আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নেকাব বিতর্ক ও একটি পর্যালোচনা

এলাহী নেওয়াজ খান

নেকাব বিতর্ক ও একটি পর্যালোচনা

হঠাৎ রাজনীতিতে নেকাব নিয়ে বেশ বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপি নেতা মোশাররফ হোসেন ঠাকুর এক টিভি টকশোতে নেকাব নিয়ে এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যা তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ইহুদি নারীরা যখন বেশ্যাবৃত্তি করত অথবা যখন কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম করত, তখন নেকাব পরত। হিজাব মুসলমানদের ড্রেস বাট নেকাব মুসলমানের ড্রেসই না।’ স্বাভাবিকভাবেই এটা নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কারণ এটা মুসলিম নারীদের পর্দার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ইবাদতের অংশ। শুধু তাই নয়, অন্য ধর্মের নারীদের সম্পর্কেও ঢালাওভাবে এ ধরনের মন্তব্য করাকেও ইসলাম অনুমতি দেয় না।

বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিগতভাবে আমি মোশারফ হোসেন ঠাকুরকে খুব ভালোভাবে চিনি। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আছে। হয়তো মাঝে অনেক দিন দেখা-সাক্ষাৎ নেই। কিন্তু যতটুকু তাকে চিনি এবং জানি তাতে তার মুখ থেকে ওই ধরনের মন্তব্য বের হওয়ায় আমি অবাক হয়েছি। তিনি কেন এবং কী উদ্দেশ্যে এ ধরনের নির্বিচার মন্তব্য করেছেন, তা আমি বুঝে উঠতে পারছি না। তবে এমন হতে পারে, ইসলামে পর্দার গুরুত্ব সম্পর্কে তার ধারণাগত বিভ্রান্তি থাকতে পারে। এছাড়া কোনো ধর্মেরই কোনো নারীকে কটুবাক্য দিয়ে আঘাত করা উচিত নয়। এমনকি কোনো গণিকাকেও নয়। কারণ আল্লাহ হেদায়েতের মালিক, তিনি একজন গণিকাকেও হেদায়েত দিয়ে উচ্চতর মুসলিমে পরিণত করতে পারেন।

এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, কোনো একজন অপরাধী যদি পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য বোরকা পরে পালিয়ে যায়; তাহলে কি আমরা বলব অপরাধীরাই বোরকা পরে থাকে। এই তো সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল যে মেয়েটি, সে বোরকা পরে বাসায় ঢুকেছিল আর পালিয়েছিল নিহত মেয়েটির স্কুল ড্রেস পরে। মেয়েটির এই বোরকা পরার কারণে কি আমরা বলব খুনিরা হিজাব পরে। বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়িকারা অনেক সময় জনসম্মুখে আসে বোরকা পরে। তাহলে কি আমরা বলব বোরকা চলচ্চিত্র নায়িকাদের পোশাক? সুতরাং সংবিধানশীল বিষয় নিয়ে কথা বলতে হলে সবারই সতর্ক থাকা উচিত।

যা হোক, এখানে আমাদের উদ্দেশ্য মোশাররফ হোসেন ঠাকুরকে সমালোচনা বা নিন্দা করা নয়। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সত্যটা জেনে নিজেদের সংশোধন করে নেওয়া। নেকাব, হিজাব, বোরকাÑএগুলো সবই মুসলিম নারীদের পর্দার এক একটা পদ্ধতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম নারীরা এভাবে আল্লাহতায়ালার বিধান অনুযায়ী পর্দা করে আসছেন। তবে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয়। যেমন : হিজাবে মাথা এবং ঘাড় আবৃত থাকে, মুখ থাকে খোলা আর নেকাবে চোখ ছাড়া মুখমণ্ডল ও সারা শরীর ঢাকা থাকে। আর বোরকায় মাথা, চোখ, মুখসহ পুরো শরীর আবৃত থাকে। তবে বোরকায় মুখমণ্ডলের উপর ঝোলানো কাপড়টি জালের মতো থাকে, যা দিয়ে পরিধানকারী সামনের দিকে দেখতে পায়। আফগানিস্তানের নারীদের এ ধরনের বোরকা পরতে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশেও অনেকে পরেন। যদিও এ ধরনের পর্দার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে অনেক আধুনিক পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে।

এদিকে ওই তিন ধরনের পর্দা, অর্থাৎ নেকাব, হিজাব আরবি শব্দ এবং বোরকাও এসেছে আরবি শব্দ থেকে। আরবি নেকাব শব্দের অর্থ হচ্ছে, পর্দা, আড়াল, আবরণ ইত্যাদি। এটা ইসলামের শুরুতেই পর্দার জন্য নারীরা পরতেন। যদিও প্রাক-ইসলামিক যুগেও অভিজাত শ্রেণির নারীদের এটা পরিধানের প্রচলন ছিল।

অন্যদিকে আরবি হিজাব শব্দের অর্থও পর্দা, আড়াল, আবরণ ও ঢেকে রাখা। অর্থাৎ ইসলামে যে সম্ভ্রম ও শালীনতার কথা বলা হয়েছে, তা এ ধরনের পরিচ্ছদের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।

আর বোরকা মূলত আরবি ‘বুরকু’ শব্দ থেকে এসেছে। এটার অর্থও পর্দা কিংবা ঢেকে রাখা। বিভিন্ন দেশে এটা বিভিন্ন নামে পরিচিত। আফগানিস্তানে এটাকে বলা হয় চাদরি, পশতু ভাষায় চাদর। বাংলাদেশে বোরকা হিসেবে পরিচিত। সুতরাং নেকাব নিয়ে ভিন্ন কোনো মন্তব্য দিয়ে এর মহৎ উদ্দেশ্য ছোট করার কোনো সুযোগ নেই।

যাহোক, বিষয়টি হচ্ছে : ইসলামে আখলাকের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছেÑযার মধ্যে রয়েছে সম্ভ্রম, বিনয় ও শালীনতা। তাই আল্লাহতায়ালা পর্দা করার যে বিধিবিধান দিয়েছেন, তা মেনে চলা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। কোরআন ও হাদিসে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। কোরআন ও হাদিসবিশারদরা উল্লেখ করেছেন, কোরআনুল কারিমের সাতটি আয়াতে এবং ৭০টির মতো হাদিসে পর্দা সম্পর্কে বিধৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবার জানার উচিত, ইসলামে পর্দা শুধু নারীর জন্য বাধ্যবাধকতা নয়, পুরুষের জন্য সমভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের সমাজে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে, পর্দা শুধু নারীর জন্য নির্দিষ্ট। বরং বলা যায়, নারীদের আগেই পুরুষের জন্য পর্দার আদেশ এসেছে। সুতরাং নারী-পুরুষ উভয়ের ওপরই আল্লাহতায়ালা পর্দার বিধান দিয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পুরুষদের চোখ নত বা সংযত রাখা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে নারীদের ক্ষেত্রে চোখ সংযত ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের পাশাপাশি শারীরিক সৌন্দর্য ঢেকে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা সুরা নুরের মধ্যে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। তিনি (আল্লাহ) বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। (সুরা নুর : আয়াত ৩০)। এ ক্ষেত্রে প্রথমে পুরুষদের পর্দার নির্দেশ আগে এসেছে।‌

পরে সুরা নুরের ৩১ নম্বর আয়াতে নারীর পর্দার নির্দেশ এসেছে। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য যেন প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের উড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, শ্বশুর, নিজেদের ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীরা, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌন কামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনরা তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নুর : আয়াত ৩১)

এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহুতায়ালা সুরা নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে পুরুষদের, আর ৩১ নম্বর আয়াতে নারীদের পর্দার যে নির্দেশ দিয়েছেন তাতে দুই আয়াতের মিলও রয়েছে এবং পার্থক্যও রয়েছে। মিলটা হচ্ছেÑআল্লাহতায়ালা নারী ও পুরুষ উভয়েরই চোখ সংযত ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের কথা বলেছেন। আর অমিল হচ্ছে, নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা। তবে দৃষ্টিই সব ক্ষতির কারণ, সে কারণে নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি নত কিংবা সংযত রাখার নির্দেশ এসেছে। যেমনটা রাসুলপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম হজরত আলি (রা.)-কে বললেন, ‘হে আলি (কোন নারীর দিকে) দুবার তাকাবে না। প্রথমবার বৈধ হলেও দ্বিতীয়বার বৈধ নয়।’ অর্থাৎ প্রথমবার হঠাৎ চোখ পড়ে গেলেও দ্বিতীয়বার তাকানো যাবে না। সাহাবারা এই নির্দেশ মানতেন কঠিনভাবে। একটি ঘটনার উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন তারা কতটা কঠোরভাবে পর্দার বিধান মেনে চলতেন।

ঘটনাটি হচ্ছে এ রকমÑহজরত সালাবা বিন আবদুর রহমান (রা.) নামে একজন সাহাবা, যিনি রাসুলপাক (সা.)-এর খেদমত করতেন। একদিন নবী (সা.) তাকে কোনো একটা কাজে পাঠান। পথে চলতে চলতে গোসলরত একজন আনসারী মহিলার প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে যায়। আর এতটুকু অপরাধের জন্য তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি আশঙ্কা করেন, তার এই অপরাধ সম্পর্কে নবীজি ওহি মারফত অবগত হয়ে যাবেন। তাই তিনি সেখান থেকে পলায়ন করে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী একটি পাহাড়ে গিয়ে আত্মগোপন করেন। এভাবে তিনি ৪০ দিন সেখানে আত্মগোপন করে থাকেন এবং নবীজির দরবারে ছিলেন অনুপস্থিত। এ অবস্থায় হজরত জিবরাইল (আ.) নবীজির কাছে এসে বললেন, আপনাকে আল্লাহর সালাম। একটি সংবাদ দিতে আমি প্রেরিত হয়েছি। আপনার এক উম্মত দীর্ঘদিন ওই পাহাড়ে অবস্থান করে আল্লাহর ক্ষমাপ্রার্থনা করছে।

এই কাহিনিটি বেশ দীর্ঘ, তিনি সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করেছেন। এরপর নবী (সা.) তাকে নিয়ে আসার জন্য হজরত ওমর ও হজরত সালমান (রা.)-কে ওই পাহাড়ে পাঠান। তারা তারা তাকে নবীজির দরবারে নিয়ে এলে সেখানে তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। নবীজি তাকে ঝাঁকি দিলে তার হুঁশ ফিরে আসে এবং তাকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাড়িতে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। নবী (সা.) তাকে দেখতে যান এবং শিয়রে বসে তার মাথা কোলে তুলে নিলে তিনি তা সরিয়ে নেন। কেন সরিয়ে নিলে নবীজি জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বললেন, এই মাথা পাপে পূর্ণ। তখন নবীজি (সা.) বললেন, তোমার কি কষ্ট হচ্ছে? সালাবা বললেন, আমার গোশত ও চামড়ার মধ্যে কেমন যেন পিঁপড়া দৌড়াদৌড়ি করছে। এবার নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার একান্ত ইচ্ছা কী? তিনি বললেন, আল্লাহ থেকে ক্ষমার সুসংবাদ লাভ। একটু পরে হজরত জিবরাইল আলাইহি সালাম অবতরণ করে নবীজি (সা.)-কে বললেন, আল্লাহ আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, যদি আমার কোনো বান্দা জমিন ভরা গুনাহ নিয়ে আসে, তাহলে আমি জমিন ভরা ক্ষমা দ্বারা তাকে ধন্য করব। ওহি মারফত এই সুসংবাদ পেয়ে নবীজি (সা.) সালাবাকে তা জানিয়ে দেন। এটা শুনে সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে খুব জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং এই চিৎকারের মধ্য দিয়ে তার ইন্তেকাল ঘটে যায়। আল্লামা ইবনে কুদামা মুকাদ্দেসি (র.)-এর ‘তওবার বিস্ময়কর ঘটনা’ গ্রন্থ থেকে এই অংশটা নেওয়া হয়েছে।

সে একটা যুগ ছিল, তখন সাহাবারা আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর বিধান অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। তাদের মধ্যে সামান্যতম গাফিলতি দেখা যেত না। একজন গোসলরত নারীর ওপর অনিচ্ছাকৃত একবার দৃষ্টি পড়ার কারণে হজরত সালাবা (রা.)-এর গুনাহের ভীতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পর্দার ব্যাপারে আমরা কতটা উদাসীন। তবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমানরা পর্দার ব্যাপারে আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছেন।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, এমন একটা সময় ছিল পশ্চিমা বিশ্ব তো দূরের কথা অনেক মুসলিম দেশেই হিজাব বা বোরকা পরা নিষিদ্ধ ছিল। যেমন : ইরান, আফগানিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মতো মুসলিম দেশে। যেমন : চরম ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণকারী তুরস্কের শাসক মোস্তফা কামাল পাশা পর্দা প্রথাসহ ইসলামের অনেক অবশ্যমান্য ফরজ ইবাদত নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ খালিদ বেগ তার ‘ফার্স্ট থিংস ফার্স্ট’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘যখন তুরস্কের নারীরা ভোটাধিকার লাভ করল, তখন এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, হিজাব ব্যবহারকারী কোনো নারী ভোট দিতে পারবে না।’ এই সিদ্ধান্তের জন্য পশ্চিমারা কামাল পাশাকে মহানায়ক হিসেবে অভিনন্দিত করেছিল।

অন্যদিকে একইভাবে ইরানের শাহেনশা রেজা শাহ পাহলভী ১৯৩৬ সালের ৮ জানুয়ারিকে ‘নারী মুক্তি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র পর্দা বর্জন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এমন অবস্থায় যা করা হয়েছিল, তা রীতিমতো নিগ্রহ ও নির্যাতনের শামিল ছিল। তখন ঘোষণা করা হয়েছিল, পর্দা ব্যবহারকারী কোনো নারী সরকারি কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবে না, কোনো সরকারি যানবাহনে উঠতে পারবে না।

ওই গ্রন্থে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৩৫ সালের বসন্তকালে ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্দা বর্জনকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করে, যে ঘোষণায় পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয় যে, হিজাব পরিহিত কোনো মেয়ে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পুরস্কার বা ডিপ্লোমা গ্রহণ করতে পারবে না। অন্যদিকে ১৯৬০ সালের দিকে আফগানিস্তানের বাদশাহ আমানুল্লাহ আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে নিজের স্ত্রী রানী সুরাইয়াকে পর্দাহীন করে তথাকথিত আধুনিক আফগানিস্তানের ধ্বজা তুলে ধরেছিলেন।

এদিকে মিসরের একটি ঘটনা বেশ চমকপ্রদ ছিল। মাদাম শারাভি পাশা নামে নারী আন্দোলনের এক মুসলিম নেত্রী তার ভ্রাতুষ্পুত্রী লা-ইজিপশিয়ান পত্রিকার সম্পাদক সিজা নাবারুয়িকে সঙ্গে নিয়ে ১৯২৩ সালে শুধু এই লক্ষ্য সামনে রেখে পর্দা বর্জন করেন, এতে পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন অধিকার গতি ও মর্যাদা লাভ করবে। এসব ছিল ঔপনিবেশিক শাসনামলের ঘটনাবলি, যা পশ্চিমাদের অভিভূত করত।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ২০০৩ সালে সৌদি আরবের একটি ঘটনা আরো বিস্ময়কর ছিল। কারণ অতিরক্ষণশীল দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবে ওই সময় ব্রিটিশ ও ডাচ দূতাবাস কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত একটি স্কুলে মেয়েদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যেসব মেয়ে হিজাব ব্যবহার করে, স্কুলে প্রবেশের সময় বলপূর্বক তাদের ক্লাস থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত একজন মিসরীয় মেয়ে সাহসিকতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে, ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে ক্লাসে উপস্থিত হতে বাধা দেয়। এ ঘটনা যখন প্রকাশ পায় এবং জনরোষের মুখে সৌদি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে স্কুল কর্তৃপক্ষ এই নিয়মটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।

সৌদি আরব ছাড়া এসব ঘটনার অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনামলে, যখন ঔপনিবেশিক শাসকরা অধীনস্থ মুসলিম দেশগুলোয় পর্দা প্রথাকে আধুনিকতার বাধা হিসেবে দেখত এবং পর্দাপ্রথা বিলুপ্ত করতে তারা উৎসাহিত করত। এখন পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। মুসলিম নারীরা দলে দলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পর্দা প্রথা মানতে শুরু করেছেন। এখন শুধু মুসলিম দেশগুলোয় নয়, পশ্চিমা দেশগুলোয়ও মুসলিম নারীরা অধিকহারে পর্দা প্রথা মেনে চলছেন। আজ বাংলাদেশের শহর, নগর, গ্রামের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, কোনো আদেশ-নিষেধ ছাড়াই নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পর্দা করে চলছেন। আগেকার সেই বাংলাদেশে এ দৃশ্য কখনো চোখে পড়ত না।

সুতরাং, এ সময় নেকাব ইস্যু নিয়ে বিতর্ক উসকে দেওয়ার ঘটনা দুঃখজনক ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। বরং আমরা সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতটি স্মরণ করতে পারি। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই সর্বোত্তম উম্মা, সমগ্র মানবজাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে এবং তোমরা নিজেরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে।’ তাই প্রখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ খালিদ বেগ বলেছেন, ‘সব মুসলমানের জন্য এই কর্তব্যকর্ম বিশেষভাবে নির্ধারিত যে, তারা সমগ্র মানবতার জন্য সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করবে এবং যা সঠিক তারই পক্ষে অবিচল দণ্ডায়মান থাকবে।’

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...