চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী আর উত্তরবঙ্গের দুঃখ তিস্তা নদী । তিস্তা নদীপারের মানুষের দুঃখ লাঘবে এই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় তিস্তা মহাপরিকল্পনা। মহাপরিকল্পনার উদ্দেশ্যগুলো হলো বন্যা পরিস্থিতি প্রশমন, ভাঙন হ্রাস ও ভূমি উদ্ধার; পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বনায়ন ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধি। চীনের প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা হচ্ছে—বাংলাদেশ অংশে তিস্তা নদীর ডান ও বাঁ উভয় তীরঘেঁষে ২২০ কিলোমিটার উঁচু গাইড বাঁধ, রিভার ড্রাইভ, হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটনকেন্দ্র, ১৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, ইপিজেড, ইকোনমিক জোন, কয়েক লাখ হেক্টর কৃষিজমি উদ্ধার, বনায়ন প্রভৃতি। তাতে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাল্টে যাবে তিস্তাপারের মানুষজনের জীবনমান। ফলে উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হবে এবং দারিদ্র্য, মঙ্গা, বেকারত্ব ও মরুবিস্তার প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে দূর হবে। দ্বিতীয়ত, তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতের অতিরিক্ত পানির আর প্রয়োজন পড়বে না বাংলাদেশের, কারণ তিস্তা নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বৃদ্ধি পাবে। ফলে বন্যায় ভাসবে না গ্রামগঞ্জ ও জনপদ। উপরন্তু সারা বছর নৌ-চলাচলের মতো পানি সংরক্ষিত থাকবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকায় বহু কলকারখানা তৈরি হবে এবং ৫০ হাজার মানুষ নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পাবে। চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং ২০২২ সালের ৯-১০ অক্টোবর নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্ট এলাকার তিস্তা নদীর অববাহিকা ও দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ, প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ২০২০ সালের আগস্টে আট হাজার ২১০ কোটি টাকার পিডিপিপি (প্রিলিমিনারি ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট প্রোপোজাল) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে জমা দেওয়া হয়।
জানা যায়, ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের পানিপ্রবাহ কনভেনশন অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানি এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না, যাতে ভাটির দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ তিস্তা ও এর উপনদীতে গজলডোবাসহ একাধিক বাঁধ, খাল ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করে দীর্ঘ সময় ধরে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে ভারত। অভিন্ন নদীতে কোনো প্রকল্প নিলে সেটা জানানোর নিয়ম রয়েছে। যদি কখনো পানি ছেড়ে দিতে হয়, সেটাও জানানোর নিয়মে পড়ে। কিন্তু ভারত বারবার কোনো কিছু না জানিয়ে ওই পানি ছেড়ে দেয়। এমনকি কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই পানি ছাড়ছে উজানের এ দেশটিতে। এতে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে; আর শুষ্ক মৌসুমে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পানি। ২০১৪ সালে তিস্তার ভারতীয় অংশে গজলডোবায় স্থাপিত বাঁধের সব গেটবন্ধ বন্ধ করে দেওয়া হলে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে জলপ্রবাহ শূন্যে নেমে আসে। এর ফলে বাংলাদেশের ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা অববাহিকায় মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল গজলডোবায় ৫০:৫০ অনুপাতে জল ভাগাভাগির। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মানলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা মানতে নারাজ। গজলডোবা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল ১ হাজার ৩৩ কিউসেক, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৫৩০ কিউসেক, ২০০১ সালে ১ হাজার ৪০৬ কিউসেক, ২০০২ সালে ১ হাজার কিউসেক, ২০০৩ সালে ১ হাজার ১০০ কিউসেক, ২০০৬ সালে ৯৫০ কিউসেক, ২০০৭ সালে ৫২৫ কিউসেক, ২০০৩ সালে ১ হাজার ১০০ কিউসেক, ২০০৬ সালে ৯৫০ কিউসেক, ২০০৭ সালে ৫২৫ কিউসেক, ২০০৮ সালে ১ হাজার ৫০০ কিউসেক এবং ২০০৯ থেকে ২০২০ সালে শূন্য কিউসেক। এখন শুষ্ক মৌসুমে যেটুকু পানি আসছে তা বাঁধ চোয়ানো। পানি বিশেষজ্ঞরা বাঁধ চোয়ানো পানিকে কিউসেকের হিসাবে ধরেন না। তিস্তার পানি এখন সম্পূর্ণ ভারতের নিয়ন্ত্রণে।
গজলডোবা বাঁধের ভাটিতে সীমান্ত জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত কিলোমিটারের মধ্যে ভারতীয় এলাকার তিস্তা নদীতে অবৈধভাবে সুপরিকল্পিতভাবে পাঁচটি স্পার নির্মাণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, তিস্তায় এখন যে পানি পাওয়া যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই কিউসেকের হিসাবে আসে না। এটাকে ভারতের দেওয়া গজলডোবা বাঁধের চোয়ানো পানি বললেই চলে। তার মতে, তিস্তা বাঁধ প্রকল্পের আওতায় চলতি বরো মৌসুমে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী, পানিপ্রবাহের প্রয়োজন চার হাজার কিউসেক। কিন্তু তা পাওয়া না যাওয়ায় সেচকাজে তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা বাঁধ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গজলডোবা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের তিনটি প্রধান নদী আত্রাই, করতোয়া ও পুনর্ভবা শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। তিস্তার দুটি শাখা নদী বাঙালি ও ঘাট এরই মধ্যে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। নীলফামারীর ৩০টি ছোট-বড় নদী মরে যাচ্ছে। পানির অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, নৌ-চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ। হারিয়ে গেছে অনেক মৎস্য প্রজাতি ও দেশীয় পাখি। নদীকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের জীবনজীবিকার প্রশ্ন জড়িত। গজলডোবা বাঁধের প্রভাবে পানির অভাবে প্রধান নদী তিস্তা শুকিয়ে যাওয়ায় ৬০ হাজারের বেশি জেলে পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। শিল্প-বাণিজ্য হুমকির মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এ বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে উত্তরাঞ্চলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। নেমে গেছে ভূপৃষ্ঠের পানির স্তর। আগে এ অঞ্চলে ৪০-৬০ ফুট গভীর থেকে ও অগভীর নলকূপে পানি ওঠানো গেলও বর্তমানে তা ১৬০ থেকে ২০০ ফুট গভীরে নেমে গেছে। নদী মরে যাওয়ায় ধীরে ধীরে এ অঞ্চল মরূকরণের দিকে এগিয়ে পাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ সরাসরি গজলডোবা বাঁধের অশুভ প্রভাবের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে। তাই মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির যে প্রাপ্যতা, সেটা নিশ্চিত করতে হবে ।
লেখক: সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, রূপালী ব্যাংক, জোনাল অফিস, লালমনিরহাট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

