দীর্ঘ ১৬ বছরের নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, হামলা, মামলা ও গুম-খুনের মাধ্যমে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা একচেটিয়া ভোগ করার পর একটি গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ ছাত্রজনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যার পরেও শেষ রক্ষা হয়নি। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন বাংলাদেশের মাফিয়া রানি-খ্যাত শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব। বিদেশে গিয়ে আওয়ামী লীগের লুটপাটকারী বহু নেতা পিকনিক মুডে বিয়ের দাওয়াত খেয়ে বেড়াচ্ছেন। আর দেশে যারা আছেন তারাও পলাতক। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে নানামুখী হিসাবনিকাশ।
জুলাই ’২৪ অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি বেশ জোরালো হয়ে উঠেছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জোর দাবি থাকলেও এ বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়ায় বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এলেও সম্প্রতি আবার তা জোরালো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল এবং ২ মে ঢাকায় সমাবেশের ডাক দিয়েছে এনসিপি। তারা এও ঘোষণা দিয়েছে যে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার আগে সংসদ নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।
সম্প্রতি আইন উপদেষ্টা ডক্টর আসিফ নজরুলের সঙ্গে দেখা করে ছাত্রদের একটা প্রতিনিধিদল অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ এবং বিচারের মুখোমুখি করার দাবিতে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে স্মারকলিপি দেন ‘গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্ম থেকে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। দলটি নিষিদ্ধ করা ছাড়াও পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরে গণহত্যা, জুলাই গণহত্যাসহ সব অপকর্মের বিচারের দাবি জানান তারা। ৯টি দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি দিয়ে আলোচনা শেষে ছাত্রপ্রতিনিধিরা জানান, আইন উপদেষ্টা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ইতিবাচক কিছু বলবেন, এমন আশা ছিল। কিন্তু তিনি কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেননি। আলাপ-আলোচনায় মনে হয়েছে, সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দূতাবাসগুলোর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায় না বলেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করছে না, কিন্তু এটি গণবিরোধী সিদ্ধান্ত।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমও গত ২৫ এপ্রিল শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ইনকিলাব মঞ্চ আয়োজিত এক সমাবেশে বলেছেন, আমরা যখনই সরকারের কাছে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কথা বলি, তারা আমাদের পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গির দোহাই দেয়।
বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী গত ২৫ এপ্রিল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগের আর এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। একই দাবি জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিও। যদিও এই দুই নেতার বক্তব্য মানেই এটা তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত, এমন নয়।
কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়ে আসা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি আবার জোরালো হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে পতিত ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগই। দলটির বিদেশে পালিয়ে যাওয়া পলাতক নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং শেখ হাসিনার হঠকারী কথায় বিভ্রান্ত আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীর ঝটিকা মিছিল গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর ক্ষতে যেন লবণের ছোঁয়া দিয়ে গেল।
গত কয়েক দিনে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে হঠাৎ করেই কয়েকজন লোক আওয়ামী লীগের ব্যানার নিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান তুলে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। এই স্বল্পকালীন ঝটিকা মিছিলের ভিডিও ধারণ করে তারা বিভিন্ন মিডিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। বিশেষ করে ফেসবুকে আপলোড করে। কোথাও কোথাও দ্রুততার সঙ্গেই স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা কাউকে কাউকে পাকড়াও করে তাদের রাগ মেটায়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশের কর্তারা মিছিল করা আওয়ামী লীগ কর্মীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ মেনে পুলিশ পরে ভিডিও ফুটেজ দেখে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায়। মিছিলকারীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ ও গ্রেপ্তার নিয়ে কোনো কোনো মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়—আওয়ামী লীগকে তো নিষিদ্ধ করা হয়নি, তা হলে মিছিল করার অপরাধে তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হবে? তারা মনে করিয়ে দেন, ফ্যাসিবাদের আমলেও জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে তাদের খুঁজে খুঁজে গ্রেপ্তার করা হতো। তাহলে ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের তফাতটা রইল কোথায়?
তারা না বোঝার ভান ধরলেও তফাত বিস্তর। আওয়ামী লীগ পতিত ফ্যাসিবাদ ও গুম-খুন-গণহত্যাকারী দল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তা নয়। সুতরাং এই দুটো দলের ওপর ফ্যাসিবাদী নিপীড়নের সঙ্গে বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের তুলনা চলে না। তা ছাড়া ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মিছিলে যদি গণহত্যায় অংশ নেওয়া কেউ বা নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কেউ থেকে থাকে, তাদের তো পুলিশ আইনানুগভাবেই গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু মিছিলে অংশ নেওয়া কে গণহত্যায় অংশ নিয়েছে, কে আসামি আর কে নিষিদ্ধঘোষিত দলের সদস্য, তা তাৎক্ষণিকভাবে বাছাই করা সহজ নয়। তাই পুলিশের গ্রেপ্তারকে কেউ কেউ ঢালাও গ্রেপ্তার বলে সমালোচনা করছেন।
এই সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকতে পুলিশ সহজেই যে নির্দেশ জারি করতে পারে, তা হলো আইনশৃঙ্খলা ও জানমাল রক্ষার স্বার্থে পতিত পলাতক ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং ও কর্মসূচিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ। কারণ গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের ওপর সাধারণ মানুষসহ গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ। তাই গুম-খুন ও গণহত্যায় অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে তাদের ওপর ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তাদের জীবনহানির সংশয়ও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করলে তা তাদের জানমাল রক্ষা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। পুলিশও রেহাই পাবে ঢালাও গ্রেপ্তারের অভিযোগ থেকে।
এর পরের ধাপে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিলের। কারণ যে দলটি ১৬ বছর ধরে দেশে ফ্যাসিবাদ ও গুম-খুনের রাজত্ব কায়েম করেছে এবং সর্বশেষ গণহত্যা চালিয়েছে, তারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে যদি জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তা হবে শহিদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি। বাংলাদেশের আইনে বিচারের রায়ে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত যে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুম-খুন ও গণহত্যাকারীদের বিচার সময়সাপেক্ষ। তাই দলের নিবন্ধন বাতিল করে আওয়ামী লীগের নামে ও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের পথ আপাতত বন্ধ রাখলে বিচারের আগেই গণহত্যাকারীরা জাতীয় সংসদকে অপবিত্র করার সুযোগ পাবে না। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
আর দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হলে তা নিয়ে ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যত জঘন্য দলই হোক, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যাটা বেশ বড়। এত বড় একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করলে দেশে যে বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, তা কীভাবে সামাল দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে—এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা শেষে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হলেই কেবল নিষিদ্ধ করার কথা ভাবা যায়, তার আগে নয়।
লেখক : কবি, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

