অনেকের আশা, নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে? নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আমলাদের সুযোগ-সুবিধা হয়তো বাড়বে; কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত দুর্নীতি কি আদৌ কমবে? শতভাগ মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরি এবং একটি ঘুসমুক্ত প্রশাসন কি শুধু একটি ভোটের মাধ্যমেই অর্জিত হবে?
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং গভীর শিকড় গেড়ে বসা দুর্নীতি কি শুধু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে রাতারাতি দূর হয়ে যাবে? শতভাগ মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির প্রত্যাশা আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের দীর্ঘদিনের। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়তো একটি সরকার উপহার দিতে পারে; কিন্তু সেই সরকার যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত পরিবর্তন না আনে, যদি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে না পারে, তাহলে শুধু ভোটের মাধ্যমে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়োগ কমিশন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
যদি সেই ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতন্ত্রই বহাল থাকে, যেখানে জনগণের সেবার পরিবর্তে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতা বেশি, তাহলে কি কোনো মৌলিক পরিবর্তন আশা করা যায়? জনগণের দুর্ভোগ কি কমবে? বিচার বিভাগ যদি সেই আগের মতোই দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে চলতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে কতটা আশাবাদী হতে পারবে? আইনের শাসন কি প্রতিষ্ঠা হবে, নাকি দলীয় প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করবে?
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর ১৯৫৪ সালে নির্বাচন হয়েছিল। ১৯৭০ সালেও ভোটের অধিকারের প্রশ্নে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে একটি নির্বাচনও হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনের পর শান্তি ও সমৃদ্ধি আসার পরিবর্তে শেখ মুজিব তো ভোট চুরির একটি কলুষিত সংস্কৃতি তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ভোটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। বারবার দেশের মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আসলে এই রাষ্ট্রীয় পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন অত্যাবশ্যক। এই দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র বহাল রেখে যদি কিয়ামত পর্যন্ত নির্বাচন হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। নির্বাচিত ব্যক্তি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন ছাড়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, যেখানে গণতন্ত্রের নামে ফ্যাসিবাদ ফিরে ফিরে আসবে।
সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একটি জনমুখী প্রশাসনের সুস্পষ্ট গ্যারান্টি। এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত করবেন, ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে নয়। যেখানে আমলাতন্ত্র জনগণের প্রতি প্রকৃত অর্থে দায়বদ্ধ থাকবে, ক্ষমতার দম্ভ পরিহার করে দ্রুত ও কার্যকর সেবা প্রদানে সদা প্রস্তুত থাকবে।
সুতরাং, শুধু একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
অতএব আমাদের শুধু একটি ‘ভালো’ নির্বাচন নয়, প্রয়োজন একটি ‘ভালো’ রাষ্ট্রব্যবস্থা। যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে। এখন প্রশ্ন হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আমরা কীভাবে অর্জন করব? শুধু একটি নির্বাচনের মাধ্যমেই কি সেই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব? নাকি এর জন্য আরো বৃহত্তর এবং গভীর সংস্কারের প্রয়োজন? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই আজ আমাদের প্রধান কর্তব্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

