আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আরাফাত ময়দান

নিমগাছ ও জিয়াউর রহমান

এলাহী নেওয়াজ খান

নিমগাছ ও জিয়াউর রহমান

বিশ্বের প্রভাবশালী সৌদি বাদশারা যা বুঝতে পারেননি, তা সামরিক পোশাক পরিহিত এক তরুণ রাষ্ট্রনায়ক বুঝতে পেরেছিলেন দূরদৃষ্টি দিয়ে। সৌদি বাদশারা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি রুক্ষ, শুষ্ক ও উত্তপ্ত মরু অঞ্চলে একটি নিমগাছ কীভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে পারে। অথচ নদীমাতৃক একটি বদ্বীপ অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধান তা বাস্তবায়ন করে গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিলেন।

তিনি হচ্ছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যাকে আজ সৌদি জনগণ তো বটেই, বরং হজ পালনকারী লাখ লাখ হাজি প্রতিবছর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে এটা অতি সাধারণ উপহার হলেও বিস্ময়করভাবে পাল্টে দিয়েছে সৌদি আরবের জীববৈচিত্র্য। পাঠক, এটা ছিল ১৯৭৭ সালের কোনো একটা সময়। সৌদি বাদশা ফাহাদ বিন আব্দুল আজিজের আমন্ত্রণে রিয়াদে পৌঁছালেন সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সঙ্গে নিয়ে গেলেন নামিদামি কোনো উপহার নয়, শুধু কয়েকটি নিমের চারা। সাধারণত সৌদি বাদশারা বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকে অনেক দামি দামি উপহার পেয়ে থাকেন। কিন্তু সৌদি বাদশা ফাহাদের কাছে এই সামান্য উপহার এতটা মূল্যবান হয়ে উঠবে এবং একদা তা কিংবদন্তিতে রূপ নেবে, তা কেউ কল্পনায়ও ভাবেনি।

বিজ্ঞাপন

সেই সফরে জিয়াউর রহমান আরাফাত ময়দানে নিমের চারা রোপণ করে কেবল সৌদি আরবের পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখেননি, বরং দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী এক ভবিষ্যতের সূচনা করেন। কৃতজ্ঞ বাদশা ফাহাদ বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক জনশক্তি আমদানির সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক সৌদি আরবে যাওয়া শুরু করে এবং সে ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

কয়েক দিন আগে ওমরাহ পালন করতে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম, সৌদি আরবের যে প্রান্তেই যাবেন, সেখানেই আপনি দেখতে পাবেন বাংলাদেশি কর্মজীবী মানুষ কাজ করে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও মালিক ও শ্রমিক উভয়ই বাংলাদেশি। আমি হিজরা রোডের (যে রাস্তা দিয়ে রাসুল পাক [সা.] হিজরত করেছিলেন) যে হোটেলটিতে ছিলাম, সেটার মালিক একজন বাংলাদেশি এবং সব কর্মচারীও বাংলাদেশের। এই রোডের অধিকাংশ দোকান ও আবাসিক হোটেলের মালিক ও কর্মচারী বাংলাদেশি। আবার তাদের শতকরা ৯০ ভাগেরই বাড়ি চট্টগ্রামে। কোনো কোনো বাংলাদেশি মালিকের দোকানে পাকিস্তানি কর্মচারী দেখে বেশ অবাক হয়েছি। এটা এখন অস্বীকার করার উপায় নেই, সৌদি আরবে কাজ করে আজ বাংলাদেশের হাজার হাজার পরিবার আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।

শুধু তা-ই নয়, প্রত্যন্ত গ্রামের যেসব শ্রমিক সৌদিতে কাজ করেন, তাদের অনেকে বাবা-মাকে ওমরাহ পালন করাতে সমর্থ হচ্ছেন, যা তারা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি। এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক অবদান। পাঠক রাষ্ট্রপতি জিয়া যে নিমগাছ লাগানোর সূচনা করেছিলেন, তা আজ সারা সৌদি আরবে ছেয়ে গেছে। সেখানে সাধারণ সৌদি জনগণ এই নিমগাছকে ‘জিয়া ট্রি’ কিংবা ‘জিয়া শাজারা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে। শাজারা অর্থ গাছ।

