শেষ কিস্তি

জুলাই কেন আমাদের লড়াই?

জুলাই কেন আমাদের লড়াই?

আগে গণভোট অনুষ্ঠনের দাবি

এই দাবি আদায়ের পর আমরা আমাদের আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু করি, যার মূল দাবি ছিল, জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘গণভোটটি’ সম্পন্ন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট সম্পন্ন করার এই দাবির পেছনে আমাদের যৌক্তিক সন্দেহ কাজ করছিল।

কারণ আমরা অনুধাবন করতে পারছিলাম যে, জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিশ্চিত না করে যদি কোনোভাবে জাতীয় নির্বাচন হয়ে যায় আর তাতে বিএনপি জয়লাভ করে তখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়া হুমকির মুখে পড়ে যাবে।

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই ঐতিহাসিক সনদকে কেন বাতিল করে দিতে চাইবে, তার প্রধান দুটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কারণ আমি পূর্বেই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। বিএনপি যেমন গোপালগঞ্জ জেলার নাম বদলে ফেলতে চায় ঠিক তেমনই আওয়ামী লীগ জুলাই নাম সহ্য করতে পারে না। সুযোগ পেলে তারা হয়ত ১২ মাসের নাম থেকে জুলাইকে মুছে ফেলতে চাইবে।

অর্থাৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ যেমন তাদের ক্ষমতাচ্যুতির ক্ষোভ থেকে জুলাইয়ের নাম সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চাইবে, ঠিক তেমনই ক্ষমতার নতুন সমীকরণে দাঁড়িয়ে বিএনপিও চাইবে না যে, জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আরেকটি শক্তির উত্থান ঘটুক।

কারণ জুলাই বিপ্লবের এই মৌলিক আকাঙ্ক্ষাগুলো যদি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে ইতিহাসের পাতায় এই বিপ্লবের প্রকৃত ত্যাগী নেতৃত্ব, আলেম সমাজের অবদান এবং বীরত্বগাথা ইতিহাস বারবার মানুষের সামনে চলে আসবে। আর সাধারণ মানুষ যখন জুলাইয়ের সেই বৈষম্যহীন চেতনার আলোকে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাইবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের চোখের সামনে একটি নতুন নেতৃত্বের ছবি ভেসে উঠবে । আর ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের এই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিকে রুখে দেওয়ার জন্যই মূলত বিএনপি জুলাই বিপ্লবের অর্জন ও জুলাই সনদকে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চাইবে।

বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল থাকলেই বিএনপির ক্ষমতার রাজনীতির জন্য বেশি সুবিধা। কিন্তু এর বিপরীতে জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত আকাঙক্ষা হচ্ছে বৈষম্যের বিলোপ ও ফ্যাসিবাদের অবসান।

সেই সাথে ইসলামপন্থীদের অভিপ্রায় হচ্ছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের দলীল বাহাত্তরের বন্দোবস্ত উৎখাত করা এবং ৪৭ এর চেতনায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেয়া এবং দ্বিজাতিতত্তের মূলধারায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে শাক্তিশালী করা।

জুলাই ইসলামপন্থীদের বেশি প্রয়োজন

আমরা যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করি তবে দেখব, জুলাই বিপ্লবের মূল নেতৃত্বদানকারীরা প্রধানত দুটি কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। তা হলো—(১) বৈষম্যের বিলোপ (২) ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিরোধ।

আর আমরা যারা এ দেশের ইসলামপন্থী ও আলেম সমাজ রয়েছি, আমরা তিন কারণে এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাই; উপরোক্ত দু’টি কারণ- —(১) বৈষম্যের বিলোপ (২) ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ। সেই সাথে আরও একটি কারণে আমরা জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চাই। আর তা হল- (৩) ইসলামপন্থী রাজনীতির অনূকূল পরিবেশ।

সুতরাং নাহিদ ইসলাম বা এনসিপির নেতৃত্ব যতটুকু জোরালোভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়, মামুনুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং ওলামায়ে কেরামের আগ্রহ, তাগিদ ও রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা তার চেয়েও অনেক বেশি। কারণ, জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট যদি রাষ্ট্রে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বৈষম্য এবং ফ্যাসিবাদের রাস্তা যেমন বন্ধ হবে-যা আমরা এবং তারা উভয় পক্ষই চাই- সেই সাথে আমরা বাড়তি হিসেবে লাভ করব ১৯৪৭ সালের ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র চেতনার পুনর্জাগরণ।

কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ যদি জুলাই সনদের প্রতি আমাদের সমর্থন ও রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে স্রেফ ‘এনসিপি বা অন্য কোনো দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন’ বলে অভিহিত করে তবে তা হবে চরম ভুল ও অজ্ঞতাপ্রসূত মূল্যায়ন।

এটি সত্য যে, জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সারির নেতৃত্ব হয়তো কৌশলগত কারণে তাদের হাতে ছিল, কিন্তু বিপ্লবের দীর্ঘ যাত্রায় আমাদের আলেম সমাজ ও তাওহীদী জনতার আত্মত্যাগ, রক্তদান ও কুরবানি তাদের চেয়ে কোনো অংশে কম তো ছিলই না, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি ছিল। আর তাই পরিবর্তনের ফসল ঘরে তোলার অধিকার ও প্রয়োজনীয়তা আমাদের বেশি।

কিছু মানুষের অদূরদর্শিতা আমাদের অধিকারকে দুর্বল করে দিচ্ছে

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হল, বর্তমান সময়ে আমাদের আলেম সমাজের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, হীনমন্যতা ও কৌশলগত ভুল এই ঐতিহাসিক অর্জন ও জুলাইয়ের ওপর আমাদের নায্য অধিকার দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে।

জুলাই বিপ্লবের এই গৌরবময় ইতিহাসের ওপর থেকে আমাদের মালিকানা যদি কোনো কারণে দুর্বল হয়ে যায়, তবে তা আমাদের দ্বীনি ভবিষ্যৎ ও রাজনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে। এর ফলে রাজপথে আমাদের ভাইদের দেওয়া রক্ত বৃথা যাবে এবং আগামীর ইনসাফপূর্ণ ইসলামিক বাংলাদেশের স্বপ্ন ব্যাহত হবে। তাই মাঠপর্যায়ে যে ধরনের কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য আমাদের এই নায্য মালিকানাকে দুর্বল করে তোলে, তা যত বড় প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ থেকেই হোক না কেন, তা হবে আত্মঘাতী এবং আমাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী।

এই সত্য উচ্চারণের ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিধা বা সংকোচ নেই। এবং ইসলামপন্থার গৌরব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কোনো দ্বিধা থাকতেও পারে না। অতএব, ইতিহাসের এই সুদীর্ঘ প্রেক্ষাপটে আমি যেসকল যুক্তি ও কারণসমূহ উপস্থাপন করলাম এই সকল কারণেই জুলাই অভ্যুত্থানের বুনিয়াদের ওপর ভিত্তি করে আগামীর নতুন সুন্দর বাংলাদেশ গঠন করবার অভিপ্রায়ে আমাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই প্রচেষ্টাকে দুর্বল বা প্রশ্নবিদ্ধ করার যেকোনো তৎপরতা ইসলামপন্থাকে দুর্বল করার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

আলোচনার সারকথা

সারকথা হল-

এক. জুলাই বিপ্লব ও আন্দোলনের সাথে আমাদের আলেম সমাজের সম্পর্ক কতটা গভীর তা ব্যাখ্যা করলাম।

দুই. ঠিক কী কী কারণে এই জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্ব ও মালিকানা সর্বাগ্রে আলেম সমাজের-তাও তুলে ধরলাম।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমি জুলাই বিপ্লবকে এককভাবে আমাদের বলছি, বরং এটি এ দেশের সর্বস্তরের মজলুম মানুষের অধিকার আদায়ের এক সম্মিলিত সংগ্রাম।

বাস্তব সত্য হলো, ২০২৪ সালের এই ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের পেছনে বহু পক্ষ ও অংশীজনের অবদান রয়েছে। তবে এ দেশের ইসলামপন্থী ও আলেম সমাজকে বাদ দিয়ে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস রচিত হতে পারে না। আমরা রাজপথে তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরে এই জুলাই বিপ্লবের ভিত রচনা করেছিলাম। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে যাদের কোনো ধরনের অংশগ্রহণ ছিল না, ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ের ভিত তৈরিতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের অবদান কম। আর ঠিক এই কারণেই, জুলাই বিপ্লব ও এর সনদের প্রতি তাঁদের দরদ ও আন্তরিকতা না থাকাটা মোটেও বিচিত্র কিছু নয়।

আমরা ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত সুদীর্ঘ এক যুগ ধরে তিনটি ধাপে এই ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে কোরবানির নজরানা পেশ করেছি। প্রথমত ২০১৩ সালে, দ্বিতীয়ত ২০২১ সালের মোদি বিরোধী আন্দোলনে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।

কথায় আছে- যার মূল্যবান কিছু হারায়, কেবল সেই অনুভব করতে পারে হারানোর তীব্র বেদনা। যারা নিজেদের অমূল্য জীবন, সীমাহীন ত্যাগ ও ধারাবাহিকভাবে রক্তের নজরানা দিয়ে একটি গৌরবময় আন্দোলনকে তিলে তিলে সফলতার দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করায়, সেই আন্দোলনের ফসল কোনোভাবে নষ্ট হতে দেখলে তাদের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয় তা অন্যদের হওয়ার কথা নয়। কাজেই, মাঠের বাইরে থেকে লম্বা লম্বা আলাপ দেওয়া সহজ; কিন্তু সুদীর্ঘ এক যুগ ধরে নৃশংস ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত রাজপথে মোকাবেলা করে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা চরম নির্যাতিত হয়েও—বিপ্লবের কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে না পারার যে আক্ষেপ তা সবার সমপরিমাণ হওয়ার কথা নয়।

গণভোটের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনের প্রেক্ষাপট আলোচনার পর, এখন সর্বশেষ পয়েন্টটি উত্থাপন করা প্রয়োজন; আর তা হল, জুলাই বিপ্লবের মূল অভিপ্রায় ও জুলাই জাতীয় সনদের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত ‘গণভোট’ প্রসঙ্গ। অর্থাৎ, জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য এই গণভোটের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কতটুকু?

এটা তো পরিষ্কার কথা, কেউ চাক বা না চাক গণভোট হয়েছে এবং বিপুল ভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে।

এনসিপিও শুরুতে গণভোট চায়নি, তাদের প্রথম চাওয়া ছিল গণপরিষদ গঠন। তাদের দাবি ছিল একটাই নির্বাচন হবে। যারা নির্বাচিত হবে প্রথমত তারা গণপরিষদ সদস্য হবে, দ্বিতীয়ত সংসদ সদস্য হবে। সেই গণপরিষদ নতুন করে সংবিধান তৈরি করবে। এটা ছিল তাদের দাবি। কিন্তু বিএনপির তীব্র বিরোধিতার প্রেক্ষিতে তারা তাদের দাবি থেকে নিচে নেমে আসে। গণপরিষদের দাবি থেকে নেমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ মেনে নিতে রাজি হয়।

জাতীয় সংসদে প্রদত্ত এক বক্তব্যে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, আপনারা যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে টালবাহানা করেন তাহলে আমরা আবার গণপরিষদের দাবিতে ফিরে যাব।’

তিনি বলতে চেয়েছেন যে, আমরা তো ছাড় দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবি মেনেছি এই শর্তে যে, আপনারাও আপনাদের সংশোধনীর অবস্থান ছেড়ে সংস্কার মেনে নিবেন। কিন্তু আমরা ছাড় দিয়ে যেটা মেনেছি সেটাও যদি বাস্তবায়ন না করে আপনাদের পূর্বের অবস্থান ‘সংশোধনী’তে ফিরে যান তাহলে আমরাও আবার আমাদের গণপরিষদ করে সংবিধান পুনর্লিখনের দাবিতে ফিরে যাব। এনসিপি আহ্বায়কের এ কথা খুবই যৌক্তিক।

গণভোটের সাথে জুলাই বিপ্লবের সম্পর্ক

এখন প্রশ্ন হল গণভোটের সাথে জুলাই বিপ্লবের সম্পর্কটা কী?

জুলাই বিপ্লবের সাথে গণভোটের সম্পর্ক হল-

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একাধিক প্রস্তাব আলোচনায় ছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব ছিল ৩টি:

ক. গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান পুনর্লিখন। যা ছিল মুখ্যত এনসিপির দাবি।

খ. সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার।

গ. গতানুগতিক সংশোধনীর মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন। এটা ছিল বিএনপির প্রস্তাব।

জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর যখন তা বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে, তখন বিষয়টি নিয়ে বিএনপির অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। তখনই আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনে নামি। আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিএনপি এ বিষয়ে মিমাংসার জন্য আলোচনার টেবিলে আসে। সেই আলোচনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে উপরোক্ত প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সমাধানের লক্ষ্যে সব পক্ষ কিছু ছাড় দিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে। এনসিপি গণপরিষদের দাবি থেকে নিচে নেমে আসে। বিএনপিও নিজের অবস্থান থেকে উপরে উঠে আসে। অন্যান্যরাও যার যার দাবি সমন্বয় করে। এবং একটি অভিন্ন প্রস্তাবে সবাই সম্মত হয়। সেটি এনসিপির দাবি অনুযায়ী গণপরিষদও না, বিএনপির দাবি অনুযায়ী গতানুগতিক সংশোধনীও না, বরং একটি মাঝামাঝি অবস্থান। অর্থাৎ সংস্কারের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ।

এখানে বিএনপি তার দাবি ( চলমান সংবিধান বহাল রাখা) থেকে উপরে উঠে সংস্কারের দাবি মেনে নিল, আর এনসিপিও তার দাবি (চলমান সংবিধান বাতিল করা) থেকে নিচে নেমে সংস্কারের দাবি মেনে নিল। আমরাও এ ব্যাপারে একমত হলাম।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া

এই পর‌্যায়ে এসে প্রশ্ন দাড়ায়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে কিভাবে?

তখন বিএনপি, জামাত, এনসিপিসহ অন্যান্য পক্ষ নিজ নিজ আইনজ্ঞদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি অভিন্ন প্রস্তাবে সম্মত হয়। আর তা হল গণভোট। তাহলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সবাই যে বিষয়টি মেনে নিল তা হলো গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা।

কোনো পক্ষ বলতে পারবে না যে, গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার গঠনের সিদ্ধান্ত আমরা মানিনি। বরং সবাই মেনেছে।

বিএনপি এখন বলছে ভিন্ন কথা

বিএনপি এখন এসে ভিন্ন কথা বলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘আমাদের একটা তাগাদা ছিল, সংস্কারের বাহানায় এরা যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়(!) সেজন্য আমরা সবকিছুতে আপোস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি।’

অর্থাৎ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার আন্তরিক ইচ্ছা বিএনপির কখনোই ছিল না। যে কোনো উপায়ে জাতীয় নির্বাচন আদায় করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। আর তাই উদ্দেশ্য আদায়ে মনের মধ্যে দুরভিসন্ধি রেখে গণভোটের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল।

এটা স্বাভাবিক কথা যে, তুমি আরেকজনের সাথে কোনো একটা বিষয়ে মিমাংসায় বসলে; সে চায় তালগাছ পুরোটুকু তার হোক। তুমিও চাও তালগাছ পুরোটুকু তোমার হোক। এখন কাউকেই পুরো তালগাছ দিয়ে মিমাংসা হয় না। এমন প্রেক্ষিতে মিমাংসা করা হল অর্ধেক তালগাছ তোমার, আর অর্ধেক তার।

এই বিচারে তুমি যে অর্ধেক ছেড়ে দিলে, তা কি মনের খুশিতে ছাড়লে? সেও যে অর্ধেক ছাড়ল, তাও কি মনের খুশিতে ছাড়ল? না। কারণ তারও দাবি ছিল পুরো তালগাছ, তোমারও দাবি ছিল পুরো তালগাছ। এখন মিমাংসা হিসেবেই তাকে অর্ধেক আর তোমাকে অর্ধেক দেয়া হয়েছে!

এই বিচারের পর নদী পার হয়ে (ক্ষমতায় গিয়ে) সে যদি বলে- তখন অর্ধেক তালগাছ তোমাকে দেয়ার বিচার মন থেকে মানি নাই, সুতরাং এখন আমি তোমাকে অর্ধেক তালগাছ দিব না। বিচারের সময় মেনে নিয়ে এখন তোমার প্রাপ্য অর্ধেক তালগাছ দিতে অস্বীকার করাটা যেমন বিশ্বাসঘাতকতা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদে দেয়া বক্তব্য ঠিক তেমন বিশ্বাসঘাতকতা। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। তার যদি অর্ধেক তালগাছ দিতে অস্বীকৃতি জানাতেই হত তাহলে সালিশের সময় অস্বীকার করত! বলত যে, তোমাকে অর্ধেক তালগাছ আমি কোনো অবস্থাতেই দিব না। তার হ্যাডম থাকলে সে যে কোনো উপায়ে পুরো তালগাছ আদায় করে ছাড়ত, তোমার হ্যাডম থাকলে তুমি পুরো তালগাছ নিতে। কিন্তু বিচারের সময় তুমি যখন মেনে নিয়েছো , তালগাছ তোমার অর্ধেক, এ কারণে আমিও পুরো তালগাছের দাবি থেকে সরে এসে অর্ধেক মেনে নিয়েছি । এখন বৈতরণী পার হওয়ার পর তুমি বলতে পারো না যে, তোমাকে অর্ধেক তালগাছ মনের খুশিতে দেই নাই। কারণ সালিশে কেউ মনের খুশিতে আরেকজনের দাবি মানে না। মনের খুশিতে দেয়নি এ কথা বলে কেউ যদি পূর্ববর্তী সালিশের সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে অবশ্যই এটা তার বিশ্বাসঘাতকতা। এটা তার অভদ্রতা, দ্বিচারিতা ও মুনাফেকী।

আমি জানি না বিএনপির ইতিহাসে এই ধরণের দ্বিতীয় আর কোনো ঘটনা আছে কি না।

আমাদের আলোচনা চলছিল গণভোটের সাথে জুলাই বিপ্লবের অভিপ্রায়ের সম্পর্কটা কোথায়? সম্পর্ক এটাই যে, জুলাই সনদ কিভাবে বাস্তবায়িত হবে সে ব্যাপারে একেকজন একেক ফর্মুলা দিল। কিন্তু আলোচনা-পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে।

গণভোট হয়ে সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে কিভাবে? গণভোটে যদি হ্যাঁ জয়যুক্ত হয় তবে। গণভোট হলেই সংস্কার পরিষদ হবে তা নয়। গণভোট হতে হবে এবং হ্যাঁ জয়যুক্ত হতে হবে। আল্লাহ না করুন, যদি হ্যাঁ জয়যুক্ত না হত, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাব এমনিতেই নাকচ হয়ে যেত। এখন গণভোট হয়েছে। হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হচ্ছে না।

জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় জুলাই সনদের সকল ধারা-উপধারায় কেউ-ই পুরোপুরি একমত ছিল না। প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো ধারায় নোট অব ডিসেন্ট ছিল। আমাদের দলেরও ছিল। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কিংবা জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যে সব জায়গায় ভিন্নমত আছে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি।

বিকল্প কেবল দু’টি- ৭২ ও ২৪

ইসলামপ্রশ্নে আমরা তো চাই একশোর মধ্যে একশো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার, জুলাইপন্থী ও অন্যান্যদের যদি দেখা হয় তাহলে ইসলামকে একশোর মধ্যে একশো দিয়ে দেয়ার লোক বর্তমানে আছে? নেই। একারণে আমাদের অনেক চাওয়া জুলাই সনদের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক ইচ্ছাই পূরণ হয়নি। কিন্তু জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদের মধ্যে ইসলামপন্থীদের যতটুকু অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ দেয়া হয়েছে, বিপরীতপক্ষে ইসলামপন্থীদের এই পরিমাণ সুযোগ, সম্মান ও অধিকার দেয়া হয়নি।

জুলাই সনদের বিপরীত পক্ষ কী? বিপরীত পক্ষ হল বাহাত্তরের বন্দোবস্ত।

ব্যবস্থাপনা তো এখন দুইটাই। এক হল জুলাই বিপ্লবের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ, আর না হয় বাহাত্তরের বাংলাদেশ। আপনি এই দু’টোকে তুলনা করুন। তুলনা করার পর যদি প্রশ্ন করি, আপনি বাহাত্তর চান না চব্বিশ চান? তাহলে কোনো দ্বিধা আছে উত্তর দিতে যে, কোন পক্ষে থাকব? চব্বিশের পক্ষে থাকব।

কেউ যদি বলে আমি বাহাত্তরের পক্ষে তাহলে সে মাথা উঁচু করে কথাটা বলুক! জাতি দেখুক তার চেহারা! জাতি দেখুক, দুই হাজার চব্বিশ সাল পরবর্তী বাংলাদেশে এখনও বাহাত্তরপন্থী আছে।

এখানে অপশন দুইটা। আপনি যদি বলেন আমি বাহাত্তরও না চব্বিশও না, আমি দুই হাজার ছয় সাল, তাহলে ভাই, ছয় সাল তো কোনো অপশন নাই। অপশন তো দুইটা।

ভোটের অপশনও তো দুইটা। ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। এখন আপনি যদি বলেন আমি ‘হ্যাঁ’ও না, ‘না’ও না- আমি তৃতীয় পক্ষ, তাহলে বলতে হয় এখানে তৃতীয় পক্ষের তো কোনো অপশন নেই। হয় তুমি বাহাত্তর নাহয় তুমি চব্বিশ। ইম্মা হাযা ওয়া ইম্মা যালিকা।

আমরা চব্বিশের পক্ষে

আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি যে, আমরা চব্বিশের পক্ষে। চব্বিশের পক্ষে থাকলে কী করতে হবে তাও পরিষ্কার। চব্বিশের পক্ষে থাকলে গণভোট ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে থাকতে হবে। কেননা এটাই চব্বিশের পক্ষ।

আর চব্বিশের বদলে যদি বাহাত্তর চান তাহলে ‘না’ ভোট দিতে হবে। অপশন আছে দুইটা। চব্বিশ আর বাহাত্তর। তৃতীয় কোনো অপশন তৈরি হয়নি। কেউ যদি তৃতীয় কোনো অপশন তৈরি করতে পারত তাহলে বলা যেত- চব্বিশও না, বাহাত্তরও না, আমি তৃতীয় পক্ষ।

অপশন যখন মাত্র দু’টো হয় তখন দ্বিধাদন্দযুক্ত কোনো অবস্থান থাকতে পারে না। আপনাকে স্পষ্ট করতে হবে, আপনি চব্বিশের পক্ষে, না বাহাত্তরের পক্ষে।

জুলাই সনদেও আপত্তির জায়গা আছে

প্রশ্ন করতে পারেন যে, চব্বিশের পক্ষে গেলে তো কিছু সমস্যা থেকে যায়। কথা হল, আপনার সামনে প্যাকেজ রাখা হয়েছে যে, এই সকল সমস্যাসহ চব্বিশ আর এই সকল সমস্যাসহ বাহাত্তর। কোনো জায়গায় পূর্ণ ইসলাম নেই। আপনি যদি বাংলাদেশে বসে এই মুহূর্তে ইমারাতে ইসলামিয়্যার শাসন চান, তাহলে তো হবে না। আপনাকে বাংলাদেশে বসে ইমারাতে ইসলামিয়ার শাসন চাইলে আগে পঞ্চাশ বছর রক্ত দিতে হবে।

কিন্তু ‘আল আক্বীদাতুল জিহাদিয়্যাহ’ আপনি সহ্য করতে পারেন না আর চান বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ইমারাতের শাসন আসুক, এটা যৌক্তিক না।

অপশন দুটো আছে। চব্বিশ অথবা বাহাত্তর। তৃতীয় কোনো অপশন নেই। সুতরাং নির্বাচনকালীন যে সকল কথায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ উৎসাহিত না হয়ে, ‘না’ উৎসাহিত হয়েছে সে সকল কথা সন্দেহাতীতভাবে বাহাত্তরের পক্ষে গেছে।

বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক- আপনি আপনার মেয়ে বিয়ে দিবেন। পাত্র আছে কেবল দুইজন। কারও মুখে দাড়ি নেই। তবে একজন দাড়ি না থাকলেও নামাজ পড়ে। আরেকজন দাড়িও নেই, নামাজও পড়ে না। তৃতীয় কোনো পাত্র নেই। মেয়ে বিয়ে দিতে হলে এই দুজনের একজনের কাছেই দিতে হবে। এখন আপনি যদি নামাজী পাত্রের বদনাম শুরু করেন যে, ‘সে তো দাড়ি রাখে না, সে তো প্যান্ট-শার্ট পরে’, যদি এভাবে এই পাত্রের ক্রিটিসিজম করেন তাহলে অর্থ দাঁড়ায়, আপনি বেনামাজী দাড়িহীন পাত্রের কাছেই মেয়ে বিয়ে দিতে চান।

যারা গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে ছিল

যারা দুই হাজার ছাব্বিশের গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে ও অবস্থান নিয়েছে তারা এটা বুঝে করুক বা না বুঝে করুক, তাদের অবস্থা হয়েছে এমন যে, দাড়িহীন নামাজী পাত্রকে বাদ দিয়ে দাড়িহীন বেনামাজী পাত্রের কাছে মেয়ে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বুঝে নিক অথবা না বুঝে নিক।

হ্যাঁ, এব্যাপারে কথা উঠতে পারত যে, জুলাই সনদ যখন তৈরি হল, তখন সেখানে কেন ইসলামী ধারাগুলো সংযুক্ত হল না। তখন আপনারা এব্যাপারে আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু তখন তো আপনাদেরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও সমমনা ইসলামী দলগুলো নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।

এরপরে যখন জাতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল, একভাগে বাহাত্তর আরেকভাগে চব্বিশ, তখন ‘হ্যাঁ’-কে দুর্বল করা, ‘হ্যাঁ’-এর ক্রিটিসিজম করা আত্মঘাতি কাজ ছাড়া কিছুই ছিল না। এটা অবশ্যই রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচায়ক ছিল। রাজনীতির সাথে ‘মুমারাসাত’ এর অভাবে এটা হয়েছে।

বিপ্লবের ধাপগুলো আলোচ্য আলেমগণ অতিক্রম করে আসেননি। আমরা অতিক্রম করে এসেছি। আমরা লড়াই করে এসেছি একটার পর একটা। আমরা লড়াই করে জুলাই এনেছি। আমরা লড়াই করে জুলাই সনদ এনেছি। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলন করেছি। আন্দোলন করে আমরা গণভোটের দাবি আদায় করেছি।

চলমান পরিস্থিতিতে কোনো ইসলামপন্থীর জন্য গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে থাকার সুযোগ ছিল না। যারা বিভিন্ন ক্রিটিসিজম করে ‘না’-এর পক্ষে থেকেছেন, তারা সূরত বুঝতে পারেননি। এখানে সূরত কেবল দুটো ছিল। বাহাত্তর অথবা চব্বিশ।

আমরা যদি ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষ না নিতাম

আমরা যদি ‘হ্যাঁ’- এর পক্ষে ক্যাম্পেইন না করতাম, নিশ্চিতভাবে বিএনপি ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করত। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ছিল গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করার। সারা বাংলাদেশে বিএনপি তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে তলে তলে গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে। সারাদেশে আওয়ামীলীগ গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে। আওয়ামীলীগ-বিএনপি ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছে আর আমাদের আলেম-উলামাদের মধ্য থেকে যারা রাজনৈতিকভাবে সঠিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারাও ‘না’ এর পক্ষে ছিলেন। তারাও কোনো না কোনোভাবে ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছেন। তারা পরিস্থিতির জটিলতা বোঝেননি যে, এখানে অপশন দু’টিই ছিল। এই পরিস্থিতিতে ‘হ্যাঁ’- এর সমালোচনা করা মানেই ‘না’-এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করা।

কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পক্ষে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও গণঅভিপ্রায় দেখে বিএনপি শেষ পর‌্যন্ত ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। তারা দেখেছে যে, ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিলে আম-ছালা দুটোই যাবে। তারা যদি নির্বাচনে প্রকাশ্যে “না” এর পক্ষে নামত তাহলে তাদের নির্বাচনে জয়ী হওয়াটা আরও বড় হুমকির মুখে পড়ত।

এতে প্রমাণ হয় মানুষের ভালোবাসা ও আবেগ জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদের পক্ষে ছিল। আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও আমাদের কিছু আত্মঘাতি আলেম-উলামা ‘না’ এর পক্ষে থাকা সত্ত্বেও ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট পড়েছে প্রায় ৭০ পার্সেন্ট। বিএনপি যদি ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে সত্যিকার অর্থে ক্যাম্পেইন করত তাহলে এখানে ভোট পড়ত ৮০ থেকে ৯০ পার্সেন্ট।

৪৭ থেকে জুলাই নিরবচ্ছিন্ন

সুতরাং এই যে গণভোট, গণভোটের সাথে জুলাইয়ের চেতনা, জুলাইয়ের চেতনার সাথে সাত চল্লিশের সংযোগ, সাতচল্লিশের সাথে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়- এগুলো কোনোটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যাদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সে আবেগ নেই, রাজনীতিতে আলেম-উলামার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্পৃহা যাদের অন্তরে নেই, তাদের কাছে এ সমস্ত আলোচনা প্যাচাল মনে হবে। কিন্তু আমাদের কাছে এগুলোর গুরুত্ব আছে। আমরা হৃদয়ে সে আবেগ লালন করি এবং প্রকাশ্যে বলি।

সর্বশেষ দু’টি প্রশ্নের জবাব দিয়ে আমি আলোচনা শেষ করব- গণভোট নিয়ে যে সকল বুজুর্গ উলামায়ে কেরাম সমালোচনা করেছেন তারা কেন করেছেন?

কিছু আলেম “না” এর পক্ষ নিলেন কেন?

এর একটি কারণ আগেই বলেছি। জুলাই সনদের বেশ কিছু জায়গায় ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন ধারা চলে এসেছে। এর মধ্যে একটা ধারা খুব ক্রিটিকাল। সেটা হল “অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন”।

সমাজ গঠন, রাষ্ট্র গঠন সব জায়গায় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ কথাটি আছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভনেস- এই কথাটা সমস্যাজনক। বহুত্ববাদ কথাটিকে আমরা পাল্টেছি, কিন্তু ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ কথাটা বদলানো যায়নি।

প্রশ্ন হল ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দটায় সমস্যা কোথায়?

সমস্যাটা হল অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দটির দুটি অর্থ। একটি হল শাব্দিক অর্থ, আরেকটি পারিভাষিক অর্থ। শাব্দিক অর্থে কোনো সমস্যা নেই। অন্তর্ভুক্তিমূলক মানে সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকা, সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্র। কাউকে বাদ দিয়ে নয়। শাব্দিক অর্থ ভালোই। কিন্তু পারিভাষিক অর্থটা বিপদজনক। অন্তর্ভুক্তিমূলক কথাটা আবিস্কৃত হয়েছে বিশ্ব মোড়লদের পক্ষ থেকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভনেস বলতে তারা বোঝায় সমাজে নারী-পুরুষ-হিজড়ার পাশাপাশি ট্রান্সজেন্ডার থাকবে। ওই ইস্যুটাকে তারা ‘ইনক্লুসিভনেস’ শব্দের আড়ালে বৈধতা দিতে চায়। অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে লিঙ্গপরিবর্তনকারী কিংবা এক লিঙ্গের মানুষ হয়েও বিপরীত লিঙ্গের বেশ ধারণকারীদেরকেও সমাজে ও রাষ্ট্রে সমান স্পেস দিতে হবে। এটা হল পারিভাষিক অর্থ।

সমস্যা হল জুলাই সনদসহ রাষ্ট্রের সব জায়গায় এই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ কথাটিকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

শব্দটা হয়ে গেছে সমস্যাজনক। আপনি যদি বিরোধীতা করেন, জনমনে প্রশ্ন উঠবে- তাহলে আপনারা কি সবার অংশগ্রহণ চান না? চাইলে অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দে সমস্যা কোথায়?

এই কূটকৌশলের মারপ্যাচে তারা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দটাকে এখানে রেখে দিয়েছে।

বাস্তব ক্ষেত্রে অবশ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দটা আছে বলেই আমরা ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু মেনে নিতে বাধ্য- ব্যাপারটা এমন নয়।

তবে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুটাকে সহনীয় করার এটা একটা সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্র রোধ করার শক্তি-সামর্থ্য আমাদের ছিল না। আমরা প্রত্যক্ষভাবে ট্রান্সজেন্ডার-সমকামিতা এগুলোর মোকাবেলা করতে পারি, কিন্তু এমন সূক্ষ্ন কৌশলে যখন ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামিতার পথ উন্মুক্ত করতে চায় তখন আমাদেরকেও কৌশলেরই আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে সরাসরি বিরোধিতা করতে গেলে জাতি ভুল বুঝবে। জাতি বলবে এই হুজুররা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র চায় না। হুজুররা শুধু নিজেরা নিজেরা সব খাইতে চায়। পরিস্থিতি এমন যে, যদি আমরা এটার বিরুদ্ধাচারণ করি, এই ইস্যুটা পুরো জাতিকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করে তুলবে।

আমার ধারণা, এই কথা দিয়েই আমাদের বুজুর্গ আলেমদেরকে বোঝানো হয়েছে।

আর তাই তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’- এর বিপক্ষে কথা বলেছেন।

কিন্তু তাদেরকে এটা বলা হয়নি যে, জুলাই সনদের বিপরীত অপশন কী আছে বাংলাদেশে?

অপশন তো দুটোই। যখন দু’টিই অপশন তখন তো আপনি দু’টির মধ্যে তুলনা করবেন। আপনি একটির সমালোচনা নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। অপরপক্ষও তো দেখতে হবে?

জুলাই সনদের বিরোধিতা করে যাদেরকে আমরা সুবিধা দিয়ে দিলাম, সেই বিএনপির ইশতেহার বা ৩১ দফার মধ্যে রেইনবো নেশনের কথা আছে।

রেইনবো নেশন কী?

রেইনবো নেশন হল সমকামীদের সিম্বল।

আসল কথা হল- বাহিরের শক্তিগুলো আমাদের দেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। রাষ্ট্রের উপরেও করে, দলগুলোর উপরেও করে। তারা যেমন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে, তেমন বিএনপি, এমনকি জামাত-এনসিপিও তাদেরকে উপেক্ষা করতে পারে না। তাদেরকে ম্যানেজ করে চলতে হয়।

আমাদের উপর ততটা চাপ নেই, কারণ আমরা রাজনৈতিকভাবে এখনও সে পরিমাণ গণনার জায়গায় আসিনি। আমরা সেই পরিমাণ অবস্থান এখনও তৈরি করতে পারিনি। তাই তারা আমাদেরকে নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না।

আমরা তাদের আধিপত্যকে রোধ করতে পারিনি। সেই সক্ষমতা আমাদের নেই। এই বাস্তবতা আমাদেরকে মেনে নিতে হয়েছে। তবে আমরা সোচ্চার আছি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভনেস শব্দের সূত্র ধরে আমাদের দেশে সমকামিতা বা ট্রান্সজেন্ডারের মতো ভয়ংকার বিষয়গুলো যেন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।

এটা হল সমস্যা রোধ করার পন্থা। কিন্তু গণভোটে ‘না’ এর পক্ষে জনগণকে উস্কে দেয়া সমস্যা রোধ করার গ্রহণযোগ্য পন্থা ছিল না।

জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন?

আরেকটা প্রশ্নের জবাব দিব। তা হল- এখন বিএনপি বলছে জুলাই সনদকে তারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। তাহলে তো সমাধান হয়েই গেল! এখন আমাদের খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু আন্দোলন করছি কেন?

আসলে এ ধরণের ঘোষণায় আমরা খুশি না।

কারণ আগেই বলেছি, জুলাই সনদের পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি অন্তহীন প্রতারণা হয়েছে। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার সময় সরকারের ঐকমত্য কমিশনের কোনো কোনো কর্মকর্তা ও বিএনপি মিলে ধোকাবাজি ও প্রতারণা করেছে। আমাদের সকলের কাছে জুলাই সনদের যে নমুনা কপি পাঠানো হয়েছিল, আমরা সবাই সে ভিত্তিতেই স্বাক্ষর করতে গিয়েছি। কিন্তু আমাদের সবাইকে অন্ধকারে রেখে, আমাদের কাউকে কিছু না জানিয়েই তারা জুলাই সনদে একটি নোট অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে। আর তা হল এই যে, **অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেই মতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’

অন্য দলগুলো অন্তর্ভুক্ত এই নোটের ব্যাপারে কিছুই জানত না। এভাবেই অন্তহীন প্রতারণা করে জুলাই সনদের মূল স্প্রিটকে একটি বিতর্কিত ও অবৈধ নোটের মাধ্যমে অকার্যকর করা হয়েছে।

এখন বিএনপি জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে- এর অর্থ হল যে সকল জায়গায় বিএনপির দ্বিমত আছে তা বাদ দিয়ে বাকিটুকু বাস্তবায়ন করবে। সমস্যা হল গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল পয়েন্টেই বিএনপির দ্বিমত আছে। যেসব দফায় বৈষম্যের বিলোপ হয়, ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটে তার প্রায় সবগুলো দফায় বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে। এই হল তাদের অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অর্থ।

গণভোটের রায় কার্যকরের প্রত্যাশা

আমি আশা করি ইনশাআল্লাহ জুলাই বিপ্লবের প্রতি এদেশের মানুষের, তরুণ প্রজন্মের যে আগ্রহ ও আবেগ আছে, আমরা যদি জাতির কাছে সঠিক বক্তব্যটা তুলে ধরতে পারি, তাহলে যেভাবে সকল প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেও প্রায় ৭০ পার্সেন্ট মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোটে ভোট দিয়েছে। সেই ৭০ পার্সেন্ট মানুষ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে সোচ্চার হবে। তারা যখন সোচ্চার হবে তখন কী ঘটবে?

বিএনপি ভোটের আগে যেমন বুঝতে পেরেছে- আমরা যদি ‘না’ এর পক্ষে মাঠে নামি তাহলে আম ও ছালা দুটোই যাবে। ঠিক তেমনই এখনও বুঝতে পারবে যে, গণভোটের রায় কার্যকর না করলে আবারও আম-ছালা দুটো যাওয়ার আশংকা তৈরি হচ্ছে।

তখন তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কারের মাধ্যমে গণভোটের রায় কার্যকর করবে ইনশাআল্লাহ।

এখন আমাদের কাজ এটাই যে, এই সূক্ষ বিষয়কে সহজ করে জাতিকে বোঝানো যে, তোমরা যে বিপ্লব করেছো, গণভোটে তোমরা যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছো সেটা বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন হওয়া জরুরি। বৈষম্যের বিলোপ ও ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করতে সত্যিকার অর্থেই যদি চাও, তাহলে আবারও তোমাদেরকে সোচ্চার হতে হবে।

বিএনপি তখন যদি দেখে যে, তাদের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামছে ও মাঠ হাতছাড়া হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে, তখন তারা বিষয়টিকে অবশ্যই আমলে নিবে।

গণতান্ত্রিক দলগুলোর সবচেয়ে বড় ভয় হল জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়।

আমাদের মুফতি শহিদুল ইসলাম রহ. বলতেন, গণতন্ত্রের খোদা হল জনগণ। আকীদার দিক থেকে যারা গণতন্ত্র বিশ্বাস করে তারা জনগণকে খোদা মনে করে। যখনই তারা দেখে খোদা নারাজ হয়ে যাচ্ছে তখন তারা খোদাকে রাজি করার জন্য যা করা দরকার সব করে। এ জন্য গণতান্ত্রিক সিস্টেমের মধ্যে কিছু করতে হলে গণতন্ত্রের খোদা জনগণকে রাজি-খুশি করতে হয়।

আমাদের তো এক ইলাহ আছে। কিন্তু যারা গণতন্ত্রের আকীদাকে বিশ্বাস করে তাদের কাছে জনগণই খোদা। তাদেরকে রাজি-খুশি রাখাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে। তো গণতন্ত্রের এই খোদাকে যদি আমরা বোঝাতে পারি, তাহলে সরকার আমাদের দাবি মানতে বাধ্য হবে ইনশাআল্লাহ। এটাই হল আমাদের বর্তমান টার্গেট। এটাই আমাদের আন্দোলন। এই আন্দোলনকে বিপথগামী করার জন্য, এটার মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করার জন্য নানা রকম কথাবার্তা ছড়ানো হচ্ছে। আমরা নাকি আরেকজনের এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছি।

রক্ত দিলো আমাদের মানুষ, জীবন দিলাম আমরা, অধিকার বাস্তবায়িত হবে আমাদের- এজেন্ডা নাকি আরেকজনের!?

এটা বিশৃংখলা ও বিভ্রান্তি তৈরি করার এক ধরণের অপচেষ্টা। এ সমস্ত কথা বলে যারা আমাদের অবস্থানকে দুর্বল করতে চায় তাদের বিশৃংখলা ও বিভ্রান্তির ব্যাপারে আমাদের পরিস্কার বক্তব্য হল, এগুলো খারেজিপনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

আল্লাহ এ জাতিকে সঠিক কথাগুলি বোঝার এবং হক ও হক্কানিয়াতের উপর থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন