আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভোটের দরজায় বাংলাদেশ

মেহেদী হাসান

ভোটের দরজায় বাংলাদেশ

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভোটের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার দেশবাসীকে ইতিহাসসেরা একটি নির্বাচন উপহার দেওয়ার কথা বলেছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ইতিহাসসেরা হওয়ার ওপর নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ। ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার আলোকে কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে তাদের রায় দেওয়ার জন্য। এ দেশের মানুষ এর আগে সর্বশেষ ভোট প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছিল ২০০৮ সালে। কিন্তু সেই নির্বাচনের ফল ভোটারদের রায় অনুযায়ী হয়নি। নির্বাচনের ফল আগেই ঠিক করে রেখেছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। পাতানো সেই নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানোর পর দেশবাসী সাড়ে ১৫ বছর ধরে বারবার দেখেছে ভোটের নামে চরম এক তামাশা। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের ফলে আবার সুযোগ এসেছে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশবাসী সম্পূর্ণ নতুন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি আজও। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের চেতনা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন আজও পূর্ণমাত্রায় জাগ্রত মানুষের মনে। তারা চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। কারণ তারা জানে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হওয়া মানে আবার সেই পুরোনো আবর্তে বাংলাদেশের ফিরে যাওয়া। সেটি তারা কোনো অবস্থাতেই হতে দেবে না। জুলাই বিপ্লব এখনো পূর্ণ হয়নি এবং এ বিপ্লব এখনো মরেও যায়নি। চলমান এ বিপ্লবকে সফল করার পথে জাতি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নামক একটি সিংহ দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো অবস্থাতেই এ ট্রেন মিস করা যাবে না এবং মিস হতেও দেওয়া যাবে না।

বিজ্ঞাপন

পতিত মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনা ও দেশ-বিদেশে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা নির্বাচন বানচাল বা নিদেনপক্ষে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের লক্ষ্য, নির্বাচন বানচালের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চরম এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া, যাতে আবার তাদের ফিরে আসার রাস্তা তৈরি হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন যেন তাদের ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের কোনো হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়ে প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষকে অতন্ত্র প্রহরীর ‍ভূমিকা পালন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, কোনো কারণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশ যদি নৈরাজ্যের দিকে ধাবিতে হয় এবং ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হয়, তাহলে ব্যর্থ হয়ে যাবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব। ব্যর্থ হয়ে যাবে দেড় হাজারের বেশি মানুষের জীবনদান, হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়া ও কোটি কোটি মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশ আবার ফিরে যাবে সেই জুলাই বিপ্লবের আগের পুরোনো চেহারায়। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ব্যর্থ হলে শুধু জুলাই বিপ্লব নয়, অকার্যকর হয়ে যাবে ১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতাও। তাই, যেকোনো মূল্যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সফল করতেই হবে। এর দ্বিতীয় কোনো পথ আর খোলা নেই বাংলাদেশের সামনে। মনে রাখতে হবে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ আর ভোট দিতে পারাটাই সব নয়, জনগণের ভোট অনুযায়ী ফল নিশ্চিত করতে না পারলে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।

অনেক কারণে এবারের নির্বাচন ব্যতিক্রম। ১৯৯১ সালের পর থেকে অনুষ্ঠিত গ্রহণযোগ্য প্রতিটি নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তথা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবার ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ নির্বাচনের মাঠে নেই। অন্য প্রধান দল বিএনপি রয়েছে নির্বাচনের মাঠে। সে হিসেবে এ নির্বাচনে বিএনপির অপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কথা ছিল ভোটের মাঠে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আকস্মিক জামায়াতে ইসলামী বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বড়মাত্রায় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আলজাজিরা, বিবিসি, ডয়চে ভেলেসহ আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী অনেক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক খবরে বলা হয়েছে, ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়ছে জামায়াত। ক্ষমতাকেন্দ্রিক ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতের আকস্মিক এই উত্থান ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অনেক সমীকরণ ও ক্লাইমেক্স। নির্বাচনে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, নতুন উত্তেজনা। বাংলাদেশ নিয়ে গভীর আগ্রহ ও স্বার্থ রয়েছেÑএমন প্রতিটি দেশ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ভারতে পালিয়ে যান মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনা। তার সঙ্গে পালিয়ে যান তার মন্ত্রী, এমপিসহ দলীয় অনেক নেতাকর্মী। কিন্তু প্রায় অক্ষুণ্ণ রয়ে যায় আওয়ামী লীগের সাজানো প্রশাসন। রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে বহাল রাখা হয় মাফিয়াতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের। অতিমাত্রায় কুখ্যাত হিসেবে চিহ্নিত কয়েকজন কর্মকর্তা নিজ থেকে পালিয়ে যান এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কয়েকজনকে রদবদল করা হয়। বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এছাড়া সরকার ফ্যাসিবাদ নির্মূলে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেনি। গুম, খুন, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, বিরোধীদের দমন-পীড়নের দায়ে অনেককে বিচারের আওতায় আনা হলেও মাফিয়াতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের দোসর আমলাসহ অনেকে ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। প্রশাসনকে আওয়ামীমুক্ত করে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা অনুসারে জনকল্যাণমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বারবার দাবি জানানো হলেও তা করা হয়নি। তাছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের কতটা নিয়ন্ত্রণ আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অনেক আগে থেকে। নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ।

এ অবস্থায় বর্তমান সরকার নির্বাচনের পথে যাত্রা করে। কাঙ্ক্ষিত ইতিহাসসেরা নির্বাচনের পথে এসবই ঝুঁকির দিক। পাশাপাশি ভারত শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছে নির্বাচন বানচাল করার জন্য। শেখ হাসিনা ভারতে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন নির্বাচন বয়কট ও নস্যাৎ করার জন্য। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নো বোট, নো ভোট’। নৌকা ছাড়া তিনি নির্বাচন হতে দেবেন না। নির্বাচনের আগে বড় ধরনের নাশকতা ঘটিয়ে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসা ঠেকানোর জন্য তারা চেষ্টা করবে বলে খবর বেরিয়েছে। তবে সে সম্ভাবনা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। কারণ কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন থেকে আর মাত্র একদিন দূরে আছি আমরা। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সবপক্ষ সঠিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করলে এবং দেশপ্রেমিক জনগণ আবার ৫ আগস্টের মতো মাঠে থাকলে নির্বাচনের দিন ঘিরেও তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য।

তবে বড়মাত্রায় আশঙ্কা রয়েছে অন্যত্র। ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত লোভের কারণে যারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তারা নিজেরাই বড় ধরনের হানাহানিতে জড়িত হতে পারে। জনগণের রায় মেনে না নেওয়ার মানসিকতা জন্ম দিতে পারে বড় ধরণের বিশৃংখলা ও হানাহানি।

একসময় মানুষের মনে প্রশ্ন ছিল, নির্বাচন হবে কী হবে না সেটা নিয়ে। সে আশঙ্কা ‍দূর হয়েছে। এখন অনেকের মনে প্রশ্নÑসারা দেশে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে কি না, সে বিষয়ে। বিভিন্ন কারণে রয়ে গেছে এ আশঙ্কা। তবে এ আশঙ্কার মধ্যেই তাদের একান্ত চাওয়া হলো নির্ভয়ে সবাই যেন ভোট দিতে পারে এবং নির্বাচনের ফল যেন ভোটারদের রায় অনুযায়ী হয়, সেটা নিশ্চিত করা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রধান দুটি দলেরই শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। একাধিক নেতা ২০০৮ সালের মতো ‘পাতানো’ ও ‘নীলনকশার’ নির্বাচনের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তবে সরকারিভাবে নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর এ ধরনের অভিযোগের কথা নেতাদের মুখে কম শোনা না গেলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে এখনো নানা ধরনের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর মূল কারণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে না পারা এবং হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের অব্যাহত ষড়যন্ত্র।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়ে দেশব্যাপী মোতায়েন রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলার সার্বিক যে চিত্র দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে, তা আশা করেনি দেশের অনেক মানুষ। অনেকেই বলেছেন, সেনাবাহিনী মাঠে আর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন ঢিলেঢালা অবস্থাÑএটা অতীতে দেখা যায়নি। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সেনাবাহিনী মাঠে নামা মানে জাদুর কাঠির মতো সমাজ থেকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অদৃশ্য হয়ে যায়। মানুষের মনে নেমে আসে শান্তি ও নিরাপত্তাবোধ। ‍নিমিষে ‍দূর হয়ে যায় ভয়ভীতি ও আতঙ্ক। সমাজে বুক ফুলিয়ে সাহসের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারে সাধারণ মানুষ। কিন্তু অপারেশন ডেভিল হান্টসহ বারবার বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করার পরও এবার সেনাবাহিনীর ভূমিকায় সাধারণ জনগণ আগের মতো সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পরপর তিনটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে মানুষের মনে যে আস্থা ও শান্তি ফিরে আসে, তার কোনো তুলনা নেই। মানুষের মন থেকে দূর হয়ে যায় সব ভয়ভীতি। নির্বাচন পরিণত হয় এক আনন্দ উৎসবে। এবার সেনাবাহিনী একইভাবে অতীতের সেই উজ্জ্বল স্মতির সাক্ষ্য স্থাপন করবেÑএমনটাই প্রত্যাশা প্রতিটি মানুষের। প্রতিটি ভোটার যেন শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেনÑসেটা নিশ্চিত করার এক গুরু দায়িত্ব আজ অর্পিত সেনাবাহিনীর ওপর। মনে রাখতে হবে, এটি শুধু একটি ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার একটি মহান যাত্রা। আগামীর বাংলাদেশের সেই যাত্রায় অবদান রাখার অসামান্য এক ভূমিকা পালনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশবাসীর প্রত্যাশা, সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ নির্মাণের সাক্ষী হয়ে থাকবে সেনাবাহিনী। তাই ১২ ফেব্রুয়ারি অমর হয়ে থাক সিপাহি-জনতার মেলবন্ধন সৃষ্টির আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী দিন হিসেবে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন