আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আরবদের জন্য হুমকি ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল

জোসেফ মাসাদ

আরবদের জন্য হুমকি ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল
এআই নির্মিত ছবি

নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করতে দেওয়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে এখন এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, আমেরিকান সেনাদের উপস্থিতি তাদের রক্ষা করে না, বরং আরো বিপদে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরাইলকেই রক্ষা করে, নিরাপত্তা দেয়, আরবদের নয়। ইসরাইলের যুদ্ধংদেহী নীতি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী কৌশলেরই একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের প্রতি আরব দেশগুলোর শত্রুতা তীব্রতর করা এবং তাদের ইরানে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে প্রকাশ্যে যোগ দিতে উসকানি দেওয়া। আমেরিকান ইহুদি বিলিয়নিয়াররা এক দশক ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতাকে উসকে দিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা প্রায় দেড় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা অ-খ্রিষ্টান ও অশ্বেতাঙ্গ বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরুর আগে মার্কিন কমান্ডাররা তাদের সৈন্যদের বলেছিলেন, তাদের এই অভিযান ‘আর্মাগেডন’ বা ‘মহাযুদ্ধের’ পক্ষে একটি যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ ‘যিশুর প্রত্যাবর্তন’ ঘটাবে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি রাজনীতির মধ্যে গভীর আদর্শগত যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তার একদিকে আছেন ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান ও ইহুদি জায়নবাদীরা, যারা ইরান ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে আছেন ডানপন্থি খ্রিষ্টানরা, যারা বিশ্বাস করেন যে, আমেরিকাকে ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে টেনে আনা হচ্ছে। একইভাবে প্রগতিশীল ইহুদিসহ আমেরিকার বামপন্থিদের অনেকেই মনে করেন, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান যুদ্ধে টেনে এনেছে। নেতানিয়াহু ইসরাইলের স্বার্থেই ট্রাম্পকে ইরান আক্রমণে প্ররোচিত করেছেন।

আমেরিকার প্রধান প্রতিরক্ষা শিল্প এবং জ্বালানি সংস্থাগুলো বিশেষ করে প্যালান্টিয়ার, লকহিড মার্টিন, এক্সন, রেথিওন এবং বোয়িংয়ের মতো কোম্পানিগুলো এই যুদ্ধ থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে এবং বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বিপুল অস্ত্র দেয়, কারণ ইসরাইলের আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করে।

আরবদের নীরবতা

ওমান ছাড়া কোনো আরব সরকারই ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানায়নি। ওমান এই আগ্রাসনকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন আনসার আল্লাহ (হুতি) ছাড়া কোনো আরব দেশই ইরানে ১৭০ জনের বেশি স্কুলছাত্রীর গণহত্যা কিংবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবার এবং সহযোগীদের হত্যার জন্য ইরানের প্রতি সমবেদনা জানায়নি।

ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইরানের কাছে সমবেদনা জানিয়েছেন। অথচ আরব সরকারগুলো এ ব্যাপারে নীরব থেকেছে। চলমান সংঘাত নিরসনে মিশরীয় ও তুর্কি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

আলজেরিয়া কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে অটল ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেশটি গাজা উপত্যকা দখলে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগে ভোট দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরই দেশটি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।

কায়রোর আল-আজহারের প্রধান ইমামও ইরানের নিন্দা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডানের (কাতার ও সৌদি আরব বাদ) প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তিনি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাননি। এমনকি খামেনিকে হত্যার ঘটনায়ও সমবেদনা জানাননি।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং জর্ডান দাবি করছে যে, ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু মার্কিন বাহিনী যে ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য তাদের ভূখণ্ড এবং আকাশসীমা ব্যবহার করছে সেই সত্যটি এসব দেশ উপেক্ষা করছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া আরব দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডের কিছু অংশের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে হস্তান্তর করেছে।

আরব দেশগুলোর এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের ইরাক, সিরিয়া এবং বর্তমানে ইরানে আগ্রাসন চালানোর জন্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। এসব দেশ ‘নিরপেক্ষ’ থাকার দাবি করছে অথচ ইরানে আগ্রাসনের জন্য ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের তাদের আকাশপথ ব্যবহারের নিন্দা জানাচ্ছে না বা প্রতিরোধ করছে না।

ঘাঁটি ও সার্বভৌমত্ব

মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন চুক্তি অনুসারে এসব আরব দেশের কোনোটিরই তাদের ভূখণ্ডে কতজন মার্কিন সৈন্য আসছে বা দেশে ফিরে যাচ্ছে, তা জানার অধিকার নেই। সেখান থেকে পরিচালিত মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডের ওপর কথা বলার অধিকারও নেই তাদের। এটি কৌতূহলোদ্দীপক যে, গত বছর সেপ্টেম্বরে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতাদের টার্গেট করে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে কাতারের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোনো আগাম সতর্কতা প্রদান করেনি বা প্রতিরোধ করেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও কাতারকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেনি, যদিও ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে ওই হামলার বিষয়ে আগেই জানিয়েছিল। অথচ কাতার এখন ইরানের পাল্টা হামলা থেকে দেশটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনা রক্ষার চেষ্টা করছে ।

সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা এবং ওমান, তুরস্ক ও আজারবাইজানের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো কয়েকটি হামলায় ইসরাইল জড়িত রয়েছে। কিন্তু এসব হামলার দায় ইরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলার দায় ইরান স্বীকার করেছে। কিন্তু অন্য হামলাগুলোয় তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছে ইরান।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডে থাকা বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইসরাইলে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে তাদের প্রতিরোধ সক্ষমতা ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং এই অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে। আরব শাসকরা মার্কিনিদের যতই সুবিধা দিক না কেন, ইসরাইলই যে সবসময় থাকবে ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারের তালিকায়, তা এখন স্পষ্ট।

কে কাকে হুমকি দিচ্ছে

মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করতে দেওয়া আরব দেশগুলোর এটা বোঝা উচিত, মার্কিন সেনা উপস্থিতি তাদের রক্ষার পরিবর্তে তাদের জনগণকে মারাত্মক বিপদের মুখে ফেলেছে। এই ঘাঁটিগুলো না থাকলে তারা ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হতো না।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং জর্ডানসহ কোনো দেশেই কখনো আক্রমণ করেনি অথচ এই জর্ডানই ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিনা উসকানিতে ইরানে ইরাকের আক্রমণের সময় সাদ্দাম সরকারকে ব্যাপক আর্থিক, সামরিক, রসদ, প্রচারণামূলক এবং কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। এই যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়। কিন্তু ইরান জর্ডানে কখনোই প্রতিশোধমূলক হামলা করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মিত্র ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাসক রেজা শাহ পাহলভির একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকেই এসব আরব দেশ ইরানকে হুমকি দিয়ে আসছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে সমর্থন করছে। সৌদি আরব ১৯৮১ সাল থেকে একটি আরব কৌশল এগিয়ে নিচ্ছে, যা প্রথম উপস্থাপন করেন দেশটির তৎকালীন যুবরাজ ফাহাদ। এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো ইরানের কথিত হুমকিকে দমন করা এবং আরব জনগণকে এটা বোঝানো যে, আরবদের প্রধান শত্রু ইসরাইল নয়, ইরান। যদিও ইসরাইল তখনো এবং এখনো আরব বিশ্ব ও ইরানের জন্য বড় হুমকি।

২০০২ সালে সৌদি যুবরাজ আবদুল্লাহর তথাকথিত আরব শান্তি পরিকল্পনায় ফাহাদের উদ্যোগটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ইসরাইলের প্রতি আরবদের এই ছাড় এবং ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র যে আরব দেশগুলো এবং গণহত্যার শিকার ফিলিস্তিনিদের আরো বিপন্ন করেছে, তা আরব শাসকরা এখনো আমলে নেয়নি।

মস্কোতে আরব রাষ্ট্রদূতরা সম্প্রতি রুশ সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন, যেন তাদের দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা বন্ধে ইরানের ওপর মস্কো চাপ সৃষ্টি করে। এর জবাবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, আরবরা ইরানে আগ্রাসনের প্রথমদিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষ নিয়েছে। তারা নিরপেক্ষ নয়, বরং তাদের নিরপেক্ষ থাকার দাবি শুধুই ভান। এই যুদ্ধে আরব দেশগুলো যে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে, তার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্বই যে তাদের নিরাপত্তার জন্য আসল হুমকি, তা যদি এখনো তারা বুঝতে না পারে, তবে আর কখনোই বুঝবে না।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন