একসময় যারা একসঙ্গে হাত মিলিয়ে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই সৌদি আরব আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। গত ডিসেম্বর মাসে ইয়েমেনে যা ঘটেছে, তা দেখে মনে হচ্ছে আপাতত এই দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের যে সুতোটা ছিল, সেটা ছিঁড়ে গেছে।
২০১৫ সালে সৌদি আর ইউএই একসঙ্গে ইয়েমেনে জোট বানিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তখন মনে হয়েছিল, দুই ভাইয়ের মতো এই দুই দেশ আর কখনো আলাদা হবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়। সৌদি চায় ইয়েমেন একটা একীভূত দেশ হয়ে থাকুক, কারণ তাদের সীমান্ত নিরাপদ রাখতে হবে। আর ইউএই দক্ষিণ ইয়েমেনে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়, লোহিত সাগরে বন্দর নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এজন্যই তারা ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসি নামের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপকে সমর্থন দিয়ে আসছে।
গত ডিসেম্বরের শুরুতে এসটিসি হঠাৎ করে বড় অভিযান চালায়। তারা তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত আর ওমান সীমান্তের আল-মাহরা প্রদেশ দখল করে নেয়, যা সৌদি আরবের জন্য সরাসরি হুমকি! রিয়াদের চোখে এটা লাল লাইন অতিক্রম করা। হাদরামাউত সৌদি আরবের সঙ্গে ৬৮৪ কিলোমিটার (৪২৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত শেয়ার করে। এই অঞ্চলে অস্থিরতা বা বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রণ সৌদির ভূখণ্ডে সরাসরি ছড়িয়ে পড়তে পারে—যেমন স্মাগলিং, সন্ত্রাসবাদ বা সশস্ত্র গ্রুপের অনুপ্রবেশ। সৌদি সরকার বারবার বলেছে, এটা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
তারপর ৩০ ডিসেম্বর মুকাল্লা বন্দরে সৌদি জোটের বিমান হামলা করে ইউএই থেকে আসা অস্ত্রের চালান নষ্ট করে দেয়। সৌদি বলছে, ইউএই এসটিসিকে চাপ দিয়ে সীমান্তের দিকে ঠেলছে। আর ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ইউএইয়ের সেনাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
ইউএই অবশ্য সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছে, চালানটা তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের জন্য সৌদির সঙ্গে সমন্বয় করেই পাঠানো হয়েছে। আর তারা স্বেচ্ছায় সেনা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, যা আসলে সত্য বলে মনে হয় না।
এই দুই দেশের মধ্যে ওপেক প্লাসে তেল উৎপাদনের কোটা নিয়ে ২০২১ সালে ঝগড়া হয়েছে! সুদানের যুদ্ধে দুই দেশের সমর্থন আলাদা পক্ষে। ইসরাইলের সঙ্গে ইউএই আব্রাহাম চুক্তি করেছে, কিন্তু সৌদি এখনো স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের কথা বলে পিছিয়ে আছে। সৌদি আরব সুদানের সরকারি সেনাবাহিনীকে (এসএএফ) সমর্থন দিচ্ছে, যেখানে ইউএই প্যারামিলিটারি র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) অস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য দেয়। অর্থনৈতিকভাবে রিয়াদের ‘ভিশন ২০৩০’ দুবাইয়ের হাব স্ট্যাটাসকে চ্যালেঞ্জ করছে। মোহাম্মদ বিন সালমান আর মোহাম্মদ বিন জায়েদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বর্তমানে ঠান্ডা হয়ে গেছে। একসময় কাতার অবরোধে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল, এখন স্বার্থের টানাপোড়েনে দূরে সরে গেছে।
এই অবনতি শুধু সাময়িক নয়। ইউএই সেনা সরিয়ে নিলেও দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি থেকে যাবে। এতে ওপেকের ঐক্য নড়বড়ে হতে পারে, উপসাগরের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার এই দুই দেশের মাঝে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের বিষয় ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। ১০ বছরের যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে, কোটি কোটি মানুষ খাদ্যাভাবে ভুগছে। এখন এই মিত্রদের ঝগড়া যুদ্ধকে আরো লম্বা করে তুলছে। দক্ষিণে বিচ্ছিন্নতা বাড়লে উত্তরের হুথিরা আরো শক্তিশালী হবে।
ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা মূলত উত্তরাঞ্চল সানা, সা’দা, হুদাইদা প্রভৃতি। হুথিরা এখনো উত্তর ইয়েমেনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে দেশের জনসংখ্যার ৬০-৬৫ শতাংশ বাস করে। তারা রাজধানী সানা ও উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে। দক্ষিণের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ (সৌদি-সমর্থিত সরকারি ফোর্স ভার্সাস ইউএই-সমর্থিত এসটিসি) হুথিদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে তাদের শত্রুরা (অ্যান্টি-হুথি কোয়ালিশন) বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা হুথিদের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করছে।
দক্ষিণের বিভেদ হুথিদের সুবিধা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসটিসি’র অগ্রগতি এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি এয়ারস্ট্রাইকের পর কোয়ালিশনে ফাটল ধরেছে। এতে হুথিরা ‘নীরব বিজয়ী’ হয়ে উঠছে। তারা শান্তভাবে দেখছে, কীভাবে তাদের শত্রুরা নিজেদের মধ্যে লড়ছে। কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, দক্ষিণের অস্থিরতা হুথিদের শাবওয়া বা অন্যান্য এলাকায় অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
হুথি এলাকায় বড় কোনো সামরিক অভিযান বা আক্রমণের খবর নেই। সৌদি-হুথি শান্তি আলোচনা চলছে এবং ২০২২-এর ট্রুস (যুদ্ধবিরতি) এখনো মোটামুটি ধরে আছে। হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি সম্প্রতি হুমকি দিয়ে বলেছেন, সোমালিল্যান্ডে ইসরাইলের উপস্থিতি থাকলে তা ‘সামরিক টার্গেট’ হিসেবে বিবেচিত হবে। ২৬ ডিসেম্বর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেন। এটি বিশ্বের প্রথম কোনো জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, যা সোমালিল্যান্ডের ১৯৯১ সালের স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ (২০২৫ ডিসেম্বর শেষে আল জাজিরায় সাক্ষাৎকারে) দাবি করেন, ইসরাইলের স্বীকৃতির বিনিময়ে সোমালিল্যান্ড তিনটি শর্ত মেনেছে—১. গাজা থেকে ফিলিস্তিনি শরণার্থী গ্রহণ করা; ২. গাল্ফ অব অ্যাডেনে ইসরাইলি মিলিটারি বেস স্থাপন; এবং ৩. আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়া।
তিনি এটাকে ‘গাজার সমস্যা আফ্রিকায় রপ্তানি’ বলে সমালোচনা করেন; যদিও ১ জানুয়ারি সোমালিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
স্বীকার করুক আর না করুক, ডাল মে কালো কিছুর ইঙ্গিত তো অবশ্যই পাওয়া যাচ্ছে, না হলে হুথিরা কেন সোমালিল্যান্ডকে সামরিক টার্গেট ঘোষণা করল?
এদিকে ইসরাইল আন্তর্জাতিক ফোর্সে (আইএফ) তুরস্কের অবস্থান কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না, আর তুরস্ক আইএফে নিজেদের সেনা মোতায়েনের চাপ আর জেদ ধরে রেখেছে। আমিও মনে করি, আইএফে তুর্কি সেনাদের অবস্থান গাজায় ফিলিস্তিনিদের কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে।
বছরের পর বছর পার হয়ে যায়, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কনফ্লিক্টগুলো আর শেষ হয় না। নতুন পালে নতুন হাওয়া যেন এই অঞ্চলকে আরো বহুমুখী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
লেখক : প্রকৌশলী, ডিফেন্স অ্যানালিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


মাহদী হাসানকে জামিন দিয়েছে আদালত
খালেদা জিয়া-উত্তর বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের বার্তা