বাংলাদেশের জনসম্পদের মেধার উন্নয়ন, তাদের সঠিক ব্যবহার এবং প্রয়োগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন অনন্য পথিকৃৎ রাষ্ট্রনায়ক। তার সদাচিন্তা ও মোহাবিষ্টতা ছিল কীভাবে এ দেশের জনগণের মেধা ব্যবহার করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন করা যায় এবং তা প্রয়োগ করে দেশে কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, কৃষির উন্নয়ন করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়।
তিনি ছিলেন এদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত সংগ্রামী জননেতা। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমের পরীক্ষায় পরীক্ষিত বীরসেনা, রাষ্ট্রনায়ক, দেশগড়ার কারিগর, আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশের জন্য অতি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি এদেশের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক। বিশ্বদরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে স্বাতন্ত্র্য পরিচয় তুলে ধরার পথ তিনিই প্রদর্শন করেন। এ দেশে প্রথম সংকলনের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা রেখে বাকি সবগুলো পত্রিকার কণ্ঠরোধ করে হত্যা করা হয়, সেই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দল বন্ধ করে দিয়ে বাকশাল কায়েম করা হয়। রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারে তখন জনজীবন ছিল অতিষ্ঠ, অসহনীয়-নিরুপায়। রাষ্ট্রপতি জিয়াই বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন আর পত্রিকা প্রকাশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। তিনি ছিলেন সার্কের উদ্ভাবক, খাল-কাটা কর্মসূচির প্রবর্তক। আর এসব কিছু মিলিয়ে তার উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও গণমুখী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল তত্ত্ব ছিল এদেশের জনগণেরই মেধার বিকাশ ও নিজ দেশের প্রযুক্তি উন্নয়ন করে তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সম্যক উপলব্ধি ছিল, কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমান অগ্রগতি লাভ করলেই শুধু জাতির উন্নয়ন সম্ভব। তাই তিনি বিপুল জনশক্তিকে শিক্ষিত করে তোলা ও তাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুসংগঠিত এবং সুপ্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন। জনসম্পদ, যুব উন্নয়ন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-কৃষির উন্নয়নের জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, মৎস্যসহ বিশেষজ্ঞদের অবদান তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেছেন। প্রতিটি সেক্টরে তিনি রেখেছেন স্বর্ণোজ্জ্বল, আলোকময় ছাপ, উন্নয়নের ছোঁয়া। তিনি দেশের খাদ্য-সমস্যাকে এক নম্বর সমস্যা মনে করেই কার্যপ্রণালি প্রণয়নে হাত দিয়েছেন। সে লক্ষ্যেই ১৯ দফা প্রণয়ন করেছেন। খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছেন। যার মধ্যে নিহিত আছে দারিদ্র্যবিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি।
যুবকদের দিকে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনাকে সঠিক প্রয়োগ দিতে তিনি ধ্যান-ধারণা পরিচালিত করেছেন তার কর্মপ্রণালির মাধ্যমে। মেধাবী ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সঙ্গে একান্ত আপনভাবে কথা বলার জন্য, উৎসাহদানের জন্য, তার পরিকল্পনা বিশ্লেষণের জন্য সঠিক মেধাসম্পন্নদের কাছে উপস্থাপনের জন্য তিনি তাদের সমভিব্যাহারে সমুদ্র ভ্রমণে গিয়েছেন। শিশুর মেধার উন্নয়নের জন্য তিনি শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন, টিভির অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেধা যাচাই করে মেধাবীদের তুলে আনার জন্য তিনি নতুন কুড়ি অনুষ্ঠান করার ব্যবস্থা করেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি সব সময় অর্থ সাহায্য দিতেন, নানা রকম বৃত্তি প্রদান ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার, শিশু ও ছেলেমেয়েদের মেধা বিকাশে সাহায্য করতে, উদ্বুদ্ধ করতে তিনি প্রায়ই তাদের সঙ্গে নানা অনুষ্ঠানে মিলিত হতেন, সময় দিতেন মহাব্যস্ততার মধ্যেও।
বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক বিষয় ছিল তার কাছে অতি প্রিয় বিষয়। তার প্রচেষ্টাতেই ও সদিচ্ছাতেই তখন শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান এবং শিল্প গবেষণা পরিষদকে আলাদা করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। এতে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বৈজ্ঞানিকদের ক্ষোভ, দুঃখ-দুর্দশার কিছুটা লাঘব হয়। উপরন্তু তিনি এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জন্য ফেলোশিপের প্রবর্তন করেন। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য তখন সর্বপ্রথম বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি পরিষদ গঠন করেন। অনেকবার তিনি এ লক্ষ্যে বিভিন্ন গ্রুপের ও পেশার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের নিশ্চয়তা যাচাই করেছেন। তাদের উদ্বুদ্ধকরণের কাজে হাত দিয়েছেন, ঠিক সেই চিন্তাতেই তিনি তৎকালীন সময়ে নিজস্ব তহবিলের এক বিরাট অঙ্কের ১৮ কোটি টাকা খরচ করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে রিয়াক্টর কিনে দেন, যা ছিল সে সময়ের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি সব সময়ই দেশের কৃষি গবেষণার উন্নয়ন, পশুসম্পদের উন্নয়ন, সমুদ্র-সম্পদের আহরণের দিকে মনোযোগী ছিলেন। তিনিই এদেশে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ (বিএআরসি) গঠন করেন। তিনিই এ প্রতিষ্ঠানে খাদ্যশস্য, তেলবীজ, ডাল, সবজি, সয়াবিন চাষসহ কৃষি-সংক্রান্ত নানা গবেষণা উৎসাহ জোগান দিতেন, অর্থ মঞ্জুর করতেন। ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিও তিনি জয়দেবপুরে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সবসময়ই দেশীয় সম্পদের ব্যবহার, তার পেছনে দেশীয় প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে উৎসাহিত করতেন। যেমন : তিনি বলতেন, সমুদ্রে আমাদের রয়েছে অগাধ ও খনিজদ্রব্য, এসব ব্যবহার করার, উত্তোলন করার জনবল এবং অভিজ্ঞ লোকও আমাদের আছে। পশুপালন, খাদ্য উৎপাদন ও মৎস্য চাষে তার উৎসাহের অন্ত ছিল না। এসব ফিল্ডের লোকদের, গবেষকদের ও বিশেষজ্ঞদের তিনি সব সময় লালন-পালন করতে কার্পণ্য করতেন না, তাদের মতামত নিতেন, তথ্য ও জনবল পাওয়া সহজতর করে দিতেন। লক্ষ্য ছিল একটাই জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এদেশকে জনগণকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো। আর প্রযুক্তির ব্যাপারে তিনি সবসময় জাপানের লাগসই প্রযুক্তি গ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি জাপান সফরও করেছেন। তবে কোনো সময়ই তিনি কোনো সফর লক্ষ্যহীনভাবে করতেন না বা প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করে বিরাট লটবহর নিয়ে বিদেশ যেতেন না।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভিশন ছিল, আমাদের একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আর এ জন্যই একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই জাতিকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, টেকনোলজি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি, চিকিৎসাসহ সব সেক্টরে প্রভূত ও বৈপ্লবিক উন্নয়ন লাভের লক্ষ্যেও কাজ করে গেছেন। শুধু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, একটি বিদেশি আগ্রাসনমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই ছিল মহান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মনের একান্ত ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা। সেগুলোর বাস্তব রূপ দান করতে তিনি আজীবন সংগ্রাম, পরিশ্রম ও মেধা ব্যবহার করে জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে অমর হয়ে আছেন প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের হৃদয়ে। এ জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন ও দেশের জনগণের কথা চিন্তা করেছেন। তিনি দেশমাতৃকার মঙ্গলের জন্য ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি নিম্নলিখিত ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

