভারতের। ১৯৮৮ সালে ভারত মালদ্বীপের গাইউম সরকার উৎখাতে সামরিক অভিযান চালায়। সম্পর্কের তলানিতে আসে ২০২৪-এ মালদ্বীপ যখন ওই দেশ থেকে ইন্ডিয়া আউট নামে ভারতীয় সেনাসদস্য এবং সামরিক সরঞ্জাম অপসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়।

আরেক ভূবেষ্টিত দেশ ভুটানের সঙ্গেও সম্পর্ক একই। আর এ কারণ চীনের সহায়তায় রাস্তাঘাটসহ উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থিম্পু।

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে কোনো আলোচনা করার প্রয়োজনই নেই। এই দুই দেশের বৈরী এবং বিবাদমান সম্পর্ককে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে সার্কসহ কোনো জোটই টিকে থাকবে না বা এটা করাও অর্থহীন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেমন, সে প্রশ্নেও সবাই অবগত। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কালের সরকারের সময়ের অসীম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সত্ত্বেও ফারাক্কা বাঁধের তথাকথিত অস্থায়ী চুক্তির পরে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের সীমাহীন সংকট যুক্ত হয়েছে পানি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে। ১৯৭২ থেকে ৭৫ এবং শেখ হাসিনার সরকারের ১৭ বছরসহ দীর্ঘ একটি সময় কেমন গেছে, তা সবারই জানা। করিডোর থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার ভাষায় ভারতকে যা দিয়েছি, সারাজীবন তা তারা মনে রাখবে, পর্যায়ে পৌঁছে যায়। স্বৈরাচারী এরশাদ এবং ১/১১-এর সরকারও কাদের নীতিকৌশলে চলেছে, তা সবারই জানা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে সীমান্তে নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) Trigger happy : Excecive use of Force by Indian troops at Bangladesh Border শীর্ষক ৮১ পৃষ্ঠার রিপোর্টে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে হত্যার বিবেচনায় বিশ্বের একেবারে প্রথম দিককার একটি বলে উল্লেখ করা হয়। বিএসএফকে দেওয়া দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা বোধ করি বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। এইচআরডব্লিউসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী ২০০০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ১৪০০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে মনে করা যায়। শুধু ২০২০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সময়েই কমপক্ষে ১৪৫ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

ভূরাজনৈতিক বিবেচনা এবং পরিস্থিতির নিরিখে বাংলাদেশ তার নিজস্ব নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি নিজেই নির্ধারণ করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও পাশের দেশটির বাধা এ কারণে যে, এটি তারাই ঠিক করে দেবে। বাংলাদেশ তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প করবে কি না এবং কোন দেশের সহযোগিতায় করবে, তাতেও আপত্তি জানানো হয়, ওই দেশটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন অযৌক্তিক অজুহাতে। একই অজুহাত দেওয়া হচ্ছে কোথায় বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করা হবে, সে নিয়েও।

একটি কথা বলতেই হবে, স্বাধীন, সার্বভৌম, আধিপত্য ও সম্প্রসারণমুক্ত আপন বাংলাদেশের দাবি উত্থাপনের কারণেই ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব তাদের জন্য ভয়াবহ ভীতি। আর এর পরের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নির্বাচন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, ১/১১-সহ নানা ঘটনাবলির বিচার প্রক্রিয়ায় ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাদের জন্য।

একটি বিষয় খুবই স্পষ্টÑদক্ষিণ এশিয়ায় চীন একটি ফ্যাক্টর। চীন ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বৈরিতা দ্বন্দ্ব সমস্যা এবং সংকটের। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কেন এর পক্ষাবলম্বন নীতির অংশীদার হবে? পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের তিক্ততার সম্পর্কে ভাগীদার বা পক্ষগ্রহণকারীও বাংলাদেশ কেন হবে?

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং সার্ক

বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের (Chathan House) ২০২৫-২৬-এর গবেষণা নিবন্ধ বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নীতিতে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বা একক নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর না করে বরং বাস্তবতা, বহুকেন্দ্রিক ভারসাম্য, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy), স্বকীয়তা এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জোরদার নীতি কৌশলের বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো এই নীতিতে চলতে চাইলেও হস্তক্ষেপবাদী নীতির বাধার কারণে সম্ভব হয় না এবং দেওয়া হচ্ছে না।

এই বাস্তবতায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালের কাছে প্রাথমিক অথচ চূড়ান্ত প্রস্তাব পেশ করেন দক্ষিণ এশীয় একটি সংস্থা গঠনের। কিন্তু সেখানেও ভারতের অনীহার কারণে শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার একটি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। তবে তার অকাল মর্মান্তিক মৃত্যু ও অন্যান্য কারণে ১৯৮৫ সালে সার্ক আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। আর এটির অনানুষ্ঠানিক মৃত্যু হয় ২০১৬ সালে, যখন ইসলামাবাদ ১৯তম শীর্ষ বৈঠকে ভারত ও শেখ হাসিনার সরকার ওই সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এটাই প্রমাণ করে কেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সমন্বয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সুদৃঢ় ঐক্য এবং পারস্পরিক সুসম্পর্কসম্পন্ন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না? যতক্ষণ পর্যন্ত না দ্বিপক্ষীয় সুসম্পর্ক ন্যায়, নীতি, ন্যায্যতা, সমতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বৈরিতা আর দ্বন্দ্ব-বিবাদের পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ায় চলতেই থাকবে।

মনে রাখতে হবে, আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, হস্তক্ষেপ আর ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত বন্ধু হওয়া যায় না, তবে শত্রু সৃষ্টির মাধ্যমে এক ঘরে বা বন্ধুহীন এবং একা হওয়া যায় খুব সহজেই।

লেখাটি শেষ করতে চাই ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক লর্ড পামারস্টনের বিখ্যাত বক্তব্য দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, দেশের কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই, আছে শুধুই জাতীয় স্বার্থ। বাংলাদেশ বর্তমানে সে পথেই হাঁটছে এবং হাঁটবে।

লেখক: গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন