বাংলাদেশের ইতিহাসের বয়ানের রাজনীতি যদি আমরা খেয়াল করি, তা হলে দেখাব এটার যে ঐতিহাসিক ন্যারেশন, তা আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করেছে এবং হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাস শুরু হয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে। এর পরে ’৭১ সালের জনযুদ্ধকে পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দলীয় কৃতিত্ব বলে জাহির করার মধ্য দিয়ে গোটা ইতিহাসের প্রকল্পকে ফ্যাসিবাদ কায়েমের সহায় করে ফেলা হয়েছিল। ‘ট্র্যাডিশন ইজ ওল্ডার দেন ফ্যাসিজম’—উমবার্ত একোর এ বিখ্যাত কথা বাংলাদেশের বেলায় হুবহু সত্য। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ভারতীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা এমনভাবে জাহির করেছেন যে, আওয়ামী লীগ খুব সহজেই ফ্যাসিবাদ কায়েমের ঐতিহাসিক যুক্তি তৈরি করতে পেরেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই ভুয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান গোটা জাতীয় ইতিহাসের মুক্তির সুযোগ করে দিয়েছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এ কালের তরুণরা যে এখনকার ইতিহাসের কর্তা, তারা নিজের জীবন দিয়ে যে ইতিহাস তৈরি করেছে, তার স্মারক হিসেবে দেরিতে হলেও এই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র হাজির হলো। এর মাধ্যমে গোটা জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসের প্রকল্পকে ’২৪-এর আলোকে পাঠের একটা প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হলে মধ্য জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে আন্দোলন চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। সব বিরোধী দল ও সর্বস্তরের জনগণ রাস্তায় নেমে এসে ফ্যাসিবাদী হাসিনার পতন ঘটায় ৫ আগস্ট। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে অশ্রয় নেন।
এরপর এই আন্দোলনের স্টেক নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। সব বিরোধী দল ও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে যে সরকার গঠিত হয়, তার নাম হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু একদল লোক মনে করে এটাই বিপ্লবী সরকার হবে। সংবিধান থেকে শুরু করে তারা সবকিছু বাতিল করে দিয়ে একদম নতুন করে দেশ গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তারা পুরোনো সংবিধানের অধীনে শপথ নেয়। সেনা-পুলিশ-আমলাতন্ত্র সবকিছুই আগের মতো থেকে যায়, শুধু কিছু লোক পরির্বতন হয়।
বিরোধী দলগুলো নিজেদের অনুগত লোকদের প্রথম দিকে সরকার পরিচালনায় যুক্ত করার চেষ্টা করে কিছুটা সফল হলেও পরে সেটা ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও ছাত্রদের মধ্যে বেশকিছু বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয়। আন্দোলনে যেহেতু বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এমন বিপুল ছাত্ররাও নিজেদের দলীয় পরিচয় আড়ালে রেখে শামিল হয়েছিল, ফলে তারা যখন এই নতুন ছাত্র নেতৃত্বকে একচ্ছত্রভাবে মেনে নিতে অস্বীকার করে, তখন ধীরে ধীরে ছাত্ররা বুঝতে পারে এভাবে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়। জাতীয় ঐক্য জরুরি। ভারতীয় প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য দ্রুতই গড়ে ওঠে। ফলে ছাত্ররা যে আমূল বৈপ্লবিক পরিবর্তন করে ফেলতে পারবে ভেবেছিল, তা তো আসলে বাস্তবসম্মত ছিল না। ফলে তারা দেখল, এই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস যদি না থাকে তাদের অস্তিত্বই থাকবে না। অন্যদিকে এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের যে নয়া স্বপ্ন তা নাগরিকভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রসমৃদ্ধ একটা দেশে রাজনৈতিক দল ছাড়া ও জনগণের নির্বাচিত সরকার ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই আগামীর পরিবর্তন বা পুনর্গঠন কোন স্পিরিটের আলোকে হবে, তার একটা ঘোষণাপত্র দেওয়াই এই অভ্যুত্থানকে প্রাসঙ্গিক রাখার একটা কার্যকর প্রক্রিয়া হতে পারে এবং পরে যারাই নির্বাচিত হয়ে আসুক, তাদের এই ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে চাপ প্রয়োগ করা যাবে। হাজার হাজার শহীদ ও আহতদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই প্রোক্লামেশনকে পাশ কাটানো কঠিন হবে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য। অন্যদিকে এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আগামীতে ছাত্ররাও নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি আকারে হাজির করার সুযোগ পাবেন। গণঅভ্যুত্থানই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নয়। এটাই ক্ষমতায় থাকার ম্যানডেট নয়। এটা এখন সবার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য রাজনীতি দরকার। রাজনীতিহীন ক্ষমতা একটি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, সেটা যারাই করুন।
কাজেই এই ঘোষণাকে একদিক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির প্যারাডাইম শিফ্ট হিসেবে দেখা যেতে পারে, ’২৪-এর ঐতিহাসিক কর্তাসত্তার উম্মেষের দলিল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। আগামী দিনের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এই নতুন কর্তাসত্তাকে কে কতটা ধারণ করতে পারছেন।
২.
ব্যাখ্যার রাজনীতি
একটা ইভেন্ট বা ঘটনা ঘটে গেলে তার পরে সামাজিক পরিসরে, যা শুরু হয় তাকে বলে ব্যাখ্যার রাজনীতি বা যেটাকে বলে পলিটিক্স অব হারমনিউটিক্স। এখন এই প্রিয়্যাম্বল কতটা আগামীতে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে এর মধ্যে অভ্যুত্থানের কালেকটিভ বা প্লুরাল সাবজেক্টিভিটিকে কতটা ধরতে পারা গেছে। জনগণের সম্মিলিত স্পিরিট এখানে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, এটার ট্রুথফুলনেস ও পয়েটিক স্পিরিচুয়ালিটিই এটার ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নির্ধারণ করে দেবে। এটার মধ্যে যদি জনগণের মুক্তির যে স্পিরিট তাকে জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার মধ্যে যে কালেকটিভ সলিডারিটি জেগে উঠেছিল তাকে ধারণ করা না যায় এবং যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বা ধারণার কোনো ভাষা ছিল না, কিন্তু প্রকাশ ছিল মিছিলের স্রোতে। যে মুক্তির ‘আইডিয়া উইথাউট ল্যাঙ্গুয়েজ’ পৌঁছে গিয়েছিল লাখ লাখ মানুষের মনে। সেই বিমূর্ত কর্মকাণ্ডগুলোকে যদি এটা ধারণ করতে না পারে, তা হলে এর ইনফিনিট ইন্টারপ্রিটেশনের সক্ষমতা থাকবে না। তখন এটা গোটা জাতীয় ঐক্যের প্রতিধ্বনি না হয়ে একটা গোষ্ঠীর স্বার্থ ও প্রাধান্য বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আবার শুধু ধারাবাহিক ইতিহাসের বয়ানও একটা প্রোক্লামেশনকে কার্যকর করতে পারে না। এর মূল হলো স্পিরিট। আর স্পিরিট সঞ্চারের জন্য লাগে সত্যিকারের প্রজ্ঞাময় ইনোসেন্সি। কোনো চালাকি থাকলে তার ট্রান্সিডেন্ট ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ’২৪-এর প্রিয়্যাম্বল এই প্রজন্মের প্রজ্ঞা ও দার্শনিক সততার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় এই প্রজন্ম ফেইল করলে এটার ঐতিহাসিক যে সম্ভবনার কথা আমরা বলছি, তা তৈরি হবে না। উল্টো মানুষ এটাকে এই প্রজন্মের চিন্তাহীন উৎকল্পনা হিসেবে বাতিল করে দেবে।
আমরা দেখেছি ’৭১-এর ঘোষণার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা গেলেও পরে মানুষ এটাকে গুরুত্ব দিয়ে নিতে পারেনি। কেননা, যারা যুদ্ধের মাঠে ছিল তারা বাদে যারা যুদ্ধ থেকে দূরে ভারতে প্রবাস জীবন কাটিয়েছে তারা পরে ব্যাখ্যা করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এবং এটাকে দাঁড় করিয়েছে মেজরিটি মুসলমানের স্পিরিটের বিরুদ্ধে। ভারতের গোলামির একটা দলিল বানিয়েছে ’৭১-কে। ফলে এই প্রোক্লামেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এর মধ্যে পবিত্র স্পিরিটের কালেকটিভ কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হওয়ার মতো স্পেস থাকতে হবে। সবাইকে স্পেস দিতে পারতে হবে। এর বিমূতর্তাও জরুরি, যাতে করে এটার একাধিক সৃজনশীল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়। এটা একরৈখিক হলে এখান থেকে বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ কণ্ঠ ও স্পিরিটের রাজনীতি তৈরি হওয়ার সুযোগ পাবে না। এর নৈতিক ও স্পিরিচুয়াল বিউটিই এটাকে অনন্ত আয়ু দিতে পারে।
অন্যদিকে সবাইকে ধারণ করার বদলে মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়ার বদলে যদি কৌশলে কোনো বিশেষ মতার্মশকে প্রাধান্য দেওয়া বা এটা যদি একদল লোকদের পছন্দের চিন্তা ও রাজনৈতিক বয়ান তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তৈরি করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়ে থাকে, তা হবে খুবই দুঃখজনক। আর যখন এটা নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা করা শুরু হবে, তখনই এর ট্রুথ বা এসন্স আছে কি না, তা ধরা পড়বে। ফলে সরল ওপেননেসকে আমলে না নিয়ে বিশেষ কোনো আদর্শকে প্রধান্য দেওয়ার জন্য এই জন্য একটা বিলম্বিত প্রোক্লামেশন তৈরি করা হয়, তা হলে এটা কয়েক পাতা কাগজ ছাড়া আর কোনো গুরুত্ব তৈরি করবে না জাতীয় জীবনে। এজন্য আন্দোলনের যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, যে স্পিরিটকে ধারণ করে এবং জনগণের ও সব বিরোধী দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন যে বাংলাদেশ আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার মূল শক্তি হলো ট্রুথ। এটা অনেকটা কবিতার মতো। অনেক সুন্দর শব্দ দিয়ে লেখা একটা বানানো কবিতা যেমন মনকে প্রশান্ত করতে পারে না, কিন্তু খুব সৎ উপলব্ধির দুটা লাইনই অনেক সময় মনে বিশাল আলোড়ন তুলতে পারে এবং পাঠক পড়া মাত্রই এর সত্য ও স্পিরিচুয়ালিটিকে কানেক্ট করতে পারেন। জাতীয় প্রোক্লাইমেশনও অনেকটা এরকম পয়েটিক ট্রুথফুলনেস ডিমান্ড করে।
কাজেই এই ঘোষণাপত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আমলে নিয়েও বলতে হবে, এর নৈতিক-স্বচ্ছতা ও সরল বিমূর্ততাই এই ঘোষণাপত্রের প্রাণসঞ্চার করতে পারে। আগামী দিনের রাজনীতি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: রাজনৈতিক চিন্তক ও সম্পাদক-জবান
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

