এক.
গোল্ডফিশ বোধ করি সবাই চেনেন। দেখতে বর্ণিল ও প্রাণবন্ত। মন ভালো করার সব যোগ্যতাই আছে এই গোল্ডফিশের। তবে একটা ‘অপবাদ’ও আছে ওদের নামে। অপবাদ না বলে বৈশিষ্ট্য বলাই যুক্তিযুক্ত হবে হয়তো। বৈশিষ্ট্যটা হলো ওদের স্মৃতিশক্তি নাকি সাকুল্যে তিন সেকেন্ডের। এরই মধ্যে সব ভুলে যায়। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রচলিত তথ্য। কোনো মানুষ বা গোষ্ঠীর স্মৃতিশক্তির ক্ষণস্থায়িত্ব বা দুর্বলতার প্রসঙ্গ এলে বলা হয় গোল্ডফিশ মেমোরি। আসলেই কি গোল্ডফিশের স্মৃতিশক্তি তিন সেকেন্ডের? সে বিষয়ে হয়তো আরো গবেষণা হতে পারে। তবে মোদ্দাকথা হচ্ছে, স্বল্পস্থায়ী স্মৃতিশক্তি।
বাঙালির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি। গোল্ডফিশের সঙ্গে বাঙালির স্মৃতির তুলনা এ কারণেই ঘুরেফিরে আসে। আবার অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবেও বাঙালির খ্যাতি সম্ভবত বিশ্বজোড়া। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ১৮ মাস বা দেড় বছর হতে চলেছে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ১৮ কোটির বেশি মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে তারা হাসিনার শাসন-শোষণে কেমন ছিল আর এখন কেমন আছে। সমস্যা-সংকুল তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশে জনতুষ্টি প্রায় অসম্ভব। দুধের নহর বইয়ে দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবু পার্থক্যটা নিরূপণ করার সামর্থ্য একেবারেই থাকবে না, এটা কেমন কথা! সুযোগ পেলেই অবলীলায় বলে দিচ্ছে ‘অন্তর্বর্তী শাসন হাসিনা আমলের চেয়েও খারাপ’। আরেকটু সফট করে কেউ কেউ বলছে, ‘শেখ হাসিনা আর ড. ইউনূসের মধ্যে পার্থক্য কী?’ এসব কথা আবার বেশি বলছে শিক্ষিত ও তথাকথিত সুশীল দাবিদাররা। তারা হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের সঙ্গে বর্তমান শাসনের পার্থক্য অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজছেন। তা-ও পাচ্ছেন না। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, পার্থক্যটা বুঝতে আর খুব বেশি সময় লাগবে না। বড়জোর বছরখানেক।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক দোসর, ভ্রাতৃসূত্রে জাতীয় পার্টির খণ্ডাংশের চেয়ারম্যান জিএম কাদের। পুরো নাম গোলাম মোহাম্মদ কাদের হলেও মানুষ তাকে ‘দিল্লির গোলাম’ হিসেবে জানেন। শেখ হাসিনার তিনটি পাতানো নির্বাচনে দিল্লির হুকুমে জাতীয় পার্টি সহযোগী হয়েছে। নির্বাচন এলেই প্রভু ডেকে নিয়ে যেত গোলামকে। ফেরার পর সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলে অবলীলায় বলত অনেক অনেক নির্দেশনা নিয়ে “এলেও ‘প্রভুরা’ তা বলতে মানা করেছে। অতএব তাদের অনুমতি ছাড়া কিছু বলতে পারব না।” সেই গোলামের বয়ানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যখন হিটলার অভিহিত করা হয়, তখন ধরেই নিতে হয় অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সঠিক পথেই আছেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক যেমনটি বলতেন, কলকাতার দাদা বাবুরা যখন আমার সমালোচনা করে, তখন আমার এ আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়, আমি দেশ ও জনগণের পক্ষে এবং সঠিক পথেই আছি।
গোলাম কাদের আস্ফালন করেছেন গণভোট প্রশ্নেও। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে যে গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছেÑতাতে ‘না’ ভোট দেওয়ার ডাক দিয়ে কাদের বলেন, ‘স্বৈরাচার রোধের নামে যে সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, তার হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দেশ চালানোর ব্যক্তিক্ষমতা দিতে হবে, ক্ষমতা না দিলে কোনো দিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।’ কাদের বলেন, ‘এই গণভোট সংবিধানবিরোধী, অবাস্তব এবং বাস্তবায়িত হলে দেশ অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে।’
আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নক গোলাম কাদেরের যন্ত্রণা বোঝা কঠিন নয়। গত ১৫ বছরে মানুষের ভোটাধিকারকে পদদলিত করে, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে, শেখ হাসিনার লুটতন্ত্রের অংশীদার কাদেররা দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে যে উদ্বিগ্ন হবেন এটাই স্বাভাবিক। বহুধাবিভক্ত জাতীয় পার্টি ভোটের বাজারে অনেক আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। যে কারণে হাসিনার মতো অসীম ক্ষমতাধর অবৈধ প্রধানমন্ত্রী না থাকলে তার ইউপি চেয়ারম্যান হওয়াও যে চান্স নেই, সেটা জানা কথা। মানুষের ধিক্কার আর ঘৃণার পাত্র হয়েও গণঅভ্যুত্থানের সরকারের বিরুদ্ধে যে ভাষায় আক্রমণ ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, তা নতুন বাংলাদেশ বলেই সম্ভব হয়েছে। শেখ হাসিনার আমলে এমন চোখ লাল করে হুংকার দেওয়া তো দূরে থাক, পায়ে লুটোপুটি খেয়ে গণভবনের ধুলো মেখে ধন্য হয়েছে। সরকার তার ম্যান্ডেট ও রাষ্ট্রের প্রতি দায় থেকে যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছে, সেখানে সংস্কারের বিষয়ে মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়ে ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য বেসামাল বক্তব্য দিয়ে গোলাম কাদের গর্হিত অপরাধ করেছেন। নিজেকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের শত্রু হিসেবে আরেকবার তুলে ধরেছেন। ভিন্ন দেশের প্রতি আনুগত্য, দায়বদ্ধতার কথা জানান দেওয়ার পর অন্য কোনো সভ্য দেশ হলে মুখ দেখাতে পারার কথা নয়। ‘গোল্ডফিশ মেমোরি’র কারণেই হয়তো জনরোষ থেকে বেঁচে যাচ্ছেন।
দেড় হাজারের অধিক ছাত্র-তরুণের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত বাকস্বাধীনতার চর্চার সুবাদে ভিনদেশের গোলামরা যা খুশি তা করতে পারেন কি না, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতি তার উথলে ওঠা দরদের পেছনে রয়েছে আসন্ন নির্বাচনে লাঙ্গলে ভোট টানা। সে স্বপ্ন তার পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। দিল্লিতে আশ্রিত তার নেত্রী ইতোমধ্যে নেতাকর্মীদের ভোট বর্জন করতে বলেছে। অতএব গুম-খুন-নিপীড়নের রানির দল গোলাম কাদেরের মায়াকান্নায় বিগলিত হয়ে লাঙ্গলের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন আশা সুদূরপরাহত। দিল্লি হনুজ দুরস্ত।
অভ্যুত্থানের পর এক টকশোতে বলেছিলাম, গোলাম কাদেরসহ ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা ১৫ বছরে বিশেষত, তিনটি অবৈধ পার্লামেন্ট ও সরকারের পদপদবি দখল করে রাষ্ট্রের যে অর্থ লোপাট করেছে, তা ফেরত নেওয়ার আইনি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কোনো সুষ্ঠু ভোটে যার সংসদ সদস্য হওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা ছিল না, সে ব্যক্তি পাতানো পার্লামেন্টে বিরোধী নেতার মতো মর্যাদার আসনে মন্ত্রীর মর্যাদায় বসে রাষ্ট্রের অর্থ শ্রাদ্ধ করেছেন। সাঙ্গপাঙ্গদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করেছেন। শেখ হাসিনার গণহত্যার দায়ই বা গোলাম কাদেররা এড়াবেন কীভাবে? অবৈধঘোষিত তিন পার্লামেন্টের লুটেরাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রের অর্থ ফেরত নেওয়ার যথাযথ উদ্যোগ নিলে কিংবা জুলাইযোদ্ধাদের দাবি অনুযায়ী ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার ও রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে গোলাম কাদেররা এখন চৌদ্দ শিকের ভেতরে থাকতেন, এভাবে আস্ফালন করার দুঃসাহস দেখাতেন না।
দুই.
নির্বাচনি প্রচার শুরু হয়েছে পুরোদমে। ভোটের লড়াইটা বেশ জমে উঠেছে মনে হচ্ছে। প্রচারযুদ্ধ এরই মধ্যে বাগযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এক পক্ষ একাত্তর আর ‘জান্নাতের টিকিট’ ইস্যু সামনে এনে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চাইছে। আরেক পক্ষ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও ঋণখেলাপি ইস্যু প্রাধান্য দিয়ে ভোটের বাজারে প্রাধান্য বিস্তারে মরিয়া।
জুলাই অভ্যুত্থানের বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা। ক্ষমতাকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করা। যারা পাঁচ বছরের জন্য সংসদে গিয়ে আইনপ্রণয়ন করবেন, উন্নয়ননীতি অনুমোদন করবেন, তারা যাতে প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো স্মরণ রাখেন। মেয়াদান্তে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, সেটা মাথায় রাখেন। ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই রাজনৈতিক জোট ভোটারদের মন জয় করতে নানা চটকদার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অঙ্গীকার করছেনÑএটাই তো জুলাইয়ের বড় প্রাপ্তি। গত দেড় যুগে তো মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো ধার ধারা হয়নি। ক্ষমতার নিয়ামক শক্তিগুলো তুষ্ট করে গদি টিকিয়ে রাখার কৌশলই ছিল চূড়ান্ত কথা।
আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরূকরণ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংকট, টানাপড়েন সত্ত্বেও প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থিতা চূড়ান্ত করে এখন প্রচারযুদ্ধে। এর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একটি খবর চোখে পড়ল গত বুধবার। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের তথ্যমন্ত্রী আবু সাইয়িদ বিএনপিতে যোগ দেওয়ার খবর দেখে রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার দশা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের আওয়ামী দুঃশাসনে আবু সাইয়িদ শুধু তথ্যমন্ত্রীই ছিলেন না, ছিলেন হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের যোগ্য উত্তরসূরি। হেন কোনো নোংরামি নেই, যা শহীদ জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করেননি। বিটিভির কর্মকর্তাদের সূত্রে জেনেছি, বাকশালের গভর্নর আবু সাইয়িদ বিটিভির আর্কাইভে থাকা শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার গৌরব এবং সাফল্যের ভিডিও ফুটেজগুলো ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার তথ্য মন্ত্রিত্বকালে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম বিটিভিকে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে কতটা নিকৃষ্টভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ওই সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠান ও সংবাদের ভিডিও দেখলেই প্রমাণ মিলবে।
কী কারণে বিএনপি তাকে শহীদ জিয়ার দলে স্থান দিল, তা তারাই বলতে পারবেন। একটি আসন কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। তাহলে কি আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি খুব চাপে আছে, যে শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা, ৭ নভেম্বর, স্বল্পকালীন শাসনকে যে ব্যক্তি কালিমা লেপন করেছে, তাকেও বুকে টানতে হলো! অনেকে বলছেন, তাকে দলে ভেড়ানোর লক্ষ্য হতে পারে পাবনা-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া (আদালতের রায়ে নির্বাচন একদফা স্থগিত হওয়ায়, পাবনা-১ এবং পাবনা-২ আসনে এখনো প্রার্থিতা চূড়ান্ত হয়নি)।
আবু সাইয়িদের অনেকগুলো বই আছে মুক্তিযুদ্ধ এবং জিয়াউর রহমানকে নিয়ে। শুধু লেখা নয়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়াকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও চরিত্রহনন করে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলতেন নিয়ম করে। তার লেখা একটি বই ‘জেনারেল জিয়ার রাজত্ব’। এ বইয়ের প্যারায় প্যারায় শহীদ জিয়ার বিরুদ্ধে যে ঘৃণা ছড়িয়েছেন গুণধর সাইয়িদ, তা এখন ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ভেসে বেড়াচ্ছে। বইটির অষ্টম পৃষ্ঠায় আবু সাইয়িদ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘২৭ মার্চ কালুরঘাটে যখন যুদ্ধ চলছে, জিয়াউর রহমান তখন কক্সবাজারের ট্রেজারি থেকে প্রাপ্ত টাকার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। যখন কক্সবাজারে যুদ্ধ জিয়া তখন রামগড়ে, যখন রামগড়ে যুদ্ধ তখন জিয়াউর রহমান ভারতীয় সীমান্ত অভ্যন্তরে নির্বিঘ্নে অবস্থান নিয়েছেন। সে জন্য যুদ্ধের সময় জিয়াকে অনেকেই ‘মেজর রিট্রিট’ হিসেবে সম্বোধন করতেন’। আবু সাইয়িদের বইয়ে লেখা বর্ণনা অনুযায়ী জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ করেননি, বরং পাকিস্তানিদের চর হয়ে কাজ করেছেন। জিয়াউর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানিদের দাস, চক্রান্তকারী, প্রতারক, ১৫ আগস্টের কুশীলব, মুক্তিযোদ্ধার হত্যাকারী, খুনিসহ অনেক ঘৃণ্য বর্ণনা স্থান পেয়েছে বইতে। বিএনপি কি আবু সাইয়িদের এসব অপতথ্য কবুল করবে?
আবু সাইয়িদ সত্তরের নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল চালু হলে আবু সাইয়িদ বাকশালের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। বাকশাল ব্যবস্থায় পাবনার গভর্নরও হন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে, আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়। তবে আবু সাইয়িদ ছিলেন ‘হার্ড লাইনার’। বাকশালে থেকে যান। ১৯৯১ সালেও বাকশাল থেকে নির্বাচন করেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করেন এবং তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগ ভাঙার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে দল থেকে বিচ্যুত হন। বিএনপিসহ অধিকাংশ দল বর্জন করলেও ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। পরের নির্বাচনের এক মাস আগে যোগ দেন গণফোরামে। ২০১৮ সালে বিএনপির জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হন। ওই নির্বাচনের পর প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে সুলতান মনসুরের সঙ্গে অংশ নিয়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় বিষোদগার ও গালাগাল করেছেন। ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।
‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’, এটা পুরোনো রাজনীতির বয়ান। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে এটা অচল। তরুণদের ভাষা বুঝতে অক্ষম হলে, তা যে কারো জন্য আত্মঘাতী হতে বাধ্য। শহীদ জিয়ার অপমান যদি বিএনপির কাছে গৌণ হয়ে দাঁড়ায়, তা খুবই বেদনাদায়ক। জামায়াতের কট্টর সমালোচক মেজর (অব.) আক্তারুজ্জমান ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে ফুল দিয়ে দল-জোটে স্বাগত জানানোর পর বিএনপির অনেকে তীব্র সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, একসময়ের কট্টর সমালোচককে বুকে টানা জামায়াতের দেউলিয়াত্বের প্রকাশ। আবু সাইয়িদকে বরণ তাহলে কী? ‘গোল্ডফিশ মেমোরি’ নাকি আদর্শিক দেউলিয়াপনা? নির্বাচনে আবু সাইয়িদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা যখন তার লেখা বইয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অপমানমূলক লেখাগুলো সামনে আনবে, তখন কী জবাব দেবেন বহু ঘাটের পানি খাওয়া সাইয়িদ কিংবা বিএনপি নেতৃত্ব? প্রায় দেড়যুগ বিলাতি রাজনীতি ঘনিষ্ঠভাবে যিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনি কোন ‘মাল’ অ্যাসেট আর কোনটা লায়াবিলিটি, সেটা বুঝতে অক্ষম এমনটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

