ইরানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানকে চীন ও রাশিয়া কোনো সহযোগিতা করছে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনেই কৌতূহল রয়েছে। কারণ ইরান অথবা চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া হয়তো ইরানকে কিছুটা সহযোগিতা করছে। মার্কিন কর্মকর্তারাও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তি যুদ্ধে নীরবে ইরানকে সহযোগিতা করছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের সময় ইরানকে মস্কোর গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে সম্প্রতি তিনজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, রাশিয়া ইরানকে সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এবং বিমানের সুনির্দিষ্ট অবস্থানও অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের তথ্য সরবরাহ ইরানের সঙ্গে মস্কোর কৌশলগত জোটের চেয়েও বেশি কিছুর ইঙ্গিত দেয়। নতুন এই কৌশলের মাধ্যমে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামনাসামনি লড়াই ছাড়াই ইরানের পক্ষে যুদ্ধ করছে। এটি এমন একটি যুদ্ধ, যেখানে ট্যাঙ্ক বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, বরং রাডার বিম, স্যাটেলাইট ফিডসহ অত্যাধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি দিয়ে লড়াই করা হয়। চীনও ইরানকে একই ধরনের সহায়তা দিচ্ছে। তারা ইরানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করছে। আজ উপসাগরে যে যুদ্ধক্ষেত্র, সেখানে দুই পক্ষই পরস্পরের রাডার ও ইলেকট্রনিক তথ্যপ্রবাহকে অকেজো করে অন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে নিজে জেতার জন্য লড়াই করছে।
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার জন্য ইরানি ড্রোন এবং যুদ্ধাস্ত্র পেয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার বিভিন্ন অবস্থানে আক্রমণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যার মধ্যে পুতিনের বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থানও রয়েছে। মস্কোর কাছে সেসব তথ্য আছে। সে কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলের যুদ্ধে মস্কোর হিসাব-নিকাশ বোঝা কঠিন কিছু নয়।
সংকেত যখন অস্ত্র হয়ে ওঠে
সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল জানেন, আধুনিক যুদ্ধে তথ্যের সমন্বয় কীভাবে প্রায়ই বুলেটের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। কেউ যখন জানে তার শত্রু কোথায় আছে, তখন সে ওই যুদ্ধে বিজয়ী হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের এই যুদ্ধেও তা-ই ঘটছে। রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন এবং ইসরাইলি যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামগুলো এমন নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম করেছে, যা তেহরানের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইরান কেবল সামরিক গোয়েন্দা উপগ্রহের একটি সীমিত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, যার উন্মুক্ত পানির উপরে দ্রুত গতিশীল নৌযান ট্র্যাক করার পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই।
রাশিয়া ইরানের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। রাশিয়ার কানোপাস-ভি স্যাটেলাইটসহ উন্নত নজরদারি নেটওয়ার্ক ইরানের সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য স্থানান্তরিত হওয়ার পরে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘খাইয়াম’। এটা তেহরানকে সার্বক্ষণিক অপটিক্যাল ও রাডার চিত্র সরবরাহ করে। এটি ইরানের নির্ভুল হামলার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে।
কুয়েতে একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানি ড্রোন হামলায় ছয় সেনা নিহত হয়েছে। সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই এই হামলা চালানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলেছেন, সম্প্রতি ইরানের কয়েকটি ড্রোন মার্কিন অভিযানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোয় আঘাত করেছে। এগুলো এমন লক্ষ্যবস্তু, যাদের অবস্থান কোনো সরকারি মানচিত্রে দেখা যায় না। ইরান কীভাবে এগুলো তার হামলার লক্ষ্যবস্তু করতে পেরেছে, তা আন্দাজ করা কঠিন নয়।
চীনের নীরব হাত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই যুদ্ধে চীনের ভূমিকা আরো নীরব, কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। চীন বছরের পর বছর ধরে ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষেত্রের ভূদৃশ্য পুনর্গঠন এবং দেশটিকে উন্নত রাডার সিস্টেম রপ্তানি করেছে। মার্কিন জিপিএস থেকে সংগৃহীত তথ্য তার বেইডু-৩ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশে ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ডে স্থানান্তর করেছে। এছাড়া ইরানি বাহিনীর জন্য সাংকেতিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং ভূখণ্ডের ম্যাপিং সাপোর্ট করার জন্য সম্প্রসারিত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে চীন।
ইসরাইলি বিমান বাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল আমোস ইয়াদলিন বলেছেন, তথ্যপ্রবাহের যুদ্ধে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি শনাক্তকরণ এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ক্ষেত্রে সময় কমাতে পারে, তবে তা আকাশযুদ্ধে ভারসাম্য পরিবর্তন করে দেবে। চীন সময় কমানোর চেয়েও বেশি কিছু করেছে। তারা আক্রমণের পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের পুরো বিষয়টিকে নতুন করে আকার দিয়েছে। ওয়াইএলসি-৮বি অ্যান্টি-স্টিলথ রাডার চীনের সরবরাহ করা একটি ইউএইচএফ ব্যান্ড সিস্টেম, যা মার্কিন স্টিলথ বিমানে রাডার শোষণকারী আবরণের কার্যকারিতা হ্রাস করার জন্য ডিজাইন করা কম-ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ ব্যবহার করে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান ৫০টি সিএম-৩০২ সুপারসনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। চীনের ওয়াইজে ১২-এর রপ্তানি রূপ, যা ম্যাক-৩ গতিতে চলতে এবং সাগরে স্কিমিং করতে সক্ষম। এটি জাহাজের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতাকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সংকুচিত করে। সামরিক বিশ্লেষকরা এগুলোকে বিমানবাহী রণতরি ধ্বংসকারী হিসেবে অভিহিত করেন।
মার্কিন-ইসরাইলি পাল্টা পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে নেই। তাদের গোয়েন্দারা ইরানি নেতৃত্বের গতিবিধি ট্র্যাক করছে, ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ড নোড ম্যাপ করছে এবং অপারেশনস রোয়ারিং লায়ন অ্যান্ড এপিক ফিউরির প্রথম পর্যায়ে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে ইরানি রাডার অবকাঠামো ধ্বংস করছে। এসব পদক্ষেপ তেহরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মেজর জেনারেল ইতান বেন-এলিয়াহু বলেছেন, রাডার ধ্বংস করা কেবল একটি মেশিনকে ছিটকে ফেলা নয়, এটি শত্রুকে অন্ধ করে দেয়। যুদ্ধের প্রথম ঘণ্টাগুলোয় তারা ইরানের অনেকগুলো রাডার মুছে ফেলেছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নায়োনি দাবি করেছেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০টি উন্নত রাডার সিস্টেম ধ্বংস করেছে। যদি এই সংখ্যা আংশিকও হয়, তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইল, উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানী এবং এর বাইরের লক্ষ্যবস্তুতে কীভাবে পৌঁছেছে তার একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ সিবিএসের ৬০ মিনিটসে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আমরা সবকিছু ট্র্যাক করছি।’
ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য
কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল ছিল মার্কিন-ইসরাইলি প্রযুক্তিগত আধিপত্যের এক অপ্রতিরোধ্য রণাঙ্গন। সেই আধিপত্য এখনো বিলুপ্ত হয়নি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চীনা সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং রাশিয়ান গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একজন সিনিয়র মার্কিন সামরিক কমান্ডার সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, সংকেত হলো নতুন বুলেট; যে স্পেকট্রাম নিয়ন্ত্রণ করে, সে যুদ্ধও নিয়ন্ত্রণ করে।
১৯৯১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বাহিনী ইরাকি রাডার নেটওয়ার্কগুলো জ্যাম করে সাদ্দাম হোসেনের প্রতিরক্ষাকে এতটাই বিভ্রান্ত করেছিল যে, মার্কিন বিমানগুলো প্রায় নির্ভয়ে ইরাকে আক্রমণ করেছিল। রাডার নেটওয়ার্ক হারিয়ে ইরাক অন্ধভাবে যুদ্ধ করে হেরে গিয়েছিল।
ইরান গত তিন দশক ধরে সেই যুদ্ধটি ঘনিষ্ঠভাবে অধ্যয়ন করেছে। তারা পরবর্তী প্রতিটি সংঘাত মনোযোগ দিয়ে পর্যালোচনা করেছে, যেখানে প্রযুক্তিগতভাবে নিম্নমানের শক্তি ইরাককে আকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। রাশিয়ার স্যাটেলাইট ফিড এবং চীনের রাডার স্থাপত্য আংশিকভাবে ইরানের সেই শিক্ষার উত্তর। তেহরান পরবর্তী বাগদাদে পরিণত না হওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার মুখে ইরানের টিকে থাকার বাইরেও একটি গভীর কৌশলগত যুক্তি কাজ করছে। চীন এই সংঘাতকে জীবন্ত আগুনের পরীক্ষাগার হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীর রক্ত ঝরাতে এবং উপসাগরে তাদের ইন্টারসেপ্টর মজুত শেষ করতে ইরানকে সক্ষম করা কেবল রাশিয়ার একটি লেনদেন নয়, বরং এটি কৌশলগত ঋণ পরিশোধের একটি রূপ।
উপসাগরীয় অঞ্চল প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যেখানে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রচলিত অস্ত্রশক্তির চেয়ে বেশি নির্ধারক প্রমাণিত হতে পারে। সৈন্য মোতায়েন বা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্যপ্রবাহ এবং উপগ্রহের মাধ্যমে সামরিক জোট পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। রাশিয়া ও চীন তেহরানের জন্য বৃহৎ সেনাদল পাঠাচ্ছে না; বরং তারা ইরানের জন্য আরো টেকসই কিছু করছে। আর তা হচ্ছে—তারা ইরানকে শেখাচ্ছে কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর পরিপূর্ণ নজর রাখতে হয়।
রাডার রশ্মি এখন ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই মারাত্মক। গোয়েন্দা সংস্থাই এখন যুদ্ধের নির্ধারক হয়ে উঠেছে। এ ধরনের একটি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিয়ে ইরান এমন সমতার জন্য লড়াই করছে, যা এর আগে দেখা যায়নি এবং এর অংশীদাররা প্রথমবারের মতো ইরানকে এই সক্ষমতা প্রদান করছে।
আল জাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

