২০১৮ সালের ২১ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাসচালকের জন্য দুর্ঘটনার শিকার হয় দুই শিক্ষার্থী আব্দুল করিম রাজিব ও দিয়া খানম মীম। তারা শহিদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। সেই ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ পাস হয়। উদ্দেশ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা তৈরি করা এবং চালক, যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, আইনটি পাস হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর মাধ্যমে বেশ কিছু কঠোর বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ১৪ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালান, তবে ধারা ৭১ অনুসারে তার এক মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এটি সড়ক নিরাপত্তা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়নে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাব লক্ষ করা যায়।
আইনের ধারা ১৬ অনুযায়ী, প্রত্যেক যানবাহনের নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় ধারা ৭২ অনুসারে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ধারা ১৭ অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি মিথ্যা নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করেন, তবে ধারা ৭৩ অনুসারে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। তবে বাস্তবে মিথ্যা নিবন্ধন শনাক্তকরণে প্রশাসনিক জটিলতা আইনটির কার্যকারিতা সীমিত করে তুলেছে। ধারা ৩৪ অনুযায়ী, গণপরিবহনে নারী, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে। যদি কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করে, তবে ধারা ৮০ অনুসারে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড এবং চালকের জন্য অতিরিক্তভাবে এক পয়েন্ট কর্তনের বিধান রয়েছে। আইনের ধারা ৪৪ অনুযায়ী, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধারা ৮৭ অনুসারে এর সর্বোচ্চ শাস্তি তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা। ধারা ৬২ অনুসারে, যদি কোনো চালক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হন, তবে ধারা ৯৫ অনুসারে তার এক মাসের কারাদণ্ড অথবা ২০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক অবহেলা ও জনগণের অজ্ঞতা এই বিধান কার্যকর করতে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইন আছে, বিধানও কঠোর, কিন্তু বাস্তবতায় তার প্রতিফলন যেন মরীচিকার মতো। প্রতিনিয়তই সড়কে ঝরছে প্রাণ। এভাবে যতবারই সড়কে রক্ত ঝরে, ততবারই প্রশ্ন জাগে—এই আইন কি শুধু কাগজে লেখা শব্দ, নাকি এরও আছে শেকলে বাঁধা এক নিয়তি? বাস্তবায়নের পথে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য অন্তরায়, যেগুলো না কাটিয়ে আইনের শক্তি শুধু নামমাত্রই থেকে যাবে।
সম্প্রতি আমি ও আমার কজন বন্ধু অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার অংশ হিসেবে ময়মনসিংহ শহরে সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে ফিল্ড ওয়ার্ক করেছিলাম। সেজন্য ময়মনসিংহে চালক, পথচারী, ট্রাফিক পুলিশ, বাস কনডাকটরসহ মোট ২০০ জনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এ পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, অনেক চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও নিয়ম ভেঙে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। এই অনিয়ম প্রধানত দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং পুলিশের দ্বারা বারবার হয়রানির ফলস্বরূপ উদ্ভূত। বিশেষত ময়মনসিংহ সড়কে সিএনজি চালানো আইনে নিষিদ্ধ, তবুও এই নিয়ম অমান্য করা হচ্ছে। পাশাপাশি চালকদের মধ্যে আইনগত শাস্তির বিষয়ে ব্যাপকভাবে অজ্ঞতা দেখা গেছে, যা অমান্যতার একটি প্রধান কারণ এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরো জটিলতা সৃষ্টি করছে।
পরিবহন খাতে সুষ্ঠু ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ পথের ধাপ, যেখানে শুধু আইনগত কাঠামো নয়, জনগণের সচেতনতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং উন্নত অবকাঠামো প্রয়োজন। আইনটির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে যদি আমরা জনজীবনে শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম হই, তবে সারা দেশের পরিবহন ব্যবস্থা হয়ে উঠবে আরো নিরাপদ, কার্যকর ও আধুনিক।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

