মন্তব্য প্রতিবেদন

আমাদের মিডিয়ার শ্রেণিবিন্যাস

Mahmudur Rahman
মাহমুদুর রহমান

আমাদের মিডিয়ার শ্রেণিবিন্যাস

বাংলাদেশের মিডিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন লেখা ও বক্তব্যে আমি তার খানিকটা মজ্জাগত ইসলামোফোবিয়া এবং আওয়ামী তোষণের অভিযোগ উত্থাপন করেছি। তবে আজ যে শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি, এর আঙ্গিক ভিন্ন। মিডিয়ার সঙ্গে আমার যোগাযোগের শুরু আশির দশকের মাঝামাঝি। সে সময় আমি প্রকৌশল ও ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশোনার সুবাদে দেশের প্রথম বিখ্যাত সিরামিক কোম্পানির উৎপাদন এবং দেশ-বিদেশে বিক্রিবাটার চাকরিতে নিয়োজিত ছিলাম। মনে আছে, সাংবাদিকদের এক বিরাট দল ঢাকার কাছে নতুন প্রযুক্তির চমৎকার কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

এরপর থেকে তারা ব্যবসায়িক এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে প্রায়ই আমার মতামত নিতেন। করপোরেট জগতের দুই যুগের কর্মজীবনের আকস্মিক সমাপ্তি টেনে ২০০১ সালের নভেম্বরে সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের পর মিডিয়ার সঙ্গে চেনাজানা আরো বেড়েছিল। ২০০৬ পর্যন্ত আমার স্বল্প লেখালেখি ব্যবসা, প্রযুক্তি এবং অর্থনীতি বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৭ সালে এক-এগারো সরকারের সময় অতি বৈরী পরিবেশে রাষ্ট্র এবং রাজনীতি নিয়ে পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখা শুরু করলাম। নয়া দিগন্তে লেখা সেসব সাপ্তাহিক কলাম পাঠক পছন্দ করলেও মইন-ফখরুদ্দীন প্রশাসন বেজায় বেজার হয়েছিল। বিপদ মাথায় নিয়েই সে সময় নিয়মিতভাবে লিখে গেছি। তার এক বছরের মধ্যে বিশেষ পরিস্থিতিতে আমার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছিল।

বিজ্ঞাপন

বলতে গেলে যেচে বিপদ বাড়ালাম। আনুষ্ঠানিকভাবে মিডিয়া জগতে প্রবেশের প্রায় দুই দশক পর এসে দেখছি যে, পুরোনো সব পরিচয় মুছে গিয়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আমার মাতামহ প্রদত্ত নামটা পত্রিকার নামের সঙ্গে একেবারে মিলেমিশে গেছে। করপোরেট জগৎ এবং সরকারে আমার কাজ করার কথা অধিকাংশ মানুষই ভুলে গেছেন। সুতরাং, বিচিত্র কর্মজীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের মিডিয়াকে মোটামুটি চেনা হয়েছে, এই দাবি বোধহয় জীবনসায়াহ্নে এবার করতেই পারি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের লেখায় আমার দেখা মিডিয়ার চেহারা পাঠককে চেনানোর চেষ্টা করব। আমার অভিজ্ঞতালব্ধ সেই মূল্যায়নের সঙ্গে তারা সবাই যে একমত হবেন, এমন অবাস্তব প্রত্যাশা করার মতো মূর্খ আমি নই।

আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়া মোটামুটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে বৃহত্তম অংশটিকে আমরা ‘করপোরেট মিডিয়া’ নামে ডাকতে পারি। বিভিন্ন করপোরেট হাউস থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার মধ্যে যুগান্তর, সমকাল, কালের কণ্ঠ, জনকণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, আগামীর সময় ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এই প্রকার মিডিয়ার সংখ্যা এতটাই বেশি যে, অনেক নাম হয়তো বাদ পড়ে গেল। কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং মালিক পক্ষের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বাইরে গিয়ে করপোরেট মিডিয়া পরিচালিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফ্যাসিস্ট শাসনের পনেরো বছরে এদের তাঁবেদার চরিত্র জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। সাধারণত, সরকার পরিবর্তন হলে এই জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিতেও রাতারাতি পরিবর্তন ঘটে যায়।

আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিপন্থি হতে মোটেও সময় লাগে না। করপোরেট মিডিয়ার অংশ হয়েও দীর্ঘদিন ধরে যে বিশেষ পত্রিকা দুটি বাংলাদেশের মিডিয়া জগৎকে রীতিমতো নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, তারা ‘সুশীল’ নামেই অধিকতর পরিচিত। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার আদতে করপোরেট মিডিয়ার অংশ হলেও তারা সমাজে এক ধরনের ‘এলিটের’ মর্যাদা উপভোগ করে এসেছে। সব সরকারের আমলেই এই দুই পত্রিকার সম্পাদক এবং মালিক বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে থাকেন।

তবে পত্রিকা দুটির সম্পাদকীয় নীতির ‘ইসলামোফোবিয়া’ নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এই প্রভাবশালী দুই পত্রিকা বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। পত্রিকা শিল্পে অর্থ উপার্জনের মূল উৎস, বিজ্ঞাপনের বাজারকেও তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর সুশীল পত্রিকার রাজনৈতিক প্রভাবে খানিকটা ভাটা পড়লেও, অর্থনৈতিকভাবে তাদের অবস্থানে তেমন কোনো হেরফের হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করতেও তাদের খুব একটা যে দেরি হবে না, তার আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি।

মিডিয়ার তৃতীয় শ্রেণিতে সরাসরি দলীয় পত্রিকাগুলোকে রাখা যেতে পারে। এই ভাগে প্রধানত রয়েছে বিএনপির দিনকাল এবং জামায়াতের সংগ্রাম। দলের একনিষ্ঠ কর্মীদের বাইরে এসব পত্রিকার তেমন একটা চাহিদা থাকে না। দল ক্ষমতায় থাকলে সরকারি আনুকূল্যে বিজ্ঞাপন থেকে রোজগার ভালোই হয়। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হলে বিরূপ পরিস্থিতিতে কর্মরত সাংবাদিকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। তখন ডোনারদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন, অর্থশালী এবং ফ্যাসিস্ট দলও এর মুখপত্র, বাংলার বাণী টিকিয়ে রাখতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর অসন্তুষ্টির ঝুঁকি নিয়েই সত্যের খাতিরে আমাকে দলীয় পত্রিকার বাস্তব অবস্থা তুলে ধরতে হলো। এরপর চতুর্থ ভাগে রয়েছে মফস্বলের পত্রিকা, যাদের নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তেমন আলোচনাই হয় না।

এদের টিকে থাকা এক নিরন্তর সংগ্রাম। দীর্ঘদিন ধরে নোয়াব এবং সম্পাদক পরিষদ নামের দুটি সংগঠন একচেটিয়াভাবে পুরো মিডিয়া জগতের একচ্ছত্র প্রতিনিধির ভূমিকা দখল করে আছে। নোয়াব এবং সম্পাদক পরিষদ নামে ভিন্ন হলেও, কার্যক্ষেত্রে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন ধনবান এলিট মালিক-সম্পাদক উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেখতে পাবেন একই ব্যক্তিরা ঘুরেফিরে সব আমলে তাবৎ প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান উপদেষ্টাদের সঙ্গে মিডিয়ার প্রতিনিধি সেজে সাক্ষাৎ করছেন। সেই ভাগ্যবান ও এলিট প্রতিনিধিদের মধ্যে কখনো রাজধানীর বাইরের পত্রিকার সম্পাদকরা অন্তর্ভুক্ত থাকেন না।

সুতরাং, ব্রাহ্মণ সমাজপতিদের মিডিয়াসংক্রান্ত আলোচনায় এক বিপুলসংখ্যক মিডিয়া কর্মী সর্বদাই উপেক্ষিত, অবহেলিত থেকে গেছেন। বর্ষীয়ান সংগ্রামী সম্পাদক শফিক রেহমানের নেতৃত্বে সারা দেশের উপেক্ষিত, ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্পাদকদের ঐক্যবদ্ধ করার একটি উদ্যোগ সম্প্রতি গ্রহণ করা হয়েছে। দেখা যাক, এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়। পাঠক হয়তো এতক্ষণে ভাবতে বসেছেন, মিডিয়ার শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে আলোচনায় আমার দেশ কোথায় গেল? নিজের পত্রিকার কথা অবশ্যই ভুলে যাইনি। প্রিন্ট মিডিয়ায় আমার দেশ-এর অবস্থান ব্যাখ্যা করেই আজকের লেখা শেষ করব।

আলোচনার শুরুতেই বলেছি, বাংলাদেশের মিডিয়া পাঁচ ভাগে বিভক্ত। চার ভাগের বর্ণনা এর মধ্যেই দিয়ে ফেলেছি। শেষেরটি এখনো বাকি আছে। আমার দেশ সেই সর্বশেষ পাঁচ নম্বর শ্রেণি। ২০০৪ সালে আমার দেশ সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল। সে সময় পত্রিকাটির প্রধান মালিক বিএনপি দল ও সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। স্বভাবতই জনমনে পত্রিকাটির একটি দলীয় চরিত্র তৈরি হয়েছিল। ২০০৮ সালে আমি যখন আমার দেশ-এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আসি তখন ১/১১ সরকার ক্ষমতায়। আমার পরিচালনায় আমার দেশ দিল্লি সমর্থিত সেই প্রচ্ছন্ন সামরিক সরকারের কট্টর বিরোধী পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

এরপর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে ডিজিএফআই এবং ভারতের ডিপ স্টেটের আনুকূল্যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে আমার দেশ শুরু থেকেই পুতুল সরকারের যাবতীয় রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের কঠোর বিরোধিতা অব্যাহত রেখেছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জনসভায় প্রায়ই আমাদের পত্রিকা উঁচিয়ে ধরে সেখানকার খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের সমালোচনা করতেন। ফলে আমার দেশ-এর গায়ে আগেকার বিএনপন্থি ছাপ আরো পোক্ত হয়েছিল।

আমার দেশ-এ প্রকাশিত অধিকাংশ সংবাদে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরোধিতার তীব্রতায় বিএনপি নেতারাও হতচকিত হয়ে পড়ছিলেন। বিশেষ করে, আমার আওয়ামী বিচার বিভাগের সরাসরি সমালোচনায় তারা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যকার প্রথম আলো সমর্থক সুশীল গ্রুপ বলতেন আমরা নাকি ‘বাড়াবাড়ি’ করছি, যদিও আমার দেশ-এর সাহসী ভূমিকায় তারাই উপকৃত হচ্ছিলেন। সেই কথিত ‘বাড়াবাড়ির’ পরিণামে ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আমার দেশ দ্বিতীয় দফায় এবং চূড়ান্তভাবে বন্ধ করা হলো। সেই সঙ্গে আমিও দীর্ঘ সময়ের জন্য জেলের ভাত খেতে গেলাম। এর আগেও ২০১০ সালে শেখ হাসিনা ও ইনুরা আমার দেশ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমিও প্রথম দফায় বছরখানেক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জেল থেকে জেলে ঘুরে বেড়িয়েছি। ২০১৩ সালে বন্ধ হওয়ার পর আমার দেশ পুনঃপ্রকাশের জন্য আমাদের প্রায় এক যুগ অপেক্ষা করতে হয়েছে।

মহান জুলাই বিপ্লবে সহস্রাধিক শহীদ এবং কুড়ি হাজার আহতের রক্তস্নাত বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর আমার দেশ-এর নবযাত্রা আবার শুরু করতে পেরেছি। আমার বিএনপির পুরোনো বন্ধুদের সুশীল অংশ এত দ্রুত আমার দেশ-এর পুনঃপ্রকাশে বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি ভীষণ রকম হতাশও হয়েছিলেন। তারা আওয়ামী লীগের অবর্তমানে বিএনপিকে যেহেতু নতুন সেক্যুলার দলের রূপ দিতে চেয়েছিলেন, তাই সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পুনঃপ্রকাশিত আমার দেশ তাদের কাছে মিডিয়া জগতে এক প্রবল প্রতিপক্ষ রূপে আবির্ভূত হয়েছিল। বিএনপির সাইবার সেলের বয়কটের ডাক মাথায় নিয়েই আমরা নবযাত্রায় ২২ ডিসেম্বর পাঠকের হাতে পত্রিকা পৌঁছে দিয়েছিলাম। তাছাড়া, পত্রিকা চালাতে গিয়ে বিপ্লবের ফসল হিসেবে গঠিত ড. ইউনূস সরকারকে আমরা নৈতিক সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থচিন্তা ছিল না। অন্য মিডিয়ার মতো ‘ভিকটিম’ সেজে মাসের পর মাস নাটক মঞ্চস্থ করার কখনো ইচ্ছা হয়নি। সরকারপ্রধানের সঙ্গে একদিনের জন্যও সাক্ষাতের প্রয়োজন বোধ করিনি। দেড় বছরে তিনি সম্ভবত বার-দুয়েক ধন্যবাদ জানাতে টেলিফোন করেছিলেন। হাসিনার লুট করা আমার দেশ ছাপাখানার করুণ অবস্থা দেখানোর জন্যও কোনো উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতা, কিংবা বিদেশি কূটনীতিকদের সেখানে আমন্ত্রণ জানাইনি। ড. ইউনূস একসময় সুশীল শ্রেণির ‘পোস্টার বয়’ থাকলেও কেন যেন সুশীল মিডিয়া তার সরকারকে তেমন একটা পছন্দ করেনি। হয়তো ভারতের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের সাহসী ভূমিকায় সুশীল মিডিয়া বিরক্ত হয়েছিল। দিল্লি থেকেও ইউনূসের বিরোধিতার নির্দেশ এসে থাকতে পারে।

অন্যদিকে আমার দেশ অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল কাজের সমালোচনা করলেও আগ্রাসী ভারত যাতে সেই সরকারকে হটিয়ে কোনো প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ফেরানোর কোনো ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য সংবাদ পরিবেশনকালে সতর্ক থেকেছে। ওদিকে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে নানা বিষয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের সেসব আন্দোলনের কোনো কোনোটির যুক্তিসংগত সমালোচনা করতে হয়েছে। দলীয় স্বার্থে আঘাত লাগতেই বিএনপির হাইব্রিড নেতাকর্মীদের কাছে আমরা হয়ে গেলাম জামায়াতপন্থি পত্রিকা এবং অতীত ভুলে সুশীল মিডিয়া তাদের নতুন বন্ধুরূপে আবির্ভূত হলো।

২০০৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত চরম বৈরী পরিবেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা আমার দেশকে যেমন বিএনপিপন্থি অভিহিত করে পাঠকপ্রিয়তা কমাতে পারেনি, তেমনই পুনঃপ্রকাশের পর গত দেড় বছরের নানা অপপ্রচারেও পত্রিকার সেই পাঠকপ্রিয়তায় কোনো হেরফের হয়নি। ক্ষমতার কাছে আমরা কোনো সরকারের আমলেই আত্মসমর্পণ করিনি। আমার দেশ-এর স্বকীয়তার মধ্যে রয়েছেÑ১. করপোরেট স্বার্থ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, ২. রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য থেকে মুক্তি, ৩. ইসলামোফোবিয়া এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অঙ্গীকার, ৪. বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি আনুগত্য এবং ৫. বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পেশাদারিত্ব থেকে পাঠকের কাছে দায়বদ্ধতা।

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের মন্ত্রীদের একটি অংশ এখন শেখ হাসিনার কায়দায় আমাদের বিরুদ্ধে ‘বিজ্ঞাপন অস্ত্রের’ ব্যাপক ব্যবহার করছেন। শুনেছি সেই মন্ত্রীরা আমার দেশ-এ তাদের মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞাপন না দেওয়ার জন্য অধস্তনদের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা বিব্রত হতে পারেন ভেবে নাম উল্লেখ করা থেকে আজকের লেখায় বিরত থাকলাম। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একসময় বিএনপিবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমর্থক ছিলেন।

শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাদের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ছিল। তাদের ইতিহাস আমি জানি। যাই হোক, এদেশের অবিসংবাদিত আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দলের সেই মন্ত্রীদের এতদিনে জানা উচিত ছিল যে, ম্যাডামের আদর্শ অনুযায়ী আমিও আপস করিনি। প্রায় দুই দশক ধরে প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রাম করেই তো আমরা টিকে থাকার চেষ্টা করছি। আমার সহকর্মীরা এটি জেনেই আমার দেশ-এ সাংবাদিকতা করছেন যে, এই পত্রিকায় কাজ করলে পাঠকের কাছ থেকে প্রচুর সম্মান এবং ভালোবাসা মিললেও আর্থিক সচ্ছলতার তেমন আশা নেই। জাতীয় কবি নজরুলের মতো আমার দেশ বাংলাদেশের মিডিয়া জগতের একক বিদ্রোহী রূপে পরিচিতি পেলে, আগের সব পেশা ছেড়ে আমার সম্পাদক হওয়া সার্থক হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন