আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফিলিস্তিন এবং নীরবতার রাজনীতি

শামসুল আরেফীন

ফিলিস্তিন এবং নীরবতার রাজনীতি
ছবি: এএফপি

আধুনিক বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞান উৎপাদন ও সম্প্রসারণের কেন্দ্র নয়; এটি সমাজের নৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত। একাডেমিক ক্ষেত্রকে অনেক সময় ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ (public sphere) হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্ন আলোচিত ও বিতর্কিত হয়। যুদ্ধ, দমননীতি বা গণহত্যার মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া শুধু জ্ঞানের ক্ষেত্রকেই নয়, বরং সমাজের নৈতিক এবং রাজনৈতিক অভিমুখকেও প্রভাবিত করে।

বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই এক গভীর নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রশ্ন এই সংকটকে সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রীয় স্তরে যেখানে বহু দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে পশ্চিমা একাডেমি—বিশেষ করে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—নীরবতা, দমননীতি এবং আত্ম-সেন্সরশিপের এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। এই বৈপরীত্য শুধু একটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়; এটি একাডেমির নৈতিক কর্তৃত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফিলিস্তিন প্রশ্নে বৈশ্বিক পরিবর্তন

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার অনেক দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে বৈধতা প্রদান করে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষে সমর্থন ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে, যা বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের ধারণাকে আবার সামনে নিয়ে আসে।

এই প্রক্রিয়া নিছক কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্ষোভ ও নৈতিক সংহতির বহিঃপ্রকাশ। ইসরাইলের দমননীতি, দখলদারিত্ব এবং গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের নতুন ভাষা তৈরি করেছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গেছে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সরকারি পর্যায়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে।

তবে এই বৈশ্বিক নৈতিক সংহতির সমান্তরালে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—যারা নিজেদের মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করে—প্রায়ই নীরব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে একসময় ক্যাম্পাস প্রোটেস্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেখানে আজ ফিলিস্তিনবিষয়ক আন্দোলন অনেকাংশেই স্তিমিত।

মার্কিন ক্যাম্পাস রাজনীতির রূপান্তর

মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘকাল ধরে সামাজিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপার্টহাইডবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন নৃশংসতাবিরোধী আন্দোলন সবসময় ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক চিন্তার হাব হিসেবে রূপ দিয়েছিল।

কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নে এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ইসলামোফোবিয়া এবং প্রো-ইসরাইলি নীতি প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ফিলিস্তিন সংহতির আন্দোলনকে প্রায়ই ‘অ্যান্টিসেমিটিজম’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন ভেঙে দিয়েছে, আর্থিক সহায়তা বন্ধ করেছে এবং প্রশাসনিক তদন্ত চালিয়েছে।

ফলে, একসময় যে ক্যাম্পাস প্রোটেস্ট সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করত, তা ক্রমেই স্তিমিত হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়াটিকে আমরা একটি ‘ডিসিপ্লিনারি রেজিম’ (disciplinary regime) হিসেবে বর্ণনা করতে পারি, যেখানে প্রতিবাদী কণ্ঠকে কাঠামোগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফুকোর বায়োপলিটিকসের (biopolitics) দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি শক্তিশালী ক্ষমতার কৌশল, যা শুধু দমন নয়, মানুষের জীবনযাপন, ভয় এবং নীরবতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

সাম্প্রতিক ঘটনা যেমন : ২০২৪ সালে বাইডেন প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বহু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফিলিস্তিন সমর্থক ছাত্রছাত্রীদের ওপর নজরদারি চালিয়েছে, তাদের বক্তব্য সীমিত করেছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করেছে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রিক্যারিটি

এই দমননীতির সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করে। তারা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিন প্রশ্নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও, বাস্তবে তারা প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে অক্ষম।

কারণ হলো ভিসা ও ইমিগ্রেশন নীতি। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন আসার পর একের পর এক এক্সিকিউটিভ অর্ডারে নতুন নতুন ইমিগ্রেশন নীতিমালা গ্রহণ করেছে। যার ফলে সামান্য প্রতিবাদের কারণে শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল হচ্ছে বা ভবিষ্যতে ও হতে পারে। তাছাড়া ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই প্রিক্যারিটি (precarity) তাদের আত্ম-সেন্সরশিপে বাধ্য করে। ফলে ক্যাম্পাসে একটি ‘নীরবতার সংস্কৃতি’ (culture of silence) গড়ে উঠছে। এই নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত ভয়ের ফল নয়; এটি রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বৈশ্বিক রাজনীতির পারস্পরিক কাঠামোগত প্রক্রিয়ার দ্বারা আরোপিত।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিরাপত্তা, ভিসা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিরাপত্তার কারণে ফিলিস্তিন সমর্থন নিয়ে ক্যাম্পাসে সরাসরি কথা বলতে পারছে না। ফলে নৈতিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা কমে যাচ্ছে, যা একাডেমিক সংস্কৃতিকে সংকুচিত করছে।

একাডেমি ইন ক্রাইসিস

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের ‘ফ্রি স্পিচ’ এবং ‘ডেমোক্রেটিক ডিবেট’-এর কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান প্রমাণ করে, একাডেমি জ্ঞান উৎপাদন করলেও তার নৈতিক দায় থেকে সরে আসছে। একে একাডেমিক ক্রাইসিস (academic crisis) বলা যায়। প্রতিদিন গণহত্যা, শিশুহত্যা এবং হাসপাতাল ধ্বংসের চিত্র বিশ্বমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে; অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানাতে সাহস করছে না। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলোÑ

১. অর্থনৈতিকনির্ভরতা—করপোরেট ফান্ডিং এবং প্রো-ইসরাইলি লবির প্রভাব।
২. রাষ্ট্রীয় রাজনীতি—পশ্চিমা রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার প্রয়োজন।
৩. সামাজিক ভীতি—ইসরাইলের সমালোচককে সহজেই ‘অ্যান্টিসেমিটিক’ আখ্যা দেওয়া, যা একাডেমিক ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একটি সুসংগঠিত ‘নীরবতার রাজনীতি’ (politics of silence) তৈরি হয়েছে। নৈতিক অবস্থান চাপা পড়ে এবং একাডেমি তার সমালোচনামূলক ক্ষমতা হারাচ্ছে।

প্রতিরোধ ও বিকল্প পরিসর

তবু সব বিশ্ববিদ্যালয় একেবারেই নীরব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট মুভমেন্টে নেতৃত্ব দিয়ে এই আন্দোলনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সফল করেছেন। এই মুভমেন্টে ও শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার দাবিকে তুলে আনতে ভুলে যাননি। আমেরিকার অনেক জায়গায় ছাত্রছাত্রীরা এখনো ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্দোলন সংগঠিত করছে। বিশেষ করে ডিভেস্টমেন্ট মুভমেন্ট, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইসরাইল-সংযুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবে দেখা যায়।

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলন তুলনামূলক বেশি সক্রিয়। এগুলো একটি কাউন্টার-পাবলিক স্পেস (counter-public space) তৈরি করে, যেখানে বিকল্প বয়ান এবং নৈতিক অবস্থান গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পাকিস্তানের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উপেক্ষা করে ফিলিস্তিন সমর্থনমূলক সমাবেশ করেছে।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, একাডেমিক সংকট সর্বত্র এক রকম নয়; বরং এটি আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনৈতিকনির্ভরতা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে ভিন্ন রূপ ধারণ করে।

একাডেমির নৈতিক দায়িত্ব

ফিলিস্তিন প্রশ্ন একাডেমিকে মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেÑবিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নাকি এটি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে নৈতিক অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্র?

যদি একাডেমি শুধু বাজারমুখী জ্ঞান উৎপাদনে সীমিত থাকে, তবে এটি নিছক প্রশাসনিক যন্ত্রে পরিণত হবে। কিন্তু যদি এটি সত্যকে সত্য বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে একাডেমি প্রকৃত অর্থে সামাজিক পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আজ যখন বহু রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরবতা শুধু কাপুরুষতা নয়, বরং জ্ঞানের মর্যাদার অবমূল্যায়নও বটে।

ফিলিস্তিন প্রশ্ন কোনো আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি মানবতার প্রশ্ন, জ্ঞানের প্রশ্ন এবং একাডেমির প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যখন ভিসা হারানোর ভয়ে নীরব থাকতে বাধ্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন রাজনৈতিক চাপের কারণে অবস্থান এড়িয়ে চলে, তখন স্পষ্ট হয়—একাডেমি গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

এ সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো : সাহসী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান, যারা সত্যকে উচ্চারণ করবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। অন্যথায় একাডেমি তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারাবে, জ্ঞান হয়ে উঠবে নিছক বাজারপণ্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হবে প্রশাসনিক যন্ত্রে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে একাডেমির অবস্থান ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে—এটি কি ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি নীরবতার রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে একাডেমির সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল : arefin_rehan@yahoo.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন