ভাগ্যসৈনিক হিসেবে সদরঘাটে লঞ্চ থেকে অথবা মফস্বল থেকে বাসে গুলিস্তানে নেমে মুরব্বির তদবিরে সাংবাদিক বনে যাওয়া সাংবাদিক আমীর খসরু নন। শিক্ষিত, সমাজ বদলের লক্ষ্যাভিসারী, মার্জিত, বুকচাপা আগুনে ভেতরে ভেতরে অস্থির, দৈহিক গড়নে ছোটখাটো একটা মানুষের নাম আমীর খসরু। ওর আবির্ভাব আমাদের সাংবাদিকতায় ওই সময় ‘বিস্ময় বালক’ রূপেই গণ্য হয়েছিল। নানা অসুখে দীর্ঘ সময় ভুগতে ভুগতে গত ১০ অক্টোবর ও চলেই গেল। খসরু এভাবে পরপারের দিকে এগোচ্ছে, রাষ্ট্র বা সমাজ কোনো খোঁজ নেয়নি। অভিমানী খসরুও হয়তো চাননি। যার অকাল! বিদায় একটা ছমছমে অপরাধবোধ আমাদের ছেয়ে আছে।
আশির দশক থেকে তুখোড় রিপোর্টার আমীর খসরু। সংবাদ, ইত্তেফাক, ভয়েস অব আমেরিকা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, হলিডে, যায়যায়দিনসহ অনেক মিডিয়ায় তিনি লিখতেন। শুরু থেকে তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ‘মানবজমিন’-এর স্বনামধন্য প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। ‘সংবাদ’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মরহুম বজলুর রহমানের সহযোগিতায় আমি ওই পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম। লেখালেখিতে সত্যিকার অর্থে নির্ভীক, নির্লোভ, অভাবেও পেশার প্রতি বিশ্বস্ত আমীর খসরু সবার কাছেই জনপ্রিয় ছিল।
রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক রিপোর্টিংয়ে কখনো কখনো বড়ভাইদের ছাড়িয়ে যেত। তার রিপোর্ট নিয়ে প্রেস ক্লাবের সকালের আড্ডা থাকত জম্পেশ। ‘অমুককে ধসিয়ে দিলাম’Ñএ ধরনের বড়াই করত না কখনো। রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে স্নেহ ও বিশ্বাস করতেন। ভারত বিষয়ে খসরুর মূল্যায়নে আস্থা ছিল বেগম জিয়ার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তার মনে উদারতা, সমাজবোধ, রাষ্ট্রকল্যাণ, জাতীয় মুক্তির বিষয়গুলো জমাট বেঁধেছে। পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে বামপন্থার ধ্যান-ধারণা প্রবল থাকে। সে প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর। কিন্তু পিরোজপুরের সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের সংস্কৃতি ও নৈতিকতা থেকে কখনো চ্যুত হয়নি। ভীষণ কৌতুকপ্রিয় ছিল। প্যারিসের শপিং মলের পুরুষ সেকশনে গিয়ে সাইজমতো জামা না পেয়ে বাচ্চাদের সেকশনে প্যান্ট-শার্ট কেনার গল্পটি ও প্রায়ই শোনাত। ওকাব বা ওভারসিজ করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিল। বিদেশি গণমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধিরা অনেক সময় তথ্যসংগ্রাহক হিসেবে স্থানীয় জুনিয়র সাংবাদিকদের কাজে লাগাতেন। খসরু ঠাট্টা করে বলত, ওরা টোকাই সাংবাদিক, ওকাবের টোকাব। আমীর খসরুকে ফ্যাসিবাদী আমলে নিপীড়ন সইতে হয়েছে। ১৫ বছর সে সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পায়নি। মন্ত্রীদের প্রেস কনফারেন্সে ওর প্রশ্ন ছিল চাবুকের মতো। সরকারের ব্যর্থতা বা অপদার্থতা ঘিরে প্রশ্ন করতে করতে একসময় বলে ফেলতÑ ‘ইয়ার্কি নাকি?’
মার্কিন সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ভয়েস অব আমেরিকা’য় কাজ করেও মার্কিন নীতির তীব্র সমালোচক ছিলেন তিনি। এ কথা তিনি লিখতে ভুলেননি যে, ‘২৫০ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছর যুদ্ধ ছাড়া ছিল আমেরিকা।’ ভারত সম্পর্কে আমীর খসরুর পর্যবেক্ষণ ছিল জ্ঞাননির্ভর। ফেসবুকে লিখেছেন, ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক বৈরী সম্পর্কের কারণে দক্ষিণ এশিয়া কখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক জোট হতে পারবে না।
আমীর খসরুর সাম্প্রতিক লেখালেখিতে জুলাই বিপ্লবের প্রতি উদ্বাহু সমর্থন ছিল। এর আগে ১৩ জানুয়ারি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিল এই বলেÑআমাদের মুক্তির লড়াই কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার মধ্য দিয়ে নয়, জনগণের অব্যাহত লড়াই মুক্তি-সংগ্রামের মূল ভিত্তি। আমার দেশ পত্রিকায় মনখুলে লিখতেন। এই জুন মাসেই তার লেখায় বলেছেন, ‘শিশু ধর্ষণ, হামের মহামারি, শত শিশুর মৃত্যু আসলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড।’
খসরুর জীবন পরিক্রমায় একটা প্রশ্নের উত্তর আমরা পাইনি। কেন তিনি জনসমাজ ও মিডিয়া সমাজ থেকে নিজেকে পরোক্ষ করে নিভৃত হয়ে গিয়েছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা না তীব্র অভিমান? ওর ভেতরে প্রতিভা ছিল, প্রতিভার ভেতরে মানুষও ছিল। সোজাসাপ্টা বা সাদামাঠা সাংবাদিকতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও সমাজ বদলের আকুতি তাকে ক্ষান্তি দেয়নি। জগৎ সংসারের বৈষম্য বে-ইনসাফিতে তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। দেশ ও সমাজের জন্য কিছু একটা করার পোকা তাঁর মাথার মধ্যে ছিলই। ইউরোপীয় দার্শনিক রেনেসাঁর অন্যতম অগ্রদূত দেকার্তে বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।’ হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর আগে খসরু ভাবছিলেন, ‘মানুষ জন্মায়, বাঁচেও, চুপ করে থাকতে পারে না আর এটাও নিশ্চিত যে তাকে মরে যেতেই হবে।’ মনে পড়ে চুলে বিলি কাটতে কাটতে আমীর খসরু মাঝেমধ্যে সিরিয়াস সব কথা বলে ফেলত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘এই দুনিয়াটা হচ্ছে খেল-তামাশার জায়গা।’ এই কথার সাহিত্য সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের সেই মন্তব্যে, ‘জীবন এবং জগৎদ্ব্যাপারটাই মায়া, অতএব নির্বাণ অথবা অনস্তিত্বই শেষ, যেখানে ইচ্ছাশক্তির সংরাগ নিভিয়ে দিয়ে একমাত্র প্রজ্ঞানই অবশিষ্ট থাকে।’
বাংলাদেশের সাংবাদিক বহিরঙ্গে দুনিয়া কাঁপিয়ে ফেলুক, কিন্তু অন্তরঙ্গে পরিবারের মধ্যে সে এক ব্যর্থ জীব। টানাটানির সংসার, অতৃপ্তির ঘেরাটোপ থাকবেই। এখন কারো কারো অবস্থা বদলেছে, জীবনের লক্ষ্য ফ্ল্যাট, গাড়িতে স্থির হয়েছে। আমি খসরুর সঙ্গে পিরোজপুরে ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ব্যক্তিত্ববান পিতা ও নরম মনের মা-এর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আজ তারা নেই। ডাকাতদের হাতে মা নৃশংসভাবে খুন হয়েছিলেন। খসরু ভীষণ শকট ছিল।
অভিমান আর শোক তাকে জীর্ণ করে ফেলেছিল। মনে পড়ে যায় ইউরোপীয় বিখ্যাত সাহিত্যিক স্যামুয়েল বেকেটের সেই বচনÑ ‘তোমরা অনায়াসেই ঠাওরে নিতে পার, আমার শৈশব ছিল সুখের... যদিও সুখী হওয়ার জন্য যে মেধাটুকু দরকার, সেটা আমার তেমন ছিল না। সন্তানকে সুখী করার জন্য যা কিছু করা জরুরি, আমার জন্য আমার মা-বাবা সবই করেছিলেন। কিন্তু প্রায়ই আমার একা একা লাগত।’
লেখক: ইকোনমিক টাইমসের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