শত শত বছর ধরে নিমগাছ যেমন ঔষধি বৃক্ষ হিসেবে মানুষের কাছে সমাদৃত, তেমনি রুক্ষ পাহাড়ি এলাকায় পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য সহায়ক। নিমগাছের রয়েছে উচ্চমাত্রার দূষণ সহ্য করার ক্ষমতা। বিশেষ করে নিমগাছের ছায়া খুব শীতল, সে কারণে হাজিরা এর নামকরণ করেছেন ‘রহমতের গাছ’ হিসেবে। আমাদের মতো বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চলে এ গাছ অনেক বেশি দেখা গেলেও এটাকে মরু অঞ্চলের গাছ হিসেবে অভিহিত করলেও ভুল হবে না। কারণ এটা উষ্ণ অঞ্চলের উপযোগী। পানি খুবই কম লাগে। কিন্তু মরুবাসী তা জানত না।

জিয়াউর রহমানই প্রথম সেই জ্ঞানটা তাদের দান করায় সৌদিরা আজ তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। শুধু জিয়াউর রহমান নন, তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিও সৌদি বাদশারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকেন বিভিন্নভাবে। তখন আরাফাতের ১০ কিলোমিটারজুড়ে প্রায় ৫০ হাজার নিমগাছ লাগানো হয়েছিল।

এসব ছাড়াও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে আছে গোটা ঘটনাবলির সঙ্গে। অনেকেই হয়তো এটা জানেন, আরাফাতের পবিত্র ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। এটাকে আরাফাত পাহাড়ও বলা হয়। আবার ক্ষমার পাহাড় হিসেবেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে খুবই সমাদৃত। প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলমান সেখানে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ তায়ালার রহমত ও ক্ষমা ভিক্ষা করেন।

নানা করণে তাই মুসলমানদের কাছে আরাফাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে হাজিরা আরফাতের সমতলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে আল্লাহ তায়ালার কাছে গুনাহ মাফের জন্য ক্ষমা চেয়ে থাকেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, আরাফাতে অবস্থান করাই হজ। কথিত আছে, হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) বেহেশত থেকে পতিত হন দুটি ভিন্ন স্থানে। তারপর ৩০০ বছর ধরে একে-অপরকে খুঁজাখুঁজি করার পর তারা এই পাহাড়েই পুনর্মিলিত হন। বেহেশতে বসবাসকালে আল্লাহ তায়ালার নিষেধাজ্ঞা না মানার কারণে প্রচণ্ড মর্মপীড়াহ নিয়ে ৩০০ বছর ধরে কাঁদতে কাঁদতে এই পাহাড়েই আল্লাহর শেখানো দোয়া পড়ে আদম (আ.) ক্ষমাপ্রাপ্ত হন।

এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই পাহাড়েই কোরানুল করিমের সেই সুরা নাজিল হয়, যে সুরায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণতাদান করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম। তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করলাম।’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ৩)।

এছাড়া হাদিস শরিফে আছে, রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, আরাফার দিন ছাড়া অন্য কোনোদিন নেই, যেদিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর সর্বাধিক সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন। অন্য একটি বর্ণণায় আছে, সেদিন তিনি পৃথিবীর নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের বলেন, ‘তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম।’ সুতরাং ইসলামে রহমতের পাহাড় ও আরাফাতের ময়দান মুসলমানদের জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এই ভূমি গুনাহ মাফের ভূমি।

আর এই ভূমিতেই মানুষের কল্যাণের জন্য নিমগাছ লাগিয়ে যে সৎ কর্মের সূচনা করেছিলেন জিয়উর রহমান, তা বিগত ৪৬ বছর ধরে অব্যাহত আছে। আর আল্লাহ তায়ালা তো বলেছেন, ‘সৎকর্মশীলদের জন্য রয়েছে পুরস্কার।’ যেমন হজরত আবু জর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি কল্যাণমূলক কাজ করবে, তার জন্য রয়েছে ১০টি অনুরূপ পুরস্কার; এমনকি আমি তা বাড়িয়ে দেব।’

সুতরাং শুষ্ক ও রুক্ষ মরুময় আরাফাতের ময়দানে মানবকল্যাণ তথা আল্লাহ তায়ালার মেহমানদের জন্য নিমগাছ লাগিয়ে জিয়াউর রহমান যে সৎকর্মের সূচনা করে গেছেন, তা যত দিন অব্যাহত থাকবে, তত দিন সদকায়ে জারিয়া হিসেবে তিনি সাওয়াব পেতে থাকবেন। একজন রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এরকম সৌভাগ্য কজনের ভাগ্যে জোটে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন