ভারতের বেঙ্গালুরুতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে আয়োজিত এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বিমান ও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ‘অ্যারো ইন্ডিয়া’ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সমাপ্ত হয়েছে। এবারের পাঁচ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীটি আয়োজক দেশ ভারতকেই বড় ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে।
এর প্রধান কারণটি ছিল, এতে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান এফ-৩৫-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয় রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান এসইউ-৫৭। রাশিয়ার এই যুদ্ধবিমানটি সমরাস্ত্রের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান এফ-৩৫-কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
ফলে ‘অ্যারো ইন্ডিয়া’র এই প্রদর্শনীতে ভারতের দুই বন্ধু দেশের সর্বশেষ প্রযুক্তির দুটি যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছে দিল্লিকেও। কারণ তারা তাদের দুই বৈরী প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের মোকাবিলায় নিজেদের বিমানবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির জন্য এফ-৩৫ নাকি এসইউ-৫৭ কিনবে, তা নিয়ে পড়েছে উভয় সংকটে। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বের সম্পর্ক বহু পুরোনো। অন্যদিকে, চীনবিরোধী মার্কিন জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভারত। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কাকে বেছে নেবে ভারত, তা ভেবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদিকে।
বেঙ্গালুরুতে প্রদর্শনীটি চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৩ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠকও হয়। ওই বৈঠকে তারা দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। সেখানে ট্রাম্প বলেন, তারা ভারতের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহের পথ তৈরি করছেন। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এই যুদ্ধবিমান শুধু মার্কিন মিত্র দেশগুলোর কাছেই বিক্রি করে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণায় বেঙ্গালুরুতে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ প্রদর্শনীতে আসা বিভিন্ন দেশের সামরিক কর্মকর্তা ও সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ভারতের মনোযোগ আকর্ষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলেন। বর্তমানে ভারত বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। তারা অস্ত্রের জন্য শুধু রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ১১৪টি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনাসহ সব মিলিয়ে বেঙ্গালুরুর এবারের প্রদর্শনী বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক কারণে এবারের এই প্রদর্শনী সত্যিকার অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বেঙ্গালুরুর প্রদর্শনীতে রুশ ও মার্কিন প্রতিনিধিরা সতর্কতার সঙ্গে পরস্পরের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলেছে। তবে তারা একে অন্যের প্রযুক্তির সমালোচনা করতে মোটেও পিছপা হননি। বেঙ্গালুরুর আকাশে রাশিয়ার এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমানের দক্ষতা ও কলাকৌশল প্রদর্শনের পর দেশটির প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এফ-৩৫ শুধু দুর্বল সমরাস্ত্র সজ্জিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, এসইউ-৫৭ ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের মাধ্যমে এটির কার্যকারিতা এখন ‘পরীক্ষিত’। অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ইউক্রেনে রুশ অস্ত্রের দুর্বলতার কথা তুলে ধরে এসইউ-৫৭-এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তারা বলেন, ইউক্রেনের সত্যিকার অর্থে কোনো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেই। কাজেই এসইউ-৫৭-এর কার্যকারিতা ইউক্রেন যুদ্ধে সেভাবে প্রমাণিত হয়নি। আধুনিক যুদ্ধে : এসইউ-৫৭ আসলেই কতটুকু কার্যকর, তা এখনো প্রমাণসাপেক্ষ বিষয় বলেও দাবি করেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
একই সঙ্গে তারা ইউক্রেনে ব্যবহার করা রাশিয়ার অন্যান্য সমরাস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মার্কিন কর্মকর্তারা একই সঙ্গে এ কথাও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দুই দশক আগে শুরু হওয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্ক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার মধ্য দিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এরই মধ্যে হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান, ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম কিনলেও যুদ্ধবিমান কেনেনি এখনো। ২০১৬ সালে ভারত ৩৬টি ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমান কিনলেও দেশটির অধিকাংশ যুদ্ধবিমান রাশিয়া থেকে কেনা হয়েছে।
ভারতের বিমানবাহিনীর জন্য ১১৪টি যুদ্ধবিমান কেনার টেন্ডার নিয়ে আলোচনা ২০১৮ সালে শুরু হলেও, এ বছর তা চূড়ান্ত করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আছে মার্কিন কোম্পানি বোয়িং ও লকহিড মার্টিন, ফরাসি কোম্পানি দাসোঁ, সুইডিশ কোম্পানি সাব এবং রাশিয়ার ইউনাইটেড এয়ারক্রাফট করপোরেশন। তবে ভারত চেষ্টা করছে তুলনামূলক কম খরচে চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কিনতে। এফ-৩৫-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের ব্যয়বহুল স্টিলথ যুদ্ধবিমান কেনা এই কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ছাড়া ভারত নিজেই পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির চেষ্টা করছে।
একই সঙ্গে দেশটি সমরাস্ত্রের ওপর পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভারতেই কারখানা স্থাপনের চেষ্টা করছে। ট্রাম্প ও মোদি ইতোমধ্যেই ভারতের কাছে ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল এবং পদাতিক বাহিনীর জন্য যুদ্ধযান বিক্রির একটি নতুন সরবরাহ ও সহযোগিতা চুক্তির ব্যাপারে একমত হয়েছেন। এ ছাড়া দেশ দুটি যৌথভাবে ড্রোন ও সাবমেরিন বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের উদ্যোগ নিতেও সম্মত হয়েছে। কিন্তু এখানে বড় যে সমস্যাটি দেখা দেবে তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কোম্পানি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তৈরিতে অংশ নিচ্ছে, তারা চাইবে না তাদের কোনো প্রযুক্তি ভারতের হাতে পড়ুক। ফলে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরিতে ভারতের চেষ্টা কতটুকু সফলতার মুখ দেখবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে, ভারতের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী চীন তার বিমানবাহিনীতে এরই মধ্যে প্রায় ২০০টি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে দেশটি এই প্রযুক্তির ৪০টি যুদ্ধবিমান তার মিত্র পাকিস্তানকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইতোমধ্যেই। চীনের এই পদক্ষেপের পর ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা ১১৪টি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করার কথা বলছেন। তারা বলছেন, ভারতের উচিত হবে বিশাল বহর গড়ার পরিবর্তে ছোট পরিসরে হলেও স্টিলথ যুদ্ধবিমান কেনার দিকে নজর দেওয়া।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের এই মতামত কার্যত রাশিয়ার পক্ষেই যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রাশিয়া তাদের এসইউ-৫৭ বিমান ভারতে উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে এই যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি ভারতের হাতে চলে আসার সম্ভাবনা বাড়বে অনেকটাই। মস্কো আগেও তাদের এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কিনলে সেটির ইঞ্জিন সরবরাহে জটিলতা তৈরি ও বিলম্ব হবে বলে বলে ভারতকে সতর্ক করে দিয়েছেন রুশ কর্মকর্তারা।
তবে, এফ-৩৫ নির্মাতা কোম্পানি লকহিড মার্টিন ভারতের জন্য সহজলভ্য হবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটি তাদের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের আধুনিক সংস্করণ তৈরির কথা ভাবছে বলে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এখন ভারত তার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এফ-৩৫ নাকি এসইউ-৫৭ কিনবে, তা নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এফ-৩৫ ভারতের কাছে সরবরাহ করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যটি এখনো পর্যন্ত একটি প্রস্তাবমাত্র। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরো যথেষ্ট সময় লাগবে।
দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ : মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

