ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলাম ও ফোবিয়া

একাডেমিক স্বাধীনতা যখন বুলিংয়ে পরিণত হয়

একাডেমিক স্বাধীনতা যখন বুলিংয়ে পরিণত হয়

৭ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের একটি ক্লাসে নিকাব পরা এক ছাত্রী সামনের দিকে বসেছিলেন। ওই ক্লাসে প্রায় ১৩০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব তাকে বলেন, এটা পর্দা করার সঠিক নিয়ম নয়, কারণ নারীদের মুখ, হাত ও পা ঢাকার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, এই ছাত্রীকে দেখে তার অস্বস্তি হচ্ছে, নিজেকে অনিরাপদ মনে হচ্ছে। এরপর তাকে পেছনে গিয়ে বসতে বলেন।

বিজ্ঞাপন

এসময় এক সহপাঠী আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘ও ওর মাজহাব অনুযায়ী এভাবে পর্দা করতে পারে।’ এবার শিক্ষক সেই সহপাঠীর ওপর ক্ষুব্ধ হন। নিকাব পরা ছাত্রী ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায়। আরো দুজন তার সঙ্গে বেরিয়ে যায়। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষক তখন প্রতিবাদ করা সহপাঠীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কীভাবে ওকে সাপোর্ট করো? তুমি বলতে পারবা, ও ফান্ডামেন্টালিস্ট নয়, ও সন্ত্রাসী নয়?’ এরপর ক্লাসের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বেরিয়ে যায়।

এই ছাত্রী এখন মাস্টার্সের শেষ সেমিস্টারে পড়ছেন। পাঁচ বছর ধরে বিভাগের শিক্ষকরা তাকে পড়িয়েছেন, তার লেখা পড়েছেন, ৯টি ভাইভা নিয়েছেন। শুধু নিকাব দেখে সে সন্ত্রাসী কি না, এমন প্রশ্ন তোলা মানে তার সম্পর্কে এত দিনের জানা সবকিছু বাদ দেওয়া। শুধু পোশাকের ভিত্তিতে একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে সন্দেহ করা অযৌক্তিক ও অন্যায়।

শিক্ষার্থীদের আপত্তিটা আসলে কোথায়

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ক্লাসেই এর আগে শিক্ষক বিভাগের ছাত্রদের নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, তারা গরিব, প্রতিদিন একই টি-শার্ট পরে আসে, গাদাগাদি করে বসে থাকে, তাদের গা থেকে গন্ধ আসে। ছাত্রদের গাদাগাদি করে বসতে হয়, কারণ বিভাগে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম ও বেঞ্চ নেই। এই ঘাটতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যর্থতা, অথচ ভোগান্তি শিক্ষার্থীদের। এ নিয়ে তাদের বিদ্রুপ করা মানে, যে অবিচার তারা এমনিতেই সহ্য করছে, তার সঙ্গে অপমানও যোগ করা।

তাই অভিযোগটা শুধু ধর্ম নিয়ে নয়। শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষমতা আছে, এমন একজন শিক্ষক তাদের সঙ্গে এবং তাদের সম্পর্কে কীভাবে কথা বলছেন, আপত্তিটা সেখানে। সেদিন নিকাবের ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে গুরুতর, কিন্তু সেটিই একমাত্র ঘটনা ছিল না। দিনের পর দিন এসব ইস্যু চলছিল।

নিকাব নিয়ে একজন শিক্ষক তার মতামত দিতে পারেন, লিখতে পারেন, কিংবা প্রাসঙ্গিক ক্লাসে যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারেন। একাডেমিক স্বাধীনতা এই অধিকার রক্ষা করে। কিন্তু ওই ক্লাসের বিষয় নিকাব ছিল না। একজন ছাত্রীকে পেছনে পাঠানো, সে সন্ত্রাসী কি না অন্যদের কাছে জানতে চাওয়া—এসব তার বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতা অপব্যবহার করা। একাডেমিক স্বাধীনতা এর অনুমতি দেয় না।

শিক্ষার্থীরা স্বীকার করেছেন, এই শিক্ষক বহু আন্দোলনে তাদের পাশে ছিলেন। এজন্য তারা তাকে শ্রদ্ধা করে। তাদের আপত্তি তার ক্লাসে যা ঘটেছে, তা নিয়ে।

নিকাব নিয়ে অস্বস্তি কি অযৌক্তিক

অনেকেরই নিকাব নিয়ে অস্বস্তি আছে। তবে এমন শিক্ষকও আছেন, যারা কখনো কোনো শিক্ষার্থীকে অপমান করেন না। শিক্ষক মুখ দেখে বোঝেন—কে বুঝতে পারছে না, কে কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়। মুখ ঢাকা থাকলে এর কিছুটা বোঝা কঠিন হয়। পরীক্ষায় যে শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেওয়ার কথা, সে-ই দিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এই সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান আছে। এই ছাত্রীর ভাইভাতেই একজন পুরুষ শিক্ষক বাইরে গিয়েছিলেন, যাতে সে নারী পরীক্ষকদের সামনে মুখ দেখাতে পারে। পরীক্ষার হলে নারী শিক্ষক বা ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছে ডাকসু। ক্লাসে নিকাব পরা ছাত্রীর প্রতিক্রিয়া বুঝতে অসুবিধা হলে শিক্ষক তাকে আলোচনায় আরো বেশি অংশ নিতে বলতে পারেন। ক্লাসের পর আলাদা করেও কথা বলতে পারেন; কিন্তু নিজের অস্বস্তির কারণে কাউকে হয়রানি করা যায় না।

শিক্ষার্থীরা এত দিন চুপ ছিল কেন

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, এই শিক্ষকের এমন আচরণ অনেক দিন ধরেই চলছিল। পড়াতে পড়াতে তিনি প্রায়ই নিজের প্রশংসা শুরু করতেন, শিক্ষার্থীদের ধর্ম ও দারিদ্র্য নিয়ে মন্তব্য করতেন। কেউ কেউ কেঁদেছে, কেউ হাল ছেড়ে দিয়েছে; কিন্তু কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীরা বহুদিন ধরেই ক্লাসে, ভাইভায় ও আবাসিক হলে অপমান সহ্য করে আসছে। নিকাব পরা ছাত্রীরাও পরিচয় যাচাইয়ের নামে হয়রানির শিকার হয়েছে।

যে শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে অপমান করছেন, সেই শিক্ষকই তার পরীক্ষার খাতা দেখতে পারেন, ভাইভা বোর্ডে থাকতে পারেন, বৃত্তি বা চাকরির জন্য সুপারিশপত্র লিখতে পারেন। অভিযোগ করা মানে নিজের ফলাফলকে ঝুঁকিতে ফেলা। শিক্ষার্থীরা দেখেছেন, কেউ অভিযোগ করলে শিক্ষকরা একজোট হয়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। পরে সেই শিক্ষার্থীর নম্বরও কমে যায়। এসব দেখার পর চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন অনেক শিক্ষার্থী।

পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পরই কেন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা নেবে

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরই বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা নিয়েছে। সেদিনই শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে লিখেছিলেন। পোস্টগুলো ছড়িয়ে পড়লে ডাকসু ও অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানায়। বিভাগের একাডেমিক কমিটি সেদিনই সুপারিশ করে।

ডাকসু কর্তৃক ৮ অক্টোবরের বিবৃতিতে আমরা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেছি। এর চেয়ে ন্যায্য দাবি কী হতে পারে?

কিন্তু শিক্ষার্থীদের ফেসবুকে যেতে হলো কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুলিং ও র‍্যাগিং প্রতিরোধ কমিটি কাজ করছে। অনুষদ, বিভাগ ও হলে অভিযোগ বাক্স আছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বুলিং ও হয়রানির অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা উন্নত করতে ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনাও জানানো হয়।

কিন্তু তদন্তের ফল খুব কমই প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ করে দৃশ্যমান প্রতিকার পাওয়ার নজিরও শিক্ষার্থীরা খুব একটা দেখে না। একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গেলে কী হারাতে পারে, তা শিক্ষার্থী স্পষ্ট বোঝে; কিন্তু কী প্রতিকার পাবে, তা বোঝে না। ফেসবুক অন্তত এই নিশ্চয়তাটুকু দেয়, মানুষ ঘটনাটি শুনবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভাইরাল হওয়া অভিযোগে ব্যবস্থা নিলে, যাদের অভিযোগ ছড়ায় না, তারা কিছুই পায় না। ফেসবুকের পোস্টের চেয়ে এই বিষয়টিই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশি উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত।

যারা মুখ খুলেছিল, তারা আবার ভয় পাচ্ছে কেন

৮ অক্টোবর একাডেমিক কমিটি এই শিক্ষককে পাঠদান থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করে। তার দুটি কোর্স অন্য শিক্ষককে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা তিনি এখনো দেখবেন। যারা ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, ঘটনা নিয়ে লিখেছেন, তাদের খাতাও এর মধ্যে আছে।

এই খাতার নম্বরেই তাদের মাস্টার্সের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে। যে ছাত্রীকে পেছনে যেতে বলা হয়েছিল এবং যে সহপাঠীরা ঘটনাটি নিয়ে লিখেছেন, তারা এখন আর কিছু বলতে ভয় পাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন কী করা উচিত

এই ব্যাচের চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা অন্য পরীক্ষককে দিয়ে মূল্যায়ন করানো উচিত। যার আচরণ নিয়ে অভিযোগ, অভিযোগকারীদের ফলাফল তার হাতে থাকা উচিত নয়। এতে শিক্ষকও সুরক্ষা পাবেন। পরে তিনি অন্যায়ভাবে নম্বর দিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠবে না।

ডাকসুর দাবি অনুযায়ী তদন্ত করতে হবে, দ্রুত তদন্ত শেষ করতে হবে এবং ফল প্রকাশ করতে হবে। তদন্তের ফল শিক্ষার্থীদের পক্ষে যাক বা শিক্ষকের পক্ষে—দুটো ক্ষেত্রেই প্রকাশ করতে হবে। কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্নের মীমাংসা করতে হলে তদন্তের ফল প্রকাশ করা জরুরি।

এই ব্যাচকে লিখিত নিশ্চয়তা দিতে হবে—মুখ খোলার কারণে পরীক্ষার ফল, ভাইভা বা থিসিসে কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ ছাড়াই নম্বর কমে গেলে শিক্ষার্থীরা যেন সেই লিখিত নিশ্চয়তা দেখাতে পারে। ভবিষ্যতের জন্যও এটিকে নিয়ম করতে হবে। তাহলে নিজের কথা শোনাতে কাউকে ফেসবুকের ওপর নির্ভর করতে হবে না।

পরীক্ষার হলে নিকাব পরা ছাত্রীদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। নারী শিক্ষক বা ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করবেন, কখনো তীব্রভাবেও করবেন—শিক্ষার্থীরা তা মেনে নেয়। কিন্তু ফলাফল নির্ধারণের ক্ষমতা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা তারা আর মেনে নেবে না। এই দাবিতে যুক্তিসংগত কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ডাকসু; ২০২৫ সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন