কিস্তি-৪

জুলাই কেন আমাদের লড়াই?

জুলাই কেন আমাদের লড়াই?

জুলাই সনদে স্বচ্ছ নির্বাচনের নিশ্চয়তা

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা বর্তমান কাঠামোতে দলীয়করণের কবলে পতিত হয়। একটি মৌলিক বিষয়ে এ দেশের সকল রাজনৈতিক দলই একমত যে, বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন অস্থায়ী নিরপেক্ষ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন বিষয়ক প্রস্তাবনা জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনে ছিল যে, দেশের প্রধান বিচারপতি যিনি থাকবেন, তিনিই হবেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এই সুনির্দিষ্ট আইনি সুযোগটি গ্রহণ করার জন্য ২০০১-২০০৬ আমলে বিএনপি সরকার তদানীন্তন প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা আইন সংশোধন করে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ তৎকালীন সময়ে যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন, তিনি রাজনৈতিকভাবে বিএনপির পছন্দের লোক ছিলেন মর্মে অভিযোগ উঠেছিল। অবসরের বয়স আইন সংশোধন করে দুই বছর বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, যেন বয়স বৃদ্ধির কারণে তিনিই স্বাভাবিক নিয়মে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদের যোগ্যতা লাভ করতে পারেন। এই আইনি পরিবর্তনের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তাদের পছন্দের ব্যক্তি আসার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তৎকালীন সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধেই আওয়ামীলীগ তীব্র আন্দোলন শুরু করে এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে দেশে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা ১১ই জানুয়ারির জরুরি অবস্থা ও সামরিক সমর্থিত সরকারের আগমন ঘটেছিল। অতএব, এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জুলাই সনদের ফর্মুলা অনুযায়ী এমন একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, যেন আগামী দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতাসীন সরকারি দলের একক পছন্দের ভিত্তিতে গঠিত হতে না পারে। অতীতে যে ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা ছিল, তা দূর করার জন্যই একটি সম্মিলিত বাছাই কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন সরকার, মূল বিরোধী দল এবং সংসদের দ্বিতীয় প্রধান বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে। এই সর্বদলীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করে নির্ধারণ করবে যে, কাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানানো যায়।

এই প্রক্রিয়ায় কেবল সরকারের একক পছন্দ হলেই চলবে না, সমানভাবে বিরোধী দলেরও তাতে আস্থা ও সম্মতি থাকতে হবে। সহজ ভাষায়, এর পদ্ধতিটি হবে, এক পক্ষ নাম প্রস্তাব করবে এবং অপর পক্ষ তা সমর্থন করবে। স্বাভাবিক নিয়মেই এক পক্ষ এমন কোনো ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে যার ওপর তাদের কিছুটা আস্থা রয়েছে; আর অপর পক্ষ তখনই তা সমর্থন করবে যখন সেই ব্যক্তির প্রতি তাদের নিজেদেরও বিশ্বাস থাকবে। ফলশ্রুতিতে, এমন একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিই কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে আসতে পারবেন, যাঁর নাম সরকারি দল প্রস্তাব করতে পারে এবং বিরোধী দলও দ্বিধাহীনভাবে সমর্থন করতে পারে। কাজেই, জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যে নতুন ফর্মুলা বা রূপরেখা আনা হয়েছে, সেই অনুযায়ী কাজ হলে গঠিত সরকারের প্রতি শাসক দল বা বিরোধী দল, কারও কোনো যৌক্তিক আপত্তি থাকার সুযোগ থাকবে না।

এই প্রক্রিয়ায় এমন একজন ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া যাবে, যাঁর নিরপেক্ষতার ওপর উভয় পক্ষেরই আস্থা রয়েছে।

সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রধান স্তম্ভটি হলো ‘নির্বাচন কমিশন’, যার ওপর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার বিরাট দায়িত্ব অর্পিত থাকে। প্রচলিত নিয়মে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এককভাবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। আর প্রধানমন্ত্রী যখন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের একক ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিজের দলের প্রতি অনুগত বা বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তিকেই সেই পদে বসিয়ে দেন। কাজেই, নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হলে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের এই ক্ষমতাকেও প্রধানমন্ত্রীর একক হাত থেকে এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। জুলাই জাতীয় সনদে নির্বাচন কমিশন গঠনকেও সর্বদলীয় বাছাই কমিটির হাতে ন্যাস্ত করা হয়েছে। এতে নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের নিশ্চয়তা তৈরি হয়।

জুলাই সনদে ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ

মূলত এগুলোই হল জুলাই জাতীয় সনদের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত থাকা সেই সকল বৃহৎ ও মৌলিক রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রধান প্রধান প্রস্তাবনা। এর প্রথম ও প্রধান লক্ষ্যই হল, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা দূর করে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এই ভারসাম্যটি মূলত এভাবে আনা হবে যে, রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু স্বাভাবিক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নিকট থাকবে, সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিশেষ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে হস্তান্তর হবে, কিছু ক্ষমতা চলে যাবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশনের কাছে এবং বাকি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও তদারকির ক্ষমতা নতুন কিছু স্বাধীন কমিশন তৈরি করে তাদের হাতে বণ্টন করে দেওয়া হবে। এইভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাগুলো যখন বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুষমভাবে বিভক্ত হবে, তখন কোনো একক স্বৈরাচারী শাসক বা দলের পক্ষে সমগ্র রাষ্ট্রকে নিজের দলীয় সম্পত্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে না। বর্তমান ব্যবস্থায় দেখা যায়, নামেমাত্র একটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন করা হয় ঠিকই, কিন্তু পরবর্তীতে সেই কমিশনের শীর্ষ পদে সরকার নিজের পছন্দের অনুগত লোক নিয়োগ দেয়। ফলস্বরূপ, ক্ষমতাসীনরা দেদারসে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও দুর্নীতি করতে থাকে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব যাদের ওপর, সেই প্রতিষ্ঠানটি নিজেই শেষ পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্তদের রক্ষাকবচে পরিণত হয়; যার কারণে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ সম্পদ অবাধে লুটপাট হয়ে যায়।

অতএব, এই সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই এই নতুন বন্দোবস্ত তৈরি করা হয়েছে। প্রথমত, দেশে যেন একটি সম্পূর্ণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই নির্বাচন কমিশন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিদ্যমান পদ্ধতিতে এই মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রে যেন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থ লোপাট বা ব্যাপক দুর্নীতি না হতে পারে, সেজন্য দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এককভাবে প্রধানমন্ত্রী যেন নিজের লোক নিয়োগ দিতে না পারেন, জুলাই সনদে সেই প্রস্তাব আনা হয়েছে। একইভাবে, বিচার বিভাগ যেন কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত না হয়, সেজন্য বিচারক নিয়োগের স্বাধীন ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের সিভিল প্রশাসন যেন দলীয়করণের কবল থেকে মুক্ত থাকে, সেজন্য পাবলিক সার্ভিস কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং দেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এইভাবে মূলত রাষ্ট্রে দুর্নীতি প্রতিরোধ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ সুগম করা এবং দেশের সামগ্রিক সিভিল প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দলীয়করণের হাত থেকে মুক্ত রাখার সুনির্দিষ্ট পথ খোঁজার লক্ষ্যেই জুলাই সনদের এই রূপরেখা ও সংস্কারের প্রস্তাবসমূহ আনা হয়েছে। পরবর্তীতে এই দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রস্তাবনাগুলোকে সংক্ষেপ করে গণভোটের জন্য প্রধানত চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছিল। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই চার প্রশ্নের মাধ্যমে মূলত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের আইনী ভিত্তি কার্যকর হয়।

এর পাশাপাশি প্রশ্ন ছিল, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে যেসকল সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর সাথে আপনি একমত কি না। আর ছিল রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য আনার উদ্দেশ্যে সংসদের ‘উচ্চ কক্ষ’ গঠন সংক্রান্ত।

রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, যেকোনো নতুন বিল পাস এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একদলীয় আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে ভারসাম্য আনা অত্যন্ত জরুরি, এই বিষয়ে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলই নীতিগতভাবে একমত হয়েছিল। বিদ্যমান এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থায় নিম্নকক্ষে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে, তারা সেই সংখ্যার জোরে যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের বিল অনায়াসে পাস করিয়ে নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংসদের বিরোধী দলগুলো বিরোধিতা করলেও, বাস্তবে তাদের সেই প্রতিবাদ কেবল মৌখিক সমালোচনা, টেবিল চাপড়ানো কিংবা ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়; আইন পাস রোধ করার মতো কোনো আইনগত বা বাস্তব ক্ষমতা বিরোধী পক্ষের থাকে না। আইনসভার ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থেই মূলত ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘উচ্চ কক্ষ’ গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই উচ্চ কক্ষের প্রয়োজনীয়তা এবং এর মোট সদস্য সংখ্যা যে ১০০ হবে—এই বিষয়ে বিএনপি এবং অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছিল। কিন্তু মূল দ্বিমতটি তৈরি হয়েছিল এই উচ্চ কক্ষের সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। জুলাই সনদে অধিকাংশ দলের প্রস্তাবনা ও দীর্ঘ আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছিল যে, উক্ত উচ্চ কক্ষটি গঠিত হবে নির্বাচনের ‘পিআর পদ্ধতি’ বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার ভিত্তিতে।

এই পিআর পদ্ধতির মূল সূত্র হল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমগ্র দেশে মোট যে পরিমাণ ভোট কাস্ট হবে, তার মধ্যে যে রাজনৈতিক দল যত শতাংশ ভোট লাভ করবে, উক্ত দল সংসদের উচ্চ কক্ষেও ঠিক তত শতাংশ আসন পাবে। যেমন এই পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (বিকেএম) প্রাপ্ত ভোট ২.০৯% অনুপাতে দুজন সদস্য নিশ্চিত হয় এবং বাড়তি আরও ০.৯% ভোট অবশিষ্ট থাকে, যার বিপরীতে জোটগত হিসাবে আরও একটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

দেশের প্রধান দল বিএনপি তাদের রাজনৈতিক জোটসহ নির্বাচনে মোট প্রাপ্ত ৫০ শতাংশ ভোটের বিপরীতে ৫০টি আসন লাভ করবে। আর অপরপক্ষে বিরোধী জোটের সব দল মিলিয়ে প্রাপ্ত ৪০ শতাংশ ভোটের বিপরীতে তারা উচ্চ কক্ষে ৪০টি আসন লাভ করবে। অবশিষ্ট আসনগুলো স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলগুলোর মাঝে বিন্যস্ত হবে।

জুলাই সনদে উচ্চকক্ষে পিআর

উচ্চ কক্ষের সদস্য নির্বাচনের এই সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতির প্রস্তাবের ওপর বিএনপির দ্বিমত ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। তাদের প্রস্তাব ছিল, উচ্চ কক্ষের আসন বণ্টন এভাবে কাস্ট হওয়া মোট ভোটের শতাংশের ভিত্তিতে না হয়ে, বরং সংসদের নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত সরাসরি আসনের অনুপাতের ভিত্তিতে হতে হবে।

এই মতের পেছনের দলীয় হিসাবটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিম্নকক্ষে যদি বিএনপি একাই ২১১টি আসন লাভ করে, বিরোধী জোট যদি পায় ৭৭টি আসন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি লাভ করে ৭টি আসন; তবে নিম্নকক্ষের এই ২১১টি আসনের বিশাল সংখ্যার অনুপাতের জোরে তারা উচ্চ কক্ষের ১০০টি আসনের মধ্যে একাই প্রায় ৭০ বা ৭১টি আসন পেয়ে যাবে। অপরদিকে বিরোধী জোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সব মিলিয়ে অবশিষ্ট মাত্র ২৯টি আসন লাভ করবে। অর্থাৎ, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, পিআর বা ভোটের শতাংশের পদ্ধতিতে যেখানে বিএনপি জোট উচ্চ কক্ষে ৫০টি আসন পাচ্ছিল, সেখানে নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতের এই পদ্ধতিতে তারা এক লাফে ৭১টি আসন পেয়ে যাচ্ছে। মূলত উচ্চ কক্ষ গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং উচ্চ কক্ষের আইনগত ক্ষমতা কতটুকু থাকবে, এই পয়েন্টটি ঘিরে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল এবং এই বিষয়টিকেও সুনির্দিষ্টভাবে গণভোটের চার প্রশ্নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

অতএব গণভোটের মূল লক্ষ্যই ছিল, জুলাই সনদে মৌলিকভাবে যেসকল সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তার ওপর কোনো দলের নিজস্ব নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও, চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই ভিন্নমতগুলোকে এক পাশে রেখে অনুমোদিত মূল সিদ্ধান্তগুলোকেই সংবিধানে বাস্তবায়ন করতে হবে। এমন এক আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন একটি বিশেষ সংস্কার পরিষদ গঠনের ম্যান্ডেট পাওয়ার উদ্দেশ্যেই দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের মানুষ গণভোটের মাধ্যমে তাদের রায় বা ম্যান্ডেট প্রদান করল যে, ‘হ্যাঁ, আমরা এমন একটি শক্তিশালী সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদের মৌলিক চেতনার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের পূর্ণ ম্যান্ডেট বা অনুমতি প্রদান করলাম।’

গণভোটের আইনী ভিত্তি

কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এই যে গণভোটটি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, তা বর্তমান সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট ধারায় বা আইনি বিধিতে উল্লেখ নেই। এই কারণে এই বিশেষ আইনি শূন্যতা দূর করতে এবং গণভোটের আয়োজনকে বৈধতা দিতে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছিল, যার নাম ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’। রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে জারি করা সেই আদেশের মূল শর্তই ছিল যে, জুলাই সনদকে সাংবিধানিক রূপ দিতে হলে দেশে একটি গণভোটের আয়োজন করতে হবে এবং সেই গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে, তবে জুলাই সনদের রূপরেখা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক হবে। রাষ্ট্রপতির সেই বিশেষ আদেশের ওপর ভিত্তি করেই দেশে সফলভাবে গণভোট সম্পন্ন হয়েছিল এবং জনগণ ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় প্রদান করেছিল। ফলে আইনগতভাবে দেশে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠিত হওয়ার কথা ছিল এবং রাষ্ট্রপতির সেই আদেশে এটিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এই সংবিধান সংস্কার পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ঠিক এই চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেই সমগ্র প্রক্রিয়াটি থমকে গেল।

বিপ্লব থেকে গণভোট ধাপে ধাপে

সমগ্র ঘটনার শুরু থেকে পুনরায় ক্রমানুসারে অবলোকন করলে এর বাস্তব চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

প্রথম ধাপে ২০২৪ সালের ৩৬শে জুলাই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব বা অভ্যুত্থান সংঘটিত হলো, যার প্রধান দুটি অভিপ্রায় ছিল ফ্যাসিবাদের অবসান এবং বৈষম্যের বিলোপ সাধন।

দ্বিতীয় ধাপে, অভ্যুত্থানের সেই মূল স্পিরিট ও চেতনাকে ধারণ করে একটি সনদ প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করা হলো।

তৃতীয় ধাপে, সেই কমিশনের দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ চূড়ান্তভাবে তৈরি ও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হলো।

চতুর্থ ধাপে, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদের ওপর দলগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর সম্পন্ন হলো।

পঞ্চম ধাপে, জুলাই সনদকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে এবং একটি গাঠনিক ক্ষমতাসম্পন্ন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্য হলো।

ষষ্ঠ ধাপে, এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে আইনী বৈধতা দিয়ে এবং গণভোট আয়োজনের নির্দেশ দিয়ে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশ বা ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হলো।

সপ্তম ধাপে, রাষ্ট্রপতির সেই আদেশের ওপর ভিত্তি করে দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠিত হলো এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নির্বাচিত হলো।

আইনি বিধি অনুযায়ী, এই নির্বাচিত ৩০০ জন সদস্যের জন্য নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেল, সেই ৩০০ জন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে কেবল ৭৭ জন সদস্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শপথ গ্রহণ করলেন এবং বাকি সদস্যগণ শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকলেন। ফলে রাষ্ট্রপতির আদেশে উল্লিখিত সেই নির্ধারিত এক মাসের সময়সীমা বা ডেডলাইনটি অতিক্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রপতির সেই বিশেষ আদেশের আইনগত কার্যকারিতাও শেষ হয়ে গেল।

গণভোট নিয়ে আইনী বিতর্ক

এই সুযোগে বিএনপি এখন সম্পূর্ণ নতুন একটি আইনি বিতর্ক সামনে নিয়ে এসেছে; তারা দাবি করছে যে, রাষ্ট্রপতির আদতে এই ধরনের বিশেষ আদেশ জারি করার আইনগত এখতিয়ার বা সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনাই নেই। এটিই এখন তাদের প্রধান ও মৌলিক বক্তব্য। এর বিপরীতে আমাদের প্রধান যুক্তি হল, রাষ্ট্রপতি এই ধরনের আদেশ জারি করতে পারেন কি পারেন না, সেই আইনি প্রশ্নটি আপনারা এখন তুলছেন কেন? যখন দেশের সকল রাজনৈতিক দল একমত হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে, একটি গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে এবং তার মাধ্যমেই জুলাই সনদের সমস্ত এজেন্ডা সংবিধানে প্রতিস্থাপন করা হবে- তখন কেন এই আপত্তি উত্থাপন করা হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তরে তাদের পক্ষ থেকে যে রাজনৈতিক কৈফিয়ত দেওয়া হচ্ছে তা হল, তারা যদি নির্বাচনের পূর্বে এই আইনি প্রশ্নটি তুলত, তবে তা নিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারত এবং দেশে জাতীয় নির্বাচন আরও বিলম্বিত হতে পারত। এই কারণে তারা কৌশলগতভাবে তখন বিষয়টি মেনে নিয়েছিল। অর্থাৎ, তাদের মানসিকতা বা কৌশলটি ছিল এই যে, নির্বাচনে জয়লাভ করে পাস করার পর তারা এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে না। কিন্তু নির্বাচনের আগে তারা তাদের মনের কথা গোপন রেখেছিল, যেন নির্বাচন বিলম্বিত না হয়। এটিই হল বর্তমান রাজনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি।

সংকটের সমাধান কী?

এমতাবস্থায় এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, আগামীর দিনগুলোতে এই সংকটের সমাধান কী এবং সামনে আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে? দেশে যে ৩০০ সদস্যের “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” নির্বাচিত হয়েছে, তার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ শপথ না নেওয়ায় প্রক্রিয়াটি ঝুলে গেছে ঠিকই, কিন্তু এখনো যদি দেশের প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলো পুনরায় পারস্পরিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তবে সেই পরিষদের বাকি সদস্যদেরও নতুন করে শপথ গ্রহণের আইনি সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশে যদিও স্পষ্টভাবে বলা ছিল যে, এক মাসের মধ্যে শপথ নিতে হবে, কিন্তু নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে শপথ না নিলে কী হবে সেই বিষয়ক আদেশে কোনো নেতিবাচক কথা উল্লেখ ছিল না। সুতরাং এক মাসের মধ্যে শপথ না নিয়ে তারা জাতির সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তবে এর প্রায়াশ্চিত্তের পথ খোলা আছে। যেমন নির্দিষ্ট ওয়াক্ত বা সময়ের মধ্যে নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। কিন্তু কেউ যদি ওয়াক্তের মধ্যে নামাজ আদায় না করে, তবে নির্দিষ্ট সময়ে তার নামাজটি আদায় হল না এবং সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার কারণে সে গোনাহগার হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তার প্রায়াশ্চিত্যের সুযোগ থাকে ‘কাজা নামাজ’ আদায় করার মাধ্যমে। ঠিক তেমনই উপরোক্ত রাজনৈতিক ভুলের ক্ষেত্রেও একটি আইনি কাযা করার সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। যদি তারা কাযা করে নেয়, তবে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।

বাস্তব কথা এটাই যে, নির্ধারিত এক মাসের মধ্যে অধিকাংশ সদস্য শপথ না নেওয়ার কারণে সংবিধান সংস্কার পরিষদটি পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হতে পারেনি এবং এর প্রাথমিক সময় বা ওয়াক্তটি শেষ হয়ে গেছে। এখন এর পরবর্তী সমাধান হিসেবে আমরা মনে করি, নির্বাচিত এই সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যে যেকোনো সময় এই আইনি ভুলের কাযা সম্পন্ন করার বা শপথ নেওয়ার সুযোগটি বহাল রয়েছে। তবে তারা স্বেচ্ছায় এই কাযা করবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ও সামাজিক ‘চাপ’ বা আন্দোলনের ওপর; যার কোনো সহজ বিকল্প এই মুহূর্তে নেই।

সমাধান জনতার আদালতে

ক্ষমতার রাজনীতিতে আপনি মাঠ পর্যায়ে যতটুকু জনমত গঠন করতে পারবেন, যতটুকু শক্ত চাপ বা রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন, ঠিক তার ওপর ভিত্তি করেই শেষ পর্যন্ত তারা এই গণরায় ও জুলাই সনদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে।

ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের সূচনা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের নেপথ্যের সমস্ত মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রম পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে আমাদের তথা জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির প্রধান দাবি হল, যেকোনো মূল্যে জনগণের দেওয়া গণভোটের সেই রায়কে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হল, এই গণভোটের রায় কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট উপায় কী?

এর একমাত্র কার্যকর উপায় হল, এবারের জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ জনগণের ভোটে যারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা অবিলম্বে সেই সংস্কার পরিষদটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করুক। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এবারের নির্বাচনে দেশের যেসকল প্রতিনিধি জয়লাভ করেছেন, তারা মূলত একই সাথে দেশের আইনসভার সদস্য (MP) হিসেবে এবং একই সাথে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য’ হিসেবে দ্বৈত ভূমিকায় নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদে শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যকারিতা ও মেয়াদ শুরু হয়ে গেছে; কিন্তু সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা এখনো শপথ না নেওয়ার কারণে সেই পরিষদের কার্যক্রম এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারেনি। তবে তাদের কার্যক্রম শুরু না হলেও, এর আইনী সম্ভাবনা কিন্তু বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; যেকোনো দিন যদি তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে নেন, তবে সাথে সাথেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও তাদের আইনগত কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

সংস্কারে অনীহা কেন?

তবে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমানে এই কাঠামোগত সংস্কারের প্রক্রিয়াটি মোটেও চাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, জনগণের ম্যান্ডেট থাকার পরেও তারা কেন এই সংস্কারের বিরোধিতা করছে? এর মূল কারণ হল, জুলাই সনদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস করে ক্ষমতার যে ভারসাম্য আনা হয়েছে, তা তারা নীতিগতভাবে মেনে নিতে পারছে না। এই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জায়গাতেই তাদের নোট অব ডিসেন্ট। একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন স্বাধীন কমিশনের ওপর যে বিশেষ এখতিয়ার অর্পণ করা হয়েছে, সেই ক্ষমতাও তারা বিচার বিভাগকে দিতে রাজি নয়। কারণ এখানেও রয়েছে তাদের নোট অব ডিসেন্ট।

দেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) স্বাধীন করে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দলীয়করণমুক্ত করার যে রূপরেখা, তাও তারা চাচ্ছে না; ফলে এখানেও রয়েছে তাদের নোট অব ডিসেন্ট। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাবটিতেও বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, জুলাই সনদের যেসকল মৌলিক পরিবর্তনের দ্বারা রাষ্ট্র থেকে বৈষম্যের বিলোপ ঘটবে এবং যেসকল আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের পথ রোধ হয়ে যাবে- তার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান জায়গায় বিএনপি তাদের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে।

July

জুলাই সনদে চূড়ান্ত স্বাক্ষরের ঠিক পূর্বমুহূর্তে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভেতরের কিছু অংশের সাথে নেপথ্যে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে, অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তারা সনদের ভেতরে যে বিশেষ শর্তটি (নির্বাচনী ইশতেহার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ) গোপনে জুড়ে দিয়েছিল তা যদি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য দলগুলো সময়মতো জানতে পারত, তবে হয়ত কেউই সেদিন সেই সনদে স্বাক্ষর করত না। আর দলগুলো যদি সেদিন স্বাক্ষর না করত, তবে তখনই মাঠ পর্যায়ে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে যেত। আর সেই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে, নির্বাচনের পূর্বে আলোচনার টেবিলে এই বিষয়টিই সবার আগে চূড়ান্ত হত যে, সংবিধান কোন পদ্ধতিতে সংস্কার করা হবে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি নিশ্চয়তা কী হবে; তা আগে নির্ধারণ করে তবেই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা লাগত। মূলত এটিই হল পর্দার আড়ালের প্রকৃত সত্য এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ ঠিক এই জটিল ও অমীমাংসিত সন্ধিক্ষণেই এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রতারণা কেন রুখতে পারল না?

এখানে একটি প্রশ্ন হয় যে, নেপথ্যের এই জালিয়াতিকে যে ‘অন্তহীন প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তবে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে তো জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী এনসিপির নেতারাও উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁরা কেন এটি রুখতে পারলেন না?

এই প্রশ্নের উত্তর হল, এনসিপির যেসকল ছাত্র প্রতিনিধি বা নেতৃবৃন্দ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে শামিল ছিলেন, তারা এই গোপন আঁতাতের ঘটনা জানতেন না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুয়েকজন ব্যক্তি গোপনে বিএনপির সুবিধার্থে এই জালিয়াতির কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন।

ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন

আরেকটি প্রশ্ন হয় যে, জুলাই সনদের সংস্কার অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কিছু ক্ষমতা হ্রাস করে তা রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতির হাতে অর্পণ করার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু দিনশেষে সেই রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতিকে তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই নিয়োগ দেবেন, তাহলে ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য কীভাবে আসবে?

এর উত্তরটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। জুলাই সনদের রূপরেখা অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় নিয়োগ পাবেন না; বরং তা একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে। দেশের উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে যে ছয় বা সাতজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি থাকবেন, তাঁদের মধ্য থেকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নির্বাচিত হবেন। যখনই বিচারক নিয়োগের এই চূড়ান্ত ক্ষমতাটি সরকারের একচ্ছত্র রাজনৈতিক হাত থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, তখন উচ্চ আদালতে বিচারকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অনেকটাই নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। আর বিচার বিভাগ যখন এইভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ হয়ে উঠবে, তখন প্রধান বিচারপতি চাইলেও নিজের ব্যক্তিগত পছন্দের কোনো ব্যক্তিকে নিয়মের বাইরে গিয়ে আপিল বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন না। এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতার নিয়ম লঙ্ঘন করে কাউকেই হুট করে প্রধান বিচারপতি পদে বসানো সম্ভব হবে না। ঠিক একইভাবে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ বা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ক্ষমতার একটি ভারসাম্য তৈরি হবে।

জুলাই জাতীয় সনদের নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিশেষ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রপতি কেবল সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভোটে নির্বাচিত হবেন না, বরং সংসদের নিম্ন কক্ষ এবং উচ্চ কক্ষ- উভয় কক্ষের সদস্যবৃন্দের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। যদি আমরা এটিও ধরে নিই যে, ক্ষমতাসীন দলের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন; তথাপি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন সাংবিধানিক সত্তা হিসেবে কাজ করবেন। সুতরাং, রাষ্ট্রপতি পদে যিনি আসীন হবেন, তিনি দেশের সর্বোচ্চ পদের অধিকারী একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হওয়ার কারণে- প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন চোখ বন্ধ করে ঠিক তাই শুনবেন, বিষয়টি তেমন হবে না। তাঁর নিজস্ব একটি বিবেক ও পদের মর্যাদা থাকবে এবং সংবিধানে যখন তাঁর হাতে কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা ও আইনি এখতিয়ার দেওয়া থাকবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর হাতে এক ধরনের ক্ষমতা চলে আসবে। অথচ বর্তমান শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি হলেন স্রেফ একটি নামেমাত্র ‘পুতুল’ পদ, যাঁর নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই এবং এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী একচ্ছত্রভাবে রাষ্ট্রে যা চান তাই বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু জুলাই সনদের সংস্কার কার্যকর হলে, একক ব্যক্তির ইচ্ছার পরিবর্তে অন্তত দুজন শীর্ষ সাংবিধানিক ব্যক্তির যৌথ সম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

যেকোনো প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান পরিচালনা ব্যবস্থায় যদি এমন একটি সিস্টেম থাকে যেখানে প্রধান ব্যক্তি যা চান, একক সিদ্ধান্তে ঠিক তাই সম্পন্ন হয় তবে একনায়কতন্ত্র সৃষ্টি হয়। আর যদি সেই সিস্টেম পরিবর্তন করে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয় তখন প্রধান ব্যক্তি চাইলেই নিজের ইচ্ছায় সবকিছু চাপিয়ে দিতে পারেন না।

তাকে যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য অন্য অংশীদার বা কমিটিকে ম্যানেজ করতে হয় এবং সবার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হয়। সুতরাং ক্ষমতার পরিমণ্ডলে দুজন ব্যক্তি মিলে যৌথভাবে কোনো বড় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া বা পারস্পরিক স্বার্থপরতায় লিপ্ত হওয়া, আর একজন একক ব্যক্তির সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রধানমন্ত্রীর সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাঁকে একদম ক্ষমতাহীন করে দেওয়া হবে। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত থাকবে। তবে তিনি ‘সর্বময় বা একক’ ক্ষমতার মালিক থাকবেন না। তাঁকে অবশ্যই রাষ্ট্রপতির আস্থা ও সাংবিধানিক সম্মতি বজায় রেখে পথ চলতে হবে। এটিই হলো জুলাই জাতীয় সনদের ক্ষমতার ভারসাম্যের মূল কথা। যেখানে প্রধান বিচারপতির হাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকবে, রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের এখতিয়ার থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নির্বাহী ক্ষমতা। কোনো একক ব্যক্তি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিতে পারবে না।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও বর্তমান অচলাবস্থা

বিগত সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের সামনে যে ধরনের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা উপস্থিত হয়েছিল, সেই নিরিখে আমরা ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গঠন করেছি এবং সবঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করেছি। আমাদের এই রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

আমাদের এই অবস্থান গ্রহণ করার পেছনে প্রথম ও প্রধান কারণ হলো- জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে দেশে সাংবিধানিক সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় এই মুহূর্তে আমাদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়।

এক কথায় বলতে গেলে, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা- অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ করে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করা আমাদের রাজনৈতিক আদর্শের জায়গা থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। তার চেয়েও বড় কারণ হল, ইসলামী রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে জুলাই-চেতনা গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক।

সামনের আলোচনায় জুলাইয়ের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতার কয়েকটি প্রধান কারণ তুলে ধরছি।

চলবে...

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন