আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সম্পর্ক

আলফাজ আনাম

ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সম্পর্ক
আলফাজ আনাম

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর সংসদীয় রাজনীতির যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। খালেদা জিয়ার দুর্ভাগ্য ছিল, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়েছিলেন শেখ হাসিনার মতো একজন প্রতিশোধপরায়ণ ও মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিকে, যিনি প্রথমবার বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন—একদিনের জন্যও সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না। খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন দলে হন বা বিরোধী দলে, কখনোই শান্তিতে থাকতে পারেননি।

স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে সংসদ গঠিত হয়েছিল, তা দুই বছরের মধ্যে অকার্যকর হয়ে পড়ে। মাগুরা উপনির্বাচন কেন্দ্র করে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপ নেয়। এর মধ্যে বিএনপির ভুল রাজনীতি যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে ক্ষমতা ছেড়ে দেন খালেদা জিয়া। ওই বছরের জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরেকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এ সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তার ধারণা ছিল, ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হবেন। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ভূমিধস বিজয় অর্জন করে।

বিজ্ঞাপন

এরপর হাসিনা তার কৌশল বদল করেন। তিনি বুঝতে পারেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে জোটবদ্ধ নির্বাচনি ঐক্য হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এরপর থেকে মূলত শেখ হাসিনা বেছে নেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে ইঙ্গ-মার্কিন সমর্থনে ভারতের মদতপুষ্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সরকারের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২০০৮ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে তিনি নিপীড়নমূলক শাসন চাপিয়ে দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি বিনাভোটের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেড় দশক ক্ষমতায় স্থায়ী ছিলেন।

হাসিনা তার বাবার একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ফর্মুলা গ্রহণ করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সংসদে যাতে বিরোধী দলের উপস্থিতি না থাকে, তার সব ব্যবস্থা করেছিলেন। হাসিনাও একই কৌশলে বিরোধী দলবিহীন রাবার-স্ট্যাম্প সংসদের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। জাতীয় পার্টিকে একই সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার করে গৃহপালিত বিরোধী দলের আসনে বসানো হয়।

শেখ মুজিব যেমন তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের ‘লাল ঘোড়া’ দাবড়িয়েছিলেন, হাসিনাও তেমনি বিরোধীদলীয় নেতাদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছেন। লাখ লাখ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর পাশাপাশি প্রধান লক্ষ্য ছিলেন খালেদা জিয়া ও তার পরিবার। ভুয়া এক অর্থ আত্মসাতের মামলায় খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। প্রতিশোধপরায়ণ আচরণের শিকার হয়ে কারাগারে তাকে পরিকল্পিতভাবে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া যখন হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় অবরুদ্ধ ছিলেন, সে সময় প্রবাসে তার এক ছেলে মারা যান। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় তাকে সন্তানের লাশ দেখতে হয়েছিল। আরেক সন্তান ছিলেন নির্বাসনে, যিনি পরবর্তী সময়ে নির্বাসিত জীবন শেষ করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

খালেদা জিয়ার হয়তো একটি সান্ত্বনা ছিল—জীবনের সায়াহ্নে তিনি হাসিনার পতন দেখতে পেরেছিলেন।

হাসিনার একনায়কতান্ত্রিক শাসনের আসল রূপ এ দেশের মানুষের স্মৃতি থেকে সহজে মুছে যাবে না। কারণ এই স্মৃতি রক্তমাখা লাশের ছবির মতো। উন্নয়নের স্লোগানের আড়ালে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম, খুন ও কারারুদ্ধ করার এক ভয়ংকর পরিস্থিতি দেশ দেখেছে। চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাচার করা হয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকা। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সমর্পণ করা হয়েছিল প্রতিবেশী দেশের হাতে। বিরোধী রাজনীতি দমনের মাধ্যমে যখন শেখ হাসিনা অনেকটা নির্ভার ছিলেন, সে সময় দাবানলের মতো জ্বলে উঠেছিল এ দেশের ছাত্র ও শিশু-কিশোররা। দেশের বিক্ষুব্ধ মানুষ একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কোটাবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দিল্লিতে হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে তার পতন ঘটে।

রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর বাংলাদেশে আরেকটি নির্বাচন হলো। দেড় দশক পর মানুষ স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এই নির্বাচনে একই সঙ্গে সংসদ গঠন ও সংস্কারের ওপর ভোট দেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থান নিছক সরকার পতনের কোনো আন্দোলন ছিল না। দেড় দশকে যে একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তার বিলোপও ছিল এই আন্দোলনের অংশ। ফলে দেশের মানুষ রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে ভোট দিয়েছেন। রাষ্ট্রসংস্কার প্রশ্নে প্রদত্ত ভোটের ৬২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দুই জোট রাষ্ট্রসংস্কারের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে। একমাত্র ফ্যাসিবাদের সহযোগী রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি প্রকাশ্যে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালায়। দেশের মানুষ জাতীয় পার্টিকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করেনি, দলটির প্রধান দুই নেতা পরাজিত হয়েছেন এবং জামানত হারিয়েছেন।

এবারের সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষই নিপীড়নের শিকার হয়েছে। দুই দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী গুম ও খুনের ভিকটিম। যাদের প্রতি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়বদ্ধতা আছে। তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ তারা সংসদে যেতে পেরেছেন। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নেতারাও সংসদে যাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষ মনে করে, জাতীয় ইস্যুগুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। রাজপথ নয়, রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হবে সংসদ।

নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের নেতাদের বাসায় গিয়ে সৌহার্দ্যের বার্তা দিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা সরকারের ভালো কাজে সমর্থন দেবেন; কিন্তু জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সংসদের ভেতরে-বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। বিরোধী দলের এমন ভূমিকা দেশের মানুষ দেখতে চায়।

এরপরও সত্য হলো, বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে সরকারপ্রধানের সাক্ষাতে যে সৌহার্দ্যের বার্তা দেওয়া হয়েছিল, তা একদিনের মধ্যেই মিলিয়ে গেছে।

সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সদস্যরা একমত হতে পারেননি। জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা সেই শপথ নেননি। শুরুতেই ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে যে অবিশ্বাস তৈরি হলো, তা আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ শপথ নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষের নেতারা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন বিরোধী দলের নেতারা। শুরুতেই মানুষ আশাহত হয়েছে। আবার পুরোনো ধারার রাজনীতিতে দেশ ফিরে যাবে কি নাÑতা নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে।

ক্ষমতাসীন দলকে একটি বিষয় উপলব্ধি করতে হবে—এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান কিংবা অতীতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ২০২৪ সালের আন্দোলনের গুণগত পার্থক্য রয়েছে। এই আন্দোলনে চৌদ্দশতের বেশি মানুষ মারা গেছে। বিশ হাজারের বেশি মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। দেশের রাজপথে নারী, শিশু ও কিশোররা নেমে এসেছিল। এ দেশের রাজনীতিতে কিংবা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে অতীতে কখনো গৃহবধূরা রাস্তায় নামেননি; কিন্তু চব্বিশে আমরা সেই দৃশ্য দেখেছি। স্কুলের শিশু-কিশোররা অতীতে রাস্তায় সরকারের পতনের জন্য স্লোগান দেয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালগুলো গ্রাফিতিতে আগে কখনো ভরে যায়নি। চব্বিশের আন্দোলনে সেই ঘটনাগুলো ঘটেছে।

আজ যে শিশুটি মাধ্যমিকে পড়ছে, সে কয়েক দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। এই শিশুরা দেয়ালে দেয়ালে লিখেছিল তারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চায়। রাজনৈতিক দলের নেতারা কী করছেন, সেদিকে তারা তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। তাদের ‘স্কুলের শিক্ষার্থী, রাজনীতি বোঝে না’—এই যুক্তিতে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা যেন ভুলে না যাই, এই আন্দোলনে শুধু ১৩৩ জন শিশু মারা গেছে।

এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল কত আসন পেয়েছে, সেটি মূল বিষয় নয়। রাজনৈতিক নেতাদের ভোটের হিসাব মাথায় রাখতে হবে। নিপীড়ক রাজনৈতিক দলটির অনুপস্থিতির পরও ৫৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। পতিত ফ্যাসিবাদী দলের সমর্থকদের বড় একটি অংশও ভোটে অংশ নিয়েছে। সেদিক বিবেচনায় নিলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে ভোটের ব্যবধান বেশি নয়। এর মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বার্তা দিয়েছে। গণভোটে যারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তারা যেন প্রতারিত বোধ না করেন, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলো যেন ভুলে না যায়। রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব পূরণ করতে না পারে, তাহলে আরেকটি রক্তাক্ত সময় দ্রুত চলে আসতে পারে। এমন সময় যেন না আসুক, আমরা তা দেখতে চাই না।

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন