সীমানায় শত্রু এবং আমাদের প্রস্তুতি

কাকন রেজা

সীমানায় শত্রু এবং আমাদের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত

ভারতশাসিত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে এটা বোঝা যাচ্ছিল, যেহেতু বিপুলসংখ্যক ভোটারকে তালিকাচ্যুত করা হয়েছিল। এনআরসি আরোপের চেষ্টায় মুসলমানদের ভোট থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাদের বাংলাদেশি হিসেবে আখ্যা দিয়ে সেই অপকর্ম করা হয়েছে। ৩০ লাখ মানুষ শুধু এ কারণেই ভোটাধিকার হারিয়েছেন। সর্বমোট বাদ পড়েছে ৯২ লাখ। এসব যে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পূর্বপ্রস্তুতি, তা কোনো কষ্টসাধ্য ধারণা ছিল না। অঙ্কটা জটিল হলেও ফলাফল খুব সহজ ছিল এবং তা নির্বাচনেই প্রমাণিত হয়েছে।

গতবারের নির্বাচনেই রামপন্থি বিজেপির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বামেদের বৃহৎ অংশের একটা অঘোষিত ঐক্য গড়ে উঠেছিল। এবার সেই ঐক্যের পূর্ণতাই মূলত বিজেপির বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। হয়তো বামেরা চতুর বলেই বিজেপির ক্ষমতায় আসার পরিকল্পনা আগেভাগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল এবং সে কারণেই তারা বিজেপির সঙ্গে অঘোষিত ঐক্য গড়ে তুলেছিল।

বিজ্ঞাপন

পাক-ভারত উপমহাদেশে বামেরা বরাবরই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করে চলেছে। তারা মধ্যপন্থার চেয়ে চরমপন্থার প্রতিই বরাবর উৎসাহিত ছিল, যদিও তাদের মুখের কথা ছিল তাদের চিন্তার বিপরীত। মুখে তারা মানুষের পক্ষে থাকার কথা বললেও সবসময়ই তাদের অবস্থান ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের বামেদের ক্ষেত্রে তাকালেও তা বোঝা যায়। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে ‘রাম’ আর ‘বাম’-এর পার্থক্য ছিল একটা ফোঁটা বা বিন্দুকেন্দ্রিক। ‘ব’-এর নিচে ফোঁটা বা বিন্দু দিলেই ‘র’ হয়ে যায়। এবার তা-ই হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ফোঁটার পার্থক্যটা ঘুচে গেছে।

পশ্চিমবঙ্গে ফোঁটার পার্থক্য ঘুচে যাওয়ার অনেক আগেই আমাদের বামেদের বৃহৎ অংশের সঙ্গে অঘোষিত রামপন্থিদের পার্থক্য ঘুচে গেছে। যদিও জুলাই বিপ্লবের কারণে তাদের ঐক্য ব্যাকফুটে ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ঘুচে যাওয়ার ফলে নেতিয়ে পড়া বাম ও রামেদের পরগাছা জোটের গোড়ায় পুনর্বার জলসিঞ্চন হবে। তারা আবার সোজা হয়ে অর্থাৎ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, যেটা চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং বাংলাদেশের রাম-বামেদের অঘোষিত জোট সক্রিয় হওয়ার সম্ভাব্যতায় আমাদের রাজনীতি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে। অস্থিতিশীল হতে পারে দেশ। বিশেষ করে ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে।

কীভাবে হতে পারে তার একটু ব্যাখ্যা দিই। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ-প্রধান শুভেন্দু অধিকারী পরিষ্কার করেই বলেছেন, মুসলমানরা ভোট দিয়েছে তৃণমূলকে আর হিন্দুরা বিজেপিকে। অর্থাৎ শুভেন্দু ধর্মীয় বিভাজনকে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এমনিতেই এনআরসির খড়্‌গমূলে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা। তার ওপর তাদের তৃণমূল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে মুসলমানরা ধর্মীয়ভাবে তো হচ্ছেই, এবার রাজনৈতিকভাবেও অত্যাচারিত হবে। তৃণমূল ভোটের স্বার্থে হলেও মুসলমানদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। ফলে রাজনৈতিক অত্যাচারের বাইরে ছিল পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা। এবার তারা ধর্মের পাশাপাশি রাজনৈতিক অত্যাচারের মুখেও পড়বে। আর এর ধকল সইতে হবে বাংলাদেশকেও। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান নির্যাতনের ঢেউয়ে বাংলাদেশেও ধর্মীয় অশান্তি সৃষ্টি হবে। এছাড়া সম্ভাবনা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীবিষয়ক সমস্যারও।

ভারতের রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিজেপি জেতার পর সেখানে বিরোধীদের ওপর, বিশেষ করে যেখানে মুসলিম ভোটার রয়েছে, তাদের ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার হয়েছে। আসাম ও উত্তর প্রদেশে যা ঘটেছে, সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গেও তা-ই ঘটবে। ধর্ম ও রাজনীতির মিশেলে মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চলবে। এছাড়া মুসলমানদের বাংলাদেশি বলা বিজেপির বরাবরের প্রবণতা। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশে মুসলিম শরণার্থীর বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া হবে চরম বোকামো। অবশ্য আমরা বোকামো করতে ভালোবাসি, না হলে চব্বিশের রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লবের দু’বছর না হতেই আমাদের মধ্যে জুলাই প্রশ্নে এতটা বিভেদের সৃষ্টি হতো না; সংসদে ঐক্য সৃষ্টির বদলে সংবিধানের কচকচানি শুনতে হতো না।

শুধু ধর্ম বিষয়েই সমস্যা নয়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের ফলে আরো অনেক কিছুই ঘটতে পারে আমাদের রাজনীতিতে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—যে কালচারাল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই শুরু করেছি এবং বলতে গেলে হিন্দুত্ববাদী কালচার স্বাধীন বাংলায় কোণঠাসা প্রায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আসার ফলে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ আবার জেঁকে বসতে পারে। হোলি, দেয়ালি ও সংক্রান্তির মতন ধর্মীয় উৎসবগুলো আবার সর্বজনীন করার অপচেষ্টা শুরু হতে পারে। মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে আবার অমঙ্গলের সূচনা হতে পারে। বাংলা ভাষা আবার সংস্কৃতের আগ্রাসনের শিকার হতে পারে। হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ জেঁকে বসলে আমাদের উপায় থাকবে না; আমাদের ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আমাদের নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতিকে বিসর্জন দিয়ে সেমি-ভারতীয় সাজতে হবে। মূলত সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ দিয়েই সাম্রাজ্যবাদ প্রসারিত হয়, এই সহজ সত্যটা আমাদের বুঝতে হবে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে। সংবিধানবিষয়ক কচকচানির চেয়ে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সাবধান থাকাটা বেশি জরুরি।

সীমান্ত সংঘাত বাড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায়নে। এমনিতেই বিশ্বের বিপজ্জনক সীমান্ত হিসেবে আখ্যায়িত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, যেখানে যুদ্ধ ছাড়া এত বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে পারে। সীমান্ত কদিন পরপরই অস্থির হয়ে উঠতে পারে। সীমান্তের দু’পারের মানুষের মধ্যেও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, নেহরু ডকট্রিন বাস্তবায়নের চেষ্টা চলতে পারে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। নেহরু ডকট্রিন মানে হলো অখণ্ড ভারত। ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময় আমাদের ভূখণ্ডকে হাজার মাইল দূরত্বের পাকিস্তানের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার পেছনে কাজ করেছে এই নেহরু ডকট্রিন। অর্থাৎ এই ভাগ ছিল অখণ্ড ভারত ফিরে পাওয়ার পরিকল্পনার অংশ। বিজেপির উগ্র নেতারা এই চেষ্টার ত্রুটি রাখতে চাইবেন না। সুতরাং এদিক থেকেও আমাদের চরম সতর্ক থাকতে হবে।

কেউ কেউ অবশ্য আশা প্রকাশ করেন যে, বিজেপি বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। তাদের ধারণা বিজেপি বাংলাদেশের বর্তমান শাসকদলকে বিব্রত করার চেষ্টা করবে না। তাদের অশ্রদ্ধা না করেই তাদের অদূরদর্শিতাকে নোটিস করতে চাই। তারা মূলত একধরনের ইউটোপিয়ায় আছেন। বাংলাদেশের ক্ষমতায় আছে বিএনপি। বিএনপির সৃষ্টি সম্পর্কে যারা সম্যক জ্ঞান রাখেন তারা জানেন, বিএনপিকে আস্থায় নেওয়া দিল্লির সাউথ ব্লকের জন্য অসম্ভব একটা বিষয়। শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার উত্তরসূরি হলেন তারেক রহমান। তারেক রহমান নিজে কোনো একক সত্তা নন, তার মধ্যে শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া দৃশ্যমান। এই দৃশ্যমানতা ‘নাই’ করে দেওয়া সম্ভব নয়; তেমনি সম্ভব নয় সাউথ ব্লকের আস্থায় বিশ্বাস রাখা। যারা রাখবেন, তারা নির্ঘাত ঠকবেন।

শেষকথা হলো সীমানায় শত্রু। সুতরাং হাত গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। আমাদের প্রস্তুতি রাখতে হবে সম্ভাব্য বিপদ এড়ানোর; প্রয়োজনে মুখোমুখি হওয়ার। আর এর জন্য ঐক্যের বিকল্প নেই। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব যে ঐক্যের জতুগৃহ, জন্মঘর—সেই ঘরেই আবার ফিরতে হবে সবাইকে। এরও কোনো অন্যথা নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: