ভিন্নমতের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহিংসতা

ভিন্নমতের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সহিংসতা

একটি সরকার গণতন্ত্রের প্রতি কতটা অঙ্গীকারবদ্ধ, তার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় বিরোধী মতের মানুষের প্রতি তার আচরণে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, ছাত্রসংগঠক কিংবা সাধারণ নাগরিক—প্রত্যেকেরই শারীরিক আক্রমণ, ভয়ভীতি ও প্রতিহিংসার আশঙ্কা ছাড়াই ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করার অধিকার থাকতে হবে। সমালোচনা করলেই যদি হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে মানুষের স্বাধীনতা কার্যত রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার এমন অপব্যবহারের শিকার হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরও একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি আমার দেশ-এর ছাপাখানার সামনে বোমা হামলা এই উদ্বেগকে আরো গভীর করেছে। একটি সংবাদপত্রের ছাপাখানার সামনে এমন হামলা মানুষের জীবন ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। সম্প্রতি সরকারের এক উপদেষ্টাকেও দেখা গেল আমার দেশ পত্রিকার একটি কপি ছিঁড়ে ফেলতে এবং তা ভিডিওর মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা হয়। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক! ধারণা করা হচ্ছে, কোনো মহল থেকে পরিকল্পিতভাবে এই আঘাতের চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও দেশের বিভিন্ন মহল থেকে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি কোনো একটি পত্রিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সহিংসতার মাধ্যমে একটি সংবাদপত্রের প্রকাশনা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হলে সম্পাদক, সাংবাদিক, মুদ্রণকর্মী ও সংবাদপত্র পরিবেশক—সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় অবস্থান কিংবা সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক যা-ই হোক, সেটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের ওপর হামলা, হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচারের অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি অভিযোগ যাচাই এবং প্রতিটি ঘটনায় ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কোনো হামলার দায় সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর চাপানো সমীচীন নয়। কিন্তু সহিংসতা প্রতিরোধ, অভিযোগের তদন্ত এবং হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। অপরাধীরা সরকারবিরোধী কোনো গোষ্ঠীর সদস্য হলেও এই দায়িত্বের পরিবর্তন হয় না।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা এ দায়িত্বকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত নিপীড়নের প্রমাণ উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস গোষ্ঠীর ভূমিকা সম্পর্কেও গুরুতর তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কার্যকর জবাবদিহিতার বাইরে চলে গেলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই অনুসন্ধান তার সাক্ষ্য বহন করে।

জুলাইয়ের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রের ওপর একটি স্থায়ী নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব অর্পণ করেছে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, তারা বর্তমান সরকারের সমালোচনা করলেও নিরাপদে কথা বলতে, সংগঠিত হতে এবং জনজীবনে অংশ নিতে পারবেন—এ নিশ্চয়তা দিতে হবে। আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষাসহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বচ্ছ আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সরকারি সহায়তা বা নিরাপত্তা পাওয়ার শর্ত হিসেবে কোনো দল বা সরকারের প্রতি আনুগত্য দাবি করা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে জুলাইয়ের অংশগ্রহণকারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ পরবর্তী কোনো অপরাধের দায়মুক্তি দিতে পারে না; আবার তাদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত কোনো হামলার বৈধতা সৃষ্টি করে না। সবার অধিকার রক্ষা, নির্দিষ্ট অপরাধের তদন্ত এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ ও ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ—এই নীতিই সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন।

ভিন্নমতের ওপর সহিংসতা শুধু সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব পড়ে গোটা সমাজের আস্থার ওপর। একজন আক্রান্ত নাগরিক যদি থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন, অথবা প্রভাবশালী কোনো সন্দেহভাজনকে তদন্তের ঊর্ধ্বে থাকতে দেখেন, তাহলে আইনগত প্রতিকারের ওপর তার বিশ্বাস কমে যায়। কেউ ভয়ে নীরব হয়ে যান, কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় খোঁজেন। উভয় পরিস্থিতিই নাগরিক অধিকার দুর্বল করে এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। তদন্তের আগেই কোনো ঘটনাকে ‘ব্যক্তিগত বিরোধ’, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ কিংবা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দিলে অবিশ্বাস আরো বাড়ে। তদন্তে এসবের কোনোটি প্রাসঙ্গিক হিসেবে উঠে আসতে পারে; কিন্তু তার জন্য প্রমাণ প্রয়োজন। আগাম রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে এবং ভুক্তভোগীদের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে, ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রথমেই স্পষ্ট ঘোষণা আসা দরকার—শান্তিপূর্ণ সমালোচনা, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদেরও তাদের অনুসারীদের কাছে একই নির্দেশনা পৌঁছে দিতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তির হুমকিমূলক বক্তব্যের জন্য সাংগঠনিক জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক যোগাযোগসম্পন্ন অপরাধীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারি নিন্দা ও আশ্বাস বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

আমার দেশ-এর ছাপাখানার সামনে হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকা উচিত সিসিটিভির রেকর্ড সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা, আহতদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা। যারা সরাসরি হামলা চালিয়েছে, তাদের বাইরে পরিকল্পনা, অর্থায়ন বা সহযোগিতার কোনো প্রমাণ আছে কি না, তাও অনুসন্ধান করতে হবে। সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থ রক্ষা করে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তথ্যভিত্তিক অগ্রগতি জানানো প্রয়োজন। দ্রুত গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি যেন সঠিক অপরাধী শনাক্ত করার দায়িত্বকে আড়াল না করে।

বিরোধী রাজনৈতিক সমাবেশ, ছাত্রসংগঠক কিংবা অন্য সমালোচকদের ওপর হামলার ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হতে হবে। প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবমুক্ত তদারকির ব্যবস্থা প্রয়োজন। পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছে কিংবা তদন্তে বাধা দিয়েছে—এমন অভিযোগও পরীক্ষা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারণ করতে হবে।

জনআস্থা পুনরুদ্ধারে পুলিশের পেশাগত নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক যোগাযোগসম্পন্ন সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা যেন শাস্তিমূলক বদলি, পদোন্নতি আটকে যাওয়া কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কায় না ভোগেন। নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে দক্ষতা, সততা এবং জনসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি পেশাগত স্বাধীনতার সঙ্গে কার্যকর তদারকিও থাকতে হবে। দুর্নীতি, প্রমাণ সাজানো, বেআইনি বলপ্রয়োগ ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য বাস্তব জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ এবং তার অগ্রগতি অনুসরণযোগ্য হতে হবে। হুমকির অভিযোগকারীকে অভিযোগ গ্রহণের স্বীকৃতি, একটি শনাক্তকরণ নম্বর এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তথ্য দিতে হবে। থানা ব্যবস্থা না নিলে কোথায় অভিযোগ করা যাবে, তার সুস্পষ্ট পথ থাকা প্রয়োজন। তাৎক্ষণিক ও বিশ্বাসযোগ্য হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। নাগরিক যে পর্যায়ে সরাসরি রাষ্ট্রের মুখোমুখি হন, সেখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা দৃশ্যমান হওয়া দরকার।

সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তাও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। প্রতিশোধের ভয়, বারবার হাজিরার কারণে আয়হানি কিংবা মামলা প্রত্যাহারের চাপ অনেক তদন্ত ও বিচারকে দুর্বল করে দেয়। সংবেদনশীল তথ্যের গোপনীয়তা, আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা এবং ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নিরাপত্তা সাক্ষীদের অংশগ্রহণ সহজ করতে পারে। সহায়তা শুধু পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; আহত শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী, দোকানি ও পথচারীর কাছেও তা পৌঁছাতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের সাংগঠনিক আচরণের দায় নিতে হবে। হামলা, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি এবং তদন্তে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কার্যকর নির্দেশনা প্রয়োজন। গুরুতর অসদাচরণের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে ন্যায়সংগত অনুসন্ধান চলাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা যেতে পারে। দলীয় শাস্তি এবং ফৌজদারি বিচার ভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণ করে; একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব যেন সংবাদপত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক সভাকে হুমকি দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি না করে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সমালোচনা ও ভয়ভীতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। জনপরিচিত ব্যক্তিরা অভিযোগের জবাব দিতে পারেন, ভুল সংবাদ চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, সংশোধন চাইতে পারেন এবং উপযুক্ত আইনগত প্রতিকার গ্রহণ করতে পারেন। নাগরিকেরও জুলাইয়ের নেতা, বিরোধী রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তার সমালোচনার অধিকার আছে। অন্যদিকে শারীরিক ক্ষতির হুমকি, অনুসরণ করে হয়রানি, আক্রমণের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং সহিংসতায় উসকানি মানুষের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে। এই পার্থক্য অনুসরণ করেই কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিরাপত্তাহীনতার জবাবে নির্বিচার গ্রেপ্তার, ঢালাও অভিযোগ কিংবা শান্তিপূর্ণ বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে। এতে নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, মামলা দুর্বল হতে পারে এবং পুরোনো নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কার্যকর জননিরাপত্তা নির্ভর করে সঠিক গোয়েন্দা তথ্য, দক্ষ তদন্ত, আইনসম্মত ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পুলিশি ব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচারের ওপর। মানুষ কতটা নিরাপদ হচ্ছে এবং তদন্ত আদালতের পরীক্ষায় কতটা টিকছে—এসব দিয়েই সাফল্য বিচার করা উচিত।

সুশাসনের জন্য এমন প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন, যার মাধ্যমে সমালোচনা সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। জননিরাপত্তায় গুরুতর ব্যর্থতা নিয়ে সংসদীয় কমিটিগুলোর অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। বিরোধী প্রতিনিধিদের সরকারি নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কার্যকর সুযোগ থাকতে হবে। স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ এবং অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন ও সাংবাদিকেরা যেন কোনো ব্যর্থতা তুলে ধরার কারণে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না হন।

বাস্তব পদক্ষেপ এখনই শুরু করা সম্ভব। প্রথম এক মাসে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও হুমকির মুখে থাকা সমালোচকদের ওপর অনিষ্পন্ন হামলার অভিযোগ পর্যালোচনা, জরুরি নিরাপত্তার প্রয়োজন চিহ্নিত করা এবং প্রতিটি মামলার অগ্রগতি অনুসরণের দায়িত্ব নির্ধারণ করা যেতে পারে। পরবর্তী তিন মাসে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রদান, অভিযোগ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সংবাদমাধ্যম ও ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়ে পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। দীর্ঘ মেয়াদে পুলিশের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনার সক্ষমতা, বিচারিক বিলম্ব এবং স্বাধীন তদারকির সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করতে হবে।

এসব অঙ্গীকারের ফল পরিমাপযোগ্য হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ গ্রহণে কত সময় লাগছে, কতটি ঘটনায় কার্যকর তদন্ত হচ্ছে, ভুক্তভোগীরা কী সহায়তা পাচ্ছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ফল কী—এসব প্রাসঙ্গিক সূচক। শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে ন্যায়বিচারের মান বোঝা যায় না। প্রকাশিত তথ্যেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ বিবেচনার নীতি রক্ষা করতে হবে।

সরকারের সামনে রাজনৈতিক আচরণের উন্নত মান প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া হবে, অভিযোগের পর তদন্ত হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেবে না—এটি কাজের মাধ্যমে দেখাতে হবে। সমর্থক, বিরোধী এবং কোনো রাজনৈতিক শিবিরে যুক্ত নন এমন নাগরিক—সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন।

জুলাইয়ের আত্মত্যাগের স্থায়ী মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে কথা বলবেন এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ন্যায়বিচার চাইতে পারবেন। একজন হুমকির মুখে থাকা সংগঠক, আহত দোকানি, সংবাদপত্রকর্মী কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতেও সেই দায়িত্ব ধারাবাহিকভাবে পালন করার মধ্য দিয়েই সরকার মানুষের স্থায়ী আস্থা অর্জন করতে পারে।

hrmrokan@hotmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...