শহীদ জিয়ার আদর্শ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

প্রফেসর ড. মুহা. আবদুর রহমান আনওয়ারী

শহীদ জিয়ার আদর্শ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

শহীদ জিয়ার আদর্শ নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক সৃষ্টির প্রয়াস চালায়। কারো দৃষ্টিতে তিনি শুধু দেশের উন্নয়নে তথা স্বনির্ভর দেশ গড়ার জন্য উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছেন এবং উন্নয়নের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরীর জন্য জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। আর জনসমর্থন লাভের জন্য ধর্মীয় বিষয়ের কিছু গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর আদর্শ ব্যাখ্যায় একটি বস্তুবাদী চেতনার পরিস্ফুটন করা হয়। অপরদিকে ইসলাম পন্থিদের একটি অংশ শহীদ জিয়াকে জাতীয়তাবাদী মতবাদের প্রবক্তা বলে দাবী করে যে, জাতীয়তাবাদ ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই তাদের মতে তাঁর আদর্শ ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রকৃত পক্ষে বাল্যকাল থেকে শহীদ জিয়া ইসলামী মূল্যবোধের উপর গড়ে ওঠেছেন। বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে থাকাবস্থায় কুরআন হাদীছ অধ্যয়ন করেছেন এবং ইসলামের আলোকে মহাকবি আল্লামা ইকবালের আত্মনির্ভরশীলতা ও সাম্যের দর্শনের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সেনা নেতৃত্বে থাকাবস্থায় তিনি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা জন্য সোচ্চার ছিলেন। এ দৃষ্টিতে ১৯৬৫ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর অবস্থান প্রমাণিত ও পুরস্কৃত। এভাবে তিনি অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তায় অটল থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। একই ধারাবাহিকতায় ও প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ ও সৈনিকদের একশ্রেণীর নেতার বৈষম্য ও অন্যায় যুলম নিপীড়ন প্রত্যক্ষ করে নিজ ও নিজের পরিবারের জীবনের পরওয়া না করে সে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। নিপীড়িত গোটা জাতির মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর এ আদর্শ কুরআন সুন্নাহ থেকে উৎসারিত। আল্লাহ তাআলা নিপীড়তদের সাহায্যে যুদ্ধ করার জন্য স্পষ্টতঃই বলেছেন: “ আর তোমাদের কি হল যে তোমরা আল্লাহর রাহে লড়াই করছনা দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা। আমাদেরকে এই জনপদ থেকে নিস্কৃতি দান কর। এখানকার অধিবাসীরা অত্যাচারী আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষাবলম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারন করে দাও।” (সূরা নিসা : ৭৫)।

বিজ্ঞাপন

ইসলামের এ আদর্শ ১৯৭৫ সনের ঘটনা প্রবাহেও অবলম্বন করেছেন। অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এবং কুচক্রীদের সাথে কোন আপষ করেননি। তিনি জানতেন বস্তুবাদী সমাজতন্ত্রীদের সাম্যের দাবী সঠিক হলেও তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যুলমের পরিপূর্ণ। তা মানুষের জন্য সঠিক নয় , বরং ইসলাম বিরুদ্ধ। তাই তিনি সে সমাজন্ত্রীদের তৎপরতায় সাড়া দেননি।

১৯৭২-১৯৭৫ সনে ধ্বংস করা হচ্ছিল ইসলামী মূল্যবোধের অবকাঠামোকে। আলেম সমাজকে করা হচ্ছিল লাঞ্চিত। তাদের মর্যাদা ছিল পদদলিত। এ দেশের ইতিহাসের এ ক্রান্তিলগ্নে শহীদ জিয়া হাল ধরেছেন শক্ত হাতে, অকুতভয় দেশ প্রেম , ন্যায় ইনসাফ ও মানবিকতা এবং ই্স্পাত কঠিন ঈমানী দৃঢ়তায় ।

পচাত্তরে পট পরিবর্তনের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠ হয়েই ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভাবাদর্শে উজ্জেবিত হয়ে তিনি সে আদর্শ সম্প্রসারণের জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। ইসলামী মূল্যবোধ সম্প্রসারণে কর্মরত সেক্টর সমূকে জাগিয়ে তুলেন এবং বাস্তব ময়দানে গিয়ে মতবিনিময় করে পরিকল্পনা তৈরী করে তা বাস্তবায়ন করেছেন। এর একটি প্রধান সেক্টর হলো ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এটি সাড়া দেশে শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে দিয়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

গণতান্ত্রিক চেতনার দাবীতে বলা যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের শিক্ষা হবে ইসলামের ভিত্তিতে। শহীদ জিয়া এ বিষয়টি উপলব্দি করে জাতীয় শিক্ষাকে ইসলামের আলোকে ঢেলে সাজাতে চেয়ে ছিলেন। এজন্য ১৯৮০ সনে সংসদে আইন পাশ করে ঢাকায় ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু এর অল্পসময় পর তাঁর শাহাদতের কারণে সেটার কার্যক্রম আগাতে পারেনি তাঁর পরবর্তী সরকারের অবহেলায়। এছাড়া, স্বাধীনতার পর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় শহীদ জিয়ার দ্বারা । সেটা ছিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু তাঁর শাহাদতের পর সেটাও যথাযথভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারেনি দেশী বিদেশী চক্রান্তের কারণে। তবে সে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম থেকে তাঁর ইসলামী আদর্শিক ভাবধারাটি সহজেয় অনুমেয়।

তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, সে কারিগরি শিক্ষার প্রতি গোটা মুসলিম উম্মাহ অবহেলা দেখাচ্ছে। অথচ হিকমাহ তথা প্রযুক্তিগত কারিগরি শিক্ষার প্রতি ইসলাম জোর দিয়েছে। মধ্য যুগে মুসলমানরাই এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিয়েছে। যে বিষয়টি ১৯৭৬ সনে তুরস্কের ইস্তাম্বলে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যে ব্যাখ্যা করেন। যার ফলে ওআইসির উদ্যোগে এর সদস্যভুক্ত দেশসমূহের শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য ভকেশনাল ইনস্টিইটউট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং এর স্থান হিসেবে বাংলাদেশকেই বেছে নেয়া হয়। ফলে রাজধানী ঢাকা শহর সংলগ্ন টঙ্গী বোর্ড বাজারে ওআইসির অর্থায়নে শহীদ জিয়া শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক ইসলামী কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ লাভ করেছে।

জিয়াউর রহমান ইসলামী আদর্শের উপর রাষ্ট্রপরিচালনার নীতির উপর সংবিধান সংশোধন করেন। আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ পরিত্যাগ করেন। এমনিভাবে সমাজতন্ত্রকে সামাজিক সুবিচার হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এটিও ইসলামের আদল ইনসাফ নীতির অন্তর্গত।

শহীদ জিয়া ক্ষমতায় আসা ও সংবিধান সংশোধনের পূর্বে জাতীয়তাবাদ বলতে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে বুঝানো হতো। কিন্তু এধরনের জাতীয়তা বহুভাষা ভাষী নাগরিকের একটি দেশে গ্রহণযোগ্য হয় না। এতে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়। একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্ববৌমত্ত্ব নষ্ট হওয়ার আশংকা দেখা দেয়। এসব বিবেচনায় তিনি জাতীয়তাকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হিসেবে গ্রহণ করেন। এতে বিভিন্ন ভাষার মানুষের মাঝে একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ জাতীয়তাবাদকে ধর্মের বিপক্ষে দান করেননি। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যেহেতু ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করে না বরং ধর্মকে আত্মস্থ করে, সে জাতীয়তাবাদ ইসলাম বিরোধী নয়।

শহীদ জিয়ার কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তিনি প্রধানত ইসলামী আদর্শই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের আদর্শ বাস্তবায়নে ক্রমনীতি অনুসরণ করেছিলেন। যা হয়ে থাকে স্থায়ী। এটাও মহানবী স. এ নীতি ছিল। ইসলামে মদ হারামকরণ ও দাসপ্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে এ ক্রমনীতির অনুসরণ স্পষ্ট।

শহীদ জিয়া এক সাথে পরিবর্তনের নীতি তথা বৈপ্লবিক নীতি অনুসরণ করেননি। তৎকালীন সমাজ বাস্তবতা তথা বাংলাদেশে বহুধর্মীয় সমাজ, দারিদ্র জর্জড়িত তলাবিহীন জুড়ি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্রমনীতিই যথপোযুক্ত ছিল। এজন্য তাঁর আদর্শ মূল্যায়নে বলতে হয় তাঁর নীতি ও নীতির প্রয়োগ ছিল ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক।

লেখক : ডিন, ইসলামিক ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অনুষদ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...